কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

গেরিলা

প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মোজাম্মেল হক নিয়োগী

রফিকের মামা একদিন রফিককে একটি বানরের বাচ্চা দিয়ে গেলেন। তিনি বানরের বাচ্চাটিকে পেয়েছিলেন বনের পাশে। রফিক তো বানরের বাচ্চা পেয়ে খুব খুশি। সে বানরের বাচ্চাটিকে আদর করে বড় করেছে। শুধু বড় করেছে বললে ভুল হবে নানা রকম খেলাও শিখিয়েছে। নাচতে শিখিয়েছে। আর শিখিয়েছে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করতে।

রফিকের বানরের অনেক বুদ্ধি। রফিকের অনেক কাজও করে দেয়। যেমন কলমটা টেবিল থেকে এনে দেয়া। বইয়ের ব্যাগটা স্কুলে নিয়ে যাওয়া। নারকেল গাছ থেকে নারিকেল পাড়া। পেয়ারা, আম, জাম এসব ফল পাড়া এসব বানরটির কাছে খুব সাধারণ কাজ। রফিকের বানরের এমন বুদ্ধি দেখে বাবা মাঝে মাঝে নিজের কাজও করতে দেন। মাঝে মাঝে বাবা বাজারের ব্যাগটা বানরটিকে দিলে সে হেলে-দুলে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারে। পথঘাটও তার খুব চেনা হয়ে গেছে। এতো ভালো বানর পাওয়া খুব সহজ না।

রফিক ক্লাস সেভেনে পড়ে। রফিকের সঙ্গে বানরের খুব ভাব। একেবারে বন্ধুর মতো। ভাল বন্ধু। রফিকও বানরটিকে খুব ভালবাসে। ভাল ভাল খাবার দেয়। ওকে নিয়ে খেলে। শীতের সময় গরম কাপড় দেয়। তাতে বানর খুব খুশি হয়। রফিক যা বলে বানরটি যেন তা বুঝতে পারে। রফিকের মা উঠানে ধান শুকাতে দিলে হাঁস-মুরগি তাড়াতে বানর বসে যায়। ওদের তাড়িয়ে দেয়।

খেলার সময় বানরটিও রফিকের সঙ্গে থাকে। বল নিয়ে যায়। বল মাঠের বাইরে চলে গেলে সেটি কুড়িয়ে এনে দেয়। বানরের এমন কাণ্ড দেখে রফিকের বন্ধুরাও খুব মজা পায়। তারাও বানরের সঙ্গে মজা করে। মজার মজার খাবারও কিনে দেয়।

একদিন স্কুলের মাঠে রফিক তার বন্ধুদের সঙ্গে বল খেলছিল। এই সময় একজনের শটে বলটি স্কুলের পাশে মজিদ মোলার বাড়িতে গিয়ে পড়ল। মজিদ মোল্লার বাড়িতে কারও যাওয়া নিষেধ। এখন কি করবে? সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। তারা আলোচনা করছে কিভাবে বলটি আনা যায়। ঠিক এই সময় দেখা গেল বানরটি বল নিয়ে হাজির। সবাই দেখে চমকে উঠল আর বলল, র্হু রে। তখন বানরকে কোলে নিয়ে রফিক মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, আজ থেকে তোর নাম বাঘা। বানরও দাঁত বের করে হাসল।

তখন ১৯৭১ সাল। দেশে যুদ্ধ লেগে গেছে। পাকিস্তানী বাহিনী বাংলাদেশের মানুষকে যেখানে সেখানে গুলি করে মারছে। মানুষকে গুলি করা যেন তাদের নেশা আর খেলা। আর পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিল রাজাকার বাহিনী। রাজাকার বাহিনীর অত্যাচারে মানুষ দিশাহারা।

মজিদ মোল্লা রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলল। তার বাড়ির পাশে স্কুলে পাক বাহিনীকে থাকতে দিল। সেখানে ক্যাম্প করল। ক্যাম্পে পাকিস্তানের পতাকাটি সারা দিন উড়ে। এই পতাকা দেখে রফিক ও তার বন্ধুদের মাথায় যেন রক্ত ওঠে যায়। তাছাড়া প্রতিদিনই শুনে স্কুলের দক্ষিণ পাশের নদীতে লাশ পড়ে আছে। কিন্তু ওরা ছোট মানুষ বলে কিছু করতেও পারে না।

একদিন রফিক তার বন্ধু আরিফকে বলল, পাকিস্তানের পতাকাটা নামিয়ে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা টানাতে হবে।

আরিফ বলল, সেটা কীভাবে সম্ভব? আমরা ছোট মানুষ। ওরা তো আমাদের মেরে আলু ভর্তা বানিয়ে দেবে।

রফিক বলল, আমার মাথায় বুদ্ধি আছে। আর আমার বাঘা বানর বন্ধুরও বুদ্ধি আছে। তখন বাঘাও তার কাছে ছিল। বাঘা রফিকের দিকে তাকাল। রফিক বাঘার মাথায় হাত রেখে বলল, বাঘা পারবে। কি বাঘা, পারবে না? বাঘা তখন মাথা নেড়ে জানাল, পারবে।

রফিক বলল, আমাদের ঘরে যে বাংলাদেশের পতাকাটা আছে সেটা বাঘা রাতে গিয়ে টানিয়ে দিয়ে আসবে। বাঘা তো গাছ বাওয়াতে ওস্তাদ।

সেদিন বিকেলেই রফিক আর আরিফ মিলে বানরকে পতাকা টানানোর কৌশল শিখিয়ে দিল। বাড়িতে প্র্যাকটিস করাল গোপনে কয়েকদিন। তারপর বাঘাকে স্কুলের পতাকাটা নামিয়ে স্কুলের পথটি দেখিয়ে ইশারায় বুঝিয়ে দিল।

রাত তখন ১০টা বাজে। বাঘা পতাকাটা নিয়ে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। রফিক আর আরিফ বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।

এক ঘণ্টা পর বাঘা ফিরে এলো। বাঘা অবাক করে দিল ওদের। তার হাতে একটা স্টেনগান। অনেক কষ্টে স্টেনগানটি কোন মতে রফিকের হাতে তুলে দিল। রফিক ও আরিফ হতবাক। এই কাজ বাঘা কিভাবে করল? বাঘা রফিকের পাশে বসে হাসল। এখন এই স্টেনগান কোথায় রাখবে সেটাই ভাবনার বিষয়?

ওরা দু’জন বুদ্ধি করে রফিকদের গোয়াল ঘরের তুষের ঢোলের ভেতরে লুকিয়ে রাখল। তবে ভয়ে ওদের বুক কাঁপতে লাগল।

পরদিন রফিক ও আরিফ খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর সূর্য উঠল। সূর্যটা যেমন লাল টকটকে হয়ে উঠল ঠিক তেমনি বাংলাদেশের পতাকাও লাল টকটক করছে। বাতাসে আস্তে আস্তে কাঁপছে। রফিক আরিফকে বলল, দেশটা কেমন স্বাধীন মনে হচ্ছে। আনন্দে তাদের চোখে পানি এসে গেল।

কিছুক্ষণ পর রাজাকাররা পাকিস্তানের পতাকা টানাতে গেল। কিন্তু পতাকার স্ট্যান্ডে বাংলাদেশের পতাকা দেখে ওদের চোখ থেকে যেন আগুন বের হতে লাগল। এক রাজাকার কয়েকটা গুলি করে পতাকাটা ছিন্নভিন্ন করে দিল। তারপরই ওদের মধ্যে শুরু“হলো যুদ্ধের প্রস্তুতি। ওরা মনে করেছে আশপাশে মুক্তিবাহিনী ঘিরে ফেলেছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে পাকিস্তানের আর্মি আর রাজাকাররা চারদিকে গুলি করতে শুরু করল পাগলের মতো। আশপাশের গ্রামের সবাই পালিয়ে গেল এখানে সেখানে। রফিক আর আরিফও পালিয়ে গেল। ওরা জঙ্গলে গিয়ে একটা গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থেকে বাঘাকে খুঁজছে। রফিক কয়েকবার ডাক দিল বাঘা। কিন্তু বাঘা কোন সাড়া দিল না। এলো না।

অনেকক্ষণ পর রফিক শুনতে পায় স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ার। ভয়ে ওদের বুক কেঁপে ওঠল। আর হয়ত রক্ষা নেই।

দুপুরের দিকে গোলাগুলি থেমে গেল। সবাই বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করেছে। রফিক ও আরিফ রাস্তায় এসে দাঁড়াল। পথের পাশে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে কয়েকজন লোক বলল, সব পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পালিয়েছে। কয়েকজন মুক্তিসেনা আর একটা বানর মিলে সব হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করেছে। হানাদার বাহিনী যখন বানরের আক্রমণে দিশাহারা তখন একইসঙ্গে মুক্তিসেনারাও গেরিলা আক্রমণ করে। আর এভাবেই গেরিলাদের আক্রমণে বিজয় এসেছে বাংলাদেশের।

অলঙ্করণ : সোহেল আশরাফ

প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০১৪

২০/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: