রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রো ড টু মে ল বো র্ন

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট-৪

তৃতীয় বিশ্বকাপ : ইংল্যান্ড ১৯৮৩

শিরোপা জিতে চমকে দিল ভারত

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের তৃতীয় আসর বসে ১৯৮৩ সালে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বকাপের মতো এবারেরও আয়োজক ছিল ‘ক্রিকেটের জনক’ ইংল্যান্ড। আরও একবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটের স্পন্সরের হতে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রুডেনশিয়াল কোম্পানি। আর তাই তৃতীয় বিশ্বকাপেও ‘প্রুডেনশিয়াল কাপ’ নাম বহাল থাকে। এবারের বিশ্বকাপেও খেলা হয় ৬০ ওভার করে। এবারের বিশ্বকাপে মোট ২৭টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বকাপে সহযোগী দলের মধ্যে থেকে আইসিসি ট্রফিজয়ী শ্রীলঙ্কা ও রানার্স-আপ কানাডা তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়। তবে এ বিশ্বকাপের আগেই ১৯৮২ সালে আইসিসি শ্রীলঙ্কাকে পূর্ণ সদস্যপদ দিলে তারা সরাসরি এ বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার সুযোগ পায়। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দ্বিতীয় আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুইয়ে ৮ম দল হিসেবে তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়। এ ছাড়া পূর্ণ সদস্য ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, ভারত ও পাকিস্তান এ বিশ্বকাপে অংশ নেয়।

এবারেও অংশগ্রহণকারী ৮টি দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়। এ-গ্রুপে স্বাগতিক ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা এবং বি-গ্রুপে অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত ও কানাডা অংশগ্রহণ করে। এবারে গ্রুপপর্বে প্রত্যেক দলকে ২ বার করে একে অপরের মোকাবেলা করতে হয়। চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবারও শিরোপা জয়ের টার্গেট নিয়ে খেলতে আসে। তাদের সামনে ছিল আকাশ ছোঁয়ার হাতছানি। কিন্তু তারা যে হ্যাটট্রিক শিরোপা পাবে না এবং ভারতের মতো একটি ‘আন্ডার ডগ’ দল কাপ জিতবে এটা বিশ্বকাপ শুরুর আগে একজন মানুষও ভেবেছিলেন কিনা সন্দেহ। যে ভারত আগের বিশ্বকাপে কোন পয়েন্টই সংগ্রহ করতে পারেনি। এমন কী আইসিসির সহযোগী সদস্য শ্রীলঙ্কার কাছেও হেরেছিল। তারাই এবারে কাপ জিতে সারা ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দেয়। বিশ্বকাপের আগে ভারতীয়রাও ভাবতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো বাঘা বাঘা দলকে টেক্কা দিয়ে তারা কাপ জিতবে। হয় তো স্বপ্ন দেখেছিল। যেমন সব দল দেখে। ভাগ্যবলে তাদের সে স্বপ্ন সত্যি হয়ে যায়।

৯ জুন ১৯৮৩ তৃতীয় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী দিনে ৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এবারও উদ্বোধনী দিনেই ৮টি দল অভিষেক ম্যাচে অংশ নেয়। এবারও একই সময়ে ৪টি ম্যাচ শুরু হওয়ায় কে আগে খেলেছে, কে পরে খেলেছে, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। তৃতীয় বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচে সোয়ানসিতে পাকিস্তান মোকাবেলা করে আইসিসির নতুন সদস্য শ্রীলঙ্কার। পাকিস্তান ৫০ রানে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সহজ জয় পায়। ওভালে অন্য ম্যাচে ইংল্যান্ড ১০৬ রানে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে আরও একটি সহজ জয় পায়। অপর ম্যাচে আস্ট্রেলিয়া আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে ১৩ রানের কষ্টার্জিত জয় পায়। চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ম্যাচে ৩৪ রানে ভারতের কাছে হারলেও গ্রুপের পরের ম্যাচে দ্বিগুণ ব্যবধানে ৬৬ রানে ভারতকে হারায়।

এ গ্রুপ থেকে ইংল্যান্ডও নিউজিল্যান্ডের কাছে একটিমাত্র ম্যাচে হেরে বাকি সব ম্যাচ জিতে ২০ পয়েন্ট পেয়ে বি-গ্রুপে শীর্ষস্থান পায়। গ্রুপের অপর দল পাকিস্তান ৩ ম্যাচে জিতে ও ৩ ম্যাচ হেরে ১২ পয়েন্ট নিয়ে আবারও সেমি-ফাইনাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গী হয়। বি-গ্রুপ থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রতিপক্ষ ভারতের কাছে মাত্র একটি ম্যাচে হেরে বাকি ৫ ম্যাচ জিতে ২০ পয়েন্ট পেয়ে গ্রুপে শীর্ষস্থান নিয়ে সেমি-ফাইনাল নিশ্চিত করে। বি-গ্রুপের অপর দল ভারত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও অস্ট্রেলিয়া কাছে হেরেও ১৬ পয়েন্ট নিয়ে সেমি-ফাইনালের টিকিট পেয়ে যায়। এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসরে এশিয়ার ৩টি দলের মধ্যে ২টি দল সেমি ফাইনালে ওঠে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আগের বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট অস্ট্রেলিয়া এবার গ্রুপপর্বের দেয়াল ডিঙোতেই পারেনি।

ম্যাঞ্চোরের ওল্ড ট্রাফোর্ডের প্রথম সেমি ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ড (৬০ ওভারে ২১৩/১০ রান) ৬ উইকেটে ভারতের (৫৪.৪ ওভারে ৪ উইকেটে ২১৭ রান) কাছে হেরে বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে। ওভালের দ্বিতীয় সেমি ফাইনালে এশিয়ার প্রতিনিধি পাকিস্তানের (৬০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৪ রান) আবারও চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের (৪৮.৪ ওভারে ২ উইকেটে ১৮৮ রান) কাছে ৮ উইকেটে হেরে আবারও ফাইনাল খেলার স্বপ্নভঙ্গ হয়।

২৫ জুন লর্ডসের ফাইনালে টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভারতকে ব্যাট করতে পাঠায়। তবে তাদের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না এটা বলা যাবে না। কারণ ভারত আগে ব্যাট করে ৫৪.৪ ওভার খেলে মাত্র ১৮৩ রানের ছোট একটা ইনিংস গড়ে। এ রানকে কেউই জয়ের জন্যে যথেষ্ট বলবেন না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলের বিপক্ষে তো নয়ই। তারপরও খেলাটা ক্রিকেট বলে কথা। ক্রিকেটে একটা প্রবাদ আছেÑ ‘শেষ বলটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে খেলার ফলাফল বলা যায় না, তার নাম ক্রিকেট।’ সেটা আবার প্রমাণিত হলো। আর সেটা প্রমাণ করল ভারতের বোলাররা। ভারতের ১৮৩ রানের জবাব দিতে গিয়ে লেজে-গোবরে করে ফেলল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ভারতের স্পিন বোলিং আক্রমণের কাছে পরাস্ত হতে হলো ক্যারিবিয়ানদের। এর আগে যে দুইবার ফাইনাল খেলেছিল সেখানে এত বেশি স্পিন বল মোকাবেলা করতে হয়নি। মহিন্দর অমরনাথ, মদনলাল, রজার বিনিদের বোলিংয়ের তোড়ে টিকতে পারল না ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানেরা। চলছিল আসা-যাওয়ার পাল্লা। ৫২ ওভারেই মাত্র ১৪০ রানে গুটিয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস। ভিভ রিচার্ডস খেললেন ৩৩ রানের একটা ছোট্ট ইনিংস। এটিই ছিল সর্বোচ্চ ক্যারিবিয়ান ইনিংস। ঘটে গেল ক্রিকেট ইতিহাসের একটি বড় অঘটন। স্বপ্নভঙ্গ হলো ক্যারিবিয়ানদের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের। অপর দিকে এশিয়ার প্রথম দল হিসেবে কাপ জিতল ভারত। সেমি ফাইনাল ও ফাইনালে অসাধারণ খেললেন ভারতের অলরাউন্ডার মহিন্দর অমরনাথ। সেমি ফাইনাল ও ফাইনালে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ও হলেন। এ বিশ্বকাপকে ভারতের না বলে বলা যায় ‘অমরনাথের বিশ্বকাপ’।

ইংল্যান্ডের ডেভিড গাওয়ার ৭ মাচে ৭৬.৮০ গড়ে সর্বাধিক ৩৮৪ রান করেন ও ভারতের রজার বিনি ১৮.৬৬ গড়ে সর্বাধিক ১৮টি উইকেট নেন। চ্যাম্পিয়ন ভারতের দলের নেতৃত্ব দেন কপিল দেব এবং রানার্স-আপ ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই ক্লাইভ লয়েড। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করেন ইংল্যান্ডের ডিকি বার্ড এবং বি জে মেয়ার।

তৃতীয় বিশ্বকাপে যোগ্য দল হিসেবে কাপ জয় করে এ কথা অনেকেই মানবেন না। অনেকটা ভালো খেলা, অনেকটা ভাগ্য সহায় ছিল বলে কাপ জিতেছে বলে অনেকে মনে করেন। কেননা ওয়েস্ট ইন্ডিজের লয়েড, ভিভ, গ্রীনিজ, হেইন্স, মারে, গোমস, কালিচরণ, কানহাই, কিং, গার্নার, ক্রফট, হোল্ডিং, মার্শাল, এন্ডি রবার্টসের মতো উজ্জ্বল তারকাদের মোকাবেলা করা ভারতের জন্যে সহজ ছিল না। তারপরও জয় জয়ই। ভারতই তৃতীয় বিশ্বকাপ জিতেছে এটাই সত্যি, এটাই ক্রিকেটবুকে লেখা থাকবে।

(চলবে)

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪

১৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: