রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

পৌষের নিমন্ত্রণ

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • তাপস মজুমদার

মেলা সম্পর্কে অকিঞ্চিৎকর এই লেখাটা লিখতে গিয়ে কেন যেন অনিবার্য মনে পড়ছে, ফিডব্যাকের চীফ ভোকালিস্ট মাকসুদুল হকের বিখ্যাত সেই গানটির কথা ও সুরÑ মেলায় যায়রে, মেলায় যাইরে...। খুবই জনপ্রিয় গান এটি, যা নাকি হিট করেছে প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও। স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে, তাহলে বলতেই হয়, পপশিল্পী মাকসুদ এই গানটি গেয়েছিলেন বাংলা নববর্ষ তথা বৈশাখী মেলাকে উপলক্ষ করে। তবে তাতে বছরজুড়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সারাদেশে অনুষ্ঠিত অন্যান্য মেলা সম্পর্কেও এর আবেদন-নিবেদন ক্ষুণœ হয় না একটুও। গানটির মর্মাথ ও সর্বজনীন আবেদন বোধকরি নিহিত এখানেই। পাঠক লক্ষ্য করুন, কবিতা ও নিরেট গদ্য যেখানে প্রবেশ করতে পারে না সহজে, গান সেখানে জিতে যায় কেমন অবলীলাক্রমে। এর জন্য এক্ষণে মাকসুদ একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

আমাদের এবারের নিবেদেন, স্বভাবতই বৈশাখী মেলা বা বাংলা নববর্ষ নয়। বাংলা দিনপঞ্জিতে একলা পৌষ, থুরি পয়লা বা ১ পৌষ ১৪২১। বাংলা সনটা উল্লেখ করলাম ইচ্ছা করেই। আমরা প্রায় কেউ পারতপক্ষে বাংলা সন-তারিখ উল্লেখ করি না। ব্যবহার তো নয়ই। অবশ্য সরকারী চিঠিপত্র ও বিজ্ঞপ্তিতে বাংলা ও ইংরেজী তারিখ ওপর-নিচে লেখা অনেকটা বাধ্যতামূলক। তবুও দৈনন্দিন জীবনে এবং প্রাত্যহিক ব্যবহারে বাংলা সন-তারিখের কথা কেন যেন ভুলে যাই বেমালুম। তবে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বিয়ে-শাদী, হালখাতা, পালাপার্বণসহ বিবিধ আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কারে বাংলা সন-তারিখের ব্যবহার অনেকটা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। এর বাইরেও ষড়ঋতুর পরিবর্তনগুলো যখন লক্ষণীয় ও অনুভূত হয় দৈনন্দিন জীবনে, তখন কেন যেন অনিবার্য স্মরণাপন্ন হয়ে থাকি বাংলা দিনপঞ্জির। এই যেমন, পয়লা পৌষের আগমনধ্বনি। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বর্তমানে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। ঢাকার বাইরের কথা জোর দিয়ে আপাতত বলতে না পারলেও, রাজধানীতে দেখছি সূর্যালোকের দেখা পাওয়া বেশ ভার। হঠাৎ হঠাৎ মেঘলা আকাশ, হঠাৎ হঠাৎ আলোর ঝিলিক, তাও মৃদমন্দ। সকাল-সন্ধ্যা বেশ ঠা-াÑ হাড় হিম করা বলব না, তবে শরীর-মনে কাঁপন ধরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। কেন যেন মনে পড়ে যায়, শীতের হাওয়ার লাগল কাঁপন...। না, গাছের ডালে নয় বরং মতিঝিলের ফুটপাথসহ রাজধানীর আনাচে-কানাচে বিক্রেতাদের কাছে এখন আমলকীর পসরা, সেই সঙ্গে তরতাজা বহেরা-হরীতকী। দামও বেশি নয়, ৭০-৮০ টাকা কেজি। যা হোক, ফিরে যাই শীতের হাওয়ায়। ফিরে যাই ঘন কুয়াশায়! অতি প্রত্যুষে বলা যায়, ঘন কুয়াশার সে কী প্রবল দাপট, হিমশীতল ইতস্তত বাতাসে মাতামাতি কুয়াশার, লেপ কিংবা কম্বলের ওম ছেড়ে সুখনিদ্রা ভাঙতে চায় না সহজে। তবুও তো শেষ পর্যন্ত অনিবার্য প্রতিদিনের দিনযাপনের গ্লানিÑ অফিস, কোর্টকাছারি, হাটবাজার, যানবাহন, হৈহল্লা, যানজট, জনজট। এত সব কিছুর মধ্যেও বেশ বুঝতে পারি যে, গ্রামের মানুষ আমাদের তুলনায় কিছুটা হলেও কষ্টে আছে বৈকি। সেখানে শীতের আক্রমণ ও প্রকোপ বেশি, কুয়াশার দাপট সাংঘাতিক, হাওয়া-বাতাস উন্মাতালÑ বেলা যে যায় বোঝা যায় না সহজেএ অথচ কৃষককে সেই কোন্ সকালে যেতে হয়েছে মাঠে; গৃহস্থবধূকে গোবরছড়া দিয়ে লেপে দিতে হয়েছে বিস্তৃত আঙ্গিনা। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে এসবই করতে হয় ও হচ্ছে হাড় হিম করা কাঁপুনিসহ। মাঝি বা জেলেদের প্রবল শীত ও কুয়াশা উপেক্ষা করে নামতে হয়েছে খাল-বিল-নদীতে। আফটার অল জনজীবন তো থেমে থাকে না কখনও, কোথাও। এসবই তো পৌষের আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ।

তবে শেষ পর্যন্ত সব কিছু ছাপিয়ে পৌষের এই নিমন্ত্রণ নিহিত থাকে সারাদেশে সম্বৎসর অনুষ্ঠিত পৌষমেলায়, নবান্ন উৎসবে, খেজুরের গুড় ও রসে, ঢেঁকিছাঁটা চালের গুঁড়িতে, শীতের সকালে গনগনে লাকড়ির মাটির উনুনে চাপানো রকমারি পিঠাপুলির সমরোহে। কবি বোধকরি একেই বেঁধেছেন কথা ও সুরেÑ পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয়রে ছুটে আয়।

তবে মেলা কিন্তু এমনি এমনি হয় না, হয়ে ওঠেনি। অধিকাংশ মেলা বা সমাবেশই প্রধানত ধর্মীয় কোন উপলক্ষে গড়ে উঠেছে যুগ যুগ ধরে। সচরাচর ধর্মীয় কোন পালাপার্বণ অথবা কোন সাধক পুরুষের স্মৃতিতর্পণের উদ্দেশ্যে বার্ষিক সমাবেশ ও আচার-অনুষ্ঠান পালন, সর্বোপরি একে কেন্দ্র করে ও ঘিরে কম-বেশি যে লোক সমাগম ঘটে থাকে, সেই উপলক্ষে বিবিধ পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়সহ নানা আমোদ-প্রমোদের অস্থায়ী ব্যবস্থা। মোটকথা মেলা হলো, একটি অস্থায়ী প্রদর্শনী এবং পণ্যদ্রব্যাদির বেচাকেনার সমাহার। যেমনÑ বইমেলা, বাণিজ্যমেলা, পৌষমেলা, বৈশাখীমেলা, বার্ষিক উরস, ইছালে ছওয়াব ইত্যাদি। ব্যাপক জনসমাগম বা লোকজনের বিপুল সমাবেশের এক মিলনমেলা, যা প্রায়ই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে কোন সহজগম্য উদার উন্মুক্ত স্থানে। সচরাচর একাধিক রাস্তাঘাট সমৃদ্ধ সংযোগস্থলের আশপাশে, বট-অশ্বত্থের ছায়া সুনিবিড় অবস্থানে, সর্বোপরি, কোন বড়সড়ো নাব্য নদ-নদীর উপকূলের সন্নিকটে।

মেলা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আরও কিছু তথ্য জেনে বিস্মিত হয়েছি। মেলা প্রধানত লোকজ উৎসব বা লোকউৎসব। ইহজাগতিক সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে আবহমান গ্রামবাংলার জনগণ কর্তৃক পালিত উৎসব-অনুষ্ঠান। আদিতে শিকারকৃত পশুর মাংস সবাই মিলে একত্রে বসে আগুন জ্বেলে সেঁকে ভোজ-পানাহার করাসহ নৃত্য-গীতে মাতোয়ারার মধ্যে মেলার উৎস খুঁজে পেয়েছেন নৃ-তাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা। অনেক পরে সভ্যতার ক্রমবিকাশে কৃষি ও পশুপালন স্তরে এসে এই উৎসব লাভ করে নতুন মাত্রা ও পর্যায়। আরও পরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যুগ ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের লোকউৎসবের সৃষ্টি হয়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখার অবকাশ এখানে নেই। অতএব আমরা আপাতত বিষয়টি নবান্ন ও পৌষমেলায় সীমিত রাখার চেষ্টা করব।

পৌষমেলার সঙ্গে নবান্নের একটা সম্পর্ক ও যোগসূত্র আছে বৈকি। আগে নবান্ন উৎসবটি নতুন ফসল ওঠার পর অগ্রহায়ণ মাসে বিশেষ করে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মাঝে মহাধুমধামের সঙ্গে পালিত হতো। তখন বছর গণনাও হতো অগ্রহায়ণ থেকে। পরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে শুরু হয় ফসলী সন বা বাংলা নববর্ষ। সে সময়ে ঢেঁকিতে ছাঁটা হতো নতুন চাল। বাড়ির বয়োবৃদ্ধরা পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন এবং ছেলেমেয়েরা নতুন জামাকাপড় পরে উঠোনে গর্ত করে জ্যান্ত কই মাছ ও দুধ দিয়ে পুঁতে দিত একটি বাঁশ। একে বলে বীর বাঁশ। বীর বাঁশের কঞ্চিগুলোতে বাঁধা হতো নতুন ধানের ছড়া। চারপাশে আঁকা হতো নতুন চালের বাটা পিটুলির আল্পনা। অতঃপর কলার খোলে চালমাখা কলা ও নারকেলের নাড়ু কাককে খেতে দিয়ে ডাকা হতোÑ কো কো কো, মোরগো বাড়ি শুভ নবান্ন। কলাটি মুখে নিয়ে কাকটি কোন দিকে যায়, লক্ষ্য করা হতো তাও। কারণ তাদের বিশ্বাস, বছরের শুভাশুভ এর ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। এই অনুষ্ঠানের নাম ‘কাকবলি’। এ দিন শস্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীকে পূজা এবং নবান্ন দানের পরই সবাই আহারাদি করে থাকে। স্বভাবতই নানারকম পিঠাপুলি, দই, খই, মুড়ি, মোয়া, পাটালিগুড় ইত্যাদি। নবান্নের শেষ হয় ‘বাসি নবান্ন’ দিয়ে। আদি মুসলমান কৃষক পরিবারের মধ্যেও প্রচলন ছিল নবান্নের। কেউ কেউ এমনকি সংস্কারবশত লক্ষ্মীকে শিরনিও দিত। একে বলা ‘হতো নয়াখাওয়া’। তবে হিন্দুদের মতো এত আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। আদিকালে সেই নবান্নই শহরে-নগরে হয়ে উঠেছে নবপর্যায়ের নবান্ন তথা পিঠাপুলির উৎসব।

অগ্রহায়ণের হাত ধরাধরি করেই আসে পৌষ। এটিও মূলত শস্য উৎসব। একে উপলক্ষ করে মুসলিম রাখালবালকেরা মানিক পীরের গান গায়। আর হিন্দু রাখালেরা লক্ষ্মীর নামে ছড়া কেটে সারা পৌষ মাস বাড়ি বাড়ি মাগন ভিক্ষা করে। মাগন শেষে পৌষসংক্রান্তির সকালে মাঠে বা বনের ধারে রান্না করে থাকে। পিঠাপুলি বা শিরনি বানিয়ে মানিক পীর বা দেবতার উদ্দেশে নিবেদন করে নিজেরা খায় এবং অন্যদের খেতে দেয়। একে বলা হতো পিঠাপর্ব বা পিঠাপরব। কালে কালে পৌষপার্বণ উৎসবটি গ্রামবাংলার পরিবর্তে পালিত হতে থাকে জেলা-উপজেলা ও শহরগুলোতে। সর্বোপরি রাজধানীতেও আবহমান লোকসংস্কৃতির উৎসব হিসেবে।

পৌষপার্বণকে মকরসংস্ক্রান্তিও বলা হয়। পশ্চিমবঙ্গে ছড়া আবৃত্তি করে পৌষ মাসের পুনরাগমনসহ গৃহস্থের কল্যাণ কামনায় পালিত হয় উৎসব। এ দিন একগোছা খড় বেঁধে রাখা হয় ঘরের খুঁটিতে। একে বলে বাউরি বা বাউনি বাঁধা। বাংলাদেশে এ দিন বাস্তুপূজা করা হয়। মাটির নিকোনো বেদির ওপর একটি কুমির তৈরি করে অনুষ্ঠিত হয় এই পূজা। অন্য অনেক কিছুর মতোই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নতুন ফসলের আগমন উপলক্ষে নানা গান ও গদ্য-পদ্য রচনা করেন পৌষকে অবলম্বন করে। সর্বোপরি শান্তিনিকেতনে প্রচলন করেন পৌষমেলার। উল্লেখ্য, এই মেলা অনুষ্ঠিত হয় কয়েক দিন ধরে।

সেই থেকে শুরু। পরে তা নাগরিক সংস্কৃতির বিকাশে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে। তবে গ্রামগঞ্জে এর প্রকোপ কমছে ক্রমশ।

পৌষ মাসে আবহাওয়া ও প্রকৃতি অনেকটা সদয় ও অনুকূল থাকায় এ সময়ে নানা উপলক্ষে মেলা বসে প্রায় সর্বত্রই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব মেলার তেমন ঐতিহ্য ও জৌলুস নেই। শহর-নগরের আগ্রাসন ও উৎপাদিত শিল্পপণ্য গ্রাম্য সম্ভারের স্থান দখল করে নিয়েছে অবলীলাক্রমে। তবে পিঠাপুলি, মেঠাই-ম-াসহ নানা খাদ্য-খাওয়া, পানভোজন চলে বৈকি। তাতে অবশ্য ভেজালও কম নেই। অনেকক্ষেত্রে নানা বিতর্কও আছেÑ হাউজি, জুয়া, চরকি, তিন তাসের খেলা অসামাজিক কার্যকলাপ, অশ্লীল যাত্রাপালা, সার্কাস ইত্যাদি। হায়, পৌষমেলা তোমার ঐতিহ্য ও জৌলুস বুঝি যায় যায়! একেই কি বলে, কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ!

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: