আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পৌষের রোদমাখা দিনে

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • জাফর ওয়াজেদ

প্রকৃতিতে পৌষের সমারোহ। চারদিকে ধানক্ষেত বিরাণ হয়ে আসে। পত্রবিহীন গাছপালা মনকে নিঃসঙ্গতার আড়ালে বেঁধে ফেলে। সবুজেঘেরা সর্ষের মাঠ মনকে আবার চাঙ্গা করে দেয়। বাতাস যেন থমকে থমকে প্রকৃতির মাঝে নিজ সৌরভ বিলিয়ে বেড়াচ্ছে। পৌষ মানেই কুয়াশা ভেজা সকাল। সবুজ পাতার গায়ে শিশিরের ফোঁটা। তার ওপর সোনালী রোদ। মাঠের সবুজ ঘাসে শিশিরে পা ভিজিয়ে হাঁটা। দুপুরের রূপালী রোদ। ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধে ভরা সন্ধ্যা আর সঙ্গে যদি যোগ হয় মোলায়েম চাঁদের আলো কিংবা কোজাগরী পূর্ণিমাÑ তবে বুঝি নীরবতা এসে ভর করে। কারো মুখে নেই কোন কথা।

শীতের সকালে কুয়াশা ভাঙ্গা রোদে গ্রাম বাংলায় পিঠে পুলির আয়োজন চলে। রোদে পিঠ দিয়ে বসে উঠোনোর চুলায় তৈরি পিঠের সমারোহ স্মৃতি হয়ে আছে কারো কারো মনে। শীত মানেই অতিথি পাখী বা পরিযায়ী পাখির ঝাঁকে ভরে যাওয়া বিল, জলা, হাওড় ও বাঁওড়। পাখিদের ঘিরে গড়ে ওঠে এক অপরূপ পরিবেশ। আবার পাখির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় পাখি নিধন।

শীত মানেই দরিদ্র মানুষের জন্য বিভীষিকা, শীত নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই অভাবি মানুষের। শীতে পাতা কুড়িয়ে আগুন জ্বালানো ও আগুন পোহানো ছাড়া শৈত্যপ্রবাহ থেকে বাঁচার আর উপায় নেই।

শীতে ফলমূল, তরি-তরকারী সব টাটকা সবুজ হয়ে বাজারে আসে। আর সুস্বাদু হয়ে রসনার তৃপ্তি ঘটায়। এখন কারো পৌষ মাস, কারও ...। না, না কারও সর্বনাশ না। পিঠে পায়েসের মৌসুমে সকলেরই মূলত পৌষ মাস। পৌষ মাস মানে শীতের আমেজ, পিঠে রোদের আলসেমি, শীতের হাওয়ায় হাজারও স্থানে বেড়ানোর পরিকল্পনা। পৌষ মাস মানেই কমলালেবু, খেলাধূলা, নতুন গুড়ের গন্ধ, চাল বাটায় সোরগোল, ঢিমে আঁচে দুধ জাল দেয়া, মাটির সরায় তেল মাখানো, নারকেল কোরানোÑ আরও কত সরঞ্জাম। পৌষ পার্বণের পালা কোন একক আয়োজন নয়। সবার সঙ্গে সবার যোগে এক ভাললাগার ক্ষণ তৈরি। যেন এই পৌষের আদত কর্ম।

পৌষের সকালের সোনারোদ গান গায় বিস্তীর্ণ সর্ষের মাঠে। এই রোদ উজ্জ্বল, ঝলমলে, অপরূপ। যেন রোদ নয়, প্রকৃতির বাঁধভাঙ্গা হাসি। ‘পৃথিবীর সব ঘু ঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে‘। শীতের দিনে ভ্রমণে মনে আনে সুখ। গ্রাম বাংলার মাটির গন্ধ প্রাণ ভরিয়ে দেয়। শীত মৌসুমে অনেকেই বর্ষজীবী ফুলের বাগান করেন। তাই প্রতি বছরেই শীতে নতুন নতুন রং ও রূপের ফুল প্রস্ফুটিত হয়।

শীতের ঋতুতে সারাদেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মুখরিত হয়ে ওঠে। গানে গানে প্রাণ হরিয়ে নেবার এই যেন মোক্ষম সময়। সারারাত পালা গান, যাত্রার আধিক্য সর্বত্র। তবে শীতকালে ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরও কমতি নেই। শীত মানেই পোশাকের বাহার। বস্ত্রাচ্ছাদিত মানুষ হেঁটে বেড়ায় শীতকে বাগে আনার জন্য। শীতের রাত আসে বেশ শীতার্ত আমেজ নিয়ে। দিন ছোট হয়ে আসে, আর রাত ফুরাতে চায় না। কুয়াশা এসে চারদিক ছেয়ে রাখে। খুব কাছের মানুষটিকেও দেখা যায় না। আলোও ভেদ করতে পারে না কুয়াশার আবরণ। আর কনকনে শীত মানেই জবুথবু জীবন।

পিঠে পুলির উৎসব

শীত মানেই ধনীদরিদ্র ভেদে পিঠে পায়েস তৈরির নানা আয়োজন। ঘরে ঘরে তাই উৎসব ভাব জুড়ে থাকে। অবশ্য দরিদ্র শীতার্ত মানুষের কাছ হতে দূরে থাকে এই উৎসব। পাতা কুড়ানোর মেয়েটির কাছে পিঠে পুলি পায়েস থেকে যায় অধরাই। বয়সী মানুষের কাছে শীতের এই অংশটা যেন ‘স্মৃতি সততই সুখের’। নগর জীবনে নতুন গুড় আর নারকেল কোরার সঙ্গে গরম গরম চিতই আর ভাপা পিঠে খাওয়ার সুখটুকু মেলে। শীতের সময়টায় নগর জীবনে পিঠের আয়োজন করে থাকে দরিদ্র মানুষরা। তবে পিঠে উৎসব মধ্যবিত্তর স্বপ্নপূরণে বেশ সহায়ক। তাই নানা স্থানে শীতের সময়টাতে নাগরিক পিঠে উৎসবে লোক সমাগমের কমতি নেই।

আজকের গতি তাড়িত যাপনচিত্রে ছোট পরিবারের একাকিত্ব হারিয়ে যেতে বসেছে এই সমাবেত পালা পার্বণ। সুযোগ বুঝে মিষ্টির দোকানে তৈরি হতে শুরু করেছে পাটিসাপটা, দুধপুলি, গোকুল পিঠে। এতে পিঠে খাওয়ার স্বাদ মিটছে বিনা পরিশ্রমেই। কিন্তু প্রিয়জনদের হাতের ছোঁয়ার বিকল্প কী হতে পারে? হয় না। টলটলে নলেন গুড় আর নারকেল কোরার সঙ্গে গরম গরম চিতই পিঠে খাওয়ার সুখ যতটা জড়িয়ে আছে পিঠের স্বাদে, ততটাই বড়দের আহলাদ আবদারে। বেনি পিঠে, গোলাপ খোয়াক্ষীরের পায়েস, ক্ষীরের পাটিসাপটা, দুধপুলি, আরিসা পিঠে, নকশি পিঠে, ক্ষীরের পানখিলি, খেজুর গুড়ের পিঠে, পালো পিঠে, ডুটি পিঠে, তিলের পিঠে, চিড়ের পিঠে, সিদ্ধ ক্ষীরের পিঠে, মুগা-পাকন পিঠে, পানি-কমলা পায়েস, পঞ্চরতœ পায়েস, আঙ্গুরের পায়েস, পেঁপের ক্ষীরপুলি, খেজুর তক্তি, কলার পিঠে, মিষ্টি কমুড়োর পায়েস, রাঙ্গা আলুর পুলি, বাঁধাকপির পায়েস, পালং পায়েস, লাউয়ের মোহনভোগ দই ও মধুর মালপোয়াÑ এসবই শীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

ফুল ফোটার কাল

শীতের মহিমা জানে শীত নিজেই। এ সময়টাতে বৃক্ষ-তরুলতাদের আয়েশী ঘুমাবার সময়। নিদ্রাতুর চোখে কখনো জাগে, পিট পিট করে তাকায়, আবার ঘুমিয়ে পড়ে শীতার্ত তন্দ্রার রাতের মতো দিনেও। তবে স্রেফ ঘুমিয়ে কাটায়, তাতো নয়। এ সময়টা যে তার ফুল ফোটাবার। শিশির ভেজা কলিগুলো বেশ সতেজতায় চোখ মেলে যখন তাকায়, প্রকৃতির রূপ যেন আরও মাধুর্যময় হয়ে উঠে। নানা রঙের, ঢঙ্গের, বাহারের ফুলেরা ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাত পোহাবার আগেই নিজেকে মেলে ধরে। ‘ফুলে ফুলে ঢলে বহে কিবা মৃদুবায়’ বসন্তের দিকে যাত্রার প্রস্তুতি নিতেই ফুলেরা পুষ্পিত ইমেজ নিয়ে শীতের কাঁপন মাখে দেহের রোমকূপে, পরাগে, পাঁপড়িতে। বয়সী মানুষ যেমন প্রবল শীতের প্রকোপে জবুথবু হয়ে যায, চাদর কাঁথা মুড়ি দিয়ে শীতের তীব্রতা থেকে একটু উত্তাপ পেতে চায়, তেমনি বৃক্ষেরাও কেমন যেন মুষড়ে পড়ে। নিশ্চুপ থাকে। পাতারাও কেঁপে কেঁপে ওঠে না তেমন। ধুলোতে আকীর্ণ পাতারা শিশিরের ফোঁটায় ভিজে বির্বণ ধূসরতা জড়ায়। শীতের হিমহিম ভাব দেহ মন জুড়িয়ে যায় ফুলের সুবাসের মোহমুগ্ধতায়। শীতের বৃক্ষেরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে বসন্তের নাতিশীতোষ্ণতার উত্তাপের। এই যে সময়, যখন বৃক্ষের পাতারা ঝরে যেতে থাকে, শুকনো পাতার নূপুর বাজার ক্ষণ আসে পায়ে পায়ে। পত্রশূন্য হয়ে আসা বৃক্ষেরা কেমন বিবর্ণতা ধারণ করে। যতই বৃক্ষ হারাক তার সজীবতা ততই বাড়ে তার ফুল ফোটানোর খেলা। গুল্ম কিংবা লতারা ফুলের প্রহর ছড়াতে থাকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। এদের অনেকে তখন জেগে ওঠে, নতুন হিম হাওয়ায় পায় প্রাণ। দেশী বুনো গাছগুলোর প্রস্ফুটন কাল এ শীতের সময়টাতেই হয়।

বাগান বিলাসীরা এসময়টাতে প্রফুল্লবোধ করেন নানা ফুলের ফুটে ওঠার আমেজে। ফুল ফুটে ফুল ঝরে কিন্তু শীতের হাওয়ায় নাচন আর থামে না। হাওয়ারা কথা বলে ফুলের কানে কানে।

শীতের ফুল সরিষা। আর সরিষা মানেই শীতকাল। বর্ষজীবী এই গাছটি শীতকাল জুড়ে বাংলার রূপকে আরও সৌন্দর্যম-িত করে এর অজস্র প্রস্ফুটনে, ক্ষেতের পর ক্ষেত জুড়ে। কবির নিসর্গী মনের চোখে হলুদ সর্ষে ফুলেরা খেলা করে অন্য এক আবাহনে, আস্বাদনে। সরিষা ফুলের রয়েছে আবার ঔষধিগুণ। মৌমাছি এই ফুল থেকে মধু আহরণ করে, তাই মধু চাষাবাদ দেশে বেড়েছে। সরিষার বীজ থেকে আহরিত তেল দেশের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ভোজ্যতেল। এদেশে শীতের ফুল হিসেবে যেসব গাছ রোপণ করা হয়, তা মূলত ইউরোপীয় জাত। সেসব দেশের হিমশীতল এলাকার ফুলগুলো এদেশের মাটিকেও ধারণ করে। বিশেষত শীতে। ফুল গাছগুলোর অনেকগুলো এক বর্ষজীবী। আবার কোন কোন গাছ বাঁচে বহু বছর। এক মওসুমে ফুল পেয়ে গেলেই সন্তুষ্ট বাগান বিলাসীরা। বাড়ির ছাদের টবেও এসব ফুলের সমারোহ চোখে পড়বেই। সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিতে আসে গাঁদা, কসমস, ডালিয়া, গন্ধরাজ, বোগেনভেলিয়া, স্যালাভিয়ার মতো রূপবান সব ফুল। গাঁদার চাহিদা অবশ্য বছর জুড়েই। সারাবছরই এই ফুল মেলে। আবার সূর্যমুখী শীতকালে যেমন ফোটে, তেমনি গরমকালেও। শীতের আরও ফুলের মধ্যে রয়েছেÑ বোতাম ফুল, চন্দ্রমল্লিকা, পপি, ফ্লক্স, পর্তুলেখা, কর্নফ্লাওয়ার, করিওপসিস, স্ন্যাপড্রাগন, কার্নেমার্ন, ক্যালেন্ডুলা, জিনিয়া দোপাটি সুইপষ্টি। লবেলিয়া ন্যাস্টার সিয়াম, পেটুনিয়া, মোরগ ফুল, ভার্বেনা, হলিহক প্রমুখ। ঢাকায় ইদানীং বিদেশী ফুলের চারার আগমন ঘটেছে। টকটকে লালফুলের প্রস্ফুটন, ঐশ্বর্য দৃষ্টি কেড়ে নেয় লতা-ভা-ির। দেখতে আকর্ষণীয় লতাটি। পাতাগুলো বড় বড়। ঢেউ খেলানো, রঙ কালচে সুন্দর সবুজ। শীতের শুরুতেই কুঁড়ি ধরে। ক’দিনের মধ্যেই রক্তলাল ফুলে ছেয়ে যায় এর পুষ্পদ-গুলো। রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে ক্যামেলিয়া ফুলের কদর বেড়েছে। চা গাছের নিকটতম আত্মীয়। গুল্মটি দেখতেও অনেকটা চা গাছের মতো। পুষ্পরানী গোলাপের মতো দেখতে। রূপ বেশি বলে গন্ধহীন। শীতে ফোটা আরেকটি ফুল লেডিস আমব্রেলা। ফুলগুলো মেয়েদের ছাতার মতোই রঙচঙ্গে ও বাহারি। রঙ কমলাটে লালচে। ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে। ফুলের আকার বেশ ছোট। একসঙ্গে অনেক ফুল ফোটে। ডালপালা বেশ বড়। ছড়ানো। লতাটি দেখতে অনেকটা বাগান বিলাসীর মতো। শীতে জাঁকালোভাবে ফোটে দেবকাঞ্চন। ফুলের রঙ হালকা লালচে বেগুনী। কিছুটা গোলাপী বর্ণেরও। গাছটির উচ্চতা ৮ মিটারের মতো। ঝাঁটি নামক ফুলটি শীতের শুরু হতে এক নাগাড়ে অসংখ্য ফুলে ছেয়ে থাকে। ছোট ছোট থোকায় ফানেলের মতো ফুলগুলো খুবই আকর্ষণীয়। সাদা, গোলাপী ও বেগুন রঙের হয়।

ফুলমূলের বাহারে আহারে

শীতকালে ফলমূল, তরি-তরকারী স্বাদে গুণে হয়ে ওঠে মনকাড়া। সুস্বাদু সবই যেন লাগে। খাবারের স্বাদে ও অনন্য করে তোলে। এসময়ের ফলও তৃপ্তিদায়ক। আতাফল গাছে ফুল আসে গ্রীষ্মকালে, আর ফল শীতের আগমনে। মিষ্টি স্বাদের ফলটির আরেকটি জাত ভাই শরীফা বা সীতাফল। দারুণ খাদ্যগুণে সমৃদ্ধ আতাফল। শীতের জনপ্রিয় ফল জলপাই। শীতে সুস্বাদ জাগায়। সবুজ রঙের ফলটি আচারের জন্য উপাদেয়। শীতকালে তাই জলপাই আচার বানানোর আধিক্য দেখা যায় ঘরে ঘরে। পানিফল শীতের গোড়াতেই বাজারে আসে। এতে রয়েছে প্রচুর খনিজ পদার্থ। আমিষ, শর্করা, লোহা, খাদ্যপ্রাণ বি ও সি। উলট কম্বল নামক ফলটির ফুলগুলো নিচের দিকে ঝুলে থাকে। ফলগুলো দেখার মতো। ফেটে গেলে আরও দৃশ্যনীয় হয়ে ওঠে। এর বাকলের আঁশ দিয়ে পরচুলা তৈরি হয়। লটকনে ফুলের রঙ লালচে বেগুনী। ডালের শেষ মাথায় অনেকগুলো ফল একসঙ্গে ধরে। শীতকালের তরিতরকারি শিম, টমেটো, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি। এসব তরিতরকারি এসময়ে বেশ সুস্বাদু হয়। শীতের রোদমাখা দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যায়। ঘুম ভেঙে উঠতে উঠতে সূর্য মধ্য গগনে চলে আসে। আর ঝুপ করে নামে সন্ধ্যা। রাত আর পোহাতে চায় না। শীতের মন্দদিক যা-ইথাক, শীত আছে শীতেই, উপাদেয় গরমের আস্বাদনে।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: