মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

স্মৃতিতে অম্লান বিটিভি পঞ্চাশ বছর পূর্তি

প্রকাশিত : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ফিরে দেখা

সমুদ্র হক

বাংলাদেশ টেলিভিশন (১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর এই দেশে পিটিভি করপোরেশন নামে যাত্রা শুরু) আজও স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে মধ্যবয়সী মানুষের হৃদয়ে। একটা সময় বিকেল ৫ টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত চলত। সকল অনুষ্ঠান সকল শ্রেণীর দর্শকের মন ভরিয়ে দিত। ছোটদের অনুষ্ঠান, সাপ্তাহিক নাটক, ধারাবাহিক নাটক, সঙ্গীতানুষ্ঠান বা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান ছায়াছন্দ, ইংরেজী ছবির সিরিয়াল, বাংলা ও ইংরেজী সংবাদ এবং মাসে একবার পূর্ণ দৈর্ঘ বাংলা ছায়াছবি দর্শকদের চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষণীয় অনেক কিছুই উপহার দিত। বাংলা সংবাদ পাঠে কাফি খান, সরকার কবির উদ্দিন, তাজুল ইসলাম, মামুন সিরাজুল মজিদ, আসমা আহমেদ, রুখশানা আনোয়ার ইংরেজীতে ফারহানা এইচ রহমান, সাদিয়া আফরোজ চৌধুরী, শামীম আহমেদ, নাফিজ ইমতিয়াজ উদ্দিন, আলম রশিদের কণ্ঠের সংবাদ ছিল হৃদয়গ্রাহী। নাটকের শিল্পীদের মধ্যে আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফেরদৌসী মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, আফরোজা বানু, জহির উদ্দিন পিয়ার, হুমায়ুন ফরীদি, নায়লা আজাদ নূপুর, তারিক আনাম, নিমা রহমানসহ অনেকে এতটাই জনপ্রিয় যে, মধ্যগগনে অবস্থান। নাটকের প্রযোজক মুস্তাফা মনোয়ার, আতিকুল হক চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মোস্তাফিজুর রহমান, নওয়াজিশ আলী খানের নাম থাকলে দর্শক সেটের সামনে থেকে নড়ত না। ইংরেজী সিরিয়াল হাওয়াই ফাইভ ও, দ্য ফল গাই, বায়োনিক ওম্যান, ডালাস, ডাইনাস্টি নাইট রাইডার দেখার জন্য রাত জেগে থাকত দর্শক। ইংরেজী সঙ্গীতানুষ্ঠান সলিড গোল্ড তো ছিল ওই সময়ের তারুণ্যের হার্ট থ্রব। আশির দশকে প্রতি ঈদের আনন্দমেলা ও ঈদের বিশেষ নাটক দেখার জন্য (বিশেষ করে আমজাদ হোসেনের ঈদ সিরিয়ালের বিশেষ চরিত্র জব্বার আলী) দর্শক টিভি সেটের সামনে থেকে নড়ত না। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ফজলে লোহানী উপস্থাপিত যদি কিছু মনে না করেন তো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এই ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান থেকেই আজকের হানিফ সংকেতের সৃষ্টি। যার (হানিফ সংকেত) ইত্যাদি অনুষ্ঠান বর্তমানে অনেক প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিটিভির একচ্ছত্র জনপ্রিয়তা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় বিটিভির জনপ্রিয় ধারবাহিক বেগম মমতাজ হোসেন রচিত সকাল সন্ধ্যা এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বাসের নামও দেয় সকাল সন্ধ্যা । সকাল সন্ধ্যার এই মনোপলি অবশ্য পরে ভেঙ্গে দেয় হুমায়ূন আহমেদের এইসব দিনরাত্রি ধারাবাহিক। সকাল সন্ধ্যা সিরিয়ালে পীযূষ ও আফরোজা বানু যেমন মধ্যবিত্ত পরিবারে রোল মডেল হয়েছিলেন এইসব দিনরাত্রি ধারাবাহিকে ডলি জহুর বাঙালী মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পবিবারে বড় ভাইয়ের বউ (ভাবি) কতটা মডেল হতে পারে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। এই ধাবাবাহিকে সুখী নীলগঞ্জ প্রকল্পের আবুল খায়ের (প্রয়াত) সুজা খন্দকারের অভিনয় আজও মনের মুকুরে রয়ে গেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেজ ছেলের ভূমিকায় আসাদুজ্জামান নূরের অনবদ্য অভিনয় তো প্যারালাল হয়ে মানুষের প্রাণ ছুঁয়ে যায়। এই ধারাবাহিকে শিশুশিল্পী টুনি যখন মারাত্মক অসুখে আক্রান্ত, তখন নাটকে তাকে মেরে না ফেলার জন্য হুমায়ূন আহমেদের কাছে কতই না আকুতি। একইভাবে কোথাও কেউ নেই ধারাবহিকে বাকের ভাইয়ের চরিত্রে রূপদানকারী আসাদুজ্জামান নূরকে (ধাবাবিাহিকে যার প্রিয় গান ছিল হাওয়া মে উড়তা যায়ে মেরা লাল দোপাট্টা...) ফাঁসি না দেয়ার জন্য দেশের প্রতিটি শহরে মিছিল পর্যন্ত হয়েছে। কোন টিভির নাটক দর্শক হৃদয়ে গেঁথে গেলে যে এই অবস্থা হতে পারে, তা দেখিয়েছে বিটিভিই । এই ধারাবাহিক চলার সময় (তখন মাসে দুই দিন দুই সপ্তাহ অন্তর ধারাবাহিক প্রচার হতো) রাতে শহরের রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। ওই সময়ে আজকের মতো এত টিভি সেট ছিল না। ধাবাবিাহিক ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান দেখার জন্য যে বাড়িতে টিভি সেট আছে সেখানে আতিথ্য গ্রহণ করত দর্শকরা। তাও সাদা কালো টিভি। আশির দশকে কোন শহরের মানুষ এবং শহর কতটা উন্নত তা জরিপ করার অন্যতম মাধ্যম ছিল ওই শহরে কত বাড়ির ছাদে টিভি এন্টিনা আছে। ১৯৭৪ টিভি কেন্দ্র ডিআইটি ভবন থেকে রামপুরা নিজস্ব ভবনে (যা বর্তমানে টেলিভিশন ভবন নামে পরিচিত) যাওয়ার পর দেশে প্রথম টিভি উপকেন্দ্র হয় নাটোরে। কথা ছিল নাটোরের উত্তরা গণভবনেকে ঘিরে এই উপকেন্দ্র সাজানো হবে। ওই সময়ে কিছুদিনের জন্য নাটোর উপকেন্দ্র হতে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টার নিজস্ব অনুষ্ঠান হতো। এক সময় সেদিনের অনুষ্ঠান ঘোষক সরকার ফিরোজ উদ্দিনের ঘোষণার (বিটিভিতে উর্ধতন কর্মকর্তা হয়ে পদন্নতি পেয়েছিলেন এবং অবসার নেয়ার পর বর্তমানে এটিএন বাংলার উর্ধতন কর্মকর্তা) বলা হলো বিটিভিতে অনুষ্ঠান ঘোষক নেয়া হবে। নাটোর টিভি উপকেন্দ্রেই অডিশন। নারী পুরুষ মিলে আমিসহ মোট ৫০ জন প্রার্থী। কত সুন্দর চেহারা একেকজনের। প্রযোজক মোহাম্মদ জাকারিয়া (প্রয়াত) অডিশন নিলেন। তারপর নাটোর কেন্দ্রের আর নিজস্ব অনুষ্ঠান হয়নি। পরবর্তী সময়ে নাটোর উপকেন্দ্র ঢাকার অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করলো যা আজও বহাল আছে। দেশে কয়েকটি উপকেন্দ্র হওয়ায় বিটিভি টেরিস্টরিয়ালের আওতায় আসে (এখনও বিটিভি একমাত্র টেরিস্টরিয়াল) সারা দেশের গ্রামে গঞ্জে এন্টিনার মাধ্যমে বিটিভি দর্শক সংখ্যা বাড়ায়। ওই সময় পর্দায় ছবি ঝিরঝির করলে ছাদে উঠে এন্টিনা ঘুরে নির্দিষ্ট উপকেন্দ্রের দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার কথা অনেকের মনে আছে। শহরের টিভি সেটের সংখ্যা যখন কম ছিল তখন জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের দিনে (বিশেষ করে ধারাবহিক নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান সিনেমা ও ছায়াছন্দ) পাড়া মহল্লার অনেকে টিভিওয়ালা বাড়িতে ক্ষণিকের আতিথ্য গ্রহণ করত। এই সময় জনপ্রিয় একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক শুরুতে বলতেন দেশের সকল স্থানে বাড়িতে ক্লাবে এবং অন্যের বাড়িতে চড়াও হয়ে যারা এই অনুষ্ঠান দেখছেন তাদের সকলকে স্বাগতম। বর্তমানে এই কথা আর বলতে হয় না।

বর্তমানে দেশে প্রাইভেট চ্যানেলের সংখ্যা প্রায় ৩০টি। বিটিভির তিনটি চ্যানেল। বিটিভি, বিটিভি ওয়ার্ল্ড ও বিটিভি সংসদ। বিটিভি ওয়ার্ল্ড দেশের বাইরে এখনও জনপ্রিয় চ্যানেল। এই দেশে টেলিভিশন সম্প্রচারে বিটিভি পথিকৃত হয়ে আছে। বিটিভি থেকেই ৯০-এর দশকের শুরুতে রাতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সিএনএন প্রচার শুরু হয়। তবে তা জনপ্রিয়তা পায়নি। যে আকর্ষণে সিএনএন সম্প্রচার করা হলো তার চেয়ে বড় আকর্ষণ দেখাল বিটিভির প্রযোজকরা। বিটিভির সেদিনের প্রযোজকরা কিভাবে ১৯৭১ সালে অকুপায়িড পাকিস্তানী আর্মির মধ্যে থেকে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে সেই স্মৃতি আজও জীবিতরা হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন। ৭ মার্চ যেদিন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার বন্ধ করে দেয় সেই দিন বেতারের অনুষ্ঠান ঘোষক বাবুল আখতার (প্রয়াত) বিকাল ৪টায় রেডিওর অনুষ্ঠান শেষ করার ঘোষণা দিয়ে প্রচার বন্ধ করে। সেই দিন তৎকালীন পিটিভির (বিটিভি) বাঙালী কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেয় এই দিন তারা টেলিভিশনে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত (পাক সার জমিন...) ও পতাকা প্রদর্শন করবে না।

ওই সময়ে টিভির অনুষ্ঠান শেষে রাত সাড়ে এগারোটায় জাতীয় সঙ্গীত প্রচার হতো। টিভির প্রযোজক ও কর্মকর্তাগণ সিদ্ধান্ত নিলেন কোন অনুষ্ঠান রাত ১২টা পার করে দিয়ে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করবেন। রাত ১২টা ১ মিনিটে নতুন তারিখ শুরু হয়। অথাৎ ১২টার অনেক পরে পতাকা প্রদর্শন করলে আগের দিন আর পতাকা প্রদর্শন হলো। এই ছিল আমাদের বিটিভির প্রযোজকগণ। মুস্তাফা মনোয়ার প্রযোজিত রবীন্দ্রনাথের রক্ত করবী নাটক আজও মাইলফলক হয়ে আছে। যে নাটকে আসাদুজ্জামান নূর শ্মশ্রুম-িত ছিলেন না। বিটিভির কথা লিখতে গেলে কি নির্দিষ্ট শব্দের গ-িতে থাকা যায়। তবু এখানেই শেষ করতে হলো। ছোট গল্পের মতো ফর্মুলার মতো শেষ হইয়াও হইল না শেষ। দেশে এবং দেশের বাইরে যারা বিটিভির অনুষ্ঠান দেখছেন তারা কি ভুলতে পারেন। পঞ্চাশ বছরেও বিটিভি চির অম্লান। পুরনোরা যে পথ দেখিয়েছেন যাঁদের অনেকেই গত হয়েছেন তাঁরা যে সৃজনশীলতা রেখে গেছেন তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ টেলিভিশন।

প্রকাশিত : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪

১৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: