আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়মোচনে করণীয়

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মফিদুল হক এবং ড. আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন

চার দশককালেরও পর, দেশজুড়ে বিজয়ের বার্ষিকী উদযাপনকালে, মুক্তিযুদ্ধের শৌর্য-বীর্যের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসছে নিষ্ঠুর পীড়ন ও নির্যাতন-ভোগের অনেক কাহিনী। এই সুবাদে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে কম-জানা এবং কম-উপলব্ধিকৃত পরম বেদনাময় অধ্যায়ের পরিচয় জাতি লাভ করছে। যুদ্ধকালে যৌন-সহিংসতার শিকার বিপুলসংখ্যক নারীর কতক প্রতিনিধি ইতিমধ্যে তাদের নীরবতা-ভঙ্গ করে বিভিন্নভাবে কথা বলতে শুরু করেছেন এবং টুকরো টুকরো এইসব স্মৃতিভাষ্য অন্য নারীদেরও আলোড়িত করেছে এবং ক্রমে আরও অনেক নারী এগিয়ে এসে বিভিন্নভাবে তাঁদের জীবনকথা মেলে ধরছেন। এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছে খুব বেশি আগে নয়, তবে বিগত এক দশকে তা একটি সমষ্টি-স্মৃতি ও সমষ্টি-কষ্টভোগের অবয়ব ধারণ করেছে। এরই ফলে আমরা দেখি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতীকীভাবে বীরাঙ্গনা মহিয়সী রমা চৌধুরীকে তাঁর দপ্তরে বুকে টেনে নিলেন, সংসদ সদস্য কেয়া চৌধুরীর উদ্যোগে তাঁর অঞ্চলের ছয়জন বীরাঙ্গনা নারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। সামাজিকভাবেও লোকচক্ষুর অনেকটা আড়ালে কেউ কেউ কাজ করছেন। এইসব ঘটনার পূর্বাপর ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে ছিন্ন ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস। স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর সরকারের সংবেদনশীল পদক্ষেপসমূহ ছিল সংঘাত-পরবর্তী সমাজে যৌনপীড়নে জীবনের স্থিতি হারানো নারীদের পুনর্বাসনে অভূতপূর্ব ব্যবস্থা। ছিল ১৯৭৫-পরবর্তীকালে বীরাঙ্গনা-নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত সকল সহায়ক কার্যক্রম বন্ধ করে তাঁদের রাতারাতি আশ্রয়-চ্যুত করার নিষ্ঠুর ঘটনা। এরপরের দীর্ঘ-অমাবর্ষে এই নারীরা কী ভাবে জীবনপাত করছেন সেই হদিস রাষ্ট্র ও সমাজ বিশেষ না করলেও জীবন তো তাদের কাটাতে হয়েছে। সমাজের পক্ষ থেকে কোথাও হয়তো তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, একান্ত ব্যতিক্রমী ও ক্ষুদ্র হলেও সেসব ছিল তাৎপর্যে বিশাল। এমনিভাবে কোন কোন গবেষণা-প্রতিষ্ঠান অথবা গবেষক আন্তর্তাগিদ থেকে এক্ষেত্রে কাজ করেছেন, আবার বীরাঙ্গনাদের মধ্যে ছিলেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর মতো ব্যক্তিত্ব, যিনি সাহসের সঙ্গে সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পেরেছেন আপন দুঃখভোগের কথা, যেন নির্যাতিত সকল নারীর অব্যক্ত বেদনা তিনি আপন সরবতার মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করলেন।

এভাবে ধীরে ধীরে হলেও অবস্থার পরিবর্তন লক্ষিত হচ্ছে। ১৯৭৫-এর নিষ্ঠুর পট-পরিবর্তনের পর আজ অবধি বীরাঙ্গনা নারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোন সহায়ক পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। কিন্তু এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে সেটা এখন নতুনভাবে স্বীকৃতি অর্জন করছে। প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে মিলেছে সংবেদনশীলতা ও স্বীকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক একাত্তরে যৌন-সহিংসতার শিকার নারীদের ‘বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের কথা ঘোষণা করেছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নগরবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা-জ্ঞাপনের জন্য যেসব বিলবোর্ড টাঙ্গিয়েছে সড়কসন্ধিতে সেখানে জ্বলজ্বলে হরফে সম্মান জানানো হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা নারীদের। সব মিলিয়ে এ কথা বলা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধে যৌন-সহিংসতার শিকার নারীদের প্রতি জাতির কর্তব্যপালন আজ করণীয় হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে সুচিন্তিত ও সংবেদনশীল নীতি প্রণয়ন করে যথাযথভাবে অগ্রসর হওয়া এখন একান্ত জরুরী। সেই বিবেচনা থেকে বর্তমান রচনার সূত্রপাত।

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে গৃহীত পদক্ষেপ

স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনে বেশ কিছূ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্যাতিত মহিলাদের জন্য বিচারপতি কে এম সোবহানের সভাপতিত্বে ‘বাংলাদেশ দুস্থ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন করা হয়। এই বোর্ডের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সুফিয়া কামাল, বদরুন্নেসা আহমদ, নীলিমা ইব্রাহিম। এছাড়াও ছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্য বাসন্তী গুহঠাকুরতা, মিসেস ফজলে রাব্বী, মিসেস মুনীর চৌধুরী প্রমুখ। সরকারের শ্রম ও সমাজকল্যাণ পরিদফতরের কল্যাণে এ বোর্ড বীরাঙ্গনাদের সহায়তায় কাজ শুরু করে। বোর্ডের প্রথম কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারী ও যুদ্ধশিশুর সঠিক তথ্য আহরণের জন্য জরিপ কার্যক্রম চালানো, নির্যাতিত নারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসা সেবার আওতায় নিয়ে আসা এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। মাদার টেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটির সিস্টার মার্গারেট মেরি, আইপিপিএফ-এর ডা. জিওফ্রে ডেভিস ও ওডার্ট ফন শুলজ এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ উদ্দেশ্যে সারা দেশে ২২টি সেবা সদন প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে এবং সেবা সদনে বীরাঙ্গনাদের সেবা দেয়া হয়। বিভিন্ন সূত্রে সেবা সদনে ২৩ হাজার নারীর গর্ভপাত ঘটানোর খবর প্রকাশিত হয়। পুনর্বাসন বোর্ড একই সঙ্গে নির্যাতিত অসহায় নারীদের জন্য বিভিন্ন পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করে। বঙ্গবন্ধু এ সকল নারীর কার্যকর পুনর্বাসনের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মতো পরিকল্পনা ও কর্মসূচী গ্রহণের নির্দেশ দেন। বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়(১৯৭৩-১৯৭৮) মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ছিন্নমূল নারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ক্রমশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ডের দায়িত্ব ও কাজের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭৪ সালে বোর্ডকে ‘নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এ রূপান্তর করা হয়। এ ফাউন্ডেশন নারী উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে বীরাঙ্গনাদের জন্য চিকিৎসাসেবা এবং তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তিপ্রথা চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নারীদের জন্য চাকরিতে ১০% কোটা চালু করে বীরাঙ্গনাদের যোগ্যতা-অনুযায়ী চাকরি দেয়া হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বেসরকারী উদ্যোগেও পুনর্বাসন প্রচেষ্টা নেয়া হয়।

যুদ্ধশিশু অর্থাৎ বীরাঙ্গনাদের গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানদের জন্য বঙ্গবন্ধু আন্তঃদেশীয় দত্তকের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর ব্যক্তিগত অনুরোধে জেনেভাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সোস্যাল সার্ভিস (আইএসএস)-এর সঙ্গে নারী পুনর্বাসন বোর্ড এবং বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি যৌথভাবে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ এ্যাবানডান্ড চিলড্রেন (স্পেশাল প্রভিশন) এ্যাক্ট ১৯৭২’ প্রণয়ন করে যুদ্ধ-শিশুদের কানাডা, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি, পুনর্বাসন কার্যক্রমের যৌক্তিকতা

বীরাঙ্গনাদের অধিকাংশের এখন ষাটোর্ধ্ব বয়স। জরা, বার্ধক্য, অভাব, নিরাপত্তাহীনতা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারী ভাতার ব্যবস্থা থাকলেও নির্যাতিত এই নারীদের জন্য রাষ্ট্র কোন সহযোগিতা প্রদান করছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার বয়স্ক ভাতাসহ অন্যান্য ভাতার ব্যবস্থা করলেও জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকারকারী এই নারীদের জন্য কোন কার্যক্রম নেই। বর্তমানে বীরাঙ্গনা নারীদের প্রতি রাষ্ট্রের কর্তব্য পালন তথা সহমর্মী সমর্থনদানের ব্যবস্থা করার বিষয়টি আবার সামনে চলে এসেছে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বীরাঙ্গনাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদানের জন্য গৃহীতব্য পদক্ষেপসমূহ তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং তা দেশের ভেতরে ও বাইরে ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুকূল আবহ তৈরি করতে সহায়ক হবে। এখানে উল্লেখ্য, সংঘাত-পরবর্তী বাস্তবতায় ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের সহায়তাদানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিম-লে ক্রমেই গুরুত্ব অর্জন করছে এবং এ ক্ষেত্রে গৃহীত বিভিন্ন ব্যবস্থা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে আমাদের এগোতে হবে। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর প্রতি সহায়তাদানের পরিকল্পনায় যে দিকগুলো স্মরণ রাখা দরকার তা হলো : যুদ্ধকালে যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর জন্য প্রয়োজন জবপড়মহরঃরড়হ, জবঢ়ধৎধঃরড়হ এবং জবযধনরষরঃধঃরড়হ অর্থাৎ অন্যায় ও নির্মমভাবে নারীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার স্বীকৃতি দিতে হবে, সেই ভিত্তিতে তার ক্ষত উপশমের পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সমাজে ও পরিবারে নারীর মর্যাদাবান প্রতিষ্ঠা ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর স্বার্থ ও প্রয়োজনের নিরিখে সর্বদা বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

কার্যক্রম পরিচালনায় প্রস্তাবনা

মুক্তিযুদ্ধকালে যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের প্রতি সহায়তাদান প্রকল্পের সূচনায় বাস্তব পরিস্থিতির খতিয়ান নেয়া দরকার। ১৯৭১ সালে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর সংখ্যা ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ বলে অনুমিত হয়। যুদ্ধ পরবর্তী চার দশকেরও বেশি সময় পার হওয়াতে এই নারীদের অধিকাংশের কাছে পৌঁছানো বর্তমানে সম্ভবপর নয়। যুদ্ধ পরবর্তীকালে এই নারীদের যেভাবে জীবন-সংগ্রাম পরিচালনা করতে হয়েছে এবং আমাদের দেশের নারীর গড় আয়ুর যে প্রচলিত হার ছিল তাতে অনুমান করা যায় ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের অনেকেই আজ জীবিত নেই। অনেকে সমাজে নানাভাবে মিশে গিয়েছেন, তারা পুরনো বেদনা প্রকাশ্য করতে হয়তো আগ্রহী হবেন না। উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বীরাঙ্গনাদের বড় অংশ আর এই সহায়তা কার্যক্রমে আসতে চাইবেন না। ফলে পুনর্বাসন ইচ্ছুক বীরাঙ্গনাদের সংখ্যা একাত্তরে নির্যাতনের শিকার নারীর তুলনায় অনেক কম হবে। তা সত্ত্বেও নির্যাতিত নারীদের কাছে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সময় ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পরিচিতি, সামাজিক অবস্থান, তাদের অতীত নির্যাতন-ভোগের ঘটনার গোপনীয়তা ইত্যাদির সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। সেজন্য নারীদের দিক থেকে তথ্য-সম্বলিত আবেদনপত্র জমা দেয়ার প্রক্রিয়ার বিপরীতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁদের কাছে পৌঁছবার মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি গুরুত্ব বহন করে।

সংবেদনশীলভাবে দেশব্যাপী তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশেষ সেল গঠন এবং তথ্য আহরণ ও যাচাই-বাছাই কাজ শুরু হলে ক্রমে আরও বীরাঙ্গনার সন্ধান পাওয়া যাবে। বীরাঙ্গনাদের প্রতি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিম্নোক্তভাবে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে :

বীরাঙ্গনাদের নিয়ে বিগত চার দশক কাল যারা এবং যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে তাদের কাছে প্রাপ্য বীরাঙ্গনাদের নাম-পরিচয় সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা যেতে পারে।

বীরাঙ্গনাদের মধ্যে যাঁরা তাঁদের দুঃখভোগ ও জীবন-সংগ্রামের বিবরণী প্রদানে আগ্রহী হবেন তাঁদের প্রদত্ত সেইসব তথ্য যথাযথভাবে যাচাই ও সংগ্রহের ব্যবস্থা করে তালিকার সম্প্রসারণ ঘটানো। যাঁরা পরিচয় গোপন রেখে তাঁদের নির্যাতন-ভোগের কথা বলতে চান তা লিপিবদ্ধ করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া।

প্রাথমিক পর্যায়ের তালিকা প্রস্তুতির পর পর বীরাঙ্গনাদের সহায়তা প্রকল্প শুরু করা এবং অর্জিত অভিজ্ঞতার নিরিখে দেশব্যাপী বীরাঙ্গনাদের সহায়তাদানের প্রকল্প প্রণয়ন করা।

এই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সরকারী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন এবং কমিটির সঙ্গে একটি গবেষণা দল প্রতিষ্ঠা করা।

গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত, ঘটনাধারার বিবরণ প্রকাশ করা। একাত্তরের যৌন নির্যাতনের পেছনে জড়িত ব্যক্তি ও সংগঠনের স্বরূপ উদঘাটন, মানবতাবিরোধী এই অপরাধের আনুষ্ঠানিক ও সামাজিক বিচারের পাশাপাশি সামাজিকভাবে তথ্যসংগ্রহ ও বিচার তথা ট্রানজিশনাল জাস্টিস প্রক্রিয়া জোরদার করা।

যুদ্ধে নারীর উপর নির্যাতন-রোধে গৃহীত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ততা গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ ও ব্যাপক নারী নির্যাতনের বাস্তবতা আন্তর্জাতিকভাবে মেলে ধরা।

স্বীকৃতি ও সহায়তাদান কর্মসূচী

বীরাঙ্গনাদের শনাক্তকরণের পাশাপাশি চলবে তাঁদের স্বীকৃতি ও সহায়তা-প্রদানের কার্যক্রম। যেহেতু জীবিত বীরাঙ্গনাদের সবাই এখন প্রবীণা, তাঁরা জীবনের দীর্ঘ সময় পার হয়ে এসেছেন কোনোরকম স্বীকৃতি ও সহায়তা ছাড়া তাই এই সহায়তা-প্রদানে আর কালক্ষেপণ বা বিলম্ব কারো কাম্য নয়। চার দশক পর বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সূচিত জাতির জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেই কাজ পুনরায় বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে, যা জরুরী ও জোরদার উদ্যোগ হিসেবে এগিয়ে নেয়া দরকার। সময়ের এই দীর্ঘ ব্যবধানে বীরাঙ্গনাদের অনেকে আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে গেছেন, অবশিষ্টরা বেশিরভাগই অসুস্থ, জীবনযুদ্ধে পরিশ্রান্ত এবং তাঁদের সবার সন্ধান পাওয়াও এক দুরূহ কাজ। এই পরিপ্রেক্ষিতে বীরাঙ্গনাদের জন্য রাষ্ট্রের কর্তব্য বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করেছে। এই বিবেচনায় বীরাঙ্গনাদের নিম্নোক্ত সহায়তাদানের প্রস্তাব করা হচ্ছে :

বীরাঙ্গনাদের সনদ ও এককালীন সহায়তা হিসেবে দশ লক্ষ টাকা প্রদান, অথবা উক্ত অর্থে স্বীয় প্রয়োজন অনুয়ায়ী তাঁদের পুনর্বাসন কার্যক্রম নেয়া।

মাসিক $ ১০,০০০.০০ (দশ হাজার টাকা) ভাতা প্রদান।

বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাদানের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারী হাসপাতালে পরিপূর্ণ চিকিৎসা লাভের অধিকার প্রদান।

বীরাঙ্গনাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ট্রমা বিবেচনায় চঞঝউ-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।

যে সব বীরাঙ্গনা তাঁদের দুঃখভোগ ও সংগ্রামের বিবরণী জনসমক্ষে মেলে ধরতে আগ্রহী তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রচারের ব্যবস্থা করা।

কোন বীরাঙ্গনা তাঁর আত্ম-পরিচয় গোপন রেখে কথা ব্যক্ত করতে সম্মত হলে তা গোপনীয়তার সুরক্ষাসহ সংগ্রহ, ধারণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। তাঁদের স্বীকৃতি ও সহায়তাদানের জন্য উপযুক্ত বিধি-বিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

বীরাঙ্গনাদের প্রয়াণের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ সম্মান জ্ঞাপন।

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

১৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: