কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এটিএম ব্যাংকিংয়ে বাড়ছে জালিয়াতি

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ দুই দশকে দেশে অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) বুথ সেবার পরিধি যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে এটিএম ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জালিয়াতির ঘটনাও। প্রায়ই ঘটছে চেক জালিয়াতি, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড জালিয়াতির মতো ঘটনা। এর মধ্যে এটিএম এবং প্লাস্টিক কার্ডে ৪৩ শতাংশ, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ২৫ শতাংশ, অনলাইনে টাকা স্থানান্তরে ১৫ শতাংশ, ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে ১২ শতাংশ, ব্যাংক এ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারে ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ২ শতাংশ জালিয়াতির ঘটনা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ জালিয়াতির সঙ্গে ব্যাংক ও তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তারা জড়িত থাকে। ১৮ শতাংশ জালিয়াতির সঙ্গে সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা থাকে। ১৫ শতাংশ জালিয়াতি হয় অননুমোদিত ব্যবহারকারী বা গ্রাহকের মাধ্যমে, ভেন্ডর বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জালিয়াতি হয় ৭ শতাংশ। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, কার্ড হারিয়ে যাওয়া এবং পিন নম্বর ছিনতাইসহ নানান কায়দায় এই জালিয়াতি হয়।

শনিবার মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ‘বাংলাদেশে এটিএম ব্যাংকিং; বর্তমান অবস্থা, অন্তরায় ও প্রতিকার’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপনকালে এ তথ্য তুলে ধরেন বিআইবিএম’র সহযোগী অধ্যপক মোঃ মাহবুবুর রহমান আলম। দেশে কার্যরত ব্যাংকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জরিপধর্মী ওই গবেষণা পরিচালনা করে বিআইবিএম’র কর্মকর্তারা।

গবেষণায় দেখা যায়, দুই দশকে দেশে এটিএম বুথ সেবার পরিধি বহুগুণ বেড়েছে। ১৯৯২ সালে একটি মাত্র এটিএম বুথ থেকে শুরু হয় এর যাত্রা। বর্তমানে দেশে কার্যরত ৫৬টি ব্যাংকের এটিএম বুথের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৬১টিতে। লেনদেনে হচ্ছে বছরে প্রায় সাড়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ১৯৯৯ সালে এটিএম বুথের মাধ্যমে লেনদেন ছিল ৭০ কোটি টাকা। ২০০১ সালে লেনদেন ছিল ২১১ কোটি টাকা। ২০০৬ সালে ছিল ৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে এটিএম বুথের মাধ্যমে লেনদেন ছিল ৬৫ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। দেশে স্থাপন করা এটিএম বুথগুলোর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩ হাজার ৫১৩টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৬২টি, সিলেট বিভাগে ৪৬১টি, রাজশাহী বিভাগে ৩৪০টি, খুলনা বিভাগে ১৬৬টি, রংপুর বিভাগে ১৬৬ এবং বরিশাল বিভাগে ১০৩টি। দেখা যায়, শহর এলাকায় ৯৫.১৬ শতাংশ এটিএম বুথ এবং ৪.৮৪ শতাংশ গ্রাম এলাকায়। প্রতি এক লাখ ব্যাংক হিসাবধারীর জন্য গড়ে ৭.৩৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য এটিএম বুথ রয়েছে ৩.৪০টি। বুথগুলোর মধ্যে ৯৫.৫৪ শতাংশই বেসরকারী ব্যাংকের। ১.৪৮ শতাংশ সরকারী ব্যাংকের, ০.২৬ শতাংশ বিশেষায়িত ব্যাংকের এবং ২.৫৮ শতাংশ বিদেশী ব্যাংকের।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ক্রেডিট কার্ড প্রথম চালু হয় ১৯৯৭ সালে। ডেবিট কার্ড চালু হয় ১৯৯৯ সালে। এর পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্লাস্টিক কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৪টিতে। এর মধ্যে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ৭২ লাখ ৩২ হাজার ৫৫৪ টি এবং ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৮ লাখ ৫৩ হাজার ২৮০টি। এসব কার্ডের মাত্র ২ শতাংশ ‘চিপ’ ভিত্তিক যা তুলনামূলক নিরাপদ। বাকি ৯৮ শতাংশ কার্ড চুম্বক প্রলেপ (ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ) দেয়া, যা লেনদেনের জন্য খুবই অনিরাপদ এবং এগুলো জাল করা সহজ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত ৮টার মধ্যে এটিএম লেনদেন হয় সবচেয়ে বেশি। এর পর বেশি লেনদেন হয় সকাল ১১টা থেকে বেলা ১২টার মধ্যে। গত বছর একদিনে একটি এটিএম বুথে গড় লেনদেন ছিল ৪০টি। এটিএম বুথের মাধ্যমে একটি লেনদেনের জন্য ব্যাংকের খরচ হয় ৪৯ টাকা। এটা অবশ্য লেনদেনের ওপর নির্ভর করে। লেনদেনের সংখ্যা বেশি হলে এই খরচ কমে যাবে। যেমন, ২০১২ সালে প্রতিটি লেনদেনের পেছনে ব্যাংকের খরচ ছিল ৭১ টাকা। ওই বছর প্রতিটি এটিএম বুথের একদিনের গড় লেনদেন ছিল ২৭টি।

২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশে ধারাবাহিকভাবে এটিএম বুথ স্থাপন বাড়তে থাকে। ২০১২ সাল থেকে এটা কমতে শুরু করে। তবে ৭১ শতাংশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশে এখন যে পরিমাণ এটিএম বুথ রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় এবং তারা প্রধানত গ্রাম এলাকায় এটিএম বুথ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তাছাড়া দেশের সব ব্যাংকের আইটি বিভাগের কর্মকর্তারা আরও ১৫ হাজার ৩৭৯টি এটিএম বুথের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে। সারাদেশের মধ্যে রাজধানী ঢাকা শহরেই ৪৯ শতাংশ এটিএম বুথ রয়েছে। গ্রামে রয়েছে ৪.৮৪ শতাংশ এটিএম বুথ। এটিএম বুথের ওপর সর্বোপরি গ্রাহক সন্তুষ্টি ৬০.৩ শতাংশ। নগদ টাকা প্রাপ্তি নিয়ে সন্তুষ্টি রয়েছে ৬৯.৬ শতাংশ গ্রাহকের। নিজস্ব ব্যাংকের এটিএম সেবা নিয়ে সন্তুষ্টি রয়েছে ৬১.১ শতাংশ গ্রাহকের।

এটিএম বুথে জাল টাকা পাওয়া যাচ্ছে বলেও এই জরিপে বেরিয়ে এসেছে। তবে এই জাল টাকা কোথা থেকে এটিএম বুথে আসছে তার কোন সঠিক উৎস খুঁজে পাননি গবেষকরা। এ বিষয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপক বিআইবিএম’র সহযোগী অধ্যপক মোঃ মাহবুবুর রহমান আলম বলেন, জরিপকালে অনেক ব্যাংকই বলেছেÑজাল নোট বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেয়া নোটের বান্ডিলের মধ্যেই ছিল। আবার অনেকে বলেছে, এটিএম বুথে টাকা ভরার কাজে যারা নিয়োজিত তারা জড়িত থাকতে পারে। তাছাড়া এটিএম বুথ থেকে সত্যি সত্যি জাল নোট পাওয়া যাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করাও বেশ কঠিন। এটিএম ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জালিয়াতিও হচ্ছে। এর মধ্যে এটিএম এবং প্লাস্টিক কার্ডে ৪৩ শতাংশ, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ২৫ শতাংশ, অনলাইনে টাকা স্থানান্তরে ১৫ শতাংশ, ইন্টারনেট ব্যাংকিয়ে ১২ শতাংশ, ব্যাংক এ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারে ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ২ শতাংশ জালিয়াতির ঘটনা পাওয়া গেছে।

বিআইবিএম’র জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ ব্যাংক মনে করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এটিএম বুথের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটিএম বুথ থেকে জাল টাকা বের হওয়ার পেছনে বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা জড়িত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর মোঃ আবুল কাসেম। তিনি বলেন, এটিএম মেশিনে জাল টাকা ঢোকানোর পর এটা যাতে বের হতে না পারে সেজন্য আরও আধুনিক ব্যবস্থা নিতে হবে ব্যাংকগুলোকে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বার বার বলা হলেও টাকার মধ্যে ফুটো করা বন্ধ হয়নি। ফলে এটিএম বুথে টাকা নিতে গ্রাহককে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

গবেষণাপত্রের ওপর আলোচনায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মোহাম্মদ শিরিন বলেন, বাংলাদেশে এখনও এটিএম সেবা নিয়ন্ত্রণ করার সময় আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন থেকে এটিএম বুথের ওপর নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে তখন থেকেই এর সম্প্রসারণ কমতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, বুথে নতুন টাকা দেয়া হলে জাল টাকা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রায়শই ব্যাংকের সিসিটিভি নষ্ট থাকে। বিদ্যুত থাকে না, নেটওয়ার্ক সমস্যা থাকার পরও আমাদের এ সেবা দিতে হয়। তাছাড়া বুথে জাল টাকা উদ্ধারের ঘটনা ঘটলে দোষীদের গ্রেফতারে পুলিশ সহযোগিতা করছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক এটিএম বুথের সংখ্যা বাড়াতে চায় না প্রসঙ্গে ডেপুটি গবর্নর তার বক্তব্যে বলেন, ব্রাঞ্চের সংখ্যা বাড়লে বুথের সংখ্যাও বাড়বে। এটাই নিয়ম। তবে আমরা অবশ্যই চাই সব ব্যাংক এ সেবার আওতায় আসুক। কয়েকটি ব্যাংকের বুথের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাই অন্যরা পিছিয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এটিএম বুথ থাকলেও টাকা না থাকা প্রসঙ্গে আবুল কাশেম বলেন, ব্যাংকগুলো চায় নতুন টাকা, কিন্তু সব সময় তো নতুন টাকা দেয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, অনেকেই জানে না নতুন টাকা ছাপাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কত খরচ এবং কতটা ঝামেলা পোহাতে হয়। আবুল কাশেম বলেন, বিভিন্ন উৎসবে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার দিয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় টাকা রাখতে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা নেয়া হয় বলে তিনি জানান। বিভিন্ন ব্যাংকের অযাচিত সার্ভিস চার্জ প্রসঙ্গে ডেপুটি গবর্নর বলেন, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড দেয়ার সময় সার্ভিস চার্জের ফাঁকফোকর জানানো হয় না। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহককে অজ্ঞ রাখে বিভিন্ন ব্যাংক। তারা সবকিছুই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে কিন্তু ব্যাংকের এমডি মাসে কত টাকা বেতন পান তা প্রকাশ করে না। এজন্য ব্যাংকগুলোকে গ্রাহক সেবা আরও বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

বিআইবিএমএর মহাপরিচালক ড. তৌফিক এ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, বিআইবিএম’র পরিচালক ও অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জী, ব্র্যাক ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসতিকাক মহিউদ্দিন, উত্তরা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন প্রমুখ। একই অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কি কি ঝুঁকি বিবেচনা করা উচিত তার ওপরও একটি গবেষণালব্ধ মডেল উপস্থাপন করা হয়।

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪

১৫/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: