মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

লাল ইশতেহার ও বাঙালীর স্বাধীনতা

প্রকাশিত : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪
  • শামসুল আরেফিন খান

(১৭ ডিসেম্বরের পর)

তার পাঠ্য বিষয় ছিল প্রধানত বাংলা আরবি উর্দু সংস্কৃত প্রভৃতি ভাষা। আইএ ক্লাসে আমার অপর দুই সহপাঠীÑ মওলানা ভাসানীর বড় ছেলে নাসের ভাসানী ও ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহমেদের ছোটভাই বাবলু বা বাবুলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ও গভীর সখ্য আর সেই সুবাদে মওলানা ভাসানীর সন্তোষে ঘনঘন যাতায়াত বেশ নজরকাড়া ব্যাপারই ছিল সে সময়। ছাত্র ইউনিয়নে ভাঙ্গন সৃষ্টি, আওয়ামী লীগ ভাঙ্গা, ন্যাপ প্রতিষ্ঠা এবং পরে ন্যাপ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মতো সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে হয়ত তাঁর নজরদারি ছিল। কিন্তু সেসব অঘটন ঘটন ও নিয়ন্ত্রণে তাঁর প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল কিনা সেটা বলা কঠিন।

আমার ঘনিষ্ঠ সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, ওসমান ফারুক, আনোয়ার আনসারী খান, মহীউদ্দীন খান আলমগীরসহ আরও অনেকে- যারা সে সময়ের ছাত্র রাজনীতি ও পরবর্তীকালে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সতীর্থ সহপাঠী সামরিক দিকপাল মেজর জেনারেল মঞ্জুর, মেজর জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু, মেজর জেনারেল সাদেকুর রহমান চৌধুরী ও মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। আমার এক সাবেক সহপাঠীকে ’৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে নৌবাহিনী প্রধানের পদ থেকে বরখাস্ত করেছিলেন। সহপাঠী বন্ধুদের কার কার মধ্যে ‘ক্রুক ভাইরাস’ ঢুকেছিল জানি না। রবার্ট ক্রুক আসল নাম কিনা তাও জানি না। তবে তাঁর রহস্যময় উপস্থিতি ব্রিটিশ স্পাই হেমফারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বোম্বের ধনাঢ্য মুদি ব্যবসায়ী পুনা জিন্নাহর এন্ট্রান্স পাস ছেলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৯২ সালে বাপের ব্যবসার কাজে লন্ডন গিয়েছিলেন। সেখানে যেয়ে তিনি পেশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। অধ্যয়নকালে তাঁর প্রথম স্ত্রী ও মাতার মৃত্যু ঘটে। ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে জিন্নাহ কংগ্রেসে যোগ দেন। বর্ণ সমতা এবং নারী ভোটাধিকার প্রভৃতি প্রগতিশীল আন্দোলনের চ্যাম্পিয়নে পরিণত হয়ে শীঘ্রই তিনি খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। সেক্যুলার দর্শনের পক্ষে কথা বলে গোখলের মতো বড় মাপের কংগ্রেস নেতাদের নজর কাড়তেও সক্ষম হন। আয়ারল্যান্ডের লর্ড জেটল্যান্ডকে এক গোপন চিঠিতে ভাইসরয় লর্ড উইলিংডন লিখেছিলেন, ‘জিন্নাহ হচ্ছেন কংগ্রেসের চাইতে বড় কংগ্রেসী।’ তিনি ধর্মমত পরিবর্তন করে শিয়া হয়ে গেলেন। কারণ শিয়ারা ধর্মের নিয়ন্ত্রণমুক্ত সেক্যুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিল। কংগ্রেস-খেলাফত আঁতাত প্রত্যাখ্যান করে কংগ্রেস ত্যাগ করলেন। এসবের কোন্টা যে দর্শণ্ড কোন্টা যে ভ-ামি সেটা বলা খুব কঠিন।

খেলাফত আন্দোলনের আগে সৈয়দ আহমদ বেরেলির নেতৃত্বে ভারতবর্ষে ওহাবী আন্দোলনের (১৮২০-১৮৭০) ঢেউ জেগেছিল। ব্রিটিশ স্পাই হেমআর যে ওহাবী মতবাদের জরায়ু তারই ধাক্কা সেটা। বাইরের মুখোশটা ছিল ধর্মীয়। ভেতরে রাজনৈতিক অভিপ্রায়। ১. পাঞ্জাবে শিখদের উৎখাত এবং ২. বাংলা থেকে ব্রিটিশ উৎখাত। বিফল সেই আন্দোলন একটা লক্ষ্যেই কেবল পৌঁছতে পেরেছিল। ইরেজী শিক্ষা বর্জন করে ভারতের মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষায় শতবর্ষ পিছিয়ে দেয়াই ছিল সে আন্দোলনের একমাত্র অর্জন। উপাদান একটি ছিল কুসংস্কারের আবর্জনা সরিয়ে ইসলামের সংস্কার সাধন। অন্যটি উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ওপর আঘাত হানা। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে পুরো ব্যাপারটাই ছিল খুবই সাম্প্রদায়িক।

খেলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২২) ছিল আরও বেশি সাম্প্রদায়িক। অটোমেন সাম্রাজ্য পুনর্প্রতিষ্ঠা ছিল খেলাফত আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য। সেই অলীক স্বপ্ন পূরণই আজও আল কায়েদা ও আইসিসদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু শুধু ব্রিটিশ বিরোধিতাকে গুরুত্ব দিয়ে কংগ্রেস পূর্ণ সমর্থন জানাল খেলাফত নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদ, শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী গংয়ের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি। গান্ধীর নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলমানের যৌথ অসহযোগ আন্দোলনে ব্রিটিশরা আবারও বিব্রত হলো। কিন্তু এটাও যে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সর্বতোভাবেই একটা ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল তাতে কোন সংশয় নেই। এতে গান্ধীর সেক্যুলার ভাবমূর্তি দারুণভাবে বিক্ষত হলো। পক্ষান্তরে জিন্নাহ তাঁর সেক্যুলার অবস্থানকে আঁকড়ে ধরলেন এবং রাজনীতির মধ্যে ধর্ম টেনে আনার প্রতিবাদে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলেন। জিন্নাহর ভূমিকা ব্রিটিশকে সাহায্য করল। গান্ধী স্বরাজের লক্ষ্যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপোস করলেন। অন্যদিকে জিন্নাহ ব্রিটিশের তরফদারি করলেন। দুইজনেরই ভেতরের চেহারাটা বেরিয়ে আসলো।

স্বরাজের বাসনায় গান্ধী সন্ধি করলেন ধর্মের সাথে। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে জিন্নাহ পক্ষ ত্যাগ করলেন। বিলেতে ফিরে গিয়ে গোসা ঘরে খিল দিলেন। কিন্তু যে খেলাফত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহ, তারই দুই প্রধান নেতা শওকত আলী ও মোহাম্মদ আলীর হাত ধরে জিন্নাহ ভারতে ফিরে এসে নবাব সলিমুল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাম্প্রদায়িক দল মুসলিম লীগের কর্ণধার হয়ে বসলেন ১৯৩৯ সালে। জিন্নাহর আসল চেহারাটা আরও পরিষ্কার হলো যখন ২৭, ২৮, ২৯ জুলাই ১৯৪৬ সালে বোম্বে শহরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন ডেকে ক্যাবিনেট মিশনের আপোস ফর্মুলা চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং ১৬ আগস্ট ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশান ডে’ ঘোষণা করলেন। পুনরায় জারি করলেন সলিমুল্লাহর সেই লাল ইশতেহার, যাতে ছিল হিন্দুদের মৃত্যুপরোয়ানা। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মুখোশ খসে পড়ল। থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ল।

স্পাই হেমফারের মতো মি. জিন্নাহও একজন হাই প্রোফাইল ব্রিটিশ এজেন্ট ছিলেন কিনা তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে এ কথা নিশ্চই বলব যে, ব্রিটিশের তাঁবেদার নবাব সলিমুল্লাহর সঙ্গে জিন্নাহর কোন পার্থক্য ছিল না। দুইজনে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ব্রিটিশ তাদের দুইজনকেই নিযুক্ত করেছিল ভারত ভেঙ্গে ভাগ করার জন্য। আরও পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়, বাংলাকে দ্বিখ-িত করার জন্যে। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে কপট সেক্যুলার মুখোশের অন্তরাল থেকে হিংস্র রক্তপিপাসু সাম্প্রদায়িক দানবটাকে বের করে আনা গেছে। জিন্নাহ যে বাংলা ভাষা ও বাঙালী বিদ্বেষী ছিলেন সেটা তিনি নিজেই প্রমাণ করেছেন ৫৬ ভাগ মানুষের মাতৃভাষাকে পদদলিত করে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত দিয়ে। তবে জিন্নাহর একটা কাজের প্রশংসা না করে পারা যায় না। তিনি অন্য যাই করুন না কেন, পাকিস্তানের কোন ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বানাননি। তাতে অবশ্য পাকিস্তান ধর্মনিরপেক্ষ হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র নিখাদ সেক্যুলার। কিন্তু সে কথা মার্কিন সংবিধানে কোথাও লেখা নেই। ভারতের সংবিধানে ’৭৬ সাল অবধি সেক্যুলার কথাটা ছিল না। ৪২তম সংশোধনী এনে ভারতকে সাংবিধানিকভাবে সেক্যুলার ও সমাজতান্ত্রিক করা হয়েছে। বাংলাদেশ জন্মেছিল সেক্যুলার হয়ে। অবৈধ সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম দিয়ে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক করেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও সে প্রশ্নে নিজের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার করেননি। নবাব সলিমুল্লাহর লাল ইশতেহার দিয়ে ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সূচনা হয়েছিল ১৯০৬ সালে। জিন্নাহ আবার সেই লাল ইশতেহার ছেড়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪৬ ডাইরেক্ট এ্যাকশানের নামে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন সারা ভারতে। স্বৈরাচার ইয়াহিয়াও একই লাল ইশতেহার জারি করে ৩০ লাখ বাঙালীর মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল ১৯৭১ সালে। সেই স্টিমরোলার বাঙালীর বুকের পাঁজর ভেঙেছে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। বাঙালীর বুকের ওপর দিয়ে আবার সেটা গড়িয়েছে ২০০৪-এর ২১ আগস্ট। বাঙালীর স্বাধীনতা সনদের পিছু পিছু ভূতের মতো এখনও হাঁটছে সেই লাল ইশতেহার! (সমাপ্ত)

লেখক : ভাষাসৈনিক-বীর মুক্তিযোদ্ধা কলামিস্ট

প্রকাশিত : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪

১৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: