আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শীত প্রাসাদ

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • কামরুল হাসান

পৌষের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় তবু শীত প্রসাদের কথা। আধুনিক রাশিয়ার প্রথম রাজপ্রাসাদ উইন্টার প্যালেস বা শীত প্রসাদ নির্মাণ শুরু হয় ১৯১১-১২ সালে। এটি বর্তমানে প্রথম উইন্টার প্যালেস হিসেবে পরিচিত এবং প্রথম উইন্টার প্যালেসের স্থপতি হলেন ডমেনিকো। প্রতিদ্বন্দ্বী ভার্সেইলি প্রাসাদের তুলনায় তা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। কিন্তু পিটার দ্য গ্রেটের ইচ্ছা তাঁর দেশ ইউরোপের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাক। তা কেবল নির্মাণশৈলীতে নয় বরং রাষ্ট্রীয় সর্ব ক্ষেত্রে। পিটার দ্য গ্রেটের হাত ধরে রাশিয়ার প্রথম নৌবাহিনীর জন্ম, আধুনিক সেনাবাহিনী গঠন হয়। দেশের নাগরিকদের জন্য প্রথম হাসপাতাল তৈরি করা হয়। পিটার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর বছর চারেক আগেই নির্মাণ করা হয় দ্বিতীয় উইন্টার প্যালেস। ১৭২৫ সালে পিটার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর রাজধানী পুনরায় মস্কো ফিরিয়ে আনা হয় এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ রয়ে যায় শিয়াল-মৃগের ঠিকানা। দেশজুড়ে শুরু হয় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চক্রান্ত। প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন সম্রাজ্ঞী আনা।

উইন্টার প্যালেস বর্তমানে রাশিয়ার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মিউজিয়াম যা হার্মিটেইজ মিউজিয়াম নামে পরিচিত। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর জারের এই প্রাসাদ জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে ছয় প্রাসাদ দ্বারা সংযুক্ত এই মিউজিয়ামের প্রথম প্রাসাদটি নির্মাণ করেন সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ। রাজধানী আবারও সেন্ট পিটার্সবার্গে ফিরিয়ে আনা হয় নির্মাণ করা তৃতীয় উইন্টার প্যালেস। নতুন উইন্টার প্যালেসের স্থপতি ছিলেন ফ্রান্সিসকো বার্তালোমিও রাসত্রেলি। তবে দুঃখের বিষয় সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ খুব বেশিদিন এ প্রাসাদ উপভোগ করতে পারেননি। ১৭৬০ সাল থেকে জার পরিবার উইন্টার প্যালেসে বসবাস শুরু করেন। অতীতে জার পরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রাসাদে বসবাস করতেন।

নতুন উইন্টার প্যালেস তৈরি হওয়ার মাত্র দু’বছর পর সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ দেহ ত্যাগ করেন এবং ক্ষমতায় আসেন নতুন সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন। পশ্চিমা দুনিয়ায় যিনি ক্যাথরিন দ্য গ্রেট নামেই পরিচিত। সত্যিকার অর্থে উইন্টার প্যালেসের এমন জাঁকালো, ব্যয়বহুলতার সবটায় উপভোগ করেন নতুন সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন। ১৭৬৪ সালে ক্যাথরিন জার্মানি হতে ২৫৫ চিত্রকলা কিনে আনেন এই প্রাসাদ সাজাতে। রাজদরবারে ফ্রান্স ভাষা ব্যবহার করা হতো। রাশিয়ান ভাষা কেবল নীচু শ্রেণীর কথোপকথনেই ব্যবহৃত হতো। সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিনের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তাঁর পুত্র পল। সম্রাট পল প্রথম উইন্টার প্যালেসে সেনা ছাউনি স্থাপন করেন। পলের দুর্ভাগ্যজনক হত্যাকা-ের পর তাঁর পুত্র আলেক্সজেন্ডার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলেই ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ান রাশিয়া আক্রমণ করেন। ১৮১৫ সালে রাশিয়ায় নেপোলিয়ানের পরাজয়ের পর উইন্টার প্যালেসের শোভা আবারও বৃদ্ধি করা হয়। ফরাসী সম্রাজ্ঞী জোসেফিন থেকে পাওয়া নানা চিত্রকর্মের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হয় উইন্টার প্যালেস। উইন্টার প্যালেসের সিলিং, ওয়াল সবখানেই সোনার প্রলেপ দেয়া নানা স্থাপত্য।

১৮৩৭ সালে আগুনের লেলিহান শিখায় উইন্টার প্যালেস ভস্মীভূত হয়। সম্রাট নিকোলাস পুনরায় উইন্টার প্যালেস নির্মাণ করেন। রাজ পরিবার দীর্ঘ পনেরো মাস পর আবারও উইন্টার প্যালেসে বসবাস শুরু করে। উইন্টার প্যালেসের নতুন স্থাপত্যশৈলী তৈরি করেন তৎকালীন দু’জন স্থপতিÑ ভ্যাসিলি স্টেসোর এবং আলেক্সজেন্ডার ব্রাউলোর। অট্টালিকার সম্মুখভাগ ও সদরের অন্য অংশের স্থপতি ছিলেন ভ্যাসিলি এবং ভেতরের সব শৈলীর দায়িত্ব ছিল আলেক্সজেন্ডারের ওপর।

উইন্টার প্যালেসের মোট ছয়টি প্রাসাদের চারটি বর্তমানে সাধারণ নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত। প্যালেস চত্বরে রয়েছে বিশাল এক মিনার যা আলেক্সজেন্ডার কলাম নামে পরিচিত। উইন্টার প্যালেসে মোট ১৫০০টি রুম, ১৭৮৬টি দরজা, ১৯৪৫টি জানালা এবং ১১৭টি সিঁড়ি রয়েছে। সিংহাসন রুম যেখানে সে স্থানে ২৮টি ঝাড়বাতিতে সাজানো হয় রাজকীয় ক্ষমতা গ্রহণের স্থান। এছাড়া রয়েছে ১৮ শতকের ময়ূর ঘড়ি, কনসার্ট হল। উইন্টার প্যালেসে ৩ মিলিয়ন আর্ট ওয়ার্ক রয়েছে। যা দেখতে যে কোন দর্শনার্থীর সময় লাগবে বছরেরও বেশি। ১৮১২ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধে রাশিয়া অসম সাহসিকতার পরিচয় দেয়। সেই কমান্ডারদের ছবিও এই প্রাসাদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ৩৩৩ জন বীর সেনার ছবি তৎকালীন সম্রাট আলেক্সজেন্ডার নিজেই মনোনীত করেন। এসব নানা শিল্প কর্ম যেন রোদের কিরণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এ কারণে জানালায় সোনার প্রলেপ দেয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় জার্মান বাহিনী সবকিছুই ধ্বংস করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারও উইন্টার প্যালেস নির্মিত হয়। রাশিয়ান সম্রাজ্যের প্রতীক এ প্রাসাদ এখনও টিকে আছে ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষ্য হয়ে।

রাশিয়ান ফেডারেশন কিংবা রাশিয়াÑ যে নামেই ডাকা হোক, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রটি সোভিয়েত ইউনিয়ন নামেই বেশি পরিচিত ছিল। রোমানভ ডাইনেস্টি বা জার শাসন, প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পতন ও অবসান এবং পুনরায় রাশিয়া নামে ফিরে আসাসহ নানা কারণে ভূ-খ-টি রহস্যকৃত এক অঞ্চল। বিশ্বের এক ষষ্ঠাংশ ভূখ-, সাইবেরিয়ার বিস্তৃত বনভূমি, বাল্টিক থেকে প্যাসিফিক সাগরঅবধি সীমান্ত সম্ভবত এ রহস্যবৃত্তের অন্যতম কারণ। কেবল সøাভরাই এ দেশটির মূল আদিবাসী নয় বরং তুর্কী-মোঙ্গল-তাঁতার জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে রুশ জাতি। অতীতে রুশ শব্দটি প্রাচ্যে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে তা কেবল রাশিয়া নামেই পরিচিত। নদী এ দেশটির বিশাল ভূ-খ- টিকিয়ে রাখতে অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজ করে। নদী দেশটির সর্বত্র বিস্তৃত এবং যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এমন অসংখ্য নদীর মধ্যে নেভাদা উল্লেখযোগ্য। এই নেভাদা নদীর তীরেই রাশিয়ার পশ্চিমা ধাঁচের শহর সেন্ট পিটার্সবার্গের পত্তন এবং জার শাসনের নতুন পথ চলা। ১৭০৩ সালে রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চল বিজয়ের পর রুশ ইতিহাসের অন্যতম পথিকৃত নেতা পিটার দ্য গ্রেট জাতিকে পশ্চিমা ধাঁচে গড়ে তুলতে এবং আধুনিক রাশিয়াকে ইউরোপের প্রধান শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে এই শহরের পত্তন করেন। ইউরোপের স্থাপত্যশৈলীর আদলে তৈরি করেন নানা সরকারী স্থাপনা। মস্কো থেকে রাজধানী সরিয়ে আনা হয় নতুন শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে। সেন্ট পিটার্সবার্গের অন্যতম আকর্ষণ উইন্টার প্যালেসের পাশেই তৈরি করেন নিজের বাড়ি। পিটার দ্য গ্রেট অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যেই শহর নির্মাণ করেন।

যদিও উইন্টার প্যালেস নির্মাণ শুরু হয় আরও এক দশক পর। উইন্টার প্যালেস ও আধুনিক রাশিয়ার ইতিহাস তাই এক সূত্রে গাঁথা। উইন্টার প্যালেস তৈরির মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় আধুনিক রাশিয়ার এবং নব্য জার শাসনের। আঠারো শ’ শতকের শুরু থেকেই ইউরোপজুড়ে প্রাসাদ নির্মাণের এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের শক্তিমত্তা প্রকাশের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করত রাজপ্রাসাদ।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: