কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বৃহত্তম প্যারাবনে মহাবিপর্যয়

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ইনাম আল হক

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম প্যারাবন। সেই সুন্দরবনের বড় অংশটি বাংলাদেশে রয়েছে, একথা প্রায়ই আমরা বড় মুখ করে বলে থাকি। সুন্দরবন সংরক্ষণে এদেশের প্রশাসন ও জনসাধারণের আন্তরিক আগ্রহের কথাও আমরা গর্ব করে নানা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উল্লেখ করি। হরেকরকমের অর্থকরী কর্মকা-, বিশেষ করে লবণ ও চিংড়ি উৎপাদনের জন্য দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে প্যারাবনের বিপুল ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। প্যারাবনকে উৎখাত অথবা খর্ব করা উপকূলীয় প্রতিবেশ ও জনজীবনের জন্য, কতটা আত্মঘাতী যে তা সেসব দেশের সচেতন মানুষ এখন ভালই বুঝতে পেরেছেন। বাংলাদেশের সুন্দরবনে অর্থনৈতিক আগ্রাসন সবচেয়ে কম হয়েছে বলে প্রায়ই তারা আমাদের বাহবা দিয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের গর্বের সেই সুন্দরবনকে আমরা এখন চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি নিয়ে এসেছি। সুন্দরবনের পানি এখন তেলের চাদরে ঢাকা পড়েছে। চাঁদপাই রেঞ্জের নদী, খাল ও ভারানিতে ভাসছে প্রায় এক লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল। সুন্দরবনের প্রতিবেশ এখন সর্বতভাবে বিপর্যস্ত। শ্যালা নদীর দুই পাড়ে মৃত ও মৃত্যুপথযাত্রী বন্যপ্রাণী পড়ে রয়েছে। সুন্দরবনের জন্য এ এক মানব-সৃষ্ট মহা-দুর্যোগ এবং স্মরণকালের মধ্যে বৃহত্তম বিপর্যয়। আইলা ও সিডর নামের দুটি ঝড় সম্প্রতি এ বনে আঘাত করেছিল। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও এই ফার্নেস তেলের সাঁড়াশি-আক্রমণ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বননির্ভর মানুষের জন্য অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে বাধ্য।

সবাই জানেন, নোনা পানিতে সৃষ্ট বিশ্বের কোন বন সুন্দরবনের সমকক্ষ নয়। তবে সুন্দর বনের খ্যাতি কেবলমাত্র বি¯ৃÍতির জন্য নয়; অতুলনীয় জীববৈচিত্র্যই এ বনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বিশ্বে অদ্বিতীয় বলেই বনটি বিশ্ব-ঐতিহ্য নির্বাচিত হয়েছে। যে কোন সমীক্ষায় এ বনের ‘এনভারনমেন্টাল সেনসিটিভিটি ইনডেক্স’ উঁচু পর্যায়ের বলে সাব্যস্ত হয়। পরিবেশ-স্পর্শকাতরতা সূচকে প্যারাবন মানেই উঁচু মানের হয়ে থাকে। বিশ্বের বৃহত্তম প্যারাবন হিসেবে সুন্দরবনের স্পর্শকাতরতা সূচকও বৃহৎ। স্পর্শকাতরতা নির্ণয়ে অপর যে দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়, তা হলো বনের ‘প্রাণী-সম্পদ’ এবং মানুষের আহরণযোগ্য ‘বন-সম্পদ’। এ দুটি ক্ষেত্রেও সুন্দরবন অত্যন্ত সম্পদশালী। প্রাণী-সম্পদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বৈশ্বিক বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর কথা ওঠে। বিশ্বের অনেক বিপন্ন প্রাণী সুন্দরবনে বাস করে। বিপন্ন প্রাণীর মধ্যে বাঘের কথা সবাই জানেন। শুশুক বা ডলফিনের কথাও অনেকের জানা আছে। বিপন্ন মাছ ও পাখির কথা এদেশে অনেকেই জানেন না, অথবা তুচ্ছ জ্ঞান করেন। কিন্তু বৈশ্বিক বিপন্ন প্যারাপাখির সর্ববৃহৎ আবাস বলে সুন্দরবন বিশ্বে সুবিদিত। এ বনটিই বিশ্বের দুই প্রজাতির প্রায়-বিপন্ন পাখির বৃহত্তম বিচরণভূমি। পাখি-দুুটির নাম প্যারা-শুমচা ও খয়রাপাখ-মাছরাঙা। আহরণযোগ্য বন-সম্পদের তালিকার শীর্ষে রয়েছে সুন্দরবনের মাছ। তবে মধু, গোলপাতা, গরান ইত্যাদিও তুচ্ছ নয়। সুন্দরবনে ক্রমবর্ধমান পর্যটনের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। সব মিলিয়ে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা সহজেই কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

আকারে এবং প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে বাংলাদেশ খুব একটা বড় দেশ নয়। স্বাভাবিক ভাবেই এ দেশে জীববৈচিত্র্যে সব চেয়ে সমৃদ্ধ স্থানের নাম সুন্দরবন। আইলা ও সিডর আঘাত হানার পর অনেকেই বুঝেছেন, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বৃহত্তম বনের নামও সুন্দরবন। এদেশের প্রশাসন ও জনসাধারণ সুন্দরবনকে তাই এখন সঠিক মূল্যায়ন করবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল।

এখন মনে হচ্ছে, পৈতিৃক সম্পত্তির মতো সুন্দরবনকে আমরা যদৃচ্ছা ভোগ করতে যতটা আগ্রহী, এর খাজনা দিতে ততটা নই। শত নদীর দেশ হওয়া সত্ত্বে¡ও তেল আনার জন্য সুন্দরবনের স্পর্শকাতর চ্যানেলই আমাদের চাই। এর পক্ষে অকাট্য যুক্তি, পরিবহন খরচ দু’-পয়সা কম। বিশ্বের শতাধিক স্পর্শকাতর স্থানে যে সব তেল-বিপর্যয় ঘটেছে তা থেকে আমরা কোন শিক্ষাই গ্রহণ করিনি। আমাদের উচিত তেল-বিপর্যয়ের মতো এ ধরনের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের যুগপোযোগী হাতিয়ার প্রস্তুত রাখা।

সুন্দরবন নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা যেমন বড় ছিল, তেল-বিপর্যয়ের পর আমাদের গ্লানিটাও আজ তেমনি বড়। ইতিমধ্যে সুন্দরবনের উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ ও মাছের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়েছে। যেসব নদীতে তেল ভাসছে, সেখানে পানির সংস্রবে আসামাত্র বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ক্ষতির অর্থ মৃত্যু। আমরা জানি, পানিতে তেল ভাসলে লোমশ প্রাণী ও পাখি সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতি বললে পুরো চিত্রটি আসলে আড়াল করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ তেল-বিপর্যয়ে লোমশ প্রাণী ও পাখির মৃত্যু-হার ৯০ % ছিল। সুন্দরবনে বেঁচে থাকতে হলে বাঘকে নদী সাঁতরাতেই হবে। এবং নদীতে নামলে বাঘের লোমে তেল লাগবে। এই তেল চেটে পরিষ্কার করতে গেলে বাঘের পাকস্থলী দূষিত হবে এবং বাঘের মৃত্যু নিকটবর্তী হবে। বেঁচে থাকতে হলে বৈশ্বিক বিপন্ন প্যারাপাখিকেও সুন্দরবনের নদী সাঁতরাতে হবে। পালকে তেল লেপটে গেলে কোন প্যারাপাখি বাঁচবে না। একইভাবে বেঁচে থাকার জন্যই প্রায় বিপন্ন খয়রাপাখি-মাছরাঙাও তৈলাক্ত পানিতে ঝাঁপ দেবে এবং সেটাই এর জীবনের শেষ ঝাঁপ হবে। এই সব মৃত ও মৃত্যুপথযাত্রী পাখি পাকড়াও করে কিছু শিকারি-পাখিও মারা যাবে।

বিপন্ন বন্যপ্রাণীর দুঃখজনক মৃত্যু ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির কাঁদুনি গেয়ে সবাইকে নিরুৎসাহিত করা এই লেখার মূল লক্ষ্য নয়। বাংলাদেশের চেয়ে অনেক দেশে এর চেয়ে শতগুণ বড় অনেক অনেক তেল-বিপর্যয় ঘটে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সুন্দরবনের চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না। সুন্দরবনের তেল-বিপর্যয় থেকে আমরা ভবিষ্যতের জন্য কী শিক্ষা গ্রহণ করলাম, সেটাই মূল্যবান।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: