মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দেশে বায়োডিজেলের সম্ভাবনা

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪
  • এসএম মুকুল

পৃথিবীর সঞ্চিত জ্বালানি একসময় না একসময় অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে। যানবাহনের ওপর এ যুগের মানুষ অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ‘জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে’Ñ ভাবতেও ভয় লাগে। তাহলে কি পৃথিবী আর ঘুরবে না, থেমে থাকবে! তাহলে উপায় কি? উপায় বাতলে দিচ্ছে বরাবরের মতো প্রযুক্তিই। আমদের চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদনগুলোই হয়ে উঠতে যাচ্ছে আগামী দিনের জ্বালানির অফুরন্ত উৎস। সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া অনেক আগেই আমরা জেনেছি। এর সম্ভাবনা ও উন্নতির কাজ এর মধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ববাসী পরিচিত হচ্ছে বায়োডিজেলের সঙ্গে। এই বায়োডিজেল সংগ্রহ করা হয় গাছ থেকে এবং এজন্য সবচেয়ে উপযুক্ত গাছ হচ্ছে যাত্রোপা তথা সাদা মান্দার, গম, ভুট্টা, পাম।

বায়োডিজেল : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জন্য বায়োডিজেল উৎপাদন একটি সম্ভাবনার খাত হিসেব আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সাদা মান্দার এক্ষেত্রে আলোর পথ দেখাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, সাদা মান্দার গাছ থেকেই ডিজেল পাওয়া যাবে। একসময় সাদা মান্দারের তেল দিয়ে কুপি বাতি জ্বালাতো আদিবাসীরা। পরে বিদ্যুতের আগমনে, এর ব্যবহার তেমন চোখে পড়ে না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর প্রধান গবেষক ড. মো. দৌলত হোসেন এবং সহযোগী গবেষক প্রভাষক পারভেজ ইসলাম দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গবেষণার পর এ তথ্য জানিয়েছেন। জার্মানির বায়োডিজেল বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. কে বেকার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনি বায়োডিজেল তৈরির জন্য সম্ভাব্য সাদা মান্দারের সঠিক জাত শনাক্তকরণে সহায়তা করেন। জার্মানির হোহেনহাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা মান্দার তেলের (বায়োডিজেল) গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বায়োডিজেলের মান ফসিল ডিজেলের চেয়ে উন্নত। এর ব্যবহারে ইঞ্জিনের ধোঁয়া কম হয় ও ইঞ্জিনের লাইফ বেড়ে যায়।

তিন থেকে পাঁচ ফুট উঁচু সাদা মান্দার গাছ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফুল ও ফল দেয়। গবেষকরা জানান, প্রতি হেক্টর জমি থেকে ১০-১২ টন সাদা মান্দার বীজ পাওয়া সম্ভব। এ থেকে ২৩-২৭ শতাংশ তেল পাওয়া যেতে পারে। প্রতি হেক্টর জমি থেকে প্রতি বছরে দুই-আড়াই হাজার লিটার বায়োডিজেল পাওয়া সম্ভব। একটি সাদা মান্দার গাছ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বায়োডিজেল পাওয়া যেতে পারে।

সাদা মান্দার থেকে বায়োডিজেল উৎপাদন

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। ফলে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য । অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। এর বিকল্প কি নেই? এদেশেই বহু বছর আগে একটি অতিপরিচিত গাছের বীজ থেকে জ্বালানি তেল তৈরি হতো। গাছটির নাম সাদা মান্দার। বৈজ্ঞানিক নাম ঔধঃৎড়ঢ়ধ ঈধৎপঁং (যাত্রোপা কারকাস)। এ দেশের আদিবাসী ও গ্রামের মানুষ সাদা মান্দারের বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করে কুপি বাতি জ্বালাত। কেরোসিন আর বিদ্যুতের আগমন সে বৃক্ষ-জ্বালানির কবর রচনা করেছে। এখন ২০০ কোটি ডলারের আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যয় মেটাতে হিমশিম অবস্থায় আবারও বৃক্ষ-জ্বালানির খোঁজ পড়েছে। সাদা মান্দার বা যাত্রোপা গাছের পরিকল্পিত আবাদ ও এর বীজ থেকে বায়োডিজেল উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সাদা মান্দার গাছের ফলের বীজ থেকে বায়োডিজেল পাওয়া যায়। সাধারণত এ গাছ ৮ ফুটের মতো লম্বা হয়। এতে প্রচুর ফল হয়। একটি গাছে বছরে প্রায় ২৫ কেজি ফল ধরে। এ গাছ ৩০-৪০ বছর বাঁচে। এক হেক্টর জমিতে প্রায় আড়াই হাজার গাছ লাগানো যায়, যা থেকে ১০-১২ টন পর্যন্ত বীজ পাওয়া সম্ভব। এক টন বীজ থেকে ২৪৫ কেজি পর্যন্ত তেল পাওয়া যায়। এ তেল সংগ্রহ করাও তেমন কঠিন কিছু নয়। সরিষা ঘানি বা ধান ভাঙ্গার কলে সামান্য রদবদল করে সাদা মান্দার বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু এক বিঘা জমিতে সাদা মান্দার চাষ করে এক বছরের কুপিবাতি বা হারিকেন জ্বালানোর তেলের চাহিদা পূরণ সম্ভব। মান্দার বীজে তেলের পরিমাণ ২৩-৩৭ শতাংশ। সে হিসেবে ১ হেক্টর জমি থেকে পাওয়া ১০-১২ টন বীজ থেকে প্রতি বছরে দুই থেকে আড়াই হাজার লিটার বায়োডিজেল পাওয়া যেতে পারে।

সাদা মান্দার বা যাত্রোপা গাছ সর্বত্রই জন্মে। দেশের পাহাড়ী এলাকা, চরাঞ্চল, রাস্তা ও রেললাইনের দু’পাশ, বরেন্দ্রাঞ্চল ও অন্যান্য এলাকার অনাবাদী পতিত জমিতে এ গাছ ব্যাপকভাবে লাগানো যেতে পারে। প্রথম দিকে উৎপাদন কম হলেও পঞ্চম বছর থেকে উৎপাদন বেড়ে যায় কয়েকগুণ । আমাদের দেশে এখন আমদানি করা জ্বালানি বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সাদা মান্দার গাছ চাষ করে উৎপাদিত বায়োডিজেল যদি দেশের চাহিদার ২৫ ভাগও মেটাতে সক্ষম হয়, তবে বছরে ২৫ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে।

সম্প্রতি বিশ্বের কয়েকটি দেশ ব্যাপকভাবে বায়োডিজেলের উৎপাদন শুরু করেছে। এর উৎপাদনের প্রায় পুরোটাই নেতৃত্ব দিচ্ছে ইউরোপিয়ান দেশগুলো। বিশেষভাবে জার্মানির নাম বলা যেতে পারে। তারা বছরে তিন মিলিয়ন টন বায়োডিজেল উৎপাদন করছে। তাদের ধারাবাহিকতায় এখন অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারত, মালয়েশিয়া এবং আমেরিকা এই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে ব্যাপক পরিমাণে বায়োডিজেল উৎপাদন করতে সক্ষম শুধু যাত্রোপা গাছের ওপর ভিত্তি করে। এই সম্ভাবনা নিরূপণ করে দশটি উন্নয়নশীল দেশে যাত্রোপা উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে বারকিনা ফাসো, চায়না, ঘানা, ভারত, লেসোথো, মাদাগাসকার, মালাবি, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড ও জাম্বিয়া।

আমাদের দেশের জ্বালানি সংকট সমাধানে বায়োডিজেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। এজন্য পরিকল্পিতভাবে সাদা মান্দার তথা যাত্রোপা গাছের চাষ করার প্রতি সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী।

ডৎরঃবঃড়সঁশঁষ৩৬@মসধরষ.পড়স

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

১৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: