কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র শাণিত শব্দে শত্রু বধ

প্রকাশিত : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯৭১ সালে মাঠে ময়দানে যখন বাংলার দামালরা অস্ত্রহাতে শত্রু হননে রত তখন আরেক ধরনের লড়াই চলছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। সেখানে শব্দ হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় অস্ত্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী আর কলাকুশলীরা বিরতিহীনভাবে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে যাচ্ছিলেন পাকিস্তানী প্রোপাগান্ডার। অনবরত বেতারে বাজছিল প্রতিরোধের আর প্রতিশোধের মন্ত্র। এই বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত চরমপত্র প্রবলভাবে মনোবল যুগিয়েছিল লড়াইয়ের মাঠে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের

অবিস্মরণীয় ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন মশিউর রহমান মিথুন

মূল ফিচার

১৯৭১’র ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে ঢাকা শহরের কয়েক হাজার নিরস্ত্র বাঙালী নিধন করে এবং একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পূর্বে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা এবং একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা প্রদান করে যান। ‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানী সৈন্যটিকে উৎ্খাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক’ বার্তাটি ঢাকা ইপিআর ওয়্যারলেস স্টেশন থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছে ২৫ মার্চ মধ্যরাতেই। তার পরেই পাকিস্তানী সৈন্যরা ইপিআর ্ওয়্যারলেস ধ্বংস করে দেয়। তবে ভোর হবার আগেই বার্তাটির শত শত কপি তৈরি হয়ে যায় সাইক্লোস্টাইল মেশিনের সাহায্যে। চট্টগ্রামের অনেক জায়গায় মধ্যরাত থেকেই মাইকে বার্তাটি প্রচার করা হতে থাকে। এরই প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ দুপুরবেলা চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিশান কেন্দ্র হতে প্রথমবারের মতো স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ঐ বার্তা পাঠ করেন।

এর মধ্যেই বেলাল মোহাম্মদ এবং আবুল কাশেম সন্দীপসহ তৎকালীন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েক বেতারকর্মী সিদ্ধান্ত নেন যে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনগণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে তারা বেতারের মাধ্যমে কিছু প্রচার করবেন। এ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তারা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রকে কাজে লাগানোর চিন্তাভাবনা করেন এবং তার নতুন নাম দেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’। তবে তারাও নিরাপত্তার কারণে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রকে কাজে না লাগিয়ে শহর থেকে কিছু দূরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে চলে যান এবং ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে প্রথম প্রচার করেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি’। সে সময়ই এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি আবার পাঠ করেন। প্রায় ১ ঘণ্টা অনুষ্ঠান করার পর তারা পরদিন সকাল ৭টায় পরবর্তী অনুষ্ঠান প্রচারের ঘোষণা দিয়ে সেদিনের পর্ব শেষ করেন।

সেখান থেকে তারা মেজর জিয়াউর রহমানকে সঙ্গে করে কালুরঘাট ফেরত আসেন। সেদিন অর্থাৎ ২৭ মার্চ এক নতুন লিখিত ও সম্প্রসারিত বক্তব্যের মাধ্যমে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ‘আই মেজর জিয়া অন বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ডু হেয়ার বাই ডিক্লেয়ার ইন্ডিপেনডেন্স অব বাংলাদেশ।’ এর পরদিন ২৮ মার্চ ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ এই নাম হতে বিপ্লবী অংশটি বাদ দেয়া হয় এবং নতুন নামকরণ করা হয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। ২৮ মার্চ প্রথম অধিবেশনে বিমান হামলায় করণীয় সম্পর্কে নির্দেশমালা প্রচারিত হয় এবং দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রথম একটি কথিকা পাঠ করা হয়।

৩০ মার্চ প্রভাতী অধিবেশনে প্রথমবারের মতো জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি প্রচারিত হয়। ৩০ মার্চ দুপুরের অধিবেশন শেষ হবার পর প্রায় ২টা ১০ মিনিটের দিকে বেতার কেন্দ্রে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বিমান হামলা করে যার ফলে এ বেতার কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বিমান হামলায় কেউ হতাহত না হলেও বেতার কেন্দ্র এবং সম্প্রচার যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। এর ফলে সেখান থেকে সম্প্রচার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠাতা দশজন সদস্য দুটি দলে বিভক্ত হয়ে আগরতলা ও ত্রিপুরার বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়েন।

৩১ মার্চ সকালে কয়েক বেতারকর্মী বেতার কেন্দ্রে অবস্থিত একটি এক কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছোট সম্প্রচার যন্ত্র উদ্ধার করেন। এর মধ্যে ১০ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১১ এপ্রিল অল ইন্ডিয়া রেডিও’র শিলিগুড়ি কেন্দ্রকে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করে সেখান থেকে ভাষণ প্রদান করেন এবং এরপরেও বেশ কিছুদিন ঐ কেন্দ্র হতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণসহ নানাবিধ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। এরপর ১৬ এপ্রিল জনগণের উদ্দেশে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্দেশিত ঘোষণা ও আদেশপত্র পাঠ করা হয়। এরপর সেখানে কয়েকদিন অনিয়মিতভাবে সম্প্রচার চলেছে। ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর মে মাসের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সরকার ও বেতারকেন্দ্রের কর্মীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার প্রদান করে। এ সময় সকল বেতারকর্মীকে ধীরে ধীরে মুজিবনগরে নিয়ে আসা হতে থাকে। ঢাকা থেকেও ঢাকা বেতারের শিল্পী-কুশলীরাও আসতে থাকেন। প্রথম অধিবেশনের দিন ধার্য করা হয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী ২৫ মে তারিখ। কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮নং দোতলা বাড়িটিতে রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য মন্ত্রীর আবাসের কক্ষের সঙ্গের একটি কক্ষে ট্রান্সমিটার দিয়ে সম্প্রচার শুরু“ হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীরা অন্য বাড়িতে উঠে যাওয়ার পর সেই ৫৭/৮ নম্বর বাড়িটিই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্থায়ী কার্যালয়রূপে গড়ে ওঠে। এরপর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে সম্প্রচারিত হতে থাকে। ২৫ মে থেকে শুরু হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান এম আর আখতার মুকুল রচিত ও উপস্থাপিত চরমপত্র। চরমপত্র অনুষ্ঠানটি ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার দিন পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন একনাগাড়ে প্রচারিত হয়েছে। ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানটির নামকরণ করেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের কর্মী আশফাকুর রহমান খান। চরমপত্রের প্রতিটি পর্ব রচনা ও পাঠ করতেন এম আর আখতার মুকুল। এটি ছিল ব্যাঙ্গাত্মক ও শ্লেষাত্মক বিদ্রƒপে ভরপুর একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানীদের প্রোপাগান্ডার জবাব দেয়া হতো। মানসম্মত রেকর্ডিং স্টুডিওর অভাবে টেপ রেকর্ডারে চরমপত্র রেকর্ডিং করা হতো এবং ৮-১০ মিনিটের এই টেপ নিয়মিতভাবে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ট্রান্সমিটার থেকে প্রচারিত হতো। চরমপত্রের প্রতিটি অনুষ্ঠানের রচনা ও ব্রডকাস্টিংয়ের জন্য এম আর আখতার মুকুলের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়েছিল ৭ টাকা ২৫ পয়সা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এই অনুষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা দানের জন্য রচিত ও পরিবেশিত হতো। এই অনুষ্ঠান বাংলাদেশের শত্রু কবলিত এলাকার জনগোষ্ঠী ও ভারতে অবস্থানরত বাঙালী শরণার্থীর মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আরও কিছু নিয়মিত অনুষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম হলো পবিত্র কোরানের বাণী,মুক্তিযুদ্ধের গান, যুদ্ধক্ষেত্রের খবরাখবর, রণাঙ্গনের সাফল্যকাহিনী, সংবাদ বুলেটিন, ধর্মীয় কথিকা, বজ্রকণ্ঠ, নাটক, সাহিত্য আসর এবং রক্তের আখরে লিখি। জল্লাদের দরবার নামে আরেকটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন কল্যাণ মিত্র। অনুষ্ঠানটিতে ইয়াহিয়া খানকে ‘কেল্লাফতে খান‘ হিসেবে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো। বজ্রকণ্ঠ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভাষণের অংশবিশেষ সম্প্রচার করা হতো। বেতার কেন্দ্রে তরুণ শিল্পীরা দেশাত্মবোধক ও অনুপ্রেরণাদায়ক গান করতেন। সম্প্রচারের জন্য এ সময় অনেক নতুন নতুন গান ও কবিতা লেখা হয়। কেন্দ্রের শিল্পীরা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে যুদ্ধকালীন তহবিল সংগ্রহ করেন।স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক গান বিপুল জনপ্রিয়তাও লাভ করে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবার পর এর নাম বদলে বাংলাদেশ বেতার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা থেকে সম্প্রচার শুরু করে বাংলাদেশ বেতার যা এতকাল রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। যুদ্ধের সময় প্রতিদিন মানুষ অধীর আগ্রহে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনার জন্য অপেক্ষা করত। সেই সময় অধিকৃত বাংলাদেশের মানুষ আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল আশা আর অনুপ্রেরনার উৎস।

প্রকাশিত : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪

১৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: