কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এবার বোকো হারাম!

প্রকাশিত : ২১ ডিসেম্বর ২০১৪
এবার বোকো হারাম!
  • ভারত-বাংলাদেশের সব জঙ্গী সংগঠন মিলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে
  • তত্ত্বাবধায়নে জাওয়াহিরি

শংকর কুমার দে ॥ আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদার নির্দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জোট গঠনের আদলে বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মিয়ানমারের জঙ্গী গোষ্ঠী ও মৌলবাদী সংগঠনের সমষ্টি নাইজিরিয়ার বোকো হারামের মতো একটি জঙ্গী জোট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের পাশাপাশি পড়শি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারেও নাশকতা চালাবে এই জঙ্গী গোষ্ঠী। নাইজিরিয়ায় বোকো হারাম একের পর এক স্কুলছাত্র ও ছাত্রীদের ওপর হামলা করে চলেছে; যার আরেকরূপ দেখা গেল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানে। বাংলাদেশের জেলে বন্দী জামা‘আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রধান সাইদুর রহমানের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গের জেএমবির আমির পদে নাসিরুল্লা ওরফে হাতকাটা নাসিরকে সরিয়ে সেই পদে বসানো হয় পুলিশের হাতে ধরা পড়া সাজিদ ওরফে নারায়ণগঞ্জের মাসুদ রানাকে। বর্ধমান খাগড়াগড়ের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত সাজিদ, জিয়াউল, শাহনুর, হাকিমদের কাছ থেকে দেয়া জবানবন্দীতে এই তথ্য পেয়েছে জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ। বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের কাছে শীঘ্রই এই তথ্য পাঠানো হবে। গোয়েন্দা সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আল কায়েদা যে জঙ্গী জোট গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল তা ফাঁস হয়েছে বর্ধমানের খাগড়াগড়ের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায়। বাংলাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জামা‘আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ হচ্ছে জঙ্গী জোটগুলোর মধ্যে বড় শরিক গোষ্ঠী, যেমনটা রাজনৈতিক বড় দলের শরিকের ভূমিকা হয়। আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদার নির্দেশেই বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মিয়ানমারের কয়েকটি জঙ্গী সংগঠন একত্রিত হয়ে জঙ্গী সংগঠনের সমষ্টি করে একটি জঙ্গী গোষ্ঠীর প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা নেয়। একটি সমন্বিত জঙ্গী গোষ্ঠী গঠন করা হলে তারা বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমারে নাশকতা চালাত জঙ্গীরা। আল কায়েদাপ্রধান আইমান আল জাওয়াহিরি চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিও বার্তায় দেয়া ঘোষণায় পাকিস্তান ও ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও জঙ্গী হামলার টার্গেটে পরিণত করেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আল কায়েদার লক্ষ্য ছিল সোমালিয়ায় সক্রিয় আল শাবাব, নাইজিরিয়া ও ক্যামেরুনে জঙ্গী তৎপরতায়রত বোকো হারামের মতো কোনও জঙ্গী সংগঠন গড়ে তোলা হবে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমকে কেন্দ্র করে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশে। আল কায়েদার নির্দেশ ও নেতৃত্বে জঙ্গী সংগঠনগুলোর সব ভেদাভেদ ভুলে একই আদর্শের ওপর ভিত্তি করে একটি জিহাদী সংগঠন গড়ে তোলার পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসমের পাশাপাশি পড়শি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারেও নাশকতা চালাবে। বর্ধমান খাগড়াগড়ের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় কয়েকজন ধরা পড়ায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ও জঙ্গী নথিপত্র ঘেঁটে এই ধরনের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা।

দুই হাজার আইইডি কোথায় গেল ॥ গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গে বসে অন্তত দু’হাজার আইইডি (ইমপ্রোভাইজ্ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) তৈরি করেছে জেএমবির জঙ্গী চক্রটি। এসব আইইডি দিয়ে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের কয়েকটি শপিংমল ও বড় হোটেলে বিস্ফোরণ ঘটাতে নির্দেশ দিয়েছিল আল কায়েদার নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি। প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে জাওয়াহিরি একবার চট্টগ্রাম সফর করে গিয়েছিলেন বলে ভারতের গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। বাংলাদেশের একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের নানা শহর ও মিয়ানমার থেকে আসা জঙ্গীদের সামনে বক্তৃতাও দিয়েছেন। জাওয়াহিরি এই সভায় হাজির ছিলেন। এ বছর সেপ্টেম্বরে জাওয়াহিরি ঘোষণা করেন, ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়েদার শাখা গড়ে তোলা হয়েছে। ঘটনাচক্রে তার এক মাসের মধ্যেই বর্ধমানের খাগড়াগড়ে আইইডি তৈরি হওয়ার সময় ঘটা বিস্ফোরণের সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক জঙ্গী নেটওয়ার্কের হদিস মেলে। এখনও পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে চলেছি, এখনও আমরা মূল জায়গায় পৌঁছতে পারিনি, বলেছেন গোয়েন্দারা।

বাংলাদেশেই গিয়েছিল আইইডি ॥

জঙ্গী সংগঠন জেএমবি বর্ধমান খাগড়াগড়সহ সেখানে যে বিপুল পরিমাণ আইইডি তৈরি করেছিল তা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে নাশকতা ঘটানোর লক্ষ্যে এসব আইইডি নিয়ে গেছে জেএমবি। তবে জেএমবি একক জঙ্গী সংগঠনের তৎপরতায় এসব আইইডি দিয়ে নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সব জঙ্গী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে জঙ্গী জোট গঠন পরিকল্পনা সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মিয়ানমারেও নাশকতা চালানো হতো। বিভিন্œ রাজনৈতিক দলের জোট বা ফ্রন্টের মধ্যে যেমন একটি রাজনৈতিক দল যেখানে বড় শরিকের ভূমিকায় থাকে তেমন ভূমিকা পালন করত জেএমবি।

বাংলাদেশের কারাগারে বসেই ॥ বাংলাদেশের কারাগারে বন্দী জেএমবির আমির সাইদুর রহমানের নির্দেশেই পশ্চিমবঙ্গের জেএমবির নেতৃত্ব ও আমিরের দায়িত্ব দেয়া হয় সেখানে পুলিশের হাতে ধরা পড়া সাজিদ ওরফে নারায়ণগঞ্জের মাসুদ রানাকে। ২০০৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ওই জঙ্গী নেটওয়ার্র্কের নেতৃত্বে ছিল জেএমবির মাথা, হাতকাটা নাসিরুল্লা ওরফে সোহেল মাহফুজ। পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গী গোষ্ঠীর সদস্যদের হাতেকলমে আইইডি তৈরির শিক্ষা দিয়েছিল এই নাসিরুল্লাই। গত পাঁচ বছর সে জেএমবির দায়িত্বে থাকলেও তাকে আমির ঘোষণা দেয়া হয়নি কখনও। ২০১২-তে নাসিরুল্লাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সাজিদ ওরফে নারায়ণগঞ্জের মাসুদ রানাকে আমির ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের জেলে বন্দী জেএমবির আমির সাইদুর রহমানের নির্দেশেই এই ঘোষণা দেয়া হয় বলে তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পেরেছে এনআইএ। সাজিদ ওরফে মাসুদ রানাকে নেতৃত্ব ও আমির ঘোষণার কারণ হচ্ছে, সে একজন সুবক্তা। ওর জানা প্রচুর লোকশ্রুতি। অন্যকে সহজেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে সে। ধৈর্যশীল, বুদ্ধিমান, সংগঠক ও তাত্ত্বিক। কিন্তু এসব গুণ নাসিরুল্লার নেই। এছাড়াও নাসিরুল্লার একটি হাত উড়ে গেছে। এ জন্য তাকে চিহ্নিত করা সহজ। তবে নাসিরুল্লা ওরফে সোহেল মাহফুজ এখনও জেএমবি জঙ্গী সংগঠনের সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।

যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে ॥ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০১২-তেই জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোকে সমন্বিত করে এক ছাতার তলে এনে একটি জঙ্গী গোষ্ঠীর সমষ্টি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন আর নাসিরুল্লা দিয়ে হচ্ছিল না। দরকার হয়েছিল সাজিদ ওরফে মাসুদ রানার মতো কাউকে। আর এর সকল প্রক্রিয়ার পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে রয়েছে আল কায়েদা। ঢাকার গণভবন, বিমানবন্দরসহ বিভিন্নস্থানে যে মানুষবিহীন আকাশযান ‘ড্রোন’ হামলা ও প্রস্তুতকারী জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সঙ্গে সমষ্টিগত জঙ্গী জোটের যোগসূত্র আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রকাশিত : ২১ ডিসেম্বর ২০১৪

২১/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: