আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নদীটা রাষ্ট্র হয়ে যায়

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

রাত্রে, তুষার আসে অন্ধকারে, আমার ঘুম ভাঙ্গে, জেগে দেখি একটা শ্বেত শুভ্র দেশে শুয়ে আছি।

আমি আরও দেখি একটা কবর। একজন মা কবরের মধ্যে ছেলেকে খুঁজছে। এই মা বাংলাদেশের কিংবা শ্রীলঙ্কার কিংবা গুয়াতেমালার।

কোনকিছু টেকে না। শুধু টিকে থাকে ইতিহাসের ব্যঙ্গ। মা জননী উঠে দাঁড়ায়। একমুঠো মাটি কবরে ছড়ায়। এই মা বাংলাদেশের কিংবা শ্রীলঙ্কার কিংবা গুয়াতেমালার।

মাটি নিয়ে বাড়ি খোঁজে মা। তাঁর বাড়ি কোথাও নাই। ইতিহাসের কোথাও তাঁর বাড়ি নাই। শুধু আছে কবর। খুন করার জায়গা। এই জায়গাটার নাম বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কা কিংবা গুয়াতেমালা।

জানো।

কি।

আমি যাকে খুব ভালোবাসতাম তার মুখ ভুলে যাচ্ছি।

একি সম্ভব।

আমার কিছু মনে পড়ে না।

অসম্ভব কথা।

আমি নিজেকে শুনিয়ে বলি : খুব সম্ভব সেই মানুষটার সঙ্গে আমার দেখা হবে।

কার সঙ্গে?

যে আমার সর্বনাশ করবে।

আমি কথাটা বলি আর তাকিয়ে থাকি।

কার দিকে।

কঙ্কালটার দিকে।

আমার এখন খিদে পায় না। কোন বন্ধুকে দেখার ইচ্ছা করে না। কিংবা কোন প্রেমিকাকে।

আমি আমার নিঃসঙ্গতার মধ্যে কঙ্কালটার দিকে চেয়ে থাকি।

এই কঙ্কালটা বাংলাদেশের। শ্রীলঙ্কার। গুয়াতেমালার।

তোমার কথা বলা ফুরায় না। আমি তোমার চোখের দিকে চেয়ে থাকি।

তোমার চোখে মেঘ ভিড় করে আসে। আমি ট্রেনের জানালা দিয়ে প্লেনের জানালা দিয়ে জাহাজের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি।

এই তাকিয়ে থাকা দূরকে দেখা। যে দূরকে মানুষ অনন্ত বলে।

তোমার শরীর। দু’জন মানুষের একটাই ভালোবাসার শরীর।

তোমার চোখে মেঘ ভিড় করে আসে। তারপর বৃষ্টি হয়।

থেকে থেকে এই মহিলাটির কথা মনে হয়। মহিলাটি জননীটি মা-টি প্রতি বৃহস্পতিবার দুই কবরের পাশে এসে বসে। মহিলাটি উবু বসে বসে থাকে, বিড় বিড় করে দোয়া দরুদ পড়ে, কোলে ভাঁজ করা থাকে তার দু’হাত, একাগ্র দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে দুই কবরের দিকে, দুই শরীরের দিকে। এই শরীরের একটি হচ্ছে তাঁর স্বামী, অপরটি হচ্ছে তাঁর ভাই। যুদ্ধকালে পাকিস্তানী সৈন্যরা, তাঁদের দু’জনকে খাড়া করে সরাসরি গুলি করে। মনে হয় দু’জন পাশাপাশি শুয়ে আছে। মহিলাটি হচ্ছে দু’জনের মধ্যকার রক্তের সূত্র, গ্রামের মানুষজন একদিন পর, তাঁদের দু’জনকে দুই মুর্দাকে দুই লাশকে দাফন দেয়। দাফনের একদিন পর, এই মহিলাটি তাঁর স্বামীকে এবং তাঁর ভাইকে দেখতে আসে। তারপর থেকে, কতদিন হয়েছে, যুদ্ধ শেষ হয়েছে, মহিলাটির প্রত্যেক বৃহস্পতিবার আসার বিরাম নাই। যেন এই দুই পুরুষ খেতখলা থেকে দুপুরে খেতে আসবে, তারপর খানিকক্ষণ ঘুমাবে এবং পরে খেতখলায় কাজে ফিরে যাবে। জোহরের নামাজ থেকে আসরের নামাজ পর্যন্ত মহিলাটি এই দু’জনকে পাহারা দেয়, পরে ঘরে ফিরে যায়।

স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর আমি ইতিহাস খুঁজতে এসেছি : ইতিহাস খোঁজার অর্থ চল্লিশ বছর আগেকার হত্যাকা-ের ইতিহাস খোঁজা। একটা নদীর পাড়ে, আমি ঘুরে বেড়াই। এই নদী বেয়ে, নৌকোয়, নিরপরাধ মানুষজন, ইতিহাস পাড়ি দিতে চেয়েছে, পৌঁছতে চেয়েছে ভারতের ইতিহাসে, পাকিস্তানের ইতিহাসকে বিদায় দিয়ে। মানুষজন, নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, পাকিস্তানের ইতিহাসকে বিদায় দিতে পারেনি এবং পৌঁছতে পারেনি ভারতের ইতিহাসে। তারা মারা গেছে এবং তাদের হত্যা করা হয়েছে এখানেই, এই নদীতেই। ইতিহাস যখন মারণাস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন ইতিহাসের হাত থেকে পালাতে চেয়েছে হিন্দু এবং মুসলমান, কিন্তু তাদের শেষ পর্যন্ত কঙ্কাল হতে হয়েছে, তাদের কঙ্কাল করেছে পাকিস্তানীরা, পাকিস্তানী সৈন্যরা এবং রাজনৈতিক দল জামায়াতীরা, আলবদররা : কঙ্কালগুলোর বংশধরদের কাছে আমি কঙ্কাল হওয়ার ইতিহাস শুনি।

১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট আমাদের কাছে মিলিটারি অকুপেসন। এই অকুপেসনের ভেতর আমরা ৩০ বছর থেকেছি। থেকে থেকে যুদ্ধ করেছি। শেষ যুদ্ধে, চূড়ান্ত যুদ্ধে, পাকিস্তান আমাদের কাছে হেরেছে। আমরা জয়ী হয়েছি। স্বাধীন হয়েছি। জয়ী হওয়া কি স্বাধীন হওয়া? কে জানে।

আমি ফের কঙ্কালগুলোর বংশধরদের কাছে কঙ্কাল হওয়ার ইতিহাস শুনতে যাই। এসব গ্রামের কঙ্কাল হওয়ার আগে ঢাকা শহরের কঙ্কাল হওয়ার কথা বলি। ১৯৭১ মার্চে, কঙ্কাল হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা, আমি এবং আমার বন্ধুরা, আমাদের ধমনীতে রক্তে টের পাচ্ছি কঙ্কাল হওয়ার পূর্বের নিঃসঙ্গতা, এই নিঃসঙ্গতা কবরের অন্ধকারে তৈরি হয়, বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বাসাবাঁধে, জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মার্চে ঢাকা শহর প্রস্তুতি নিচ্ছে : ধ্বংস এবং পোড়ামাটি শহরটাকে ঘিরে ধরছে, মানুষজন পালাবার আগে দেরি করছে, হাজার হাজার পাতার ইতিহাসের মধ্যে তাদের জায়গা কোথাও নেই, পাকিস্তানের মিলিটারি অকুপেসনের মধ্যে, নিরস্ত্র মানুষজনের পালাবার কোন জায়গা নেই, শুধু আছে তাদের পোড়া শরীর, অগ্নিদগ্ধ মনুষ্যদেহ, পালাবার আগে পালাবার মধ্যে, তাদের পোড়া শরীর একবার দেখে ও আর একবার না দেখে, আমরা ছুটছি শহর ছেড়ে, নদীর দিকে কিংবা রাস্তার দিকে, যে-রাস্তা আমাদের সাভারে বনজঙ্গলের দিকে নিয়ে যাবে কিংবা যদি বুড়িগঙ্গার ওইপাড়ে জিনজিরার দিকে নিয়ে যাবে। হাজার হাজার মানুষের ভিড়, সবাই কিন্তু নিঃসঙ্গ, এই নিঃসঙ্গতা কি আওয়ামী লীগের কিংবা কমিউনিস্ট পার্টির, কিংবা ভাসানী ন্যাপের অথবা মুজাফফর ন্যাপের? এই নিঃসঙ্গতা কি সত্যিকার মার্কসিস্টের, যেমন আমি নিজেকে মার্কসিস্ট বলে দাবি করি? রাজধানীর ওই পাড় থেকে পাকিস্তানী সৈন্যরা ট্যাঙ্ক নিয়ে, মেশিনগান নিয়ে এগিয়ে আসছে, নিরস্ত্র আমাদের কবর দিতে। পুরো জানুয়ারি মাস, সারাটা ফেব্রুয়ারি মাস, সমগ্র মার্চ মাস : আমরা বাঙালীরা ভেবেছি স্বাধীন হবে পাকিস্তানী অকুপেসন থেকে, কিন্তু হায়রে স্বাধীনতা নিয়ে পালাতে হয়েছে সারাদেশে শেষ পর্যন্ত।

কঙ্কাল হওয়ার আগে এবং পরে, দুটি ঘটনার কথা বলি। যে রাতে পাকিস্তানী অকুপাইড ফোর্স ঢাকা শহরে আগুন লাগায়, সে বিকেলে আমি জয়নুল আবেদিনের বাড়িতে গিয়েছি। আবেদিন তখন পর্যন্ত আমাদের দেশের সেরা শিল্পী। তিনি থাকতেন তখন রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাকের পেছনে, তাঁর নিজের ছোট একতলা বাড়িটাতে।

দেখি, তিনি লুঙ্গিপরা, একমনে ফুলের চারায় নিরানি দিচ্ছেন। আবেদিন ভাই, এই সময়ে ফুলের চারার যতœ করছেন। যদি হয়, যুদ্ধ হবে বলে মনে হচ্ছে। যুদ্ধে আমরা জিতব, দেখবেন আমরা জিতব, তখন যুদ্ধ শেষে ফুল দরকার পড়বে, স্বাধীনতার জন্য ফুল দরকার পড়বে, সেই কথা ভেবে ফুলের চারার, নানান জাতের গোলাপের : লাল সাদা হলুদ, গোলাপের চারা লাগিয়ে রাখছি। যেদিন দেশ স্বাধীন হবে, পাকিস্তানীরা পালাবে, সেদিন সবার আগে যেসব দোকান খুলবে, সেসব হবে ফুলের। পোড়া শহরে, সবার আগে, দরকার পড়বে ফুলের। রুটির আগে, শব্দের কোলাহলের আগে, দরকার পড়বে ফুলের। আবেদিন হাসতে হাসতে, চোখে পানি এনে, কথাগুলো বলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ফের আমার দেখা, যুদ্ধ শেষের প্রথম দিনে। তিনি যে পাড়ায় লুকিয়েছিলেন একই পাড়ায় আমিও লুকিয়েছিলাম। যুদ্ধ শেষের প্রথম দিনের বার্তা তাঁকে পৌঁছাতে গিয়ে, কেন জানি আমার গলা শুকিয়ে যায়। মনে হয় এই মুহূর্তে পানি না পেলে আমি মরে যাব। আবেদিন ভাই পানি খাওয়াতে পারবেন। আবেদিন ভাইয়ের স্ত্রী পানি নিয়ে এলেন কাচের গ্লাসে। এই কাচের গ্লাসটাই বাঁচাতে পেরেছি। আবেদিন বলে উঠলেন : এই গ্লাসটাতে ফুল রাখব। প্রথম ফুল।

আমি আবেদিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। পোড়া শহরে ফুল দরকার। খাদ্যের আগে, বস্ত্রের আগে, বাসস্থানের আগে, ফুল দরকার। ঢাকা শহরটা ফুল দিয়ে সাজাতে হবে।

আর একটা কাজ বাকি।

আমি আবেদিনের হাত ধরে, দুটি বাড়ির পরে, গলির শেষে দাঁড়াই। সব বাড়ির দরজা, যুদ্ধ শেষের প্রথম দিনে, খুলে যায়। যে মাঠটার নাম, এতদিন পাকিস্তান মাঠ, সেই মাঠটার নতুন নামকরণ করি : বাংলাদেশ মাঠ। চার পাশের ঘরদোর খোলা, ছাদ ভর্তি নানান বয়সী মেয়ে, বৃদ্ধারা লাঠি হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। আমি আর আবেদিন ভাই, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী সবাই বাংলাদেশ মাঠ বুকে করে আকাশে উড়ে যাই। কোথাও পাকিস্তান নাই।

১০

গ্রাম জনপদের কঙ্কাল হওয়ার কাহিনী, বার বার, মুলতবি রেখে, আমি আজ সকাল বেলা নদীর পাশে দাঁড়াই। নদীটা, দুই গ্রাম, পেছনে ফেলে ভারতের নদী হয়েছে। পাকিস্তানের একটা নদী ভারতের অন্য একটা নদী কি করে হয়। আমি ভাবি আর অবাক হই। নদী নিজের মতো নিরন্তর বয়ে যায়। এই বয়ে যাওয়াটাই ভূগোল, কারও কারও দৃষ্টিতে ইতিহাস, আর কারও চোখে জীবিকা : মাঝিদের নৌকো, জেলেদের জাল, নদীর পাড়ের কাদামাটি কুমারদের চাক। এই জীবিকা নষ্ট হয়ে যায়, নদীটা নষ্ট হয়ে যায়, নদীটা অন্য এক ভূগোল হয়ে যায়, অন্য এক ইতিহাস। নদীটা নাইওর নিতে পারে না। নদীটাকে অনুমতি নিতে হয়।

নদীটা রাষ্ট্র হয়ে যায়। শিশু-কিশোর কিংবা হিন্দু-মুসলমান অথবা যুবক-যুবতী অথবা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হয়ে রক্তের স্রোত হয়। এই স্রোত নদী আর টানতে পারে না। দুটো নোংরা শব্দ গ্রাম ভুবনে ছড়ায় : মিলিটারি অকুপেসন।

১১

আমি একটা মেয়ের কাঁধে হাত রেখে চল্লিশ বছর আগেকার মিলিটারি অকুপায়েড নদীর পারে কিংবা নদীর পাশে এসে দাঁড়াই। এই মেয়েটি আমাকে জানাবে চল্লিশ বছর আগেকার নদীর ভূগোল আর ইতিহাস।

মেয়েটির চুল খোঁপা করা। বাতাসে অল্প অল্প কাঁপছে। আঁচলটাও বাতাসে উড়ছে।

আমি বলি, তোমাকে দেখে সুখী মনে হয়।

জানেন না আমার দুটি নাম।

জানি না তো।

আমার একটা নাম শিউলি। অন্য নাম মরিয়ম। আমাকে কোন্্ নামে ডাকবেন?

তুমি কোন্্ নাম চাও?

আমি? শিউলি মরিয়ম।

মেয়েটাকে দেখে আমার মা-র কথা মনে হয়। আমি বাড়ি আসব শুনলেই মা পাকের ঘরে ঢুকতেন। তাঁর আদরের ছেলের জন্য পাক করতে বসতেন। তাঁর আঙ্গুলে লেগে থাকত নানা মসলার গন্ধ, তাঁর চুলে লেগে থাকত ধনেপাতা আর তিসির গন্ধ, তাঁর ত্বকে লেগে থাকত ইউক্যালিপটাসের গন্ধ : পাকের ঘরের সামনে দুটি ইউক্যালিপটাস গাছ খাড়া আকাশের দিকে। তাঁর দুই হাতের তালুতে লেগে থাকত নানা মসলা চূর্ণ করার স্বাদ। আমার মা, হায়রে আমার মা, আমাকে এভাবে সুগন্ধে ভরে রাখতেন।

১২

পরে, আমি নামকরা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি, নীল নদে রাম-সেমের মূর্তি দেখতে গিয়েছি, ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান ও বিদ্যার নজির দেখেছি। বালি ত্বকের রং বদলে গেছে, মন্দিরের পাথর মনে হয় ফ্লেসের রং : রাম সেমের গা থেকে নিষ্কাশিত রক্ত, পাথর ফেটে রক্ত বার হচ্ছে।

১৩

আমার এখন তাই মনে হয়। নদী ফেটে, স্রোত ফেটে, দুই পাড়ের জলজ উদ্ভিদ ফেটে রক্ত বার হচ্ছে : চল্লিশ বছর আগেকার জবাই করা, গুলিতে ঝাঝড়া হওয়া মনুষ্য শরীর, রক্তে লাল হয়ে উঠেছে সকাল বেলার রোদ।

১৪

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বাম রাজনীতি করেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাম রাজনীতি করতে করতে ইংল্যান্ডে ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্কলারশিপ পেয়ে ইংল্যান্ডে চলে গিয়েছি। কিন্তু এখানকার হত্যা, নারী শিশু বৃদ্ধদের হত্যা আমি ভুলিনি। যদি কখনো সুযোগ পাই সময় পাই এই হত্যাকা-ের ইতিহাস আমি লিখবই। আমি এই অঞ্চলের বাসিন্দা। আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে এই মানুষগুলোর কাছে। সেজন্য আমার এখানে আসা।

১৫

মানুষ নিজের কাছে দায়বদ্ধ। শিল্পী বর্নাডের কথা আমি কখনো ভুলি না। যেদিন তিনি মারা যান, তার আগের দিন, একটা প্রদর্শনী কোথাও হচ্ছিল। তিনি ঘণ্টাদুয়েক ঘুরে ঘুরে, তাঁর ছেলেকে নিয়ে প্রদর্শনীতে হাজির হয়েছেন। কারণটা কি। তাঁর একটা কাজ : ফুল এবং ফুল, সোনালি রং দরকার। তাঁর হাত কাঁপছে, ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। ছেলে ব্রাশ ধরে আছে। বর্নাড জানতেন তাঁর সময় ফুরিয়ে এসেছে। তবু এই যাওয়া দরকার, সেকেন্ড পিগমন্ট না দিলে ছবি শেষ হতো না।

বর্নাডের কথা আমি ভেবেছি বহুদিন। কোনকিছু বাদ রাখতে নেই। মৃত্যুর আগে সব কাজ শেষ করে যেতে হয়। না হলে মৃত্যুর মধ্যে স্বাদ থাকে না। জীবন ফুরোবার আগে কার হাতের মধ্যে তুমি মরে যেতে চাও। সে জন্য আমার আসা।

১৬

এভাবেই চারপাশের গ্রামগুলো পুরনো স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। কখনো কখনো একটা আইডিয়া একটা গ্রাম হয়ে ওঠে। কখনো কখনো একটি গ্রাম একটা আইডিয়া হয়ে ওঠে। ইয়াহিয়া খান কিংবা টিক্কা খান কখনই মানুষের মাথার ভিতরের স্বপ্ন সরিয়ে দিতে পারে না। স্বপ্নগুলো হচ্ছে : একটা দীর্ঘ স্মৃতিসহ একটা নদী এবং তার চিরন্তন চলা। কবরে কেবল মানুষ থাকে না। মানুষ থাকে তার অতীতে, তার স্মৃতিতে, এখানে থাকা তার অধিকার। এই অধিকার থেকে তাকে কে উপড়ে ফেলে দেবে। ইয়াহিয়া খানরা পারে না, টিক্কা খানরা পারে না। এখানের প্রতিটি গ্রাম, এভাবেই, এক একটা আইডিয়া হয়ে ওঠে।

আমি আইডিয়াগুলোকে সালাম দিতে এসেছি।

১৭

শিউলি মরিয়ম।

বলেন।

তোমাকে এত খুশিখুশি লাগে।

লাগবে তো।

কেন বল তো।

আমার বয়স এখন তিরিশ। এতকিছু দেখেছি এতকিছু শিখেছি। আমি শিউলির দিকে মরিয়মের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি ভাবি যা কিছু ভালোবাসা থেকে তৈরি হয় তা-ই জীবন্ত। আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমার ইচ্ছা হয় শিউলি মরিয়মের মাথায় হাত রাখতে, ইচ্ছা হয় ওর মাথায় হাত রেখে আকাশ এবং মেঘ এবং গাছপালা এবং নদী দেখতে।

আমাকে খুশিখুশি কেন লাগে, বলেন তো।

বল তুমি।

এই এলাকায় এখন হিন্দু নাই মুসলমান নাই। গ্রামগুলো এখন না-হিন্দু না-মুসলমান।

বুঝলাম না।

পাকিস্তানীরা হিন্দু মারতে গিয়ে মুসলমান মারতে গিয়ে সবাইকে না-হিন্দু না-মুসলমান করে দিয়েছে। সবাই এখন মানুষের কথা কয়।

১৮

আমি একটা গল্প শুনতে এসেছিলাম। সেই গল্পের মাঝখানটা কারা যেন মুছে দিয়েছে। একটা বিষণœতার বদলে একটা স্বাভাবিকতা আমাকে ঘিরে ধরেছে। গল্পটা আমাকে বদলে দিয়েছে।

আমিও তো এই গ্রামগুলোর মানুষদের মতো না-হিন্দু না-মুসলমান। মানুষ মানুষকে দয়া করে। মানুষ মানুষকে হত্যা করে না। হত্যা করা তো স্বাভাবিক মৃত্যু না।

১৯

শিউলি মরিয়ম ফের বলে, কখনো কখনো বলতে বলতে থেমে যায়। আমি সেই ফাঁকে শ্রাবণ মেঘের আকাশ দেখি। গঞ্জের দোকানগুলো খোলা শুরু করেছে। নদীর পানিতে ঢেউ। ইচ্ছা করে গঞ্জে একটা ঘর তুলি। ব্যবসাপাতি করার জন্য না। নদীর ছলছল পানি দেখার জন্য।

মরিয়ম শিউলি বলে, এই নদী নিয়ে সব ঘটনা। তিরিশ বছর আগের ঘটনা। বলতে গেলে চোখে পানি আসে। তখনকার দিনে, এই অঞ্চল, পাকিস্তানী সোলজারদের দখলে। এখান থেকে ইন্ডিয়ার বর্ডার মাত্র তিন মাইল। যে রাত্রের ঘটনা, অমাবস্যার রাত। দুশো লোক জড়ো হয়েছে। চড়নদার বেশিরভাগ হিন্দু, কিছু মুসলমান আছে। মাঝি বেচারা মুসলমান। মুসলমান মাঝিরা চড়নদারদের বর্ডার পার করে দেবে। দুশো মানুষ পুরুষ-মহিলা যুবক-যুবতী শিশু। শব্দ না করে তারা নৌকায় উঠে বসেছে। বদর বদর করে মাঝিরা নৌকা ছেড়েছে। তখন পাকিস্তানী সোলজাররা নদীর দুইপাড় ঘেরাও করে মেশিনগানের গুলি ছুড়তে শুরু করে। সেই সময়, এখানকার মানুষজন, কিছু ইংরেজী শব্দ রপ্ত করেছে : সোলজার মেশিনগান হল্ট, এমন সব শব্দ। তার পরের ঘটনা বড় হয়ে মার কাছ থেকে শোনা। মা বাবা দুইজনই গুলি খেয়ে মারা যায়। আমি দুধের শিশু, কাঁদছিলাম, মা-র দুধ মুখে নিয়ে। সোলজাররা আধাঘণ্টা গুলি চালিয়ে বন্দরে ফিরে যায়। মা বাবাকে নিয়ে নদীতে নেমে আমাকে তুলে নেয় মার বুক থেকে। যারা বেঁচে গেছে তারা অবাক নয়নে দেখে। মা কোনদিকে না চেয়ে, বাবাকে নিয়ে, আমাকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে আসে। সেই বাড়ি আমার বাড়ি, মা-বাবা আমার মা-বাবা, আমি মার দুধ খেয়ে মরিয়ম শিউলি। মা-বাবা আমাকে মুসলমান করেননি হিন্দু করেননি। আমি না-হিন্দু না-মুসলমান। সতেরো বছর বয়সে আমার বিবাহ হয় সুকুমারের সঙ্গে। সুকুমারকে সব ঘটনা খুলে বলেছেন মা-বাবা। সুকুমার এখানকার স্কুলের শিক্ষক। মা-বাবা তাদের বিষয় সম্পত্তি আমার নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমার কাকীমা খবর পেয়ে, ইন্ডিয়া থেকে আমাকে ফেরত নিতে আসেন। আমি যাইনি। আমার হিন্দু হওয়া লাগবে না মুসলমান হওয়া লাগবে না। কেনই বা লাগবে। আমি চলে গেলে আমার-মা-বাবাকে কে দেখবে। সুকুমারকে কে দেখবে। বিষয় সম্পত্তি কে দেখবে। এই তল্লাটে আমার মতো না-হিন্দু না-মুসলমান বহু আছে। পাকিস্তানীরা হিন্দু মেরে মেরে মুসলমান করেছে, মুসলমান মেরে মেরে মানুষ অপবিত্র করেছে। হিন্দুদের ঠাকুর দেবতা আমাদের বাঁচাতে পারেনি, মুসলমানদের আল্লা খোদা আমাদের বাঁচাতে পারেনি। আমরা বেশ আছি।

২০

মরিয়ম শিউলি হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলে। আমার মনে হয় এই হাসি এই কাঁদন ভালোবাসা। এই শব্দটা একটা বিশাল প্রশ্ন। কিংবা এই শব্দটা নরম ও নমিত। এই শব্দটার মতো আর কোন শব্দ মানুষ তৈরি করতে পারেনি। না হাসি না কাঁদন।

আমার মনে হয় আমরা সবাই একটা পরিবার। মনুষ্য পরিবার। আমি মরিয়মকে শিউলি বলে ডাকি। শিউলিকে মরিয়ম বলে ডাকি। আমি সামনের দিনগুলোতে, হে আল্লা হে ঈশ্বর, এই শক্তি নিয়ে এই ভালোবাসা নিয়ে যেন বেঁচে থাকতে পারি।

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

১৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: