কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিজেকে ফিরে পেলেন ওয়াগনার

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • বিউটি পারভীন

সময়টা বেশ খারাপ যাচ্ছিল এ্যাশলে ওয়াগনারের। এবার সোচিতে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকে বিশেষ বিবেচনায় অভিজ্ঞতার আলোকে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিগার স্কেটিং দলে। শেষ পর্যন্ত ব্যর্থই হয়েছেন। ব্যক্তিগত ইভেন্টে হতে পেরেছিলেন সপ্তম। তবে দলগত ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিততে পেরেছিলেন দলের অন্য সদস্যদের দারুণ নৈপুণ্যের সুবাদে। কিন্তু এরপর জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোন আসরেই সাফল্য ধরা দেয়নি। কিন্তু ২৩ বছর বয়সী ওয়াগনার আশা ছাড়েননি। প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁর সমবয়সী স্বদেশী অনেক ফিগার স্কেটারই ছেড়ে দিয়েছেন। তাই একটা মানসিক চাপও ছিল তাঁর ওপর ফিগার স্কেটিং ছেড়ে দেয়ার। কিন্তু লেগে থাকলেন ওয়াগনার। যার সুফল অবশেষে পেলেন এবার স্পেনে এসে। বার্সিলোনায় অনুষ্ঠিত আইএসইউ গ্রাঁ প্রি ফাইনালে শেষ মুহূর্তে ঝলকিত নৈপুণ্য দেখিয়ে আরেকটি হারের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়ানো ওয়াগনার জিতে গেলেন ব্রোঞ্জ। তাঁর এমন দুর্দান্ত নৈপুণ্যের ঝলকে অবশ্য রাশিয়ান মেয়েদের নতুন একটি ইতিহাম গড়া হয়নি। অর্থাৎ নতুন করে কোন রেকর্ড হতে দেননি ওয়াগনার। কিন্তু সাফল্যের দেখা পেয়ে গেছেন অনুপ্রেরণা হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিগার স্কেটিংয়ে ‘দাদীমা’ বলে পরিচিতি পেয়ে যাওয়া ওয়াগনার আরেকটি অলিম্পিক মঞ্চে পারফর্ম করার আকাক্সক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। সেটাতে কিছুটা হলেও গতি সঞ্চার হলো।

এবার বার্সিলোনায় গ্রাঁ প্রি আসরের ফ্রি স্কেট ব্যক্তিগত ইভেন্টে প্রথম দিনশেষে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল ওয়াগনারের হার। মাত্র ৬ জন বিশ্বসেরা স্কেটার নিয়ে গ্রাঁ প্রি ফাইনাল হয়ে থাকে। সেখানে প্রথম দিন শেষে স্কোরে তলানির ৬ নম্বর অবস্থান নিয়েই শেষ করেছিলেন ওয়াগনার। প্রায় নিশ্চিত ছিল রাশিয়ার মহিলা ফিগার স্কেটারদের আইএসইউ গ্রাঁ প্রিতে নিরঙ্কুশ বিজয় হতে যাচ্ছে। কারণ আগের দিন ফ্রি স্কেটের শর্ট প্রোগ্রামে রাশিয়ান মেয়েদেরই ছিল আধিপত্য। এর আগে কোন দেশের নারী স্কেটাররা কোন গ্রাঁ প্রি আসরে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে পারেনি। তাই নিশ্চিতভাবে নতুন ইতিহাস গড়ার পথেই এগিয়ে যাচ্ছিল রাশিয়ার মেয়েরা। প্রথম চারটি অবস্থানই ধরে রেখেছিল বেশ ব্যবধান রেখে। আর ৬ নম্বরে ছিলেন বিশ্ব স্কেটিংয়ের ‘দাদীমা’ হিসেবে পরিচিত মার্র্কিন ফিগার স্কেটার এ্যাশলে ওয়াগনার। কিন্তু তিনিই ইতিহাস হতে দিলেন না। শেষদিনে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে তৃতীয় চূড়ান্ত ফলাফলে তৃতীয় স্থান দখল করে জিতলেন ব্রোঞ্জ। তবে রাশিয়ান সপ্তদশী এলিজাবেতা তুকতামাইশেভা স্বর্ণ জিতেছেন। কিন্তু দারুণ ব্যর্থতা দেখিয়ে ষোড়শী জুলিয়া লিপনিটস্কায়া কোন পদকই জিততে পারেননি আগের দিন দুইয়েক থাকার পরও। তবে তিন নম্বরে থাকা ১৫ বছর বয়সী কিশোরী এলেনা রেডিওনোভা আগের দিনের চেয়ে আরেকটু ভাল করার পুরস্কার হিসেবে জিতেছেন রৌপ্য। পদক বঞ্চিত হওয়াটা নিশ্চিত হওয়ার পরেও হাল ছাড়েননি ওয়াগনার এবং শেষ পর্যন্ত শেষ দিনের ঔজ্জ্বল্য তাঁকে তিন ধাপ ওপরে পৌঁছে দিল। পেছনে থেকে দারুণ প্রত্যাবর্তনে ব্রোঞ্জ জয় চাট্টিখানি কথা নয়। সেটাই করার পর দারুণ সন্তুষ্ট ওয়াগনার বলেন, ‘শেষ অবস্থান থেকে ফিরে এসে জেতা সত্যিই আমার জন্য বিশাল ব্যাপার। বিশেষ করে সেটা যদি হয় বিশ্বের সেরা মেয়েদের বিরুদ্ধে।’

২০১৩ গ্রাঁ প্রি ফাইনালে সর্বশেষবার পদক হিসেবে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন ওয়াগনার। আর ২০১২ সালে জিততে পেরেছিলেন রৌপ্য। ক্রমেই যেন নিজের নৈপুণ্য ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। ৬ জনের প্রতিযোগিতায় শর্ট প্রোগ্রামে সবার নিচে থাকা কারও পক্ষে আর পদক জয় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অতি নিখুঁত না হলে কিংবা ওপরে থাকাদের নৈপুণ্য একেবারে বাজেরকম না হলে শেষে থাকা কারও পক্ষে সেরা তিনে চলে আসা কঠিনতম কাজ। কিন্তু সেই কঠিন কাজটাই করে দেখিয়েছেন ২৩ বছর বয়সী ওয়াগনার। তাঁর বয়সী অনেকেই ইতোমধ্যে বিশ্ব আসর আর অলিম্পিকে অংশগ্রহণের চিন্তা বাদ দিলেও এখনও ওয়াগনার আগামী অলিম্পিকে নিজের জায়গা নিশ্চিতের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এবার সোচি অলিম্পিকে সপ্তম স্থান নিয়ে শেষ করেছিলেন এ মার্কিন তরুণী। এ বিষয়ে ওয়াগনার বলেন,‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া অনেক মেয়েই চলতি মৌসুমে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত সেই অবস্থানে যাইনি। বিশ্রাম নেয়ার সময় নেই আমার। আমার মধ্যে এখনও প্রচুর জীবনীশক্তি বিদ্যমান। আমি পারফর্মেন্সে ব্যক্তিগত জীবন ও ভালবাসার বিষয়টিকে টেনে আনি। আর সেটাই স্কোরে প্রতিফলন ঘটায়। এখন সবেমাত্র যারা এ লড়াইয়ে নেমেছেন তাঁদের আগেই আমাকে কৌশলী কোন পন্থা বের করে ফেলতে হবে। ২৩ বছর বয়সে এখন এটাই আমার একমাত্র স্বপ্ন যে অলিম্পিকে পুরস্কারের মঞ্চে দাঁড়াব।’ চূড়ান্ত দিন শেষে ফ্রি স্কেটের প্রতিযোগিতায় সব মিলিয়ে ২০৪.৫৮ পয়েন্ট স্কোর করে স্বর্ণ জিতেছেন তুকতামাইশেভা। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রেডিওনোভা সব মিলিয়ে ১৯৮.৭৪ পয়েন্ট স্কোর করেন। আর ওয়াগনার নতুন করে ১২৯.২৬ পয়েন্ট স্কোর করে সব মিলিয়ে ১৮৯.৫ পয়েন্ট নিয়ে ব্রোঞ্জ ছিনিয়ে নেন।

মাত্র ৫ বছর বয়সে স্কেটিং শুরু করেছিলেন ওয়াগনার। সে সময় তাঁর মা ব্যালে নৃত্য কিংবা ফিগার স্কেটিংয়ের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নিতে বলেছিলেন। কিন্তু ছোট ভাই অস্টিন ওয়াগনারের সঙ্গে নিউইয়র্কের প্রাট ইনস্টিটিউটে তিনিও ফিগার স্কেটিংকেই বেছে নেন। খুব দ্রুতই স্কেটিংয়ের মঞ্চে নিজের দক্ষতার ছাপ দেখান তিনি। ১৯৯৮ সালে ফিগার স্কেটিংয়ের প্রথম প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েই স্বর্ণ জিতেছিলেন। সে বছর টারা লিপিনস্কিকে অলিম্পিকে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে স্বর্ণ জিততে দেখে আরও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ওয়াগনার। তারপর থেকেই তাঁর একমাত্র ইচ্ছা হয়েছিল অলিম্পিক মঞ্চে পারফর্ম করার। ২০০২-০৩ মৌসুমে তিনি ইউএস জুনিয়র ফিগার স্কেটিং চ্যাম্পিয়নশিপসে কোয়ালিফাইড হন। ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় তিনি ১৭তম হন। পরের মৌসুমেই নোভিস পর্যায়ে উত্তীর্ণ হন। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় রৌপ্য জিতে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন। তবে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপস বাছাইয়ে দশম হয়ে আর ২০০৪ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপসে অংশ নেয়া হয়নি। কিন্তু ২০০৪-০৫ মৌসুমে সব পর্যায়ে প্রথম হয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপসে প্রথমবার অংশ নেন এবং সপ্তম হন। ২০০৬-০৭ সালে জুনিয়র গ্রাঁ প্রি আসরে রৌপ্য জয়ের পর নিজেকে বিশ্বের অন্যতম স্কেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পথটা খোলসা করেন ওয়াগনার। এখন শুধু ভবিষ্যতে উজ্জ্বলতা ছড়ানোর প্রত্যয়। সেটা পেয়েও গেছেন।

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪

১৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: