মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কতটুকু সফল পেরু জলবায়ু সম্মেলন

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • আরিফুর সবুজ

পেরুর উপজাতিদের কুয়েচ্চা ভাষায় ‘পাচামামা’র অর্থ হচ্ছে ‘জননী পৃথিবী’। এই জননী পৃথিবীকে রক্ষা করতে বিশ্বের সব দেশের নেতারা পেরুতে মিলিত হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এই ঐকমত্য আগামীতে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা মোকাবেলা করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে উন্নত, অনুন্নত দেশগুলোর সম্মত হওয়া, গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ডের তহবিল বৃদ্ধি এবং লস এ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের বিষয়ে সম্মেলনে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও, বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই ঝুলে রইল আগামী প্যারিস সম্মেলনের জন্য। সম্মেলনের এটাই বড় ব্যর্থতা। বাংলাদেশও তেমনভাবে এই সম্মেলন থেকে উপকৃত হয়নি। তহবিলে বেশি অর্থ জমা হয়েছে, এই বিষয়েও খুশি হওয়ার কিছু নেই। শর্তের বেড়াজালে সেই টাকা পাওয়া আদৌ সম্ভব কিনা, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাছাড়া ২০১৫ সালের করা প্যারিস চুক্তি ২০২০ সালে বাস্তবায়ন আদৌ করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সম্মেলন থেকে ফিরে আসা বন ও পরিবেশমন্ত্রী।

এই সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ডের অর্থের পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জলবায়ুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অর্থ সাহায্যে দেয়াই এই ফান্ডের উদ্দেশ্যে। ২০১০ সালে এই ফান্ড গঠন করা হলেও পরিতাপের বিষয় এই ফান্ডে কোন অর্থই জমা পড়েনি। তা শূন্যেই পড়েছিল। কিন্তু বান কি মুনের উদ্যোগের কারণেই ফান্ডের অর্থ এক হাজার কোটি ডলার। এই ফান্ড থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরই লাভবান হওয়ার কথা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই অর্থ পেতে হবে নানা শর্তসাপেক্ষে। সেটাই ঝামেলা। সম্মেলনের আলোচিত লস এ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া বিরোধিতা করলেও, পরে তা আলোর মুখ দেখেছে। ২০১৫ সালে পর্যালোচনার শর্ত জুড়ে দিয়ে এই ফান্ডটির জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলো কর্মকৌশলও নির্ধারণ করেছে।

আগামী বছরের ডিসেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক যে প্যারিস প্রটোকল তথা আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা, সেটারই খসড়া কাঠামো নির্ধারণের জন্য বসেছিল পেরুর এই সম্মেলন। প্যারিস চুক্তি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চুক্তির মধ্যে দিয়েই বিশ্বের কোন দেশ কিভাবে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে, কোন দেশের দায়িত্ব কতটুকু, ক্ষতিপূরণ কী হবে ইত্যাদি নির্ধারিত হওয়ার কথা। এজন্য এই চুক্তির খসড়া নির্ধারণী সম্মেলনটির দিকে নজর ছিল সবার।

উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের নেতারা চুক্তির কাঠামোর খসড়া প্রণয়নের ক্ষেত্রে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারছিল না। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যাপক বাকবিত-া চললেও কোনো ধরনের ঐক্যে পৌঁছাতে পারেননি বিশ্ব নেতারা। ফলে সম্মেলনের মেয়াদ আরও দেড় দিন গড়িয়েছে। অবশেষে অনেক নাটকীয়তার মধ্যে দিয়ে চুক্তির খসড়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ না হলেও, আংশিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বিশ্ব নেতারা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিরা কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোকে বেশি দায়িত্ব নেয়ার দাবি করছিল। তাদের যুক্তি ছিল, উন্নত দেশগুলো কয়েক দশক ধরেই পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো আঙুল তুলেেেছ উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে। তাদের যুক্তি, উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বেশি কয়লা পুড়িয়ে অধিক কার্বন নিঃসরণ করছে। তাই তাদেরই বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি না হওয়ার কারণেই ঝুলে ছিল সম্মেলনটির ভাগ্য। অবশেষে আংশিক সমঝোতা সম্মেলনটিকে ঘিরে কিছু আশার আলো ছড়ায়।

‘লিমা কল ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন’ নামের খসড়া চুক্তিতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধের জন্য গ্রীনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে সম্মত হয়েছে। কিয়োটো প্রেটোকলে নিঃসরণের মাত্রা কমানোর দায়িত্ব ছিল কেবল শিল্পোন্নত দেশগুলোর। কিন্তু এই সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে সেই দায়িত্ব সব দেশের ওপরই পড়ল। তবে দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তাছাড়া গ্যাস নিঃসরণ মাত্রা দেশগুলো কিভাবে অর্জন করবে, সেটারও কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেয়া হয়নি।

থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। পেরু সম্মেলনকে এভাবেই মূল্যায়ন করছেন পরিবেশবাদীরা। সম্মেলন নিয়ে বেশ ঢাকঢোল পেটানো হয়েছে, কিন্তু ফলাফল যেন শূন্য হাঁড়ি। না, এটা বলাও ঠিক হবে না। কিছু অর্জন আছে, তবে তা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। সম্প্রতি শেষ হওয়া পেরুর জলবায়ু সম্মেলন তথা কপ সম্মেলনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান দেখে এটাই বলা যায়।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: