হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইবোলা মোকাবেলার নেতৃত্বে কিউবা

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • আতাউর রহমান

পশ্চিম আফ্রিকায় চার মাস হয়ে গেল আন্তর্জাতিকভাবে ইবোলা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে, ইতিমধ্যে অঞ্চলটি এই সংক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে সরাসরি চিকিৎসা সহায়তায় কিউবা পৃথিবীর নেতৃত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে। অন্যান্য দেশগুলোর মতো দেশদুটি এ ক্ষেত্রে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার বেশিরভাগ এখনও বাস্তবায়ন সম্ভভ হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু ইবোলা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য চাওয়ার আগেই এক কোটি ১০ লাখ লোকের ক্যারেবীয় দ্বীপ কিউবা ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছে। দেশটির এটাই প্রথম ইবোলার মুখোমুখি হওয়া। রোগটি মোকাবেলায় এ পর্যন্ত কিউবা সবচেয়ে বেশি চিকিৎসক ও সেবিকা পাঠিয়েছে। দেশটির ২৫৬ জন স্বাস্থকর্মী সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। এছাড়া আরও দুশ’ স্বেচ্ছাসেবী পশ্চিম আফ্রিকার পথে রয়েছেন। এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে কোন দেশের চেয়ে বেশি সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি।

ইবোলা বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের হুমকি হ্রাস পাওয়ায় পশ্চিমা গণমাধ্যমের কৌতুহল কমতে শুরু করেছে। এরমধ্যে কয়েকশ ব্রিটিশ স্বাস্থ্যকর্মী এতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশগ্রহণে প্রস্তুত হয়েছে। গেল সপ্তাহে ৩০ জনের মতো স্বেচ্ছাসেবী সিয়েরা লিওনে পা রেখেছেন। দেশটির সেনাবাহিনীও সেখানে ক্লিনিক তৈরি করছে। অথচ বিপুল সংখ্যক কিউবার চিকিৎসক গেল অক্টোবর থেকে সিয়েরা লিওনে কাজ করছেন এবং ইবোলা নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাবেন।

ইবোলা সংক্রমণে ইতিমধ্যে ছয় হাজারেরও বেশি লোকের মৃত্যু হয়েছে। লজ্জার বিষয় হলো, ব্রিটিশ ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদরা কিউবার এই অভিযানকে অভিনন্দন জানাতে বাধ্য হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি কিউবার অবদানকে হৃদয়গ্রাহী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র অর্ধশতক ধরে কিউবাকে পরাস্ত করতে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। কিউবার এক চিকিৎসক ইবোলা আক্রান্ত হলে ব্রিটিশ ক্লিনিকে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ইবোলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁরা কিউবাকে সহযোগিতা করবেন।

যে কোন মানবিক বিপর্যয়ের পর কিউবার সিংহভাগ স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের ঘটনা এটাই প্রথম না। চার বছর আগে দারিদ্র্যপীড়িত হাইতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে মানবিক বিপর্যয় রোধে কিউবা সবচেয়ে বড় চিকিৎসক দল পাঠায়। ভূকম্পে আক্রান্তদের ৪০ ভাগের চিকিৎসা সেবা দেয় কিউবার চিকিৎসকরা। ২০০৫ সালে পাকিস্তানের কাশ্মীর ভূমিকম্পে কিউবা দুই হাজার চারশ স্বাস্থ্যকর্মী পাঠায়। আক্রান্তদের শতকরা সত্তরভাগ চিকিৎসা সেবা সরবরাহ করে এই দ্বীপ দেশটি। কাশ্মীরে তারা ৩২টি অস্থায়ী হাসপাতাল রেখে যায় এবং চিকিৎসাবিদ্যায় এক হাজার স্কলারশিপ দেয়।

জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা ত্রাণ সরবরাহের এই ঐতিহ্য কিউবা বিপ্লবের প্রথম বছরের কথা মনে করিয়ে দেয়। বৈশ্বিক চিকিৎসা আন্তর্জাতিকতাবাদের এক অসাধারণ ও দ্রুত বিস্তৃতির এটা কেবল একটি দিক। পৃথিবীর ষাটটি উন্নয়নশীল দেশে বর্তমানে কিউবার অর্ধলাখ চিকিৎসক ও সেবিকা কর্মরত রয়েছে। কানাডীয় অধ্যাপক জন ক্রিক এটাকে বলছেন, কিউবার চিকিৎসা আন্তর্জাতিকতাবাদ পৃথিবীর কয়েক কোটি লোকের জীবন রক্ষা করেছে। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমে এই অতুলনীয় চিকিৎসা সেবায় সংহতির খবর উঠে আসেনি বললেই চলে।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় দ্বীপরাষ্ট্রটির অবস্থা খুব নাজুক। অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই নিষেধাজ্ঞায় দেশটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নাভিশ্বাস উঠার অবস্থা। যদি যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার মেয়াদের শেষ বছরগুলোতে তাৎপর্যপূর্ণ কোন কিছু করতে চায়, তাহলে ইবোলা সঙ্কট মোকাবিলায় কিউবার ভূমিকাকে দেশটি ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার একটি সুযোগ হিসেবে নিতে পারে। বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীল যুদ্ধেরও একটা ইতি টানতে পারেন ওবামা। কিউবার বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সফলতার প্রশংসায় যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস গেল অক্টোবর ও নভেম্বরে ছয়টি সম্পাদকীয় ছেপেছে। এতে কিউবার ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি কিউবার চিকিৎসকদের ত্রুটি বের করতে আমেরিকার চেষ্টারও সমালোচনা করা হয়। দুই দেশের মধ্যে বন্দিবিনিময়ে আলোচনায় বসতেও আহ্বান জানানো হয়।

নিষেধাজ্ঞা উল্লেখযোগ্যভাবে হালকা করা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের নির্বাহী সুযোগ আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সামনে। কিউবাবিরোধী এ্যাক্টিভিস্টদের একটি গ্রুপের ওপর গোপন নজরদারি করার অভিযোগে তেরো বছর আগে কারাদ- দেয়া তিন কিউবার গোয়েন্দাকে মুক্তি দিয়ে এটা শুরু হতে পারে। ১৯৯৮ সালে কিউবার পাঁচ গোয়েন্দা সদস্যকে গোপন নজরদারি, হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর সতেরো মাস তাদের নিঃসঙ্গ কারাবন্দী রাখে। পরবর্তীতে বিচারে এই গোয়েন্দাকে পনেরো থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয় যুক্তরাষ্ট্রের আদালত। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার দীর্ঘ বৈরি সম্পর্কের অংশ হয়ে আছে। এই পাঁচজনের মধ্যে তিনজন এখনও যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে আছেন।

আগামী বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় আমেরিকাস শীর্ষ সম্মেলন কেন্দ্র করে ওবামার সামনে সেই সুযোগও এসে গেছে। উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারেবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার নেতাদের এই শীর্ষ বৈঠকে কিউবাকে আমন্ত্রণ না জানালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো সম্মেলন বয়কটের হুমকি দিয়েছে। চিকিৎসা সেবায় এই বিশাল অবদান কিউবায় গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ব্যাপারে যে উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, তাও দূর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিউবার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সত্যিসত্যি তুলে নেয়া হলে দেশটির অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে কিউবার সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সফলতাই কেবল প্রমাণিত হবে না, বরং এটা বিশ্বজুড়ে কয়েককোটি মানুষের জন্যে আশীর্বাদেরও কারণ হবে, কারণ তারা তখন অবারিত মুক্ত কিউবার স্বাস্থ্যসেবা থেকে উপকৃত হতে পারবেন। কর্পোরেট চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবাও সুবিধা পাবেন কোটি মানুষ।

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪

১৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: