মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দেখে বেড়ান স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্নগুলো

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

বিজয়ের মাস অনুপ্রেরণার, শ্রদ্ধার এবং স্মরণের। এদেশের বিভিন্ন প্রান্তে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে তৈরি হয়েছে অনেক স্মারক ভাস্কর্য ও স্থাপনা। মহান বিজয় দিবসে আপনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন সেই স্মৃতিচিহ্নগুলোয়। এ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন রাজীব পাল রনী।

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’: ‘সাবাস বাংলাদেশ’ ভাস্কর্যটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারের পাশে এবং সিনেট ভবন সংলগ্ন দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ছাত্র-শিক্ষকদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য স্থাপন করা হয়েছে ‘সাবাস বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য। ছয় ফুট বেদীর ওপর স্থাপিত রয়েছে রাইফেল হাতে দু’জন মানুষের ভাস্কর্য। একজন অসীম সাহসের প্রতীক, যিনি ধৈর্য দিয়ে বিজয়কে জয় করেছেন এবং অন্যজন রয়েছে বিপুল উল্লাসে, যা দিয়ে বোঝানো হয়েছে আমাদের দেশটা সামনে এগুনোর পথ খুঁজে পেয়েছে। ভাস্কর্যের মূল দুটি অবয়বের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের পতাকার একটি ভাস্কর্য ফরম। এর উচ্চতা মাটি থেকে ছত্রিশ ফুট, যেটা পুরো দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। বিখ্যাত শিল্পী নিতুন কুন্ডু সম্মানী ছাড়াই এই তৈরি করেন ভাস্কর্যটি । ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শহীদ জননী বেগম জাহানারা ইমাম ভাস্কর্যটি উন্মোচন করেন। বিজয়ের মাসে দেখে আসতে পারেন এটি ।

অঙ্গীকার : চাঁদপুর জেলার মুক্তিযোদ্ধা সড়কের পাশের লেকে হাসান আলী সরকারী হাইস্কুল মাঠের সামনে একাত্তরের শহীদ স্মরণে নির্মিত হয়েছে ‘অঙ্গীকার’। অপরাজেয় বাংলা’র শিল্পী সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ ভাস্কর্যটির স্থপতি। সিমেন্ট পাথর আর লোহা দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যটিতে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা স্টেনগান উর্ধে তুলে ধরে যেন জানিয়ে দিচ্ছেন, আমরা অঙ্গীকার রক্ষা করেছি। চাঁদপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এসএম সামছুল আলমের প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সালে দৃষ্টিনন্দন এ ভাস্কর্যটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ : মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে লড়াইয়ের এক অবিস্মরণীয় সাক্ষী। ১৯৭১-এর অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে মেহেরপুর জেলা শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে মুজিবনগরে নির্মিত হয়েছে ঐতিহাসিক ‘মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ’। প্রথম মন্ত্রিপরিষদ যেখানে শপথ গ্রহণ করেছিল, সেখানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধটি । ১৬০ ফিট ব্যাসের গোলাকার স্তম্ভের ওপর ২৩টি কংক্রিটের দেয়ালের সমন্বয়ে এ সৌধটি তৈরি। স্মৃতিসৌধটির নকশা করেন স্থপতি তানভীর করিম। সৌধটির পাশেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য। ৩০ লাখ শহীদের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে বসানো হয়েছে ৩০ লাখ পাথর।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ : ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভারের নবীনগরে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এটি নির্মিত হয়। এর স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন। স্মৃতিসৌধের উচ্চতা ১৫০ ফুট। সৌধের স্তম্ভগুলো মাঝখান থেকে মোড়ানো এবং ধারাবাহিকভাবে সাজানো। স্মৃতিসৌধের দিকে তাকালেই যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালে আমাদের বিজয়ের গৌরবগাঁথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেয়া লাখো শহীদের মুখ। সৌধের পাশেই বেশ ক’টি গণকবর এবং একটি প্রতিফলন সৃষ্টিকারী জলাশয় আছে। আপনার সন্তানকে নিয়ে এখানে বেড়ানোর পাশাপাশি জানাতে পারেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানা অধ্যায়

ভাস্কর্য জাগ্রত চৌরঙ্গী : ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে গাজীপুর-চান্দনা চৌরাস্তায় স্মারক ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ হাজার হাজার ছাত্র-জনতা চান্দনা চৌরাস্তায় জড়ো হয়ে দখলদার বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গড়ে তোলে প্রথম সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ । প্রথম প্রতিরোধের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে, উদ্দীপ্ত করে তোলে সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের। প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধের সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে স্বাধীনতার পরপরই দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ স্থাপন করা হয়। ৪২ ফুট উঁচু ভাস্কর্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা বাম হাতে রাইফেল এবং ডান হাতে গ্রেনেড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তৎকালীন রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাসের জেওসি মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর উদ্যোগে এ ভাস্কর্যটি তৈরি করেন ভাস্কর আবদুর রাজ্জাক। সহশিল্পী ছিলেন হামিদুজ্জামান খান।

রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ : মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথম আবিষ্কৃত বধ্যভূমির নাম ‘রায়েরবাজার বধ্যভূমি’। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক দু’দিন আগে পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী পরাজয় সুনিশ্চিত দেখে অগণিত শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের হাত-পা, চোখ বেঁধে গভীর রাতে ইটখোলার সামনে এ বধ্যভূমিতে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই বীর সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ঢাকার মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে বেড়িবাঁধে স্থপতি ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ ও জামি আল-শফির নকশা অনুযায়ী দৃষ্টিনন্দন সৌধটি নির্মিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। বাঙালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, বীরত্ব, সংগ্রাম ও ত্যাগের চিহ্ন বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে এ জাদুঘর। এখানে মোট ৬টি গ্যালারি রয়েছে। প্রথম গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে ব্রিটিশ শাসন ও প্রাচীন বাংলার ইতিহাস। দ্বিতীয় গ্যালারিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান পর্বের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, শরণার্থী এবং অস্থায়ী সরকারের রেকর্ডপত্র । চতুর্থ গ্যালারিতে মুক্তিযুদ্ধের বীরযোদ্ধাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও অন্যান্য স্মারক তুলে ধরা হয়েছে। পঞ্চম গ্যালারিতে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার্য অস্ত্র আর তাদের আত্মত্যাগের কাহিনী। শেষ গ্যালারিতে আছে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ, আর তার আগে তাদের ও রাজাকারদের হত্যাকা-ের নিদর্শন। পুরো জাদুঘরটিতে একসঙ্গে প্রদর্শিত হয় প্রায় ১ হাজার ৩০০টি সামগ্রী। আমাদের নতুন প্রজন্মের সন্তানরা ইতিহাসকে জানতে ও বুঝতে জাদুঘরে আসতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা। রোববার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

শিখা চিরন্তন : সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু স্মৃতিবিজড়িত স্থান। একাত্তরের ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এ উদ্যানে -‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর এখানেই আত্মসমর্পণ করে। আগামী প্রজন্মের কাছে জাতির এ ঐতিহাসিক স্মৃতি ধরে রাখার লক্ষ্যে এ উদ্যানটিতে ১৯৯৭ সালে শিখা চিরন্তন স্থাপন করা হয়।

জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ : মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে পাওয়ার হাউস সংলগ্ন জুটপট্টির মাথায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বড় বধ্যভূমি ‘জল্লাদখানা বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে জনবিরল এলাকায় এ পাম্প হাউসটিকে বধ্যভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছিল পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ‘জল্লাদখানা’ নামে পরিচিত ওয়াসার এই পরিত্যক্ত পাম্প হাউসের ৩০ ফুট নিচে খনন চালিয়ে ৭০টি মাথার খুলি, ৫ হাজার ৩৯২টি অস্থিখ- এবং শহীদদের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী পাওয়া যায়। শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে এবং একাত্তরের ঘাতকদের নির্মম অত্যাচারের বিষয়ে নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরতে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট (মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর) নির্মাণ করেছে এ স্মৃতিপীঠ।

বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। শীতের ছুটিও শুরু হয়েছে। এই সময়টাতে আপনি আপনার সন্তানদের নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থাপনাগুলোয় ঘুরে আসতে পারেন, যা আপনার সন্তানকে পরিচয় করিয়ে দেবে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের সঙ্গে, বোঝাবে দেশপ্রেমের মাহাতœ্য।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: