কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কলাপাড়ায় তাপবিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে অপপ্রচার

প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০১৪
  • লিফলেট ছড়ানো হচ্ছে

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলাপাড়া, ১৯ ডিসেম্বর ॥ সাগরপারের জনপদ পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নিশান বাড়িয়ায় পায়রা তাপবিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে শুরু হয়েছে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার। সরকার যখন আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে তাপবিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রাথমিক ধাপ শুরু করেছে তখন একটি লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। যেখানে কোন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের কারও কোন নাম উল্লেখ করা হয়নি। শুধু নিচের দিকে লেখা রয়েছে, প্রচারে :- মধুপাড়া, চরনিশানবাড়িয়া, নিশানবাড়িয়া ও ধানখালীর সর্বস্তরের জনগণ। লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে ধানখালী ইউনিয়নের মধুপাড়া, চরনিশানবাড়িয়া ও নিশানবাড়িয়া মৌজায় ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ১০০২ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য সরকারী প্রস্তাবনা রয়েছে। এটি নির্মাণ হলে আটটি গ্রামের তিন শ’ বছরের পূর্ব-পুরুষদের বসতি, ১২টি জামে মসজিদ, আটটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি দাখিল মাদ্রাসা ও একটি মাজার শরিফসহ ১৫ হাজার লোকসংখ্যা আশ্রয় হারাবে। প্রতি বছর উৎপাদন বঞ্চিত হবে ১২ কোটি টাকার ফলন থেকে। বিভিন্ন ধরনের ফলন সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। বালু ভরাটে এক হাজার বাড়িঘর পানির নিচে ডুবে যাবে। বলা হয়েছে, প্রকল্প থেকে নিষ্কাশিত গরম পানি ও বর্জ্যে মৎস্যক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে আন্ধারমানিক নদীর পানি পর্যন্ত দূষিত হয়ে যাবে। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের ফাতড়ার বনাঞ্চলসহ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটি নির্মাণ এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতির শিকার হবে। পায়রা সমুদ্রবন্দরের ব্যাপক ক্ষতির কথা লিফলেটটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি পরিকল্পিতভাবে উদ্বেগজনক কয়েকটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়েছে লিফলেটে। যেখানে দাবি করা হয়েছে বছরে তাপবিদ্যুত কেন্দ্র থেকে ১৩ লাখ টন ফ্লাই অ্যাশ ও তিন লাখ টন বটম অ্যাশসহ তরল ঘনীভূত ছাই ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করবে। ৭৭ হাজার টন ক্ষতিকর সালফার ডাই অক্সাইড ও ৪৬ হাজার টন হাইড্রোজেন ডাই অক্সাইড উৎপাদিত হবে। ১৯২ টন ক্ষুদ্র কণিকা উৎপাদন হবে, যার ফলে ব্রঙ্কাইটিসসহ ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ হবে। ৬৫০ পাউন্ড মার্কারি বা পারদ উৎপন্ন হবে, ফলে ব্রেন ড্যামেজসহ স্নায়ুতন্ত্রের নানা রোগ হবে। ৮৭২ পাউন্ড আর্সেনিক উৎপন্ন হবে, ফলে আর্সেনিকোসিস এবং ক্যান্সারের বিস্তার ঘটবে। ৪৪৩ পাউন্ড সীসা, ২০ পাউন্ড ক্যাডমিন উৎপন্ন হবে- যা মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এমনকি এসব বিষাক্ত পদার্থের কারণে প্রকল্প এলাকার ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ এলাকায় পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। কোন বিশেষজ্ঞ কিংবা পরিবেশ বিজ্ঞানীর কোন মতামত ছাড়াই এমনসব উদ্বেগজনক আরও অসংখ্য তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে দুই পৃষ্ঠার লিফলেটটিতে এমন বলা হয়েছে যে প্রকল্পটি করা হলে ১৫ কিমি দূরে কলাপাড়া পৌর শহরসহ প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ ক্ষতির শিকার হবে। লিফলেটটিতে সরকারের পরিসংখ্যানের সঙ্গে কোন মিল নেই। প্রকল্প এলাকার বাইরের এমনকি ৫০ কিলোমিটার দূরের পরিবেশ ক্ষতির নেতিবাচক উদ্বেগজনক তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে শত শত লিফলেট গোপনে বিলি করা হয়েছে। কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ ব্যাপারে ধানখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ গাজী জানান, বিএনপিসহ একটি গ্রুপ এই এলাকার তথা সরকারের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে এমনসব অপপ্রচার করা হচ্ছে। পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক অমিতাভ সরকার জানান, এটি একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার। এনিয়ে শঙ্কা কিংবা আতঙ্কের কিছুই নেই। তদন্ত করে মনগড়া তৈরি লিফলেট বিতরণকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ২১ অক্টোবর একনেক বৈঠকে ১৩২০ মেগাওয়াট থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট শীর্ষক এ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। এজন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৮২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বিদ্যুত বিভাগের অধীন নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের বাস্তবায়ন করবে বলে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান। এ সময় মন্ত্রী বিদ্যুতকেন্দ্রে আমদানিযোগ্য কয়লা পরিবহন, পানির প্রাপ্যতা, বিদ্যুতকেন্দ্রের কারিগরি বৈশিষ্ট্য, কুলিং সিস্টেম ও পাওয়ার ইভাক্যুয়েশন, পরিবশেগত কারণ ইত্যাদি বিবেচনা করে প্রকল্প এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানান। বাংলাদেশ পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান-২০১০ অনুসারে এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়ার কথাও জানানো হয়। সর্বশেষ ৭ নবেম্বর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন বিদ্যুত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এমপি। তখন তিনি বলেন, কলাপাড়া হবে দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য নগরী। এখানে হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুত দেশের সর্বত্র সরবরাহ করা হবে। নসরুল হামিদের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন দল পায়রা তাপবিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের ধানখালী ইউনিয়নের নিশানবাড়িয়া, মধুপাড়া ও চরনিশানবাড়িয়া এলাকা পরিদর্শন করেন। প্রকল্প এলাকার পরিধি ও কার্যক্রম মানচিত্রসহকারে উপস্থাপন করেন নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএম খোরশেদুল আলম।

এ প্রকল্পের কর্মকাণ্ড হাতে নেয়ার সময় স্থানীয় অধিবাসীরা প্রথমে মানববন্ধন করে প্রকল্পটি অন্যত্র জনমানবহীন এলাকায় সরানোর দাবি করেন। পরবর্তীতে অধিগ্রহণ বাবদ পর্যাপ্ত টাকা প্রদান এবং মাঠ পর্যায়ে যার যার টাকা সরাসরি বিতরণের দাবিও করে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করে উদ্বেগ এবং আতঙ্ক ছড়ানোর মতো তথ্যসংবলিত একটি লিফলেট নিয়ে প্রকল্প এলাকার মানুষসহ কলাপাড়ার সর্বত্র চলছে আলোচনা। চলছে অজানা এক উৎকণ্ঠা।

প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০১৪

২০/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: