কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ॥ কিছু বিক্ষিপ্ত ভাবনা

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • তৌহীদ রেজানূর

১৯৯৫ সালের মার্চ মাসের কোন এক সন্ধ্যা। আমি আর অনল (শহীদ চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হানের সন্তান) গেছি ঢাকার শান্তিবাগেÑ জনাব দেলোয়ার হোসেনের কথা শুনতে। এ পর্যন্ত জানামতে দেলোয়ার সাহেব একাত্তরে ঘাতক আলবদর বাহিনীর বধ্যভূমি রায়েরবাজার থেকে প্রাণ নিয়ে বেঁচে আসা একমাত্র বন্দী। তাই ডেভিড বার্গম্যান ও গীতা সায়গলের যৌথ উদ্যোগে নির্মিতব্য ‘ওয়ার ক্রাইমস ফাইল’ তথ্যচিত্রের সহায়ক-গবেষক দলের অংশ হিসেবে আমরা দু’জনে এসেছি তাঁর বাসায়। ‘দু’জন গবেষক কথা বলতে এসেছে’Ñ এমন ধারণা নিয়েই তিনি আলাপ শুরু করলেন। তখনও তিনি জানেন না আমরা দু’জনেই শহীদ সন্তানও বটে। তিনি সবিস্তারে বলে চললেন আলবদর বাহিনীর ডেরা মোহাম্মদপুরের শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (যা তখন ছিল আলবদর বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র) ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে রক্ত হিম করা তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। যে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ তা হলোÑ নির্যাতন কেন্দ্রে তিনি যে সেলে বন্দী ছিলেন, সেখানে একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিখ্যাত শিক্ষক অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীকেও অপহরণ করে এনে রাখা হয়েছিল। ভয়াল সেই বন্দী শিবিরে তাঁর লব্ধ হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু দেলোয়ার সাহেবের বিবৃত একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা জরুরী। অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীকে নির্যাতন কেন্দ্রে আনার পর একপর্যায়ে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা (যারা বয়সে খুবই তরুণ) দেলোয়ার সাহেবদের কক্ষে প্রবেশ করেই নিরেট বাংলায় চিৎকার করে জানতে চায় ‘মুনীর চৌধুরী কে?’ অধ্যাপক চৌধুরী তাঁর পরিচয় জানালে বর্বরের দল তুই-তুকারি করে জিজ্ঞাসা করেÑ ‘বল, তুই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কয়টা বই লিখেছিস?’ রবীন্দ্রনাথের ওপর কোন বই না লেখার কারণে মুনীর চৌধুরী ‘না-সূচক’ উত্তর করেন, কিন্তু পাষ-ের দল তাঁকে আমনুষিক অত্যাচার থেকে রেহাই দেয়নি। দেলোয়ার হোসেনের কথা শুনতে শুনতে নানা ভাবনা তখন আমাকে অস্থির করে তুলছিল।

১৯৪৮-এ বাঙালীর ‘বোল’-এ অবাঙালী ভাষা চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা যখন ব্যর্থ হলো তখন গদিনশীন কর্তারা আঘাত হেনেছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপরে। হরেক প্রচেষ্টার একটি পাকিস্তান মুল্লুকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা; বাঙালী অধ্যুষিত অঞ্চলে নির্বাসিত হয়েছিলেন বাঙালী কবি শিরোমণি রবীন্দ্রনাথ। রাজার হুকুমে ‘হিন্দু কবি’ রবীন্দ্রনাথের গান বাজানো বন্ধ হলো রেডিওতে, সব অনুষ্ঠানে। সমাজের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ‘খৎনা’ করাতে তৎপর প্রশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। ষাটের দশকের প্রথমভাগে প্রশাসনিক সব চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে মানুষ জড়ো হলো ঢাকার দৃষ্টিনন্দন উদ্যান রমনার বটমূলে। পালন করল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শততম জন্মবার্ষিকী। সমাজের ‘কালি মাখা মেঘ’ দূর করতে তাঁরা ঠিকানা খুঁজল রবীন্দ্রনাথে। জন্ম হলো ছায়ানটের। অসাম্প্রদায়িক সম্মিলনের এ আরেক নজির। সব বিঘœ উপেক্ষা করে বাঙালীর সেই মহাসম্মিলন চালু রয়েছে আজও, থাকবে চিরদিন। এমনি করেই আমাদের আরাধ্য স্বাধীন স্বদেশ ভূমি অর্জনের সেই যাত্রায় পাথেয় হলেন রবীন্দ্রনাথ এমন পোক্তভাবে যে সদ্যোজাত বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বীরবাঙালী রবীন্দ্রনাথের গানকেই বেছে নিল। মুক্তির সেই সংগ্রামে শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নন; কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়সহ অন্যান্য মহান শিল্পীর রচিত বরাভয় সঙ্গীত আমাদের ‘ক্লান্তিহীন, শ্রান্তিহীন, সঙ্কটে অটল’ থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে।

রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে বাঙালী জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করে রাখার জন্য পাকিস্তানী শাসকবর্গের অবিরাম প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ জনতা সব অনাচার থেকে মুক্তির বীজ বুনে গেছে পুরো পাকিস্তান আমলজুড়ে। মুক্তিকামী জনতার পদভারে তাই একদিন প্রতিদিন প্রকম্পিত হয়েছে এ অঞ্চল। বাঙালীর আন্দোলন ফুলে-পল্লবে ক্রমবিকশিত হয়েছে এবং বাঙালী তার ওপর নেমে আসা ‘কাল রাত্রির অর্গল’ ভেঙে ‘মুক্ত প্রাণের সাড়া’ আনবার জন্য আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছে। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট নামে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী ঢাকাতে আঘাত হানে। এর পরবর্তী দিনগুলোতে ঢাকা শহরের চিত্র তিনটি মোটা দাগে বিভক্ত :

১. ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়া মানুষের দল যারা বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচর দিয়ে অথবা অন্যান্য বিভিন্ন পথে বাঁচার আশায় পলায়নপর।

২. ঢাকায় রয়ে যাওয়া মুক্তিকামী মানুষের দল, যারা যুদ্ধবৈর শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে এই মুক্তিযুদ্ধকে গোপনে সহযোগিতা করার প্রচেষ্টায় রত।

৩. ঢাকায় বসবাসরত স্বাধীনতাবিরোধী চক্র (বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ, ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ) যারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাঙালী নিধন অভিযানকে সফলতা দানের জন্য সক্রিয়।

প্রথম দলের একটি অংশ মুক্তিবাহিনীতে নাম লিখিয়ে, গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে আবার ঢাকাকে শত্রুর কবল মুক্ত করতে ফিরে আসে ঢাকায় এবং একের পর এক গেরিলা আক্রমণ করে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের পরাস্ত করতে থাকে।

দ্বিতীয় দলটি ক্রমান্বয়ে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে যেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঢাকার মুক্তিকামী মানুষদের প্রতিটি ঘর তখন ’দুর্গ’ হয়ে উঠেছে।

তৃতীয় দলটি দিনে দিনে আরও ভীষণ হয়ে উঠতে থাকে। তাদের হিংস্রতা চরমে পৌঁছাবার নিমিত্তে তারা গঠন করে খুনী বাহিনীÑ আলবদর ও আলশামস। তাদের সহযোগিতা করতে স্বেচ্ছাসেবকের দল (রাজাকার বাহিনীর সদস্য) রইল সদা প্রস্তুত। এই ঘাতকের দল মুক্তিযোদ্ধাদের কিংবা মুক্তিকামী বাঙালীদের হত্যা করার জন্য তখন ঢাকা শহরের সদরে-অন্দরে বুক ফুলিয়ে চলে। তাদের দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জারজ-সন্তান’, ’ইসলামের শত্র’, ’ভারতের চর’ ইত্যাদি বলে গালাগাল দেয় ও নির্দ্বিধায় হত্যা করে। এরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলে নির্যাতন কেন্দ্র। ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুর হয়ে ওঠে তাদের নির্যাতনের অভয়ারণ্য। আজকে যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়Ñ একাত্তরে সে এলাকাজুড়ে ছিল নির্যাতন কেন্দ্র। এখানেই হত্যার শিকার হয়েছেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ, শহীদ রুমি (জাহানারা ইমামের ছেলে)। মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে এদেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের নির্যাতন এর পরে নৃশংসভাবে হত্যা করে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। মিরপুরে কালাপানি, জল্লাদখানা, মুসলিম বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় তারা হত্যা করে বুদ্ধিজীবীসহ অগণিত মুক্তিকামী মানুষদের। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁটাবন মসজিদ সংলগ্ন এলাকায়ও আবি®কৃত হয় বধ্যভূমি। ঢাকার অনুরূপ চিত্র তখন বাংলাদেশজুড়ে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিজেই হত্যার শিকার হন। পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস মোটা দাগে বাঙালীর সকল অর্জনকে বর্জন করার ইতিহাস, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনরুত্থান ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের ইতিহাস। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে আপন স্বজন হারিয়েছি তারা কখনোই এই সকল যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করিনি। নব্বই দশকের শুরুতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তার প্রতি এ দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দলের ও আপামর জনতার সমর্থন ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সেই গণদাবি নানা প্রতিকূলতার যুপকাষ্ঠে বলি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে বিপুল জনসমর্থন পরিলক্ষিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার মধ্য দিয়ে চিহ্নিত ঘাতকগোষ্ঠীকে পুনরায় বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আলবদর নেতা কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে। অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ও প্রক্রিয়াধীন অথবা কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু অপ্রত্যাশিত হলেও সত্য যে, দেশে ও বিদেশে নানা ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংগঠন এই ্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।

শুধু যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের জন্য চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েই নয়Ñ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টির এক অশুভ পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’র জায়গা করে নিতে স্বল্পতম সময়-ব্যবধানে যে দাম দিতে হয়েছে সে সত্য জাতিসংঘ তো বটেই, গণহত্যা বিষয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁরাও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই স্বীকার করে নিয়েছেন। দীর্ঘ ৪৩ বছর পর, ’৭১-এর হত্যাযজ্ঞ নিয়ে দেশে-বিদেশে, দেশী-বিদেশী মানুষের সংখ্যা চালাচালি আর পরিসংখ্যান নিয়ে মাতামাতি দেখে জরুরী ভিত্তিতে আমাদের সকলের এখন অনুসন্ধান করা প্রয়োজন কারা, কেন, কাদের উদ্দেশ্য সাধনে, কিভাবে কি করেছে, করছে ও করবার ভাবনা ভাবছে। তাই সরকার ও দেশপ্রেমিক নাগরিকমাত্রেই এসব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে নিঃসন্দেহে।

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

১৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: