মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নেপথ্যে পোপ ফ্রান্সিস

প্রকাশিত : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪
কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নেপথ্যে পোপ ফ্রান্সিস
  • শিকদার আরিফ

যুক্তরাষ্ট্রের দাতব্যকর্মী এ্যালান পি গ্রস গেল কুড়ি বছর ধরে কিউবার কারাগারে বন্দী ছিলেন। পোপ ফ্রান্সিসের ব্যক্তিগত অনুরোধে কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্দী প্রত্যর্পণে রাজি হলে তিনি মুক্তি পান। দশ ডিসেম্বর কিউবার বন্দীরা নিজ দেশের মাটিতে ফিরলে এ্যালান গ্রসও মুক্তি পেয়ে চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। এতে দেশ দুটির মধ্যে অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা কূটনৈতিক অচলাবস্থারও অবসান ঘটে। গোপন এই বন্দীবিনিময়ে পোপ ফ্রান্সিস জামিনদারের ভূমিকা রাখেন।

সত্যিকার অর্থে এটা একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে উল্লেখযোগ্য সফলতা ছিল। ১৯৫৯ সালে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিল্পবের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কোচ্ছেদ ঘটে। এই অর্ধশতাব্দিতে সমাজতান্ত্রিক কিউবার পতন ঘটাতে গোপন ও প্রকাশ্যে হেন চেষ্টা নেই যে যুক্তরাষ্ট্র করেনি। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সালÑ এই পাচ বছরে অন্তত আটবার ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। তাঁকে হত্যা করতে তাঁর কলমে হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ লুকিয়ে রাখা হয়, আবার গোপনে তাঁর কাছে ভয়াবহ বটুলিনাম বিষভরা সিগারেট পাঠানো হয়। এছাড়া দেশটির ওপর সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাও ছিল।

১৭ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আকস্মিক ও নাটকীয়ভাবে কিউবার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ঘোষণা দেন। যদিও দেশটির বেশ কয়েকজন সিনেটর এই উদ্যোগ আটকে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে এই ঘোষণাটুকু দিতে ওবামাকে দেড় বছর সময় নিতে হয়েছে। এ সময়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয় দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে। সবকিছু চলেছে অত্যন্ত গোপনে। এ্যালান গ্রসের স্বাস্থ্য খারাপের দিকে যাচ্ছেÑ এই খবর ছড়িয়ে পড়লে তাকে ছাড়িয়ে আনতে যুক্তরাষ্টের চেষ্টা প্রকাশ্য হতে শুরু করে। বেশ কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তার কিউবান প্রতিপক্ষ ব্রুনো রদ্রিগেজ পারিলাকে বলেন, যদি বন্দা অবস্থায় গ্রসের মৃত্যু ঘটে, তবে সম্পর্কোন্নয়নের সব প্রশাসনিক চেষ্টাও ভেস্তে যাবে।

দীর্ঘ বৈরিতার অবসানে দুই দেশের চেষ্টা অত্যন্ত গোপনীয় হলেও গেল মার্চে বারাক ওবামা প্রভাবশালী এক মধ্যস্থকারীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করেন। আর্জেন্টিনায় জন্ম নেয়া পোপ ফ্রান্সিস হলেন ল্যাটিন আমেরিকা থেকে প্রথম রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান। সে সময়ে ওবামা ভ্যাটিকান সফরে গিয়ে কিউবার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে পোপ ফ্রান্সিসকে ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানান। এর কয়েক দিন পর প্রেসিডেন্ট ওবামা ও রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে চিঠি লিখে সমাঝোতায় পৌছতে দুই নেতাকে চাপ দেন পোপ ফ্রান্সিস।

২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা শুরু করেন বারাক ওবামা। তখন তিনি কিউবান-আমেরিকানরা যাতে স্বজনদের কাছে যেতে পারেন এবং কিউবায় তাদের আত্মীয়দের কাছে অর্থ পাঠাতে পারেন, এ ক্ষেত্রে সব বিধিনিষেধ হালকা করেন। ওই বছর এপ্রিলে পশ্চিম গোলার্ধের নেতৃবৃন্দের এক সম্মেলনে ওবামা বলেন, কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু কিউবায় আটক যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার চুক্তিভিত্তিক কর্মী এ্যালান গ্রস ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে সম্পর্কের বরফ গলা থেমে যায়। যদিও তাঁকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অর্থহীন প্রচারাভিযান চালায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি ক্লিনটনের অন্যতম অনুশোচনা ছিল কিউবান কারাগার থেকে তাঁকে মুক্ত করতে না পারা। এরপরেও মেয়াদের শেষ দিকে কিউবার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা পুর্নবিবেচনা করতে ওবামার কাছে তিনি আহ্বান জানান। দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হয়ে ওবামা তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্ব বিবেচনায় কিউবার বিষয়টি শীর্ষে রাখেন।

কিউবা সরকার তার নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে সফরের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ হালকা করলে কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তাবের জন্যে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এই সময়টিকে বেছে নেন। তবে আফ্রিকাজুড়ে ইবোলা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে সেখানে কিউবান চিকিৎসকদের তৎপরতা পৃথিবীর মানুষদের নজর কাড়ে। আমেরিকান দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমস দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্¯’াপনে পরপর বেশ কয়েকটি সম্পাদকীয় ছাপে। পরবর্তীতে দুই দেশের এই বৈরিতা দূরিকরণ প্রক্রিয়ায় ওবামা হোয়াইট হাউসের দুই কর্মকর্তা বেঞ্জামিন জে হোডস ও রিকার্ডো জুনিগাকে নিয়োগ দেন। তাঁরা কানাডায় গিয়ে কিউবার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার টরোন্টো ও অটোয়ায় দুই দেশের মধ্যে সাতটি বৈঠকের আয়োজন করেন। এই গোপন বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তবে কিউবান কর্তৃপক্ষের কাছে হোয়াইট হাউসের বার্তা আদানপ্রদানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ভিয়েতনামের সঙ্গে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্¯’াপন হয়েছে, কিউবার সঙ্গে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন জন কেরি।

দুই দেশের কথা চালাচালির মধ্যে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে নেলসন ম্যান্ডেলার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বারাক ওবামা ও রাউল ক্যাস্ট্রোর মধ্যে এক তাৎক্ষণিক সাক্ষাত হয়। দুই নেতা পরস্পর হাত মেলালেও ওবামা এ্যালান গ্রসের স্বাস্থ্যের অবনতির প্রশ্নটি তখন উত্থাপন করেননি।

কিউবানদের মধ্যে রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রভাব অপরিসীম। যে কারণে ওবামা বিষয়টিতে ভ্যাটিক্যানের সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। পোপের সচিব কার্ডিনাল পিয়াট্রো পারোলিন ভেনিজুয়েলায় দূত হিসেবে কাজ করেছিলেন দীর্ঘদিন। ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতি সম্পর্কে তিনি অভিজ্ঞ। জন কেরি তাঁর সঙ্গে গত জুনে ও সপ্তাহখানে আগে বেশ কয়েকবার বৈঠকে মিলিত হন। এতে দুই দেশের আলোচনা অক্টোবরে একটা ফলপ্রসূ জায়গায় পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার আলোচকদের মধ্যে পোপ ভ্যাটিকানে বৈঠকের আয়োজন করেন। সেখানেই সমঝোতার চূড়ান্ত শর্তে পৌঁছান তাঁরা।

শেষমেশ কিউবা সরকার তার জনগণের প্রতি পোপের প্রভাব অবহেলা করতে পারেনি। বন্দী প্রত্যর্পণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পোপ তাঁর প্রভাব পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন। দুই দেশের বৈরিতা দূরিকরণে বন্দী প্রত্যর্পণই ছিল মূল বাধা। যুক্তরাষ্ট্রের নীল-সাদা রঙের প্লেনটি এ্যালান গ্রসকে নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে উড়াল দেয়ার আগেই কিউবার তিন বন্দী নিজ দেশের মাটিতে পা রাখেন। দুই দেশের চার বন্দী যন্ত্রণাকাতর কারাজীবন থেকে মুক্তি পান, আর দেশ দুটির দীর্ঘ কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতারও অবসান ঘটে।

সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস

প্রকাশিত : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪

২৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: