আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিজয় দিবস সন্ধ্যা

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মুনতাসীর মামুন

আজ থেকে এক দশক আগেও বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে বেরুতে সঙ্কোচ হতো। আরও আগেরতো কথাই নেই। অথচ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন অধিকাংশ দেশে যেতে বাঙালীর ভিসা লাগত না। বাঙালী তখন বীরের জাতি হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের পর থেকে দৃশ্যপট বদলে গেল। কারণ বাংলাদেশ তখন পরিচিত হয়ে উঠল হন্তারক দেশ হিসেবে। তারপর দুই জেনারেলের মিলিটারি শাসন। বাংলাদেশ পরিচিত হয়ে উঠল ডিকটেটরের দেশ হিসেবে। এরপর খালেদা-নিজামীর জঙ্গী মৌলবাদী শাসন। বাঙালী পরিচিত হয়ে উঠল জঙ্গী মৌলবাদী কোথাওবা মধ্যপন্থী ইসলামী দেশ হিসেবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সেক্যুলার দেশ হিসেবে। অথচ তিন যুগে বিভিন্নভাবে তার পরিচয় বদলেছে। সবাই এ দেশটিকে তখন ব্যর্থ হন্তারক এক নায়কী জঙ্গীরাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করেছে। সুতরাং সবুজ পাসপোর্ট দেখলেই ইমিগ্রেশন কর্তাদের ভ্রƒ কুঁচকে যেত।

এই রাষ্ট্রের গায়ে আরেকটি তকমা ছিল। কিসিঞ্জার বলে গেছিলেন, তলাবিহীন ঝুড়ি অর্থাৎ ভিক্ষুক রাষ্ট্র। সুতরাং বিদেশের দরজায় যাওয়ার উদ্দেশ্য ঐ রাষ্ট্রের উন্নয়নে সহায়তা নয় বরং ভিক্ষা করা। আমার মনে আছে বছর ২৫ আগে যখন জাপান যাই, তাদেরই আমন্ত্রণে, তখন আমার সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করা হয়েছিল। ইমিগ্রেশনের লাইনে ছিলাম। আমার পাসপোর্ট দেখে আমাকে আলাদা করা হলো। সবাই বিদেয় হলে তারপর ১৫-২০ মিনিট পরীক্ষা করার পর আমার পাসপোর্টে সিল পড়ল। এর কারণ, তখন বিভিন্ন রাষ্ট্রে বাঙালীরা যাচ্ছে ভাগ্য ফেরার আশায়। তারা এটি পছন্দ করছে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, চীন কোরিয়া থেকে তখন আরও বেশি মানুষ যাচ্ছিল জাপান। এমনকি ইরান বা পাকিস্তান থেকেও। কিন্তু জাপানীরা তাদের সঙ্গে খুব একটা খারাপ ব্যবহার করত না, চীন বা কোরিয়ানদের সঙ্গে তো নয়ই কারণ, আকারে, ক্ষমতায় সেগুলো ছিল শক্তিশালী। বাংলাদেশ তখন শুধু গোলমেলে রাষ্ট্রই নয়, দুস্থ রাষ্ট্র্রও বটে। ক্ষমতাবানদের কেউ সহজে ঘাঁটাতে চায় না।

এ থেকে আমাদের জেনারেশন একটি শিক্ষা নিয়েছিল। যে লক্ষ্য সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তা পূরণ হয়নি। এর জন্য ১৯৭২-৭৫ অবস্থা পটভূমি হিসেবে বিচার করলেও মূল দায় ১৯৭৫-এর পর জেনারেল জিয়ার কাঁধে। প্রথমে সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রের মূলনীতি পরিবর্তন, যা তিনি করতে পারেন না কিন্তু বুকের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে কাজটি তিনি করেছেন। আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিচার করা যাবে না বলে ইনডেমনেটি আইন পাস করেছেন, যা তিনি পারেন না। জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য নিষিদ্ধ দলকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন, যা বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেছিলেন। এই প্রথম বিশ্বে বিশ্বাসঘাতক ও খুনীদের ডেকে এনে রাষ্ট্র সমাজে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। আরও প্রচুর অপকর্ম করেছেন। আজ এটি স্পষ্ট যে, মুক্তিযুদ্ধে তিনি গিয়েছিলেন বাধ্য হয়ে, আসলে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন পাকিস্তানবাদে। বাঙালীর আত্মপরিচয় বদলে বাংলাদেশি করার মাধ্যমে তিনি এই বার্তা দিয়েছিলেন যে ১৯৭১ সাল একটি ব্যত্যয়, বাংলাদেশের মূল ধারা ১৯৪৭। লে. জে. জিয়াউর রাহমান বাংলাদেশের যত ক্ষতি করেছিলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কেউ তা করেননি।

লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং খালেদা জিয়াও একই ধারা অনুসরণ করেছিলেন। ফলে গত তিন দশকে যে সব শিশু সাবালক হয়েছে তারা বেড়ে উঠেছে ভায়োলেন্স, জঙ্গী মৌলবাদ, দায়হীন সংস্কৃতির মধ্যে। এ কারণে আজ মানবতাবিরোধী অপরাধী ও তাদের দলের সমর্থক বেড়েছে, মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে ‘পাক বন্ধু’ বলতে কেউ কেউ দ্বিধা করছে না। যে ব্যক্তি এ কথাটি উচ্চারণ করছেন সে ব্যক্তিকে জামায়াত-বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর পদে দেখতে চান। জাতির জনক যদি ‘পাক বন্ধু’ হন তাহলে ইয়াহিয়া খানকে তারা জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এ রকম বিকৃতমনা ভয়ঙ্কর লোকসব যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় যায় তাহলে বাংলাদেশ ও নতুন প্রজন্মের অবস্থা কী হবে ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। তারা সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে দেশের বাইরে পা রাখতে পারবেন না।

১৯৪৭ সালের পর থেকে যদি বাংলাদেশের অবস্থা বিবেচনা করি তাহলে দেখব সেক্যুলার, জাতীয়তাবাদী, গণতন্ত্রীমনা দল বা দলগুলো যদি একত্রিত হয়ে অপশক্তিকে প্রতিরোধ করে এবং ক্ষমতায় যায় তখন দেশে শান্তি ও স্থায়িত্ব ফিরে আসে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। কয়েকটি উদাহরণ দিই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছিল একেবারে বিধ্বস্ত। বঙ্গবন্ধুর পুরো সময়টাই কেটেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ন্যূনতম অবকাঠামো গড়ে তোলা ও সাধারণ মানুষের খাদ্যের বন্দোবস্ত করার যেটি অন্তিমে যুক্তরাষ্ট্রের কারণে সম্ভব হয়নি। কিন্তু মূল বিষয় হলো সংবিধান থেকে শুরু করে বাজেট সবকিছু নিবেদিত ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। এমনকি বিশ্বব্যাংকের ডিকটাট মানতেও রাজি ছিল না বাংলাদেশ। শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘ফান্ডামেন্টালি আমরা একটা শোষণহীন সমাজ গড়তে চাই। আমরা একটা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি করতে চাই।’ দেশের পরিস্থিতি ১৯৭২ সালে কী দাঁড়িয়েছিল তার দু’একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৯৭১ সালে চাল ছিল প্রতি মণ ৩৪.৬৩, ১৯৭২ সালে ৯৩.৭৫, চিনি প্রতি সের ২.২৭, ১৯৭২ সালে ৯ টাকা। সরষের তেল ৫.২৭ প্রতি সের, ১৯৭২ সালে ৯৩.৭৫। এ অবস্থায় দেশের ভার গ্রহণ করেও তিনি চেষ্টা করছিলেন শান্তি, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারণে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ হলেও ১৭৯৫-এর দিকে শৃঙ্খলা ফিরে আসছিল। শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ কর্মসূচী গ্রহণ করার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার লক্ষণ ফুটে ওঠে। চালের দাম ৮ টাকা থেকে সাড়ে ৫ টাকায়, আলু ২.৭৫ থেকে ১.৫০ পয়সায় নেমে আসে। ঢাকা শহরে মধ্যবিত্তের ব্যয়সূচক ৪৫৮.৫ (জানুয়ারি) থেকে ৪১৬.৯ (এপ্রিলে) এবং খাদ্যমূল্য সূচক একই সময়ে ৪৫৯.০ থেকে ৪৪৬.৩ হ্রাস পায়। আগস্ট মাসে অবস্থার আরও উন্নতি হয় ভালো আবহাওয়া ও ভালো ফসল হওয়ার কারণে। দ্রব্যমূল্য নামতে থাকে। ১ লা সেপ্টেম্বর থেকে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা শুরু হওয়ার কথা কিন্তু তার আগেই ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন শেখ মুজিব।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সংহত করার জন্য যখন দল গঠন করেন তখন তাঁর সমর্থকদের প্রচুর অবৈধ অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দেন। বলা হয়ে থাকে, তাঁর আমলে দুর্নীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল তার আগে এ ভুখ-ে তা দেখা যায়নি। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, ব্যবসায় নামে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো জিয়া সমর্থকদের ঋণ দিতে থাকে। তারা তা গ্রহণ করে আর ফেরত দেয়নি [অধিকাংশ]। এভাবে বাংলাদেশে ‘ঋণ খেলাপি’ নামে শক্তিশালী একটি চক্রের সৃষ্টি হয়। বিএনপির রাজনৈতিক কর্মীরা ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করে। সেনাবাহিনীতে বিনা কারণে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। ১৯৮১ সালে সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে জমা হয়েছিল ৫০০ কোটি কালো টাকা। কারণ ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ও ঔপনিবেশিক মতাদর্শ অক্ষুণœ রেখে যাঁরা ক্ষমতায় আসেন তাঁদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নিজের ঘনিষ্ঠচক্র বা সমর্থকদের সন্তোষ্ট রাখা, সাধারণ মানুষকে নয়। সাধারণ মানুষের অবস্থা তখন কী দাঁড়ায় তারও দু’একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ সালে যেখানে চাল প্রতিমণ ছিল ৬০ টাকা, ডাল ৩.৫০ প্রতি সের, ডিমের হালি ১.২৫, তরিতরকারি প্রতি সের গড়ে ২.১৭। ১৯৭৮ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১০০ টাকা, ৯ টাকা, ৪ টাকা ও ৪.০৬ পয়সা। আরও কিছু সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব দেয়া যায়- ১৯৬৯-৭০ এর তুলনায় ১৯৭৮-৭৯ সালে চালের ব্যবহার মাথা পিছু হ্রাস পায় ১৬২ কিলোগ্রাম থেকে ১৪০ কিলোগ্রাম। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে ভূমিহীন সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫১ ভাগে। ১৯৬৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৯ ভাগ। জিয়ার কৃষিমন্ত্রী পর্যন্ত জানান, ‘ভূমিহীন ও ভাগচাষীরা প্রকৃতপক্ষে সকল প্রকার নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। জমির মালিকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দাস-প্রভু ও ক্রীতদাসের মতোই।’

১৯৭৯ সালে জিয়া যখন ক্ষমতার শীর্ষে তখন বাংলাদেশে ‘কর্মদক্ষ জনসমষ্টির এক-তৃতীয়াংশ ছিল কর্মহীন।’ গ্রামের মানুষ ১৯৭৫-৭৬ সালে গ্রহণ করতেন ৮০৭ গ্রাম খাদ্যদ্রব্য। ১৯৮১-৮২ তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৭৪৬ গ্রামে। ১৯৭৫-৭৬ সালে গড়পড়তা ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২০৯৪ এ, ১৯৮১-৮২ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১৯৪৩-এ, যা নিম্নতমের চেয়ে ১৫ ভাগ কম। ১৯৮১-৮২ সালে তিন চতুর্থাংশ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। ১৯৭৭-৭৯ সালে উচ্চ শিক্ষার্থী ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা হ্রাস পায় ২১ ভাগ। এ ধরনের ইতিহাসের ধারায় যাঁরা ক্ষমতায় আসেন তাঁরা কীভাবে মানুষজনের সঙ্গে প্রতারণা করেন তা বোঝা যাবে একটি উদাহরণ দিলে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে জিয়া প্রতিশ্রুত প্রকল্পসমূহের মূল্যায়নের জন্য একটি বৈঠক ডাকা হয় তাতে দেখা যায়, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে সড়ক ও জনপথ বিভাগে যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করা হয় তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুত প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ৬২ বছর সময় লাগবে। এমনকি ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান পর্যন্ত এক বৃক্ততায় বলেন যে, উন্নয়নের জন্য সংরক্ষিত মোট সম্পদের চল্লিশ ভাগ বিনষ্ট হচ্ছে দুর্নীতির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য। অর্থনীতিবিদদের এক সম্মেলনে তিনি একথা স্বীকার করেছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতেই বোধহয় ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক আবদুল মোমেন লিখেছিলেন।-

Corruption has been converted from a crime to a habit and the acknowledhement of this fact has led to a faster growth of corruption in the country. Following it has appeared political corruption which has taken upon it self the protection of other crimes.

আগেই উল্লেখ করেছি জেনারেল এরশাদ জিয়ার পথই অনুসরণ করেছিলেন তাঁর আমলের বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্রের ও নিজের এবং তল্পিবাহকদের সম্পদের মধ্যে পার্থক্য না করা। এরশাদ আমলে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে তার পরিবার ও নতুন সমর্থকগণ। তাঁর সময়ে ‘উন্নয়ন বাজেটের মধ্যেও মূল আঘাত গিয়ে পড়েছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো সামাজিক অবকাঠামো খাতের ওপর।’ সাধারণ মানুষ এমন নিঃস্ব অবস্থায় পৌঁছে যে গণঅভ্যুত্থানে অবশেষে এরশাদ বিদায় হোন।

এখানে তাঁর আমলের কয়েকটি সংখ্যাতত্ত্ব তুলে ধরছি উদাহরণ হিসেবে। এক হিসাবে জানা যায় মাত্র ২৫টি প্রকল্পে লোপাট হয়েছিল ১৩৪৮৫ কোটি টাকা। লক্ষণীয় যে এসমস্ত প্রকল্প ঘুরে ফিরে স্বল্প কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই লাভ করেছিল। এদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট, তাঁর স্ত্রী, নিকট আত্মীয়স্বজন, মন্ত্রীবর্গ, আমলাবৃন্দ। বেগম রওশন এরশাদের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ম্যাডাম টেন পারসেন্ট’। অর্থাৎ সরকারী যে কোন প্রকল্প কেউ পেলে তাকে দশ ভাগ কমিশন দিতে হতো। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়- ‘১৯৮৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শিল্পঋণ সংস্থার মেয়াদোত্তীর্ণ অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭শ’ কোটি টাকা। ঐ টাকা আটকে ছিল ৩৮২টি প্রকল্পে আর সেই ৩৮২টির মধ্যে মাত্র ২২টি প্রকল্পেই ছিল প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ। যার অর্থ হচ্ছে ২২ জন ব্যক্তি বা গ্রুপ শিল্পঋণের প্রায় অর্ধাংশ আত্মসাৎ করে বসে আছে।... ১৯৮৪ সালে জুনে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১শ’ ৭০ কোটি টাকা, যা ৫ বছর পর ৭শ’ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ এই ৫ বছরে যে সকল ব্যক্তি ঋণের সুযোগ গ্রহণ করেছেন তাদের বড় অংশই সুস্পষ্টভাবে জনগণের সম্পদকে কুক্ষিগত করেছে।’

অনার্জিত অর্থে ধনীগোষ্ঠীর সদস্যের সংখ্যা কিভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল তা বোঝা যাবে ১৯৯০ সালে মাশির হোসেনের রিপোর্টে। এই রিপোর্টের উপাত্তই স্পষ্ট করে দেয় বাংলাদেশের অর্থনীতি কিভাবে পণবন্দী হয়ে গিয়েছিল স্বৈরাচারী শাসকের হাতে। তাই দীর্ঘ হওয়া সত্ত্বেও রিপোর্টের কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি-

‘৮৯ সালের জুন মাসের হিসাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৮৬৯টি কোটি টাকার এ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর এতে জমা আছে ২৩৮৭ কোটি টাকা। দেড় বছর আগে অর্থাৎ ‘৮৮ সালের ডিসেম্বরে একই ব্যাংকে কোটি টাকার এ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৬৮৭টি। জমা ছিল ১৬৮৯ কোটি টাকা। এ্যাকাউন্টের সংখ্যা দেড় বছরে বেড়েছে ১৮২টি। জুন ‘৮৯-এ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাতে জমা টাকার পরিমাণ ছিল ১৮০৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারী খাতে জমা হচ্ছে মাত্র ৪২৬৭ কোটি টাকা। বেসরকারী খাতে জমা ছিল ১৩৮২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ও স্বনিয়োজিত ব্যক্তির শিরোনামে ছিল ৯৮১১ কোটি টাকা। ১৯৮৯ সালের জুন মাসের শেষে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার এ্যাকাউন্ট সংখ্যা ছিল ৭৭৬টি। জমা টাকার পরিমাণ ছিল ৪৫৫ কোটি। ’৮৮ সালের ডিসেম্বরে কোটি টাকার এ্যাকাউন্ট ছিল ৬৩৬টি মোট জমা টাকার এ্যাকাউন্ট সংখ্যা ছিল ’৮৯-এর জুনে ৬৯টি এবং জমার পরিমাণ ছিল ৪৮২ কোটি টাকা। ’ ৮৮ সালে এই ধরনের এ্যাকাউন্ট ছিল ৩৩টি এবং জমা ছিল ২২৭ কোটি টাকা। দশ কোটি ও তদুর্ধ টাকার এ্যাকাউন্ট ছিল ’৮৯-এর জুনে ২৪টি, জমা টাকার পরিমাণ ছিল ৪৫০ কোটি ৮৭ লাখ। দেড় বছর আগে ছিল ১৮টি ও জমা টাকার পরিমাণ ছিল ২৬৫ কোটি টাকা। এখানে উল্লেখ্য যে, ’৮২ সালে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে জমা টাকার পরিমাণ ছিল ২৮০৬ কোটি টাকা। এ টাকার মধ্যে সরকারী খাতে জমা ছিল ৮৩০ কোটি টাকা এবং বেসরকারী খাতে জমা ছিল ১৪৩০ কোটি টাকা।’

এরশাদের আমলে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হওয়া সম্বব ছিল না সর্বগ্রাসী লুটপাটের জন্য। এবং তা হয়ওনি, যদিও সরকারী প্রচার মাধ্যমে অহরহ উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

এখানে কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৮০-৮১ সালে উন্নয়ন বাজেটের ৬৫ শতাংশ আসত বৈদেশিক সাহায্য থেকে, ১৯৮৮-৮৯ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১২৬.৩ শতাংশে। ঋণ দ্বারা ব্যাপকভাবে লাভবান হয় উচ্চ-মধ্যবিত্তরা যার মধ্যে অন্তর্গত সামরিক-বেসামরিক আমলা ও রাজনীতিবিদরা। ১৯৭২-৮১ সালে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৮৩, ১৯৮১-৮৯ সালে ২.৫৫ ভাগ। ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে ১৯৮২-৮৯ খাদ্য উৎপাদন বাড়েনি। ১৯৭২-৮১ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৯৫ ভাগ। ১৯৮১-৯০ সালে গিয়ে দঁড়ায় তা ৩.১৯ ভাগ। ব্যয় বৃদ্ধি সবচেযে বেশি হয়েছিল সামরিক খাতে। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ দেখিয়েছেনÑ ১৯৮২-৮৮ সালে সামরিক খাতে প্রকৃত মূলে ব্যয় বেড়েছে ৯.৪ ভাগ। পুলিশ আনসার ও বিডিআর খাতে ৫.৪ ভাগ। কারণ সহজেই অনুমেয়। সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীকে যাবতীয় সুযোগ দিয়ে ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করা।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এরশাদ আমলের আরও কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন কিছু উপাত্ত উদ্ধৃত করে, যা প্রাণিধানযোগ্য-

‘সরকারী ব্যয় থেকে উপকার কারা পাচ্ছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠী সামাজিক খাতে ব্যয়ের মাত্র ২৪.৫ শতাংশ পেয়ে থাকেন, দরিদ্র নয় এমন জনগোষ্ঠী (৩০%) পেয়ে থাকেন ৬৫.৭ শতাংশ। অর্থনৈতিক খাতে রাজস্ব ব্যয়ের উপযোগিতা লাভের অনুপাত হলো ১৪.৬ ও ৭০.১ শতাংশ মাত্র। ভৌত অবকাঠামোতে এটি ১৬.৯ ও ৫৮.৬ ও প্রশাসন ও প্রতিরক্ষায় ১০.৬ ও ৭৩.০ শতাংশ মাত্র। উন্নয়ন ক্ষেত্রেও এ বৈষম্য লক্ষণীয়। সামাজিক খাতে ব্যয় থেকে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী ১০০ টাকার মাত্র ২০.৫ টাকা পরিমাণে উপকার পায়। দরিদ্র নয় এমন জনগোষ্ঠী পায় ৬৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক খাতে অনুপাত হলো ১৩.০ ও ৭১.৬, ভৌত অবকাঠামো খাতে ১৭.৫ ও ৬৬.৬, প্রশাসনে ১৩.৬ ও ৭২.৯ এবং অন্যান্য খাতে ১৯.২ ও ৬৩.৯। সরকারী ব্যয়ের অভিগাত থেকে উপকারের অভিগাত যে বিষম সেটি পরিষ্কার আর রাজস্ব আয়ে অভিঘাতও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিকূলে।’ (চলবে)

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

১৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: