মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

একি স্বপ্ন?

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • গি দ্য মপাসাঁ
  • অনুবাদ : কাজী আখতারউদ্দিন

আমি তাকে পাগলের মতো ভালবাসতাম!

গতকাল প্যারিসে ফিরে এসেছি। এসে আবার আমার ঘরের দিকে তাকালামÑ ঘর, বিছানা, আসবাবপত্র সবকিছু, একজন মানুষ মারা যাবার পর যা কিছু ফেলে যায় তার সব। এসব দেখার পর আমার মাঝে নতুন করে তীব্র শোক এত ভয়ানকভাবে জেগে উঠল যে, ইচ্ছে হচ্ছিল জানালা খুলে এক লাফ দিয়ে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়ি। এই চার দেয়ালের গ-ির মাঝে আমি আর থাকতে পারলাম না, যেখানে তার আশ্রয় ছিল, যেখানে রয়ে গেছে এখনও তার দেহের হাজারও অণুপরমাণু, দেহের চামড়া আর নিঃশ্বাসের। আমি আমার টুপিটা হাতে তুলে এখান থেকে পালাতে যাব, দরজার কাছে পৌঁছাবার সময় হলের মাঝখানে বড় আয়নাটা পড়ল, যেটা সে এ জায়গায় লাগিয়েছিল যাতে প্রতিদিন বাইরে যাবার আগে নিজেকে দেখতে পারে মাথা থেকে পা পর্যন্ত, পায়ের ছোট্ট জুতো থেকে মাথার টুপি পর্যন্ত সবকিছু।

সেই আয়নাটির সামনে আমি থমকে দাঁড়ালাম, যেখানে তাঁর প্রতিচ্ছায়া পড়তো ঘন ঘন, এত ঘন ঘন যে মনে হলো তার প্রতিচ্ছবি এখানে স্থিত হয়ে রয়েছে এখনও। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকলাম সেই আয়নার দিকে দৃষ্টি স্থির নিবদ্ধ রেখে, সরাসরি সেই মসৃণ, গভীর, শূন্য আয়নাটার দিকে। আমার মতো এ আয়না তাকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করেছিল। অনুভব করলাম যেন এই আয়নাটিকে আমি ভালবাসি, ছুঁয়ে দেখলাম, ঠা-া। বিষাদময় এই আয়না, জ্বলন্ত এই আয়না, ভয়ঙ্কর এই আয়না, মানুষের মনে কি কষ্টই না দিতে পারে! সুখী মানুষ তো সেই, যে ভুলে যেতে পারে সবকিছু যা সে একদিন হৃদয়ে গ্রহণ করেছিল।

আমি বেড়িয়ে পড়লাম, তারপর এক সময় আমার অজান্তে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে চললাম। খুঁজে পেলাম তার সেই সাধারণ কবরটাকে, একটা শ্বেত পাথরের মার্বেল ক্রস, যার উপরে লেখা রয়েছেÑ

সে ভালবেসেছিল, তাকে ভালবেসেছিল তারপর সে মারা যায়।

সে এখানেই রয়েছে মাটির নিচে। মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম আর বসে রইলাম অনেকটা সময়। তারপর অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই আমার মনে একটা অদ্ভুত, পাগলাটে ইচ্ছা জাগল, একজন হতাশ প্রেমিকের ইচ্ছা আমাকে গ্রাস করল। ইচ্ছা হলো সারারাত তার কবরের পাশে বসে কেঁদে কাটাই। কিন্তু কেউ দেখে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে তাড়িয়ে দেবে। তাহলে কি করব? বুদ্ধি করে উঠে দাঁড়ালাম, তারপর ঘুরে বেড়ালাম এই মৃতের শহরে। হাঁটতেই থাকলাম, হাঁটতেই থাকলাম। আমরা যে শহরে থাকি, তার তুলনায় কত ছোট এই শহর। তারপরও মৃতরা সংখ্যায় কত বেশি জীবিতদের চেয়ে। আমাদের প্রয়োজন সুউচ্চ বাড়ি, চওড়া রাস্তা, কত বেশি জায়গা। আর এদিকে বংশানুক্রমে সমস্ত মৃত মানুষের জন্য বলতে গেলে কিছুই নেই। মাটি তাদের নিজের কোলে ফিরিয়ে নেয়। বিদায়!

কবরস্থানের শেষ মাথায় সবচেয়ে পুরনো অংশে এলাম, যেখানে ক্রসগুলো ভেঙ্গে গেছে। একটা বিষণœ, সুন্দর বাগান জন্মেছে এখানে, অযতœ লালিত গোলাপ আর শক্ত, কালো সাইপ্রেস গাছের।

আমি একদম একা এখানে। তাড়াতাড়ি একটা ঘন সবুজ গাছের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে মোটা মোটা ডালপালার নিচে লুকালাম।

তারপর যখন চারপাশ গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল, তখন লুকোনো জায়গা থেকে বের হয়ে ধীর নরম পায়ে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। অনেকক্ষণ ঘুরেও তার কবরটা খুঁজে পেলাম না। হাত লম্বা করে, প্রত্যেকটা কবরের গায়ে হাত দিয়ে ঠোক্কর খেয়ে, আমার পা, হাঁটু, বুক এমনকি মাথা দিয়ে ঠুকরেও তাকে খুঁজে বের করতে পারলাম না। একজন অন্ধমানুষের মতো হাতড়ে বেড়ালাম; পাথর, ক্রস, লোহার রেলিং আর শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মালাগুলো। কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পেলাম না!

আকাশে চাঁদ নেই, কি এক রাত! দু’সারি কবরের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরুসেই পথের মাঝে আমার ভীষণ ভয় করছিল। আর চলতে না পেরে একটা কবরের উপর বসে পড়লাম; হাঁটু দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমি আমার বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিলাম, সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পাচ্ছিলাম আরেকটা শব্দ। কি সেটা? একটা বিভ্রান্তিকর অজানা শব্দ। বুঝতে পারছিলাম না কোত্থেকে আসছে এটা, আমার মাথায় হচ্ছে, নাকি এই গহিন রাতে, অথবা এই রহস্যময় মাটির নিচ থেকে? আতঙ্কে আমার সারা শরীর অবশ, আর ঠা-া হয়ে আসছিল। আমি চিৎকার দিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল ভয়ে মরে যাব।

হঠাৎ মনে হলো কবরের মার্বেল পাথরের যে সø্যাবটার উপর আমি বসেছিলাম, সেটা নড়ছে। উপরের দিকে উঠে আসছে মনে হলো। এক লাফ দিয়ে সরে গেলাম পাশের কবরটার উপরে। পরিষ্কার দেখলাম, যে পাথরটা এখুনি আমি ছেড়ে এসেছি সেটা সোজা উপরের দিকে উঠছে। তারপর বাঁকানো পিঠ দিয়ে পাথরটা ঠেলে মৃত মানুষটা বেরুল। সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পেলাম, অন্ধকার রাত হওয়া সত্ত্বেও। ক্রসের উপরের লেখাটা পড়লাম।

এখানে শুয়ে আছেন জ্যাকুস অলিভ্যান্ট

যিনি একান্ন বছর বয়সে মারা গেছেন

তিনি তার পরিবারকে ভালবাসতেন,

ছিলেন দয়ালু এবং সম্মানীয়

এবং প্রভুর আশীর্বাদ নিয়ে গত হয়েছেন।

মৃত মানুষটাও পড়ল কবরের লেখাটুকু, তারপর সে পথ থেকে একটা পাথর তুলে নিল, একটা ছোট, সুচালো পাথরের টুকরো। তারপর সাবধানে কবরের উপরে লেখা অক্ষরগুলোর উপর ঘষতে থাকল। আস্তে আস্তে সে লেখাগুলো মুছতে শুরু করল। খালি চোখের কোটর দিয়ে সে যেখানে লেখাগুলো খোদাই করা ছিল, সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার তর্জনীর ডগার হাড় দিয়ে লিখতে শুরু“ করল উজ্জ্বল অক্ষরে :

এখানে শুয়ে আছেন জ্যাকুস অলিভ্যান্ট

যিনি একান্ন বছর বয়সে মারা গেছেন।

তিনি তার বাবার মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছিলেন নির্দয় আচরণ করে,

কারণ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি তিনি

আগে দখল করতে চেয়েছিলেন;

নিজের স্ত্রীর উপর অত্যাচার করেছেন,

সন্তানদের উপরেও,

প্রতিবেশীদের ঠকিয়েছেন,

যাকে পেরেছেন তার সবকিছু হরণ করেছেন,

মরেছেন মানুষের অভিশাপ নিয়ে।

লেখা শেষ করে মৃত লোকটা নিষ্পন্দ দাঁড়িয়ে তার হাতের কাজের দিকে চেয়ে রইল। তারপর আমি ঘুরে পেছন ফিরে দেখলাম, সব কবরগুলো খোলা, নিচে থেকে মৃত মানুষেরা উঠে এসেছে। সবাই তাদের কবরের গায়ে তাদের স্বজনরা যে লেখাগুলো খোদাই করেছিল, সেগুলো মুছে ফেলে সত্যি কথাগুলো লিখছে। দেখলাম ওরা সবাই প্রতিবেশীকে জ্বালিয়েছিলÑ ছিল বিদ্বেষপরায়ণ, অসৎ, ভণ্ড, মিথ্যুক, বদমেজাজি। চুরি করেছে, ঠকিয়েছে, সবধরনের খারাপ কাজ করেছে, সবধরনের অসম্ভব খারাপ কাজ এই তথাকথিত ভাল বাবারা, বিশ্বাসী স্ত্রীরা, এই সুসন্তানরা, এই নিষ্পাপ কন্যারা, এই সৎ ব্যবসায়ীরা করেছে। আর এখন এরা সবাই এক সঙ্গে তাদের চিরস্থায়ী এই আবাসে লিখে চলেছে সত্যিটা, ভয়ঙ্কর আর পবিত্র সত্য কথাটি, যে ব্যাপারে জীবিত থাকাকালীন সবাই অজ্ঞ ছিল বা না জানার ভান করেছিল।

আমি ভাবলাম সেও হয়ত কিছু একটা লিখেছে তার কবরের ফলকে। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ভয়ভীতি ঠেলে ফেলে আমি ছুটলাম তার দিকে, জানি অবশ্যই তাকে আমি এখুনি পেয়ে যাব। মুখ না দেখেও আমি তাকে সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেললাম। আর দেখলাম সেই মার্বেল ক্রস যেখানে উৎকীর্ণ ছিল একটু আগে

সে ভালবেসেছিল, তাকে ভালবেসেছিল তারপর সে মারা যায়।

এখন দেখলাম :

একদিন তার ভালবাসার মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করার জন্য

সে বৃষ্টির মধ্যে বাইরে বেড়িয়েছিল

ঠা-া লেগে তারপর সে মারা যায়।

পরদিন সকালে ওরা আমাকে কবরস্থানে অজ্ঞান অবস্থায় পেল।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: