কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সিআইএর অপকর্ম যুদ্ধাপরাধের শামিল

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • কামরুল হাসান

মার্কিন সিনেট এমন সময়ে সিআইএ নিয়ে গোপন প্রতিবেদন প্রকাশ করল, যখন বর্ণবাদ ইস্যু দেশটিতে চরম নৈরাজ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারদের বর্ণবাদী আচরণের। পুরনো অপরাধের মাধ্যমে নতুন অপরাধ ঢাকা, যেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতোই বিষয়। কিন্তু অপরাধের এই ভয়াবহ প্রবণতা পট্টি কিংবা তালি দিয়ে আদৌ মার্কিনীদের চরিত্র ঢাকা সম্ভব হচ্ছে না। বরং বেরিয়ে আসছে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী চেহারা।

এ্যাসাঞ্জ-স্নোডেনের মতো সিনেটের এই প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সতর্কতা জারি করা হয় মার্কিন স্থাপনা ও কমান্ডারদের ক্ষেত্রে। সঙ্কটে থাকা ইমেজ তলানিতে এসে ঠেকে। দূরত্ব তৈরি হয় ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের মাঝে। মূলত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভরাডুবি এ প্রতিবেদন প্রকাশের অন্যতম কারণ। আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকাতেই বুশ প্রশাসনের এমন গোমর ফাঁস করা হলো। বিচার নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই হোয়াইট হাউসের। আগামী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতায় আনাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি সংস্থাটি। তৃতীয় বিশ্বের জনপ্রিয় নেতাদের হত্যা ও ক্ষমতাচ্যুত করা, বন্ধু রাষ্ট্রের বিদেশনীতিকে প্রভাবিত করা, অস্ত্র-মাদকের মতো জঘন্য সব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাটি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই গোয়েন্দা সংগঠনটি এসব কাজে সিদ্ধহস্ত।

আর এমন সংগঠনের সবচেয়ে বড় বলি এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার মতো দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো। পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক শিবিরে থাকা দেশগুলোতেও অর্থের মাধ্যমে ব্যাপক প্রভাব বলয় তৈরি করে সিআইএ। এমন জঘন্য সব সাফল্যের পরও, সিআইএ ব্যর্থতার পাল্লাও কম ভারি নয়। নাইন ইলেভেনের আগে আল কায়েদা হামলা, আফ্রিকার মার্কিন দূতাবাস কিংবা সৌদি মার্কিন সেনা ছাউনিতে বোমা হামলার ব্যাপারে কোন রকম পূর্ব সতর্কতা কিংবা তথ্য ছিল না সংস্থাটির কাছে।

সিআইএ গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক ব্যর্থতা হলো, লিবিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে হামলা। সেই হামলায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মৃত্যু প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রমের। মার্কিন সিনেটের বর্তমান প্রতিবেদন ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক মানদ-কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আবারও বিশ্বজুড়ে দাবি উঠছে,বুশ-চেনির বিচারের। তথ্য বেরিয়ে আসছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির নামে নাগরিক অধিকার হরণের। অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে জাতিসংঘ এখন সিআইএ বিচারের দাবি তুলছে। যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সের মতো ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্ররাও এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু সিআইএ দাবি, তাদের নির্যাতন সঠিক ছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তাতে বহু নাগরিকের জীবন রক্ষা পায়।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন মুল্লুকে আল কায়েদার হামলার পাঁচ দিন পর মার্কিন সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ।আফগানিস্তান, পাকিস্তানসহ অন্যান্য স্থান হতে আটক করা হয় আল কায়েদার সদস্যদের। আটককৃত আল কায়েদা সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২০০২ সালে ‘সম্প্রসারিত জিজ্ঞাসাবাদ-প্রক্রিয়া’ অনুমোদন করেন বুশ-চেনি প্রশাসন। মার্কিন প্রশাসনের এমন অনুমোদন জাতিসংঘ চুক্তির পরিপন্থী। সিআইএ জিজ্ঞাসাবাদে যেসব নির্মম কৌশল ব্যবহার করা হতো তার মধ্যে রয়েছে : ওয়াটার বোর্ডিংÑ কাপড় মুখ বেঁধে তার ওপর পানি ঢালা। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট পাওয়ার মধ্য দিয়ে আটককৃত ব্যক্তির পানিতে ডুবে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতো। এছাড়া, টানা ১৮০ ঘণ্টা ঘুমাতে না দেয়া, পোকা-মাকড়ের ভরা বাক্সে আটকে রাখা, জঙ্গীদের হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা ইত্যাদি। সৌদি নাগরিক আবু জুবাইয়াদে নির্যাতনের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের যাত্রা। সিআইএ’র নির্যাতনমূলক এমন জিজ্ঞাসাবাদের মূলে ছিলেন দু’জন মনোচিকিৎসক। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন সরকারের কাছ থেকে তাঁরা ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার গ্রহণ করেছেন। মার্কিন বিমান বাহিনীর প্রাক্তন এই দুই মনোবিজ্ঞানীর আল কায়েদা কিংবা জঙ্গী সম্পর্কে কোন পূর্ব ধারণা ছিল না। উত্তর ভিয়েতনামী যোদ্ধাদেরও জিজ্ঞাসাবাদে এমন কার্যক্রম ব্যবহার করা হতো। চার বছর পর বুশের নির্দেশে এ কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটে এবং বুশ আটককৃত ব্যক্তিদের গুয়েতনামো কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা সিআইএ‘র হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা উঠে আসে সিনেটের ৬৭০০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন। সিনেটের দাবি, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে, তাতে উল্লেখ করার মতো কোন সাফল্য ছিল না। এছাড়া সিআইএ মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করেছে। মার্কিন জনগণ কিংবা প্রশাসনকে বোকা বানানো সিআইএ’র নতুন কোন ঘটনা নয়। ইরাকের মরণাস্ত্র সম্পর্কেও তারা এমন তথ্য দিয়েছিল। যে সূত্রের বরাত দিয়ে তারা যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গায়, পরে জানা যায় তা নির্জলা মিথ্যা। ইরাকে কেবল মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধ চাপিয়েই ক্ষান্ত হয়নি সংস্থাটি। মার্কিন বাহিনীকে ইরাকের শিয়া-সুন্নির যৌথ হামলা থেকে বাঁচাতে তারা সৃষ্টি করে আন্তর্দলীয় বিদ্বেষের বীজ। জেমস স্টিল হলো ইরাক গৃহযুদ্ধ ও শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের মূল আর্টিটেক্ট। কর্নেল জেমস স্টিল সিআইএ’র একজন কাউন্টার ইনসারজেন্স স্পেশালিস্ট। দক্ষিণ আমেরিকায় তার ভূমিকার জন্য তিনি সিআইএ বেশ প্রশংসিত। ইরাকে মার্কিন হামলা ঠেকাতে তখন বুশ-চেনির প্রশাসন কুখ্যাত এই কর্নেলকে দায়িত্ব দেন ইরাকে বিদ্রোহ দমনের। কর্নেল স্টিল অত্যন্ত নিপুণভাবে ইরাকে বুনে গেছেন সেই বিদ্বেষ, যা এখনও প্রতিদিন রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যে। সিআইএ বন্দী নির্যাতনের চেয়ে জঘন্য ছিল জেমস স্টিলের অপরাধ। কিন্তু বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে ...। ফার্গুসন থেকে গাজা। সর্বত্রই এখন মার্কিন রাষ্ট্রের নীতির বলি বিশ্বের তাবত মানুষ।

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪

১৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: