মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশ বেতারের হীরকজয়ন্তী

প্রকাশিত : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৪
বাংলাদেশ বেতারের হীরকজয়ন্তী
  • সমুদ্র হক

দূরশ্রুতি মাধ্যম বেতার বা রেডিও শুধু এই উপমহাদেশ নয় বিশ্বজুড়ে কতটা জনপ্রিয় ছিল তা সামান্য শব্দে লিখা খুবই কঠিন। বাংলায় আকাশচুম্বী বা আকাশ ছোঁয়া বলে একটা শব্দ আছে। এই আকাশ পথেই শব্দ তরঙ্গায়িত হয়ে ধরা পড়ত এই একটি বাক্সে। যা রেডিও সেট। বেতারের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েই গিয়েছিল। এই দেশে বেতারের যাত্রা শুরু ৭৫ বছর আগে ১৯৩৯ সালে। ১৯৭১ সালে বাঙালী জতির সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ১৬ ডিসেম্বর, ৭৫ বছর আগে ১৯৩৯ সালে এই দেশে বেতারের যাত্রা শুরু হয় বিজয়ের এই লাল তারিখে। আজ যারা প্রবীণ ও মধ্যবয়সী তাঁদের কানে বেতার (রেডিও) শব্দটি পৌঁছার সঙ্গেই নষ্টালজিক হয়ে পড়েন। ৫০ ও ৬০ এর দশকে যাদের ঘরে রেডিও ছিল গ্রাম ও শহরের মানুষ তাদের মান্য করত। সেদিনের রেডিও ধরন ছিল এ রকম- চৌকোনা বড় বাক্সের মতো দেখতে। সম্মুখ ভাগে সূক্ষ্ম জালের মতো যার ভেতরে থাকে স্পীকার। রেডিও শোনার জন্য ছিল চৌকোনা বড় ব্যাটারি। চার পিনের একটি প্লাগ সেই ব্যাটারিতে লাগিয়ে রেডিও অন করে শোনা যেত। এর আগে ছাদে মাছ ধরা জালের মতো দুই ইঞ্চি প্রস্থ ও ৭-৮ ফুট লম্বা একটি এরিয়েলের সঙ্গে বেতার সংযোগের তার লাগাতে হতো। সেদিনের রেডিওর মধ্যে মারফি, মিডিয়েটর ব্র্যান্ড ছিল অতি পরিচিত। বড় ব্যাটরির মধ্যে এভারেডি এক্সাইডের ছিল সুনাম। ৬০-এর দশকেই এইসব বড় রেডিওর পাশে টর্চের ব্যাটারি চালিত রেডিও প্রথম বাজারজাত করে একটি বহুজাতিক কোম্পানি। এই রেডিও পরিচতি পায় ট্রানজিসটর নামে। ৬০-এর দশকেই এই ট্রানজিসটর মধ্যবিত্তের ঘরে বড় বিনোদন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। খবরের পাশাপাশি গান, নাটক, কৃষি, শিল্প, পরিবার-পরিকল্পনা, নারী বিষয়সহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান এতটাই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে যে শ্রোতা সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যায়। গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে উঠানে রেডিও রেখে চারধারে লোকজন বসে অনুষ্ঠান শুনত। ৬০-এর দশকের মধ্যভাগে স্কুল ও কলেজে টিফিন পিরিয়ডে রেডিও শুনত শিক্ষার্থীরা। স্কুলে রেডিও শোনা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও কলেজে তা ছিল অনিয়ন্ত্রিত। ছেলে ও মেয়েদের কমন রুমে আলাদা রেডিও সেট। কে কোন কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনবে এ নিয়ে তর্ক শুরু হয়ে যেত। ধনী, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের তরুণ-তরুণীরা এত ভাল শ্রোতা ছিল যে বেতারের কোন অনুষ্ঠান কখন তা নখদর্পণেই থাকত। সেদিনের ঢাকা বেতারের অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমাজ সংস্কার বিষয়ক মজিদের মা সিরিয়াল নারী উন্নয়নে ও চেতনায় বড় অবদান রাখে। সেদিনের তরুণদের কাছে বেতারের আধুনিক গান সিনেমার গান প্রচারের পাশাপশি সপ্তাহে একদিন অনুরোধের আসর প্রচারিত হতো। এই আসরে গান শোনার জন্য কত যে চিঠি যেত। অনুরোধের আসরে যাদের অনুরোধে গান তাদের নাম ঘোষণা করা হতো। তরুণ-তরুণীরা অপেক্ষায় থাকত কখন কার নাম ঘোষিত হয়। সেদিনের ঘোষক-ঘোষিকাদের কণ্ঠ ছিল জাদুকরি। কথা শুনেই হার্ট থ্রবের অবস্থা। সেদিনের সংবাদ পাঠকরা ছিলেন শিল্পী। সংবাদও যে কত বড় শিল্পকর্ম তা সেদিনের পাঠকগণ বুঝিয়ে দিয়েছেন। রেডিওর গীতিকার ও সুরকার যে কত মেলোডি সুর সৃষ্টি করে প্রচার করত যা শুনে কেউ মনে করত সিনেমার গান কিনা। এভাবে বেতারের অনেক গান চলচ্চিত্রে স্থান পায়। ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বেতারে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার বন্ধ করে দিলে অনেক শিল্পী কলাকুশলী তার প্রতিবাদ জানায়। বেতারের এগিয়ে চলার পালায় আসে গণআন্দোলন। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী সরকারের রোষানলে পড়েও বেতারের শিল্পী প্রযোজেকগণ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অনুষ্ঠান প্রচার করেছেন। বেতারে অনেক প্রযোজক পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনে যোগদান করেন। যাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন, আতিকুল হক চৌধুরী (দু’জনই প্রয়াত)। বেতারে আবদুল্লাহ আল মামুন প্রযোজনা করেন এমন সব প্রতীকী নাটক যা পাকিস্তান সরকারের পিঠে চাবুক মারার মতো। সেদিনের ঢাকা বেতারের ইনটেলিজেন্ট কর্মকর্তাদের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারেনি পাকিস্তানের মিলিটারিরা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ বেতার থেকে সরাসরি প্রচারের ঘোষণা দেয়া হয়। গ্রামে শহরে দেশের সকল মানুষ এই ভাষণ রেডিওতে শোনার জন্য ভিড় করে অপেক্ষায় থাকে। বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে বেতার থেকে সেদিনের অনুষ্ঠান ঘোষক বাবুল আখতার (পুরো নাম মঞ্জুর কাদের বাবুল যিনি প্রয়াত) তেজস্বী কণ্ঠে ঘোষণা দেন পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারে বাধা দেয়ায় বেতারের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী এই মুহূর্ত থেকে রেডিও পাকিস্তানের সকল অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিল। এই ঘোষণা সেদিন বাঙালীর রক্ত কতটা টগবগিয়ে উঠেছিল তা সেদিনের তরুণরাই অনুভব করতে পারে। পরদিন সকালে পাকিস্তানী স্বৈরশাসক বাধ্য হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের অনুমতি দিতে। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে বেতার এভাবেই বড় ভূমিকা রাখা শুরু করে। যার ধারাবাহিকতায় শুরু হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ২৫ মার্চ ক্র্যাক ডাউনের পর ঢাকা কেন্দ্র হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দখলে নেয়ার পর বেশিরভাগ শিল্পী কলাকুশলী সীমান্ত অতিক্রম করে বন্ধু দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়। ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং ১৭ এপ্রিল শপথ নেয়ার পর সিদ্ধান্ত হয় বেতার কেন্দ্র স্থাপন ও প্রচারের। ভারত সরকার কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে দ্বোতলা একটি বাড়িতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হয়। দিনভর অনুষ্ঠান রেকর্ড করে স্পুল টেপ পাঠিয়ে দেয়া হয় সীমন্ত এলাকায়। সেখানে বিশেষ ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে অনুষ্ঠান ইথারে প্রেরণ করা হয়। এই প্রচারে বন্ধু সরকার ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ (মধ্যম তরঙ্গ) ট্রান্সমিটার দিয়ে সহযোগিতা করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মে মিডিয়াম ওয়েভ ৩৬১ দশমিক ৪৪ মিটার ব্যান্ডে ৮৩০ কিলোহার্জে সকাল ৬টা ৫৯ মিনিটে উদ্বোধনী ঘোষণা করেন আশফাকুর রহমান। ৭টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী। এরপর অনুষ্ঠান সম্পর্কীয় ঘোষণা। ৭টা ১৫ মিনিটে প্রথম বাংলা সংবাদ পাঠ করেন হাসান ইমাম (তবে নাম ছিল সালেহ আকরাম)। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরু হয়ে ঘণ্টা দুয়েক চলে। সেই অনুষ্ঠান পরদিন সকালে সম্প্রচার করা হয়। দিনে দিনে অনুষ্ঠানের পরিধি বাড়তে থাকে। সংবাদের সঙ্গে গান, নাটক, কবিতা এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, শ্রোতারা প্রতিটি অনুষ্ঠান মনযোগ দিয়ে শোনে। চরমপত্র অনুষ্ঠান ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কল্যাণ মিত্র রচিত জল্লাদের দরবার অনুষ্ঠানে অভিনয় করতেন রাজু আহমেদ আজমল হুদা মিঠু। পিণ্ডির প্রলাপ অনুষ্ঠান করতেন বর্তমানে দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন বেতারের শব্দ সৈনিক। এ ছাড়াও কামাল লোহানী, আলমগীর কবির (প্রয়াত), পারভীন হোসেন, নাসরীন আহমেদ, টিএইচ শিকদার মোস্তফা আনোয়ার, আশরাফুল আলম, নুরুল ইসলাম সরকার, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, শাহীন সামাদ, তিমির নন্দী ফকির আলমগীর সুজেয় শ্যামসহ অনেক শিল্পী কলাকুশলী প্রযোজক সকলেই বড় ভূমিকা পালন করেছেন। যে ভাবেই এগিয়ে যাক প্রচারের ইতিহাসে ৭৫ থেকে আগামীর শত শত বছর বেতার নিজস্ব বলয়ের মর্যাদা নিয়েই ইতিহাসের খাতায় টিকে থাকবে। দেশ বিজয় অর্জনের পর বাংলাদেশ বেতার দেশ গঠনে যে ভূমিকা রেখেছে তা বেতার ইতিহাসে স্বর্ণের অক্ষরে লিখা থাকবে।

প্রকাশিত : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৪

২৫/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: