আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কেওক্রাডাংয়ের পথে

প্রকাশিত : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৪
  • সাইফুল আলম

শীত এলেই পাহাড়ে ভ্রমণে যাওয়া যেন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত শীতে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় উঁচু পাহাড় কেওক্রাডং। অনেকদিন এটাকে দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় হিসেবেই ধরা হতো। কিন্তু বেচারার দুর্ভাগ্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতায় এখন দ্বিতীয় হয়ে গেছে। পড়ন্ত বিকেলে বান্দরবান শহরে পৌঁছেই তড়িঘড়ি করে শহরতলী বাসস্ট্যান্ড চলে এলাম রুমার বাস ধরার জন্য। এখানেও দুর্ভাগ্য পিছু ছড়ালো না, গিয়ে দেখি দিনের শেষ বাসটিও পগারপার।কি আর করা, পরের দিনের সকালের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন গতান্তর রইল না। বাসের বেশিরভাগ যাত্রীই পর্যটক। তারা বিভিন্ন গ্রুপে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছে, কেউ বা যাবে বগা লেক পর্যন্ত, কেউ বা কেওক্রাডং, তাজিনডং, যাদিপাই ঝরনা কেউবা আর দূরে। সবার চোখে-মুখে উত্তেজনা আর বাঁধভাঙ্গা আনন্দ। বাস চলা শুরু তো শুরু হয়ে গেল চোখ ধাঁধানো পাহাড়ের সৌন্দর্য অবলোকন। বাসের জানালা দিয়ে অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে চলে এলাম রুমা বাজারে। এখানে কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। যেমন প্রথমেই বাধ্যতামূলক একজন স্থানীয় গাইড যোগাড় করা পরে আর্মি চেকপোস্টে নিজেদের নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করা। করা হলো সবই। চাঁন্দের গাড়িতে এবার যাত্রা শুরু উদ্দেশ বগা লেক। আমাদের গ্রুপ ছোট বলে অন্য একটা গ্রুপের সঙ্গে জোট বেঁধে গাড়ি রিজার্ভ করা হলো। আমাদের গ্রুপে আমরা ৪ জন আর একজন গাইড, আর অন্য গ্রুপে ওরা ৩ জন আর ১ জন গাইড। সর্বমোট ৯ জনকে নিয়ে নতুন দল হলো। চাঁন্দের গাড়ির সুবিধা হলো চারদিকে খোলা, ডানে বামে সামনে পেছনে আর ওপরের সৌন্দর্য একযোগে উপভোগ করা যায়। পাহাড়ী পথে যতই এগোবেন ততই নতুন নতুন দৃশ্য দেখতে পাবেন। চারদিকে সবুজের ছড়াছড়ি আর উপরে গাঢ় নীল আকাশ। এত নীল আকাশ ঢাকায় কখনও দেখা যায় না।

ঘণ্টা দেড় এক চলার পর এক জায়গায় এসে গাড়ি থামাল। এবার গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে হবে। দিনটি ছিল ছুটির তাই অনেকে এসেছে বগা লেক দেখতে। এখন উঁচু পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠতে হবে বগা লেক দেখতে। পাহাড়ের এই অংশটা বেশ খাড়া, ট্রোকিং করতে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল। উপরে ওঠার সময় দেখলাম অনেকেই আর কুলিয়ে উঠতে না পেরে বসা আবার কেউবা আধোশোয়া অবস্থায় পড়ে আছে। বিশেষ করে স্থূলকায় মহিলাদের অবস্থা খুবই করুণ। আদৌ তাদের লেক দেখা হয়েছিল কি না ওপরওয়ালা জানেন। আমরা পারলাম, বগা লেক দেখলাম, এর সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করার নয়।

এরই মধ্যে দুপুর হয়ে গেল। মধ্যাহ্ন ভোজ শেষ হলো পাহাড়ীদের রান্না করা খাবার আর সুস্বাদু পাকা পেঁপে দিয়ে। কিছুটা বিশ্রাম এরপর পড়ন্ত বিকেলে আবার যাত্রা শুরু উদ্দেশ্যে কেওক্রাডংয়ের চূড়া। যেতে যেতে পথে রাত হয়ে যাবে ভেবে ভয় পাচিছলাম। কিন্তু গাইডদ্বয় আমাদের আশ্বস্ত করল বিকেলে বা রাতে পাহাড়ে ভ্রমণ করা আরামদায়ক আর এই অংশটুকু নিরাপদও বটে। সত্যটি তখনই অনুধাবন করলাম যখন আমরা শীতের গোধূলি বেলাতেও হেঁটে হেঁটে ঘেমে যাচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এলে, আমাদের পথচলা কিন্তু থামল না। একটা দুটো করে তারা জেগে উঠতে শুরু করল, এক সময় সমস্ত আকাশ তারায় তারায় ছেয়ে গেল। এরই মধ্যে আধোচাঁদ তার স্নিগ্ধ আলো দিয়ে পরম মমতায় আমাদের পথ দেখাচ্ছিল। সে কি রোমাঞ্চকর অনুভূতি। এই মায়াবী রাতেও মাঝে মাঝে পেঁচার ডাক আর হঠাৎ দল বেঁধে উড়ে যাওয়া বাদুরের ঝাঁকের ডানার শব্দ কিছুটাও হলে ভুতুরে পরিবেশ সৃষ্টি করছিল। অবাক করা বিষয় হলো, যতই উপরে উঠছি মনে হচ্ছে চাঁদ আর তারাগুলো যেন দ্রুত আমাদের কাছে চলে আসছে। একটু এগোলেই যেন ছোঁয়া যাবে। পাহাড়ী পথে চলা গাড়িগুলো চাঁদের কাছাকাছি চলে যায় বলেই হয়ত সেগুলোর নাম চাঁন্দের গাড়ি।

প্রায় চার ঘণ্টা হাঁটার পর রাত্র ৮ টায় কেওক্রাডং চূড়ায় পৌঁছলাম। রাত কাটানোর জন্য মাচায় ওপরে তৈরি কাঠের ঘরে আশ্রয় নিলাম। হিম শীতল পানিতে হাতমুখ ধোয়ার পরে অনুভব করলাম কনকনে ঠা-া আর হাড়কাঁপানো শীত। আশ্রয়স্থলে পর্যাপ্ত কম্বল থাকায় এ যাত্রায় বাঁচা গেল। বাইরে শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ মনে হচ্ছে প্রচ- ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নৈশভোজের পর সারাদিনের ক্লান্তিকে সঙ্গে নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন একটা ঘুম দিলাম। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সূর্যের অপেক্ষায় রইলাম। এক সময় অতি প্রত্যাশিত তার দেখা পেলাম। দূরে বহু দূরের পাহাড়ের চূড়া গলিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলো। আহ্ সে কি নযনাভিরাম দৃশ্য। দার্জিলিংয়ের টাইগার হিলে দেখা সূর্যোদয় চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। চরম একটা আনন্দময় আর উত্তেজনায় ভরা ক্ষণ কাটানোর জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেরার জন্য পাহাড় থেকে নামা শুরু করলাম। সকালে দূরের পাহাড়ের চূড়ায় স্তরে স্তরে জমে থাকা মেঘগুলোও কিন্তু কম সুন্দর নয়। বেশ কিছুদূর এসে দার্জিলিং পাড়ায় প্রাতরাশ শেষে নীড়ের জন্য আবার পথচলা। ফিরতি পথে গত রাতে না দেখা দৃশ্যগুলোও চমৎকার।

প্রকাশিত : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৪

২৩/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: