রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সংস্কৃতির অপমৃত্যু, রাষ্ট্র রক্ষা হবে কি?

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • স্বদেশ রায়

মুদ্রার একটি পিঠ যদি দেখা হয় তাহলে ২০১৪-এর বিজয় দিবসে দেশবাসী আনন্দিত হতে পারে, নিজেদের বিজয়ী মনে করতে পারে। ২০১৪-এর বিজয় দিবসে জাতির অন্তত এটুকু প্রাপ্তি আছে যে, একজন যুদ্ধাপরাধীকে জাতি স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে ফাঁসি দিতে পেরেছে। যুদ্ধাপরাধীদের গুরুকে জেলখানায় মরতে হয়েছে। আরও কয়েকটি নরকের কীট যুদ্ধাপরাধী জেলখানায় মরেছে।

কিন্তু এ কাজগুলো যে খুব বিজয়ী বেশে এ জাতি করতে পেরেছে এমনটি যদি মনে করা হয় তাহলে মনের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে। যুদ্ধাপরাধীদের গুরুর জানাজা হয়েছে দেশের প্রধান মসজিদে। সেখানে বাঁধনের একপাটি জুতো ছাড়া কোন প্রতিবাদ ছিল না। সরকারের শুধু নয়, সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে নাগরিক মধ্যবিত্তের একটা আপোস ছিল। কেন এ আপোস এ ভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরেছে? এর উৎস কোথায়?

একটি জাতীয় জীবনে ও সমাজ জীবনের মূল চরিত্র যখন আপোস হয়, জাতির বড় অংশ যখন বীরত্ব হারিয়ে ফেলে তখন এর কারণগুলো খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। নাজমুল করিম, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রঙ্গলাল সেন এমন সমাজ ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা হয়ত এর কিছুটা কারণ খুঁজে বের করতে পারতেন। খুব সাধারণের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। কারণ, আপোসগুলো ঘটেছে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। সবগুলো সচেতন পথে ও স্বার্থের তাগিদে তাও নয়। অনেকগুলো ঘটছে আপোসের চাকায় পড়ে, যেমন চার্লি চ্যাপলিনের ছায়াছবিতে মর্ডান টেকনোলজির চাকার ভেতর দিয়ে মানুষের প্রতীক হয়ে অভিনেতা চ্যাপলিন নিজে চলে যান। বাস্তবে সমাজে আপোসের চাকাটা এত জোরে ঘুরছে যে ওই চাকার ভেতর কে কখন পড়ে যাচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। ছোট একটা উদাহরণ, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তাঁর বক্তব্য শেষে বলেন, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, জামায়াত নেতারাও তাদের বক্তব্য শেষে বলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। পার্থক্য কোথায় থাকল, কমিউনিস্ট পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীতে? জিন্দাবাদ শব্দের অর্থের প্রতি কোন ঘৃণা কারও নেই, এমনকি এক সময়ে এই বাংলার বিপ্লবীরা ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের পরে আর কী আমরা এই ভূখ-ে জিন্দাবাদ বলতে পারি? যে জিন্দাবাদ বলে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে, যে জিন্দাবাদ বলে আমাদের মাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। আমি আমার সেই শিক্ষক পিতার কথা স্মরণ করে, আমি আমার সেই বীরাঙ্গনা মাকে মনে করে তাদের সন্তান হিসেবে কী এই ভূখ-ে আর কখনও জিন্দাবাদ বলতে পারি? অথচ মুক্তিযুদ্ধের একটি পর্যায়ে, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণ সমর্থন করার পরে কমিউনিস্ট পার্টি তো সর্বাত্মকভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তারা কিভাবে জিন্দাবাদ বলে? তারা যখন জিন্দাবাদ বলে তখন তাদের ধমনীর রক্ত কি ধাক্কা দেয় না, তাদের শরীর কি কেঁপে ওঠে না অন্তত এই ভেবে আমি আমার শহীদ শিক্ষক পিতা ও বীরাঙ্গনা মাতাকে অসম্মান করছি। তাদের ধমনীর রক্ত বাধা দিলে তারা নিশ্চয়ই এ কাজ করত না। বরং তাদের রক্ত তাদের বিবেক সমাজ ও রাষ্ট্রের আপোসের চাকায় পড়ে এতই শীতল হয়ে গেছে যে, তাদের বোধ তাদেরকে আঘাতও করে নাÑ কী কাজ তারা করছে?

এখন এত বড় আপোস কেন এই সমাজকে গিলে ফেলল? প্রথমেই বলেছি, প্রয়াত সমাজ বিজ্ঞানী নাজমুল করিম, রঙ্গলাল সেন বা জীবিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এদের মাপের মানুষ গবেষণা করলে জাতিকে বলতে পারতেন, কেন এমনটি ঘটল? তবে সাধারণ বিশ্লেষণে এই আপোসের কারণের একটি উপাদান বের করা যায়। এই উপাদানটি সংস্কৃতির অপমৃত্যু ও সমাজ তার নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলা। বাঙালী জাতি ও স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখ-ের আকাক্সক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালী সংস্কৃতির সঞ্জীবনী ধারায়। বাঙালী জাতি হিসেবে সব সময়ই সহজিয়া ছিল, কোন তথাকথিত রেজিমেন্টাল ধর্ম কখনই বাঙালীর মানস সংস্কৃতিকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। এই সহজিয়া বাঙালী মানসে বিংশ শতাব্দীর বাঙালী রেনেসাঁর সেরা উপাদান রবীন্দ্র- নজরুলে পুষ্ট হয়ে ষাটের দশকে বাঙালী সংস্কৃতির মুকুলগুলো একে একে ফুটতে থাকে এ ভূখ-ে। তার সুবাসও ছড়িয়ে পড়ে। সেই সুবাসে উদ্বেলিত হয়ে বাঙালী জাতির জীবনে তখন জাতি চিন্তা আসে, আসে রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা। কিন্তু সত্য হলো এই মুকুলগুলোকে ফোটার পরিবেশ কখনই দেয়া হয়নি।

এই মুকুলগুলো ফুটে একটি আনন্দময় বাগান হওয়ার কথা ছিল স্বাধীনতার পরে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছরে এসে আজ এ সত্য স্বীকার করতে হয়, বিজয়ের মাত্র কিছুদিনের মধ্যে বাঙালী সংস্কৃতির বাগান সৃষ্টি না হয়ে যাতে তা আগাছায় ঢেকে যায় তার সব চেষ্টাই হয়। কেউ করে সচেতনভাবে কেউ করে অবচেতনভাবে। শুধু যদি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেখা হয় তাহলে দেখা যায়, চৈনিক কমিউনিস্টরা মওলানা ভাসানীকে সামনে রেখে বাঙালী সংস্কৃতি ধ্বংসের যাবতীয় কাজ করতে থাকে সমাজতন্ত্রের নামে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় রাজাকার ও আলবদরা। অন্যদিকে জাসদও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে ষাটের দশকে তৈরি হওয়া এদেশের সেরা সন্তানদের একাংশকে বিভ্রান্ত করে পশ্চিমবঙ্গের নকশালদের আদলে বাঙালী সংস্কৃতি ধ্বংস করে চলে। তাদের সঙ্গেও যোগ দেয় রাজাকারÑআলবদররা। অন্যদিকে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, স্বাধীনতার পরে যারা রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার দায়িত্ব পেয়েছিল তারা রাষ্ট্রটাকে কিছুটা বুঝেছিল, রাষ্ট্রের যাবতীয় কাঠামো বা যেটুকু কাঠামো হয়েছে তা ওই সরকারের হাত দিয়ে। কিন্তু সত্য হলো, তারা সমাজ বোঝেনি। অথচ রাষ্ট্র সৃষ্টির পরে সব থেকে বড় দায়িত্ব সমাজ গড়া। রাষ্ট্র বিপ্লবের পরে যারা সমাজ গড়তে পেরেছে তারা টিকে আছে। যারা গড়তে পারেনি তারা ভেঙ্গে পড়েছে না হয় বদলে যেতে বাধ্য হয়েছে। সমাজ একদিনে গড়া যায় না কিন্তু সমাজ গড়ে তোলার স্রোতকে নদীর প্রবহমান ধারায় পরিণত করতে হয়। যা করতে পেরেছে নিজ দেশে আমেরিকা। যদিও আজও সেখানে ফার্গুসন ঘটনা ঘটছে তারপরেও তারা ধীরে ধীরে একটি ডাইভারসি ফরেস্টের মতো সমাজ তৈরি করে চলেছে। জাত-পাতসহ নানান কুসংস্কারে বহুধা বিভক্ত ভারতীয় সমাজকেও প-িত জওয়াহেরলাল নেহেরু এই ডাইভারসি ফরেস্ট তৈরির কাজটি শুরু করেছিলেন। বলা যায় আমেরিকার ফাদার ফিগারদের পরে একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক জওয়াহেরলাল নেহেরু যিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী। এমনকি ভারতীয় জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীও কিন্তু সমাজ বিজ্ঞানী নন, বরং তিনি বেশি ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে তাই সমাজ ভাবনা থেকে যায় উপেক্ষিত।

সমাজ ভাবনা উপেক্ষিত হলেই সংস্কৃতি বিপাকে পড়ে। তাই স্বাধীনতার পরেই বাঙালী সংস্কৃতি বিপাকে পড়ার ধারাটি শুরু হয় এ সত্য আজ স্বীকার করতে হবে। এর পরে বাঙালী সংস্কৃতির ওপর খড়গ নেমে আসে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে। বাংলাদেশের দুই সামরিক শাসক জিয়া ও এরশাদ মূলত পাকিস্তানের প্রতিনিধি। পাকিস্তানও যেমন গোটা সময়টা বাঙালী সংস্কৃতির ওপর একের পর এক আঘাত করে সংস্কৃতিকে ধ্বংসের চেষ্টা করেছিল, জিয়া ও এরশাদ পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই-এর বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হিসেবে সেই একই কাজ করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়া বঙ্গবন্ধুর রক্ত বাঙালী সংস্কৃতির জন্য দেশের মানুষের একটি অংশের ভেতর মৃত সঞ্জীবনী সুরার মতো কাজ করে। ষাটের দশকের বাঙালী সংস্কৃতির সেই নিজস্ব শক্তি যেন বঙ্গবন্ধুর রক্তে পুষ্ট হয়ে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে ধীরে ধীরে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে প্রবাহিত না হলেও অন্তত উন্মত্ত পদ্মা দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। কিন্তু বাঙালী জাতির জন্যে আরেক ৪৬ সাল নেমে আসে ১৯৯১তে। ১৯৪৬ সালে এই বাঙালী যেমন পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়ে নিজস্ব প্রবাহমান ধারাকে শুধু মরা ব্রহ্মপুত্র তৈরিতে সহায়তা করেনি, ১৯৭১ সালের ৩০ লাখ মানুষের জীবন দেয়া ও সাড়ে ছয় লাখ মা-বোনের ইজ্জত হারানোর বীজটিও সেদিন বোনা হয়। এছাড়া ১৯৪৬-এর দাঙ্গা, কোটি মানুষ গৃহ হারা, মাতৃভূমি হারা এসব তো রয়েছে। ইতিহাসকে এ দেনা অনন্তকাল ধরে শোধ করতে হবে। ১৯৯১ সালও বাঙালী জাতির জন্যে আরেক ১৯৪৬। ১৯৪৬ সালে এই জাতি যেমন ভুল ভোট দিয়েছিল ১৯৯১ সালেও এই জাতি সেই একই কাজ করে। ১৯৯১ সালে ভোটের মাধ্যমে জামায়াত ও বিএনপি জেতার ভেতর দিয়ে ৪৭ এর পরে বাঙালী সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসার সব থেকে বড় সুযোগটি সৃষ্টি হয়। জাতি হিসেবে বাঙালী চরিত্রে এই অস্থিরমনা বা এক অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। এই জাতির ইতিহাসে দেখা যায়, এ জাতির উত্থান পতনে জাতীয় চরিত্রের এ বৈপরীত্য বার বার কাজ করেছে। আর শুধু যে জাতির সাধারণ শ্রেণী এর জন্যে দায়ী তা নয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারাও। বিংশ শতাব্দীতে বাঙালীই প্রথম জ্ঞানী নেতা উপহার দিয়েছিল এই ভারত উপমহাদেশকে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ধারা ক্ষীণ হয়ে যায়। তাই ১৯৪৬ এ শুধু মুসলিম লীগ নেতা নয় সব দলের নেতারাও ভুল করেন। সব থেকে বড় দুর্ভাগ্য শেরে বাংলাও তখন মুসলিম লীগ নেতা। অন্যদিকে কংগ্রেসে শরৎ বোসের মতো নেতারা তখন মূল স্রোতধারার বাইরে ছিটকে পড়েছেন। বিধান রায়দের মতো অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা তখন ধীরে ধীরে নেতা হচ্ছেন।

১৯৯১ সালে বাঙালী জাতির জন্যে আরেক ১৯৪৬ সৃষ্টির জন্যেও কিন্তু সাধারণ শ্রেণীর পাশাপাশি নেতারাও দায়ী। কারণ বাঙালী সংস্কৃতির রসে পুষ্ট আওয়ামী লীগ নেতারা বিন্দুমাত্র উপলব্ধি করতে পারেননি, দুই পাকিস্তানী প্রতিনিধির সামরিক শাসনে বাংলাদেশের সমাজের অন্তরে ক্যান্সার কত বড় আকার ধারণ করেছে। কারণ রাজনীতি ও সমাজনীতির এই মিলিত রূপের ফল চিন্তা বা উপলব্ধি করার মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন আওয়ামী লীগে ছিল না। অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টি যারা কোনদিন এদেশের সমাজের অন্তরে ঢুকতে পারেনি তাদেরও নেতৃত্ব চলে যায় একেবারে নিম্নমানের নেতাদের হাতে। যারা আওয়ামী লীগকে প্রভাবিত করে পাকিস্তানের প্রতিনিধি এরশাদের পতনের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে অনেকখানি এক কাতারে নিয়ে এসে তথাকথিত পাকিস্তানী সংস্কৃতি ও বাঙালী সংস্কৃতির পার্থক্য অনেকটা ধোঁয়াশা করে তোলে জাতির কাছে। অন্যদিকে আবদুর রাজ্জাক তথাকথিত বাকশাল সৃষ্টি করে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়া বঙ্গবন্ধুৃর রক্তের শক্তিতে যে সোনার ছেলেরা এদেশে তৈরি হয়েছিল তাদেরকে তিনি ততদিনে হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দিয়েছেন। তাই ১৯৯১ তে বাংলা ভূখ-ে আরেকটি ৪৬ সৃষ্টিতে আবদুর রাজ্জাকের ভূমিকাও কম নয়। ১৯৪৬-এর পরে ১৯৪৭ আসে বাঙালী জাতির জীবনে শকুনের ডানায় করে। ১৯৯১-এর পরে বাঙালীর রাষ্ট্রীয় জীবনে ১৯৪৭ আসেনি কিন্তু বাঙালী সংস্কৃতির ওপরে কী ভয়াবহভাবে শকুন নেমেছে তা এখনও আমরা সঠিক উপলব্ধি করতে পারিনি। তাই স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে যখন বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে তখন বাস্তবে উৎসাহিত হওয়ার খুব বেশি কিছু নেই। কারণ বাঙালীর প্রাণ যে বাঙালী সংস্কৃতি তাকে ধীরে ধীরে অক্টোপাসের মতো আটকে ধরে হত্যা করছে বাঙালী সংস্কৃতিবিরোধী শক্তি। অর্থ দিয়ে, লোভ দিয়ে, আপোসকে কাজে লাগিয়ে, তথাকথিত ধর্মের মোড়ক দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে বাঙালী সংস্কৃতিকে। আর এ কাজে সকলে সচেতন ও অবচেতনভাবে জড়িত। যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছে তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকার শর্টকাট পথ হিসেবে তথাকথিত ধর্মের নামে যারা বাঙালী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাদেরকে তোষণ করছে। অর্থাৎ তারাও হীরক রাজার মতো নিজ হাতে নিজের মূর্তি ভাঙ্গার জন্যে দড়ি ধরে টান দিচ্ছে। সেখানে আপোস কতটা বড় আকার ধারণ করেছে যে, হেফাজতকে উচ্ছেদ করতে হবে বলে গণজাগরণ মঞ্চকেও উচ্ছেদ করা হয়। অন্যদিকে গণজাগরণ মঞ্চের যারা পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিল তারাও কিন্তু বাঙালী সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়ার সাহসী যোদ্ধা হতে পারল না। তারাও আপোসের পথে পা বাড়িয়েছে। একটি অংশ সরকারকে তোষণ করছে তারা প্রকৃত বিচারে গণজাগরণ মঞ্চের তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করে না। এ দেশে এ মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ ব্যবসার নামে শতটি দোকান খোলা হয়েছে সেখানে আর একটি নতুন যোগ ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে যে মুখগুলো পরিচিত হয়েছিল নতুন বাঙালী সংস্কৃতির নতুন প্রজন্মে যোদ্ধাদের মুখপাত্র হিসেবে তারা আপোসের চোরা গলিতে হারিয়ে যাচ্ছে। গণজাগরণ মঞ্চের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রকৌশলী রাজীব। তার ফেসবুকে দেয়া শেষ স্ট্যাটাসটি ছিল, মুক্তিযুদ্ধের একটি স্লোগান ‘জয়বাংলা’কে অবমুক্ত করেছি আরেকটি স্লোগান ‘জয় বঙ্গবন্ধু’কে অবমুক্ত করতে হবে। এই রাজীব হত্যা থেকে শুরু করে গণজাগরণ মঞ্চের যত কর্মীকে হত্যা করেছে জামায়াত-বিএনপি এর মূল উস্কানিদাতা মাহমুদুর রহমান নামক এক জঙ্গী। তথাকথিত সংবাদপত্রের সম্পাদক সেজে এই জঙ্গী এ কাজ করে। তাকে সরকার গ্রেফতার করলে তার মুক্তির দাবিতে যে ১৫ জন সম্পাদক বিবৃতি দেয়, গণজাগরণ মঞ্চের কেউই বাঁধনের মতো একপাটি জুতো তাদের দিকে ছুড়ে মারেনি। শুধু এ নয়, প্রতিবাদ করে একটি বিবৃতিও দেয়নি। কারণ, তারা মনে করেছিল এই ১৫ জন বিখ্যাত সম্পাদকের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলে তারা আর প্রচার পাবে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জোট দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে ওই ১৫ জনের একজনকে একুশে পদক দিয়ে প্রমাণ করেছে তারাও বাঙালী সংস্কৃতি বিকাশের থেকে তথাকথিত ধর্মীয় সংস্কৃতির নামে যে কালো শকুন বাঙালী জাতি ও রাষ্ট্র ধ্বংসের জন্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। অন্যদিকে স্বাধীনতার চেতনা ও বাঙালী সংস্কৃতি ধ্বংসের একটি বড় কারণ হিসেবে ইতিহাস একদিন চিহ্নিত করবে এদেশের বর্তমানের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে। তথাকথিত নিরপেক্ষতার নামে তারা বাঙালী সংস্কৃতিবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কথা বলার অবাধ সুযোগ দিচ্ছে? ইউরোপে হলোকস্টের পক্ষে কেউ কি কোন মিডিয়ায় মত প্রকাশ করতে পারে? বাংলাদেশের এই টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অবাধ সুযোগ দিচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে কথা বলার জন্যে।

এ নিয়ে এ সমাজের ভেতর থেকে এবং রাষ্ট্রেরও কোন আপত্তি নেই। তাই বাঙালীর সংস্কৃতিকে বাঁচানোর কেউ আছে বলে এই ৪৪তম বিজয় দিবসে আশা করার খুব কোন কারণ নেই। আর সংস্কৃতি না বাঁচলে এ ভূখ- থাকবে তবে আর যাই হোক, বাঙালীর রাষ্ট্র থাকবে না। এখন বাংলাদেশীর রাষ্ট্র তখন পাক-বাংলার জঙ্গীদের রাষ্ট্র হবে। তবে বিজয় দিবসে শুধু নয়, কোন সময়ই শুধু হতাশা নয়, আর এই হতাশ না হওয়ার কারণ একটিই, তা হলোÑ বাঙালী চরিত্রের হাজার ত্রুটির ভেতরও এক আশ্চর্যজনক গুণ আছে, বাঙালী মরতে মরতে ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে জেগে ওঠে। তাই কোন এক মুহূর্তে শেখ মুজিবের মতো দীর্ঘদেহী কোন না কোন তরুণ ডাক দেবেই, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। সেই ডাকে আবার দুলে উঠবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পানি। হয়ত আমরা থাকব না, তবুও চোখ বুজে দেখতে ভাল লাগে, আহা! লালনের সহজিয়া বাংলা। মাঠে, প্রান্তরে, নদীর বুকে ঝরে পড়ছে বাঙালী- প্রাণের আলোর ধারা।

swadeshroy@gmail.com

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

১৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: