আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জয় বাংলার সন্তান মনোয়ারা

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারি। দেয়ালে টানানো যুদ্ধদিনের ছবি। পাকিস্তানী হানাদারদের নির্মম অত্যাচারের চিত্র সেখানে। রয়েছে তাদের পাশবিকতা আর নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নারী মুখ। আর সে অগণিত মুখের মধ্যে জন্মদাত্রীকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এক নারী। গাল বেয়ে পড়ছে অশ্রু। শিকড়হীন হয়ে ভিনদেশে বড় হওয়া নারী শিকড়ের সন্ধানে এসেছেন নিজ জন্মভূমিতে। তিনি মনোয়ারা ক্লার্ক ৭১-এর নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় এক স্বাধীন রাষ্ট্র্র বাংলাদেশ। আর জন্ম নেয় মনোয়ারাও। কিন্তু বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেলেও জন্ম পরিচয় না থাকায় এদেশের মাটিতে মনোয়ারার স্বীকৃতি মেলে না। মমতাময়ী মাদার তেরেসার আশ্রয়ে দু’বছর থেকে আশ্রয় মেলে কানাডিয়ান এক দম্পতির ঘরে। তাদের সঙ্গে জন্মভূমি থেকে সুদূর কানাডায় পাড়ি জমায় মনোয়ারা। সেই থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন মাতৃভূমি থেকে। ৪০ বছর পর মা আর মাতৃভূমির সন্ধানে মনোয়ারা আসেন বাংলাদেশে।

মনোয়ারা জানেন না কে তার মা। মাকে আর জন্ম পরিচয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছেন সম্ভাব্য সব জায়গায়Ñ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, রায়েরবাজার বধ্যভূমিসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সব জায়গা ঘুরে বেড়ান আপন অস্তিত্বের সন্ধানে। পাকিস্তানী হানাদারদের নির্মমতার চিত্র তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। ভয়াবহ নির্যাতনের ছবি আর তাঁর বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্ট এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় তাঁকে আরও বেশি দুঃখী ও অসহায় করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত যুদ্ধদিনের সেইসব স্মৃতিচিহ্ন দেখতে দেখতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মনোয়ারা।

দীর্ঘ ৪০ বছর পর মাকে খুঁজতে আসেন মনোয়ারা। কিন্তু কোথাও তিনি তাঁর মায়ের কোন সন্ধান পাননি। তাতে হতাশ নন মনোয়ারা। তিনি জানান, নিজের জন্য আমার দুঃখ নেই। শুধু কষ্ট লাগে যখন আমি আমার নির্যাতিত মায়ের কথা ভাবি। তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে অমানবিক পাশবিক অত্যাচার। তাঁর গর্ভে আমার জন্ম। আমাকে নিয়ে তাকে কতই না কষ্ট করতে হয়েছে।

একাত্তরের পর মাদার তেরেসা হোমসের সহায়তায় কানাডায় আশ্রয় মেলে মনোয়ারার। ইন্টারনেটের কল্যাণে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারেন। জানতে পারেন কিভাবে বাংলাদেশ নামক দেশটি বিশ্বের বুকে জন্ম নিয়েছে। ছোট্ট এ দেশটি কীভাবে দীর্ঘ সংগ্রাম আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে। আর এ স্বাধীনতা অর্জনে অগণিত নারী-পুরুষ জীবন দিয়েছে। অসংখ্য মা-বোনকে হারাতে হয়েছে সম্ভ্রম। ১৬ ডিসেম্বর যে মহান বিজয় দিবস এ কথাও জানেন মনোয়ারা। তাই বিজয়ের মাসে শিকড়ের টানে ছুটে এসেছেন সুদূর কানাডা থেকে। পাশ্চাত্য সভ্যতার আভিজাত্যে বড় হলেও মাতৃভূমির জন্য তার বুকের কোণে ছিল শূন্যতা। ছিল হাহাকার। মনোয়ারা জানান। বিস্মৃতপ্রায় লাল সবুজের দেশের জন্য তার টান ছিল সব সময়। পিতামাতার পরিচয়হীন যুদ্ধশিশু মনোয়ারা জানেন তার জন্মদাত্রী মাকে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না আর কখনই। কিন্তু মাতৃভূমিতে যেন তার একটু ঠাঁই মেলে, একটু স্বীকৃতি মেলে তার সেই আকুতি নাড়া দিয়েছে এদেশের মানুষেরও মনে। মানবিকতার ডাকে তাই সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের সহায়তার মনোয়ারা পেয়েছেন নাগরিক সনদ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিশেষ সহায়তায় সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ৩-এর (আজিমপুর-লালবাগ) ২৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে মনোয়ারাকে জন্মসনদ দেয়া হয়। লাল সবুজের পতাকাবাহী এদেশের পরিচয় বহনের স্বীকৃতি পেয়ে উচ্ছ্বসিত মনোয়ারা।

জন্মভূমির দেয়া পরিচয়ের সনদটি বুকে আঁকড়ে ধরে গর্বিত কণ্ঠে মনোয়ারা বলেন, ‘আমি এই জয়বাংলার সন্তান।’ মনোয়ারার এই আনন্দ যেন বিজয়ের মাসের আমাদের আনন্দকে আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে গেল।

অপরাজিতা ডেস্ক

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: