আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভালুকায় দুই শিশুসহ এক পরিবারের চার জনকে জবাই

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • পুলিশের দাবি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

বাবুল হোসেন/কামরুল এহসান চন্দন, ভালুকা থেকে ॥ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার লবণকোটা গ্রামে সোমবার রাতে স্বামী-স্ত্রীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এরা হচ্ছেÑহবিরবাড়ি ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক ও পরিবহন শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বাচ্চ ু(৩৫), তার স্ত্রী পারুল(২৫), সাত বছরের শিশুকন্যা জিনিয়া ও দুই বছরের শিশুকন্যা রিপা। জিনিয়া স্থানীয় ‘নক্ষত্র শিশু নিকেতন’ স্কুলের নার্সারির শিক্ষার্থী ছিল। বাচ্চু ময়মনসিংহ ভালুকা রুটে শিখা পরিবহন সার্ভিস নামের মিনিবাসের চালক ও মালিক ছিলেন। হত্যাকা-ের কারণ জানাতে পারেনি পুলিশ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দুবৃর্ত্তরা একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পর বাচ্চুর রক্তাক্ত লাশ বাড়ির সামনে মিনিবাসের ভেতরে এবং পারুল ও দুই শিশুসন্তানের লাশ বসতঘরের ভেতর রেখে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। সোমবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পর না ওঠায় মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে জানাজানি হয় চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকা-ের ঘটনা। খবর পেয়ে পুলিশ, র‌্যাব ও সিআইডি ঘটনাস্থলে গিয়ে হত্যাকা-ের আলামত সংগ্রহসহ সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করার অনুসন্ধান চালায়। প্রাথমিক তদন্ত ও আলামত দেখে পুলিশ এই হত্যাকা-কে পরিকল্পিত বলে দাবি করছে। হত্যাকা-ের আগে পারুল ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলেও পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে। পুলিশের কাছে হত্যাকা-ের মোটিভ পরিষ্কার না হলেও সন্দেহের তীর বাসচালক বাচ্চুর পলাতক সহকারী তনুর দিকে। সোমবার বিকেলেও বাচ্চুর সঙ্গে দেখা গিয়েছে তনুকে। এরপর থেকে তনু পলাতক। পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। পুলিশ সুপার মঈনুল হকসহ ময়মনসিংহ থেকে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ভালুকা উপজেলার পাড়াগাঁও গ্রামের ওয়ারেছ আলীর পুত্র রফিকুল ইসলাম বাচ্চু তিনবছর ধরে স্ত্রী পারুল ও দুই সন্তানকে নিয়ে লবণকোটা গ্রামে শাশুড়ি আলাতন নেছার বাসার পাশাপাশি বসবাস করে আসছিল। এর আগে পারুল ও তার মা আলাতন নেছা ছিলেন গাজীপুরের টঙ্গীতে। সেখান থেকে এসে বসত গাড়েন লবণকোটা গ্রামে। পাশাপাশি আধাপাকা বাড়ির এক পাশে পারুলকে নিয়ে বাচ্চু ও আরেকপাশে পুত্র উকিল উদ্দিনকে নিয়ে আলাতন থাকতেন। পরিবহন শ্রমিক বাচ্চু স্থানীয় টিএম টেক্সটাইলের কর্মীদের মিনিবাসে আনা-নেয়ার করার কাজ করত। তাকে এই কাজে সহায়তা করত যশোর থেকে আসা বাস হেলপার তনু। সোমবার তনুকে বাচ্চুর সঙ্গে দেখা গেলেও হত্যাকা-ের পর আর দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি স্থানীয়দের। পারুলের বড়ভাই উকিল উদ্দিন জানান, প্রতিদিন সকাল ৮টার মধ্যে ঘুম থেকে জাগত জিনিয়া। মঙ্গলবার সকাল ৯ টা বাজলেও ঘুম থেকে না জাগায় তালাবদ্ধ দেখে বাইরে থেকে ভেতরে লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এসে বাড়ির সামনে মিনিবাসের ভেতরে বাচ্চুর লাশ ও ঘরের ভেতর সন্তানসহ পারুলের লাশ দেখলে হত্যাকা-ের খবর ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। অথচ একসঙ্গে চারজনকে হত্যাকা-ের ঘটনায় কোন টের পায়নি আশাপাশের কেউ। স্থানীয়রা বলছেন, সোমবার রাতে এলাকায় মাইকে ওয়াজ চলছিল বলে এর শব্দে কোন কিছুই টের পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে ময়মনসিংহ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু আহাম্মদ আল মামুনসহ ভালুকা মডেল থানার পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরির্দশনে যান এবং লাশ উদ্ধার করেন। বাচ্চুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় কাটাছেঁড়া করাসহ গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। পারুলকেও ধারালো অস্ত্রের আঘাতসহ গলাকেটে এবং দুই শিশুসন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। বসতঘরের ভেতর থেকে উদ্ধার করা পারুলের লাশ ছিল উলঙ্গ এবং কাঁথা দিয়ে মোড়ানো। পারুল ও দুই সন্তানের লাশ পড়েছিল মেঝেতে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকা-ের আগে পারুল ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে। সিআইডি ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে বলে জানায় পুলিশ। রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে ধর্ষণের বিষয়টি, দাবি পুলিশ কর্মকর্তাদের। এদিকে ঘটনার পর পুলিশ মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে আটক কিংবা গ্রেফতার করতে পারেনি। মঙ্গলবার সকালে ঘটনা জানাজানি হলে হাজারো মানুষ বাচ্চুর বাড়িতে ভিড় জমান। এ সময় পুলিশকে এই ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। খবর পেয়ে ছুটে আসা পারুল ও বাচ্চুর স্বজনের আহাজারিতে এ সময় আশপাশের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। বাচ্চুর পরিবার হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

এদিকে হত্যাকান্ড নিয়ে এলাকার নানা শ্রেণীপেশার মানুষ নানা কথা বলছেন। প্রতিবেশীরা বলছেন, বাচ্চুর পরিবার ছিল শান্তিপ্রিয়। প্রয়োজন ছাড়া পাড়াপড়শির সঙ্গে তেমন একটা মিশত না তারা। বাচ্চু ও পারুলের মধ্যে কখনও ঝগড়া-বিবাদের কথা না শুনলেও পাশের বাড়ির একাধিক সূত্র জানায়, মাঝেমধ্যে ঝগড়া হতো পারুল ও আলাতনের মধ্যে। তবে ঝগড়ার বিষয় সম্পর্কে জানাতে পারেনি স্থানীয় কোন সূত্র। বাচ্চুর বড়ভাই নূরে আলম সিদ্দিকী (৪৫) জানায়, শ্রমিকদলের নেতৃত্বে জড়িত থাকায় দলের নেতাকর্মীর সঙ্গে বিবাদ ছিল। ক’দিন আগে একবার বিরোধে হামলারও শিকার হয়েছিল বাচ্চু। আর বাচ্চুর বাবা ওয়ারেছ আলীর (৭০) দাবি পুত্রের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। তারপরও কেন হত্যা করা হয়েছে প্রশ্ন বাবার। এর বাইরে বাচ্চুর স্ত্রী পারুল ও যশোর থেকে আসা বাচ্চুর সহকারী তনুকে নিয়েও রয়েছে এলাকায় নানা গুঞ্জন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এসব বিষয় উঠে এলেও বলা হচ্ছে, একসঙ্গে চারজনকে হত্যার মোটিভ এখনও পরিষ্কার নয়। তদন্তের পরই জানা যাবে আসল কাহিনী।

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪

১৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: