মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ঘষিয়াখালী-কুমারখালী চ্যানেল খননে পথ কমছে সাড়ে ৫ কিমি

প্রকাশিত : ২১ ডিসেম্বর ২০১৪
  • চ্যানেল ভরাটের কারণেই অনিবার্য হয়ে পড়ে সুন্দরবন বিপর্যয়
  • আজ জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ দল যাচ্ছে

বাবুল সরদার, রামপাল থেকে ফিরে ॥ বাংলাদেশ-ভারত নৌ-বাণিজ্য প্রটোকলভুক্ত বাগেরহাটের ঘষিয়াখালী-কুমারখালী চ্যানেলের সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার পথ কমছে। চ্যানেলটি এখন সোজা বা সরাসরি লম্বা করে খনন করা হবে। ফলে আন্তর্জাতিক এ নৌরুটটি বর্তমান ২২ কিলোমিটারের পরিবর্তে কমে সাড়ে ষোল কিলোমিটারে দাঁড়াবে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ আন্তর্জাতিক নৌরুটটি খনন না করায় পলি জমে ভরাট হয়ে যায়। এ অবস্থায় পরিবেশবিদ ও সুন্দরবন বিভাগের আপত্তি সত্ত্বেও ২০১১ সালের এপ্রিল মাস থেকে সুন্দরবনের শ্যালা নদী হয়ে মংলা বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করে। অনেকেই মনে করেন, ঘষিয়াখালী-কুমারখালী চ্যানেলটি চালু থাকলে ফার্নেস অয়েল ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনা ঘটত না। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের এত বড় ক্ষতি হতো না।

খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আবদুস সামাদ জানান, ঘষিয়াখালী-কুমারখালী চ্যানেলটি বর্তমানে ২২ কিঃমিঃ দীর্ঘ। এটি সরাসরি বা সোজাসুজি খনন করা হলে সাড়ে ৫ কিলোমিটার পথ কমে যাবে। সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের পর এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মুঃ শুকুর আলী জানান, মোড়েলগঞ্জের পশুর নদী হয়ে মংলা নদীর সঙ্গে এ সংযোগ চ্যানেলটিতে রামপালের কালিগঞ্জ বাজার থেকে ইউসেপ বা মোড় থাকায় বর্তমানে সাড়ে ৫ কিঃমিঃ অতিরিক্ত ঘুরতে হয়। তাই চলমান খনন/ড্রেজিংয়ে এটি পেড়িখালির রোমজাইপুর হয়ে সোজা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় জনসাধারণের মাত্র ৪শ’ মিটার ফসলি জমি অধিগ্রহণ করা হবে। তবে এ জমির পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ হিসেবে নগদ অর্থ দেয়া হবে। যদি কেউ অর্থ না নেন তাঁকে দেড়গুণ জমি দেয়া হবে। সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাস জমি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগামী ২২ ডিসেম্বর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভায় এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ ব্যাপারে শুক্রবার সকালে সেখানে রামপাল উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, বাগেরহাট জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার, পরিবেশবিদ মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল জলিল বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি ঘষিয়াখালী চ্যানেল সংলগ্ন দু’পাশের রেকর্ডীয় ৩২টি খাল জরুরীভাবে দখলমুক্ত ও পুনঃখননের আহ্বান জানান। আন্তর্জাতিক এ নৌরুটটি ড্রেজিং ও ৩২ খাল খননসহ দখলমুক্ত কাজ সেনা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। তাঁরমতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামত দ্রুত এবং যথাযথ কাজ করতে সেনা বাহিনীর তত্ত্বাবধান থাকা প্রয়োজন।

রামপাল নদী-খাল রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক এ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন শেখ বলেন, সুন্দরবন ও মংলা বন্দর রক্ষায় আন্তর্জাতিক নৌরুট মংলা ঘষিয়াখালী বাঁচাতে হলে চ্যানেলের পূর্ব দিকের মাদারতলা খালের গোড়া থেকে সোজা পশ্চিমে রোমজাইপুর জিগিরমোলার পশ্চিম পাশের সংযোগ স্থাপন, দাউদখালী নদীসহ রামপাল ও মংলার সকল সংযোগকারী রেকর্ডীয় খাল ও এর উপর অবৈধ বাঁধ এবং অবৈধ স্থাপনা অপসারণ ও খননের বিকল্প নেই। এই চ্যানেল বন্ধের নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চিংড়ি ও মৎস্য ঘের চাষ। এ কারণে এলাকার হাজার হাজার মানুষকে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এসব দুর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে আগামী শনিবার সকালে রামপালে ভরাট হয়ে যাওয়া নদীর বুকে রামপাল উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি, রামপাল নদী-খাল রক্ষা কমিটি, সিডিপি, পিআরভি, বাপাসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সাধারণকে নিয়ে মানববন্ধন করা হবে।

সরেজমিনে সেখানকার এলাকাবাসী, ব্যবসায়ী, নৌযান শ্রমিক ও জনপ্রতিনিধিরা এই নৌরুটের বিভিন্ন দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন। তাঁরা ঘষিয়াখালী চ্যানেলের কাজে ধীর গতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রামপাল থানা ঘাটের নৌকা চালক সুলতান আহম্মেদের ভাষায়, “খুট-খুট (ধীরে ধীরে) করে কাজ করছে, এভাবে কাজ হলি ২৫ বছরেও খনন হবে না।..” দিনমজুর আলী শেখ বলেন, একুশ বছর ধরে এই নৌরুটে নৌকা চালিয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করেছি, এপথ বন্ধ হওয়ায় আমাদের পেটে ভাত নেই। আজ আমাদের অর্ধাহারে অনাহারে কাটাতে হচ্ছে। এই চ্যানেলটি খননের জন্য আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই।

চ্যানেলের দক্ষিণ পাশের স্থানীয় পেড়িখালী এলাকার বাসিন্দা বাবুল শেখ ও মুক্ত হোসেন বলেন, এই নদী খনন না করা হলে বর্ষাকালে এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আরও দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেবে। তবে নদী খননের আগে প্রভাবশালী ঘের মালিকদের কবল থেকে সরকারি খাল উদ্ধার করে বাঁধ কাটা জরুরী। তা না হলে মংলা ও রামপাল উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখানে নদীর বুকে আটকে থাকা “ফরাজী পরিবহন” নামের একটি কার্র্গোর চালক জাহাঙ্গীর বলেন, সুন্দরবনের নৌরুটটি বন্ধ হওয়ায় খুলনা থেকে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় কার্গোটি নিয়ে এই রুট দিয়ে যাওয়ার সময় রামপালের কুমারখালী নদীর চরে গত সাত দিন ধরে আটকে রয়েছি। কার্গোয় থাকা মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলে অনেক পথ ঘুরতে হয় এবং বনদস্যুদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাতে হয়। এই রুটটি চালু থাকলে আমাদের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচল করতে হতো না।

চ্যানেলের কোল ঘেঁষা স্থানীয় পেড়িখালী ইউপির সদস্য শাহাদাত হোসেন বলেন, এই চ্যানেলটি বন্ধ থাকায় বর্ষাকালে এলাকায় পানি উঠে ঘরবাড়ি তলিয়ে যায় এবং জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এমনকি অনেক পরিবারের মা-বোনরা রান্না-বান্না করতে পারে না। এই নদী খননের আগে চিংড়ি ঘেরের নামে আটকে রাখা সরকারী খাল অবমুক্ত করা প্রয়োজন। এখানে এলাকাবাসী জানান, রামপাল উপজেলার ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী মহল খনন করা প্রবাহমান খালগুলো দখল করে দীর্ঘদিন ধরে চিংড়ি চাষ করে আসছে। ফলে এই নদীর প্রবাহিত পানি ওই শাখা খালগুলোতে প্রবেশ করতে না পারার কারণে নদী মরে গেছে। এই নদীর প্রবাহিত পানি ওই শাখা খালগুলোতে প্রবেশ করতে পরছে না বলেই দ্রুত নাব্য হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানা দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে।

বাংলাদেশ-ভারত নৌ-বাণিজ্য প্রটোকলভুক্ত নৌ-পথের মৃতপ্রায় মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের প্রায় ২২ কিলোমিটার অংশে খনন কাজ ধীরগতিতে চলছে। গত ৬ মাসে মাত্র চার কিলোমিটার অংশে খনন কাজ করতে পেরেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। তবে খনন কাজের দরপত্র আহ্বান করার পর দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাতে অংশ না নেয়ায় নদী খনন কাজ বিলম্ব হচ্ছে বলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। আন্তর্জাতিক নৌরুটি বন্ধ থাকার ফলে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ১১০ কিঃমিঃ ঘুরে মংলা বন্দরে চলাচল করত জাহাজ । এর ফলে সুন্দরবনে দুর্ঘটনা ঘটে।

সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ফার্নেস অয়েল ট্যাঙ্কার ডুবির পর মংলায় এসে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান মোঃ সামছুদ্দোহা খন্দকার সাংবাদিকদের জানিয়ে ছিলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে এই চ্যানেলটির খনন কাজ শেষ করা হবে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দল আজ সুন্দরবনে আসছে ॥ পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের ডিএফও আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, রবিবার বনের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে জাতিসংঘের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রতিনিধি দল সুন্দরবনে আসছে। সুন্দরবনের দীর্ঘস্থায়ী কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ ও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে করণীয় বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা মত দেবেন। তাঁদের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে সরকার। সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ বা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হওযায় কোন ঝুঁকি নিতে নারাজ বন বিভাগ। জাতিসংঘের এই প্রতিনিধি দল ৪-৫ দিন সরেজমিন পরিদর্শন ও নানা বিষয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিএনপির তদন্ত কমিটি আজ আসছে ॥ আজ রবিবার সুন্দরবন আসছে বিএনপির তদন্ত কমিটি। শ্যালা নদীতে ফার্নেস অয়েল বহনকারী ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনায় সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়-ক্ষতি নির্ধারণ এবং সরকার গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে সরেজমিনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান প্রাক্তন পানিসম্পদ মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের এ প্রতিনিধি দল আসছে।

প্রকাশিত : ২১ ডিসেম্বর ২০১৪

২১/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: