কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • আমিনুর রহমান সুলতান

বাংলাদেশের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঐতিহ্য বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১০-১৯৫৬), সতীনাথ ভাদুড়ী (১৯০৬-১৯৬৫) প্রমুখের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উপন্যাসের স্বরূপে পাওয়া যাবে সত্য, তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাজাত উপন্যাসের ঐতিহ্য, বাংলাদেশের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঐতিহ্যের মতোই সাতচল্লিশ-উত্তর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে।

‘মুক্তিযুদ্দ চেতনা : আমাদের শক্তির ও সংগ্রামের উৎস’ প্রবন্ধে ড. আহমদ শরীফ আমাদের ঐতিহ্যের সম্পদের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা থেকে উপর্যুক্ত বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেছেনÑ

আমাদের সঙ্কট-সমস্যার, সংহতির, সংগ্রামের ও বিজয়ের চারটি স্তম্ভ, চারটি বীকন রশ্মি, চারটি মীনার। এক বায়ান্ন’র ভাষা সংগ্রাম, দুই বাষট্টির শিক্ষাদ্রোহ, তিন ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান এবং চার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এগুলোই আমদের ঐতিহ্যের সম্পদ।১

শুধু তাই নয়, এই ঐতিহ্য থেকেই যে আমাদের জীবনের সাফল্য অর্জিত হতে পারে সে দিকেও তিনি দৃষ্টি রেখে একই প্রবন্ধে বলেছেনÑ

আমাদের সমকালীন সব আর্থিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাষ্ট্রিক সঙ্কট-সমস্যা সমাধানের জন্যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-চেতনাকেই সম্পদ ও সম্বল করা ফলপ্রসূ বলেই আবশ্যিক।২

এবং তিনি আরও উল্লেখ করেছেনÑ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমাদের মানুষ ও সমাজ গড়ার কাজে নামতে হবে।৩ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস এ চেতনাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে সন্দেহ নেই। কেননা উপন্যাস জীবন ঘনিষ্ঠ, জীবনসংলগ্ন শিল্প। আর এই জীবন ঘনিষ্ঠতা সমকালীন সমাজের মনসস্তত্ত্ব তথা অর্থনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাকে স্বীকার করে নিয়েই গড়ে ওঠে। আমরা জানিÑ

উপন্যাসের নোঙ্গর গেঁথে থাকে ব্যক্তি মানুষের জীবন যা তার প্রাতিস্বিক সত্তার গভীরে। কিন্তু উপন্যাস ব্যক্তি সত্তার কাহিনী হলে কী হবে, অনেক সময় উপন্যাস প্রত্যাক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে বহন করে চলে সমাজ এবং রাজনীতির অভিজ্ঞান।৪

স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালের রাজনৈতিক উপন্যাসের যে ঐতিহ্য সে ঐতিহ্যের পথ ধরে বাঙালী তাঁদের বৈচিত্র্যময় আত্মঅন্বেষণের পথ খুঁজে পায় মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের মধ্য দিয়ে কেননাÑ

মুক্তিযুদ্ধ জীবনকে প্রভাবিত করেছে, জীবনের সেই প্রভাব সাহিত্যি প্রকাশিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়েছে, সাহিত্যের জগৎটাও পরিবর্তিত হয়েছে।৫

আর এই স্বাতন্ত্র্যের ধারার সময় ও সমাজের আলেখ্য প্রত্যক্ষ করে, সামাজিক রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে কথাশিল্পীরা লিখেছেন একাধিক উপন্যাস। তবে ‘স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে জনজীবনের জাগরণের প্রবাহকে ধারণ করে’ এদেশের উপন্যাসের প্রারম্ভ ঘটলেও সে প্রবাহ আর বজায় থাকেনি।

নানা সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক প্রতিকূলতার আবর্তে বাংলাদেশের মানুষের জীবন কয়েক বছরের মধ্যেই আবর দ্বন্দ্ব-সংকুল হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে সংশয়ের সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন মূল্যবোধের সঙ্গে স্বাধীনতা-উত্তর মূল্যবোধের বিরাট পার্থক্য সূচিত হয়। আবার হতাশায় আক্রান্ত হয় সমাজ জীবন।৬

দুই.

কথাশিল্পী ও অধ্যাপক আনোয়ার পাশা তাঁর ‘রাইফেল রোটি আওরাত’৭ (১৯৭২) গ্রন্থে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক পরিবেশের বর্ণনা প্রদান করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেনÑ

একটা পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল বটে উনিশ শো সাত-চল্লিশের চৌদ্দই আগস্ট। সেটা পাকিস্তানের রাজনৈতিক সত্তা, সেটা দেহ। রাষ্ট্রের প্রাণ হচ্ছে তার অর্থনীতি, এবং তার চিন্ময় সত্তার অভিব্যক্তি সাংস্কৃতিক বিকাশের মধ্যে। ঐখানেই ছিল গ-গোল। হাজার মাইলের ব্যবধানে বিরাজিত দুটো অংশের মধ্যে একটা অর্থনীতি গড়ে উঠলে তাতে একটা অংশে দ্বারা অন্য অংশের শোষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেইÑ অর্থনীতির ক্ষেত্রে একাংশের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে অন্য অংশের উপর। মুসলিম লীগ প্রাণপণে সেই আর্থনীতিক প্রাধান্য দেশের পশ্চিমাংশে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছিল।৮

অবশ্য আর্থনীতিক শোষণ ছাড়াও এ সময় তারা দুটি দেশের মধ্যে ভৌগোলিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন, সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিছিন্ন পূর্ববাংলার ওপর সাংস্কৃতিক আধিপত্য বর্তাতে চাইলেন। দুই দেশের সাংস্কৃতিকে এক করতে চাইলেন উর্দু ভাষাভিত্তিক। এই আর্থনীতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক পেষণ দুই-ই রাজনৈতিক কৌশলের অপর পীঠ।

কিন্তু হাজার মাইলের ব্যবধানে বিরাজিত দুটো অংশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্য সাধন করা যে খুবই কঠিন এবং জটিল কাজ তা পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বাস্তবতার নিরিখে বিচার না করে ধর্মীয় ভাবাবেগে আপ্লুত হলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণেও উদ্যোগী হলেন। সাংস্কৃতিক ঐক্য সাধনের প্রাথমিক পর্ব ভাষার ওপর প্রয়োগও করা হলো। কিন্তু পরিণামে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর কিছুটা হলেও বোধোদয় ঘটে যে, পূর্ববাংলার জনমানব অধিকাংশ মুসলমান হলেও এরা বাঙালী, বাংলা তাদের মাতৃভাষা। তাই মাতৃভাষার মমত্ববোধে বাঙালীরা শহীদ হতেও দ্বিধা করে না।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিস্তার সম্ভব হয়নি বলেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। ইসলামী আদর্শ তথা দ্বি-জাতিতত্ত্বের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক ও আর্থনীতিকভাবে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ফায়দা লুটতে থাকে।

বাঙালীরাও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগঠিত করার পর চুপটি মেরে বসে থাকেনি। এরাও রাজনৈতিক ও আর্থনীতিক শোষণ নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে মুক্তির অন্বিষ্টে একে একে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করে বাষট্টি, উনসত্তর এবং পরিশেষে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ।

এই আন্দোলনের পেছন অবশ্যই ক্রিয়াশীল ছিল জাতীয়তাবাদ ও স্বদেশপ্রেম। স্বদেশের প্রতি গভীর ভালবাসার ফসল এই সব আন্দোলন। তবে এই সব আন্দোলন করতে গিয়ে যুগে যুগে ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী প্রতিটি আন্দোলন থেকেই কিছুটা পলায়নমুখিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মধ্যবিত্তের এটি সম্ভব হয়েছে তাদের চেতনাগত অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে। কেননা এই শ্রেণীটা সবসময় নিজ স্বার্থ সংরক্ষণের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে, যতটা না করে সমাজ স্বার্থে। ফলে জাতীয় ও রাজনৈতিক উত্থান পতনের ভেতর স্বতন্ত্র চরিত্র হিসেবে সহজেই আলাদা করা যায় এদের।

তবে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হলে, এই মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র ও সাধারণ জনতার মতো এরা বলিষ্ঠ ভূমিকা না রাখতে পারলেও কিংবা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে অংশগ্রহণ না করলেও এরা কাজ করেছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে, স্বাদেশিকতার চেতনায় মুক্তিকামনা করেছে বাংলাদেশের মানুষের। বাসনা প্রকাশ পেয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের। স্বীকার করছি এদের যাত্রা অসম দ্বৈরথে।৯ অসম দ্বৈরথ বলতে এখানে বাস্তবতা আর আদর্শবাদের কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবতার মুক্তির আন্দোলনে জাতীয় চৈতন্যের জাগরণের সাথে এই শ্রেণী একাত্ম হয়ে ওঠে অস্বীকার করার উপায় নেই। ছাত্র, কুলি, মজুর, সাধারণ জনতা, দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে মধ্যবিত্ত শ্রেণীও মুক্তিসংগ্রামের সাফল্য প্রত্যাশা করেছে। আর এসবের প্রতিফলন ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে লেখা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলোতে। আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ (১৯৭২)-এর সুদীপ্ত শাহীন, শওকত ওসমানের, ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’১০ (১৯৭১)-এর প্রৌঢ় শিক্ষক গাজী রহমান, শওকত আলীর ‘যাত্রা’১১ (১৯৭৬)-এর অধ্যাপক রায়হান, রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’১২ (১৯৭৫)-এর অধ্যাপক তাহের তার যথার্থ প্রমাণ।

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

১৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: