মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হিমজর্জর শীতে উষ্ণ কবিতা

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মারুফ রায়হান

পৌষ কি বুকের ভেতর পুষে রাখে অলৌকিক আগুন, যাতে আত্মা সেঁকে নিতে পারে জবুথবু জীবন্মৃত! ঝরাপাতাদের গানের ভেতর ঘ্রাণের ভেতর শীতের দংশন কি রেখে যায় কোন গাঢ় দাগ? শীতেরও নিজস্ব সুর থাকেÑ শ্রুতি ভেদ করে যাবে সে আনন্দধ্বনি কোথায় এমন শক্তিমান?Ñ এই যে ক’টা লাইন লিখে ফেললাম পৌষের পাঁচালি গাইতে গিয়ে, তা কি সম্ভব হতো যদি না হিমহিম হাওয়ায় আমার বুকের বামপাশ তপ্ত না হয়ে উঠত? আপাত দৃষ্টিতে শীত বড় অকাব্যিক। কবিতা থেকে কোন বাস্তব উষ্ণতা মেলে না পাড়াগাঁর নাড়ার আগুনের মতো, কিংবা বনেদি বৈঠক ঘরের হিটিং মেশিন বা হিটারের মতো। তবু কবিতার রয়েছে এক প্রবল শীত নিবারণী অহঙ্কার। এক পরাবাস্তব উষ্ণতা। তাই এই সামান্য রচনা পৌষ পঙ্ক্তিকেই কুর্নিশ করবে। শিশিরের আর্দ্রতা মুছে, কুয়াশার চাদর সরিয়ে পাঠকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুরু করা যাক আলাপচারিতা।

কথায় কথায় যে বলি, বদলে গেছে জলবায়ুÑ তা মিথ্যে নয়। তবু পৌষ আসে ফিবছর প্রকৃতির নিয়মে। শহরে পৌষের একরকম রূপ ও অভিঘাত; গ্রাম-বাংলায় আরেক রকম। আচ্ছা ইউরোপ-আমেরিকায় কি পৌষ আসে! তাদের তো বছরভরই উইন্টার, কাশবনের মতো বরফ-ছাওয়া। তবে তাদেরও আছে বরফে উষ্ণ কবিতা। বাংলা সাহিত্যে বাংলার পৌষ ছবি এঁকেছে বিচিত্র আঙ্গিকে। বাংলার মানুষ আজ গোটা বিশ্বে সংসার পেতেছে। তাই পৌষ নিয়ে তাদের নস্টালজিক হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পৌষ বললে শুধু শীতই বোঝায় না, বোঝায় তার চেয়ে অধিক কিছু। সে হেমন্তিকা প্রহর পেরিয়ে ঘন কুয়াশার দিকে যাত্রা শুরু করে। পৌষের পিঠ ঘেঁষে ধীরে ধীরে সেঁধিয়ে যায় মাঘের ভেতরে, থরথর করে কাঁপে ঠা ায়। শুষ্ক মৃতপ্রায় মন তবু স্বপ্ন দেখে আসন্ন ফাল্গুনের। আবার জীবন হেসে ওঠে, রঙ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। শীতের বারান্দাজুড়ে পড়ে থাকা রোদে কবিতার চুম্বন। কিন্তু তার আগে পৌষের পাঁচালি চলতেই থাকে ...।

বুদ্ধদেব বসুর একটা কবিতার নাম ‘শীতরাত্রির প্রার্থনা’। বুদ্ধদেব লিখেছেন, ‘বাইরে বরফের রাত্রি। ডাইনি হাওয়ার কনকনে চাবুক/গালের মাংস ছিঁড়ে নেয়, চাঁদটাকে কাগজের মতো টুকরো করে/ছিটিয়ে দেয় কুয়াশার মধ্যে, উপড়ে আনে আকাশ, হিংসুক/হাতে ছড়িয়ে দেয় হিম; শাদা, নরম, নাচের মতো অক্ষরে/পৃথিবীতে মৃত্যুর ছবি এঁকে যায়।’ কবি নিশ্চয়ই ইউরোপে বসে এটা লিখেছেন। আজকের কবি ঢাকা শহরে বসে ইউরোপে তাঁর দয়িতার শীত যাপনের কথা স্মরণ করছেন। কবি প্রচ শীতের রাতে উদোম শরীরে শীতের কামড় নিয়ে বুঝে উঠতে চাইছেন ইউরোপের মাইনাস ডিগ্রীর তাপমাত্রার বাস্তবতা। শীতের সাঁকোয় চড়েই তাঁর প্রেমাস্পদার সঙ্গে অপার্থিব নৈকট্য লাভের অবাক কসরৎ!

জীবনানন্দ দাশ কবিতায় শীতের কথা বলতে গিয়ে ‘শীতরাত’ কবিতায় কী ভীষণ সত্যোচ্চারণই না করেছেন : ‘এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে।’ এতে দার্শনিকতা আছে। কিন্তু গোটা কবিতা যখন পড়ি তখন এক ব্যাপকগভীর গহিন মৃত্যু আমাদের গ্রাস করতে চায়। শীতের পরেই আছে বসন্ত; মাঘের বাগধারার পরে ফাল্গুনের ফুলের সৌগন্ধ। জীবনানন্দ যেন এই পুনপুন আবর্তনকে ব্যঙ্গ করে যান এই ভাবেÑ ‘এদিকে কোকিল ডাকছেÑ পউষের মধ্যরাতে;/ কোনো একদিন বসন্ত আসবে বলে?/কোনো একদিন বসন্ত ছিল তারই পিপাসিত প্রচার?’ জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য তবে শূন্যতায়, অমোঘ মৃত্যুতে। শীতরাতই সে ধ্রুব সত্যকে আমাদের সামনে নিয়ে আসতে সমর্থ। এই কবিতার শেষটা ভীষণ ভয়ার্ত। কবি জানাচ্ছেন, অরণ্যকে আর পাবে না সিংহ, খসে পড়া কোকিলের খসে পড়া গান পাহাড়ে নিস্তব্ধ! উপসংহারে পৃথিবীর উদ্দেশে বলছেন,

হে পৃথিবী,

হে বিপাশামদির নাগপাশ,Ñ তুমি

পাশ ফিরে শোও,

কোনোদিন কিছু খুঁজে পাবে না আর।

শীতের মৃত্যুচুম্বিত রাতগুলো নিয়ে আর কী সত্য আমাদের জানা বাকি রইল, বলুন?

আবার এই কবিই তাঁর মাল্যবান উপন্যাসে শীতের জান্তব অভিঘাতটি প্রকাশ করেছেন। শীতের ভেতর মানুষের নিঃসঙ্গতার তীব্রতীক্ষ্ম অনুভূতির জেগে ওঠার পাশাপাশি নিদ্রাতুর অথচ অদম্য যৌনতার দিকটিও তুলে ধরেছেন। মাল্যবান ও উৎপলাÑ দুই মেরুর দুই মানব-মানবীর ভেতর শীতের চাইতেও যেন সুগভীর শীতলতা রয়েছে। তবু গভীর শীতের এক রাতে একে অন্যের শরীর খুঁড়েই উষ্ণতার সন্ধান করে চলে।

প্রসঙ্গ বদলানো যাক। আসা যাক রবীন্দ্রনাথে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিটি ঋতু নিয়ে কবিতা আর গান লিখেছেন অঢেল ধারায়। বর্ষার ওপর লেখা তাঁর গানের সংখ্যা দেড়শর মতো। বসন্তও খুব কাছাকাছি, একশ’ দশ কি পনেরো হবে। শরত পিছিয়ে আছে তেত্রিশটি গান নিয়ে। কিন্তু শীত একেবারেই নিচে, মাত্র বারোটি গান। ভাবুন!

গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শীত এলে কি প্রাথমিকভাবে একটু স্বস্তি আসে না? গরমের হাঁসফাঁস থেকে বাঁচা যায় বলে? আবার বিত্তবানেরা পোশাক প্রদর্শনীর একটা সুযোগও পান বটে। সোয়েটারে উলের বোনা ছন্দ বেজে ওঠে। তবে কিছুদিন না যেতেই শীতের নেতিবাচক খবরগুলো আসতে শুরু করে। মানবতাবাদীদের আহ্বান শোনা যায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। শহরে ধুমসে চলে শীতের উৎসব, আর গ্রামাঞ্চলে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা। শীতের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ের চিত্র কবিতায় খুব একটা আসে না। আর যারা শীতে জবুথবু হয়ে পড়েন তাদের কাছে শীতকাব্য বিন্দুমাত্র মূল্য বহন করে আনে না।

শহুরে শীতের স্বরূপ কবিতায় তুলে ধরেছেন শামসুর রাহমান নিষ্ঠার সঙ্গে। ‘পড়েছে শীতের হাত’ কবিতাটি তিনি শুরুই করেছেন ফ্ল্যাটবাড়ির অনুষঙ্গ দিয়েÑ তাতে দেখছি ‘ফ্ল্যাট বাড়িটাকে মৃদু চাবকাচ্ছে ঘন ঘন এই/শীত, পঞ্চাশোর্ধ ত্বকে দাঁত/বসায় তাতার হাওয়া...’। দীর্ঘ এ কবিতাটি শীতের দীর্ঘ রাতের মতো অব্যতিক্রমী এবং নাটুকে। শীতের হাত কোথায় কোথায় পড়েছে তার সংবাদদাতাসুলভ বর্ণনা দিয়েছেন শামসুর রাহমান। ফুটপাথে ‘পশুর ধরনে’ শুয়ে থাকা মানুষ আর ‘নেশাময় মেথরপট্টির’ কথাও বাদ যায়নি। একেবারে শেষ পাদে এসে কবিতার পাঠককে তিনি প্রবল নাড়া দেন শীত-উত্তীর্ণ শিল্পীমনের সৃজন-উষ্ণতার বাস্তবতা তুলে ধরে। লেখেন তাঁর হৃদয় শীতমুক্ত থাকার কথাটি; উত্থাপন করেন ‘পবিত্র তাপের’ প্রসঙ্গ। আমাদের প্রতীতী জন্মে শীত নাগরিক শিক্ষিত ব্যক্তিকে আপন দর্পণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। নিজের জীবনের দিকে মানুষ নিবিড় করে ফিরে তাকায়; ফিরে তাকায় শৈশবের স্মৃতির দিকেও। ধূমায়িত চায়ের পেয়ালা হাতে, গায়ে রোদ্দুরের গন্ধ মেখে নিজের সঙ্গে কথা বলে।

আধুনিক কবিদের রচনায় শীত এসে চকমকি পাথর ঠুকে যায়। পাঁচ কবির পঙ্ক্তি তুলে দিচ্ছি এখানে, পাঠকেরা সেখান থেকেই পেয়ে যাবেন শীতের ছোঁয়া।

শীতের ঢেউ নামি আসবে ফের/ আমার বুড়ো হাড়ে ঝনাৎকার (আবদুল মান্নান সৈয়দ)

সব মরবে এবার শীতে/কেবল আমার ফুসফুসের পাতাঝরার শব্দ ছাড়া (এবার শীতে : আবিদ আজাদ)

আমিও সারারাত মৃত মানুষের শীতে শীতার্দ্র হয়েছিলাম (নষ্ট অন্ধকারে : রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ)

শীতের আকাশ যেন কুড়োতেছে নাক্ষত্রিক বরফের কুচি (প্রত্যাবর্তন নিজের দিকে : আসাদ মান্নান)

কনকনে শীতের দুপুরে জাদুবাস্তবতা প্রকৃতির রূপরহস্য/আলোর গোলক হয়ে বিষুবরেখার ভেতরে আবর্তিত হতে থাকে (শীতের কবিতা : সুহিতা সুলতানা)

শীত প্রকৃতির বহিরঙ্গে এবং মানবশরীরে যে প্রভাব রেখে যায় তা নিয়ে কাব্য হয়েছে সুপ্রচুর; না লিখলেও চলে যে সমকালীন কবিদের সেসব রচনার বেশিরভাগই সহজিয়া কড়চা। আগামী দিনের কবি বাংলার শীতঋতুকে আঁকবেন এমন জলরঙ শব্দে যাতে শীতঘুম টুটে যাবে মানবমনের, আর প্রকৃতির গভীর গোপন স্বর কথা বলে উঠবে সান্দ্র সুরে।

marufraihan71@gmail.com

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: