কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধের অমর গাথা

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জাকির হোসেন তমাল

দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন চলাকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়। ছাত্রদের রক্ষা করতে পাকসেনাদের বুলেটের সামনে বুক পেতে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। তিনিই স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে মূলত ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল। এরপর থেকেই একে একে নিখোঁজ হতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তৎকালীন পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্প ছিল শহীদ শামসুজ্জোহা হল। এখানে ধরে এনে নানা রকম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হতো মুক্তিকামী মানুষকে। ওই হলের পেছনেই মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বরতার চিহ্ন রয়েছে একটি বধ্যভূমি।

মুক্তিযুদ্ধে রাবি ॥ মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন শহীদ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ৯ জন শিক্ষার্থী, ৫ জন সহায়ক কর্মচারী ও ১১ জন সাধারণ কর্মচারী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শহীদ হন সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার। ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল সকালে পাকবাহিনী তাঁকে পশ্চিমপাড়ার শিক্ষক কোয়ার্টার থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। ১৫ এপ্রিল বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আসলাম ও কর্নেল তাজের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসের জুবেরী ভবন থেকে তুলে নিয়ে যায় গণিত বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুর রহমানকে। এরপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের। ২৫ নবেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুমকে তুলে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। কেবল এই তিন শিক্ষকই নন, মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার হারিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারী, ছাত্রসহ আরও ২৬ জন সদস্য।

শহীদ যাঁরা

শিক্ষার্থী : আবদুল মান্নান আহমেদ (¯œাতক সম্মান শ্রেণী, দ্বিতীয় বর্ষ, বাণিজ্য বিভাগ), আমীরুল হুদা জিন্নাহ (এমএ শেষ বর্ষ, বাংলা বিভাগ), গোলাম সরওয়ার খান সাধন (পূর্ব বিভাগ এমএসসি), প্রদীপ কুমার রাহা (রসায়ন বিভাগ), মোহাম্মদ আলী খান (প্রথম বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ), শাহজাহান আলী (বাণিজ্য বিভাগ), মিজানুল হক (এমএসসি, পূর্ব ভাগের পদার্থবিদ্যা বিভাগ), ফজলুল হক, আঃ লতিফ ও রেজাউল করিম।

শিক্ষক : হাবিবুর রহমান (গণিত বিভাগ), মীর আবদুল কাইয়ুম (মনোবিজ্ঞান বিভাগ) ও সুখরঞ্জন সমাদ্দার (সংস্কৃতি বিভাগ)।

সহায়ক কর্মচারী : শেখ এমাজ উদ্দিন (স্টোন টাইপিস্ট, প্রশাসন শাখা), এসএম সাইফুল ইসলাম (উচ্চমান সহকারী, হিসাব বিভাগ), মো. কলিমউদ্দিন (কর্ম সহকারী, প্রকৌশল দিপ্তর), আবুল হোসেন (পরিবহন শাখার ড্রাইভার), শফিকুর রহমান (কাঠমিস্ত্রি, প্রকৌশল দফতর)।

সাধারণ কর্মচারী : আবদুর রাজ্জাক (নৈশপ্রহরী, প্রশাসনিক ভবন), মোহনলাল (সুইপার, স্টুয়ার্ড শাখা), নূরু মিঞা (প্রহরী, স্টুয়ার্ড শাখা), মোহাম্মদ ইউসুফ (উপাচার্য অফিসের জরুরী পিয়ন), মোঃ ওয়াজেদ আলী (পিয়ন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতর), মো. আফজাল মৃধা (প্রহরী, উপাচার্য দফতর), ওয়াহাব আলী (অর্ডালি পিয়ন, প্রক্টর দফতর), আবদুল মালেক বেয়ারা (আইন বিভাগ), কোরবান আলী (প্রহরী, ভূগোল বিভাগ), ইদ্রিস আলী (পানি বাহক, সৈয়দ আমীর আলী হল), মো. আবদুল মজিদ।

স্মৃতি বিজরিত ক্যাম্পাস ॥ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরখ্যাত ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’ অন্যতম। এটি ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। সংগ্রহশালায় উল্লেখযোগ্য দলিলাদির মধ্যে রয়েছেÑ শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশিদুল হাসান, সিরাজউদ্দিন হোসেন প্রমুখের রোজনামচা। শিল্পী কামরুল হাসানের অঙ্কিত মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পোস্টার। রয়েছে রাবি গণকবর থেকে প্রাপ্ত নাম না জানা শহীদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। ঢাকার জগন্নাথ হলের হত্যাকা-, রায়ের বাজার বধ্যভূমি, রাবির গুলিবদ্ধ শিক্ষক ড. জোহার আলোকচিত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে চোখে পড়ে শিল্পী নিতুন কু-ু নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্বারক ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’। এটি ১৯৯০ সালের ২৬ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম উদ্বোধন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, কর্মচারীসহ আশপাশের লোকজনকে হত্যা করে জোহা হলের পেছনে মাটিচাপা দেয়। সেখান থেকে মানুষের হাড়গোড় এবং মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে এ স্থানটি সংরক্ষণ করতে সেখানে নির্মিত হয় ‘বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ’। এটি ২০০৪ সালের ২১ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়। ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলের সামনে নির্মাণ করা হয় স্বাধীনতা স্বারক ভাস্কর্য ‘বিদ্যার্ঘ’। ২০১২ সালে জোহা হলের বামপাশে ড. শামসুজ্জোহার প্রতিকৃতি ‘স্ফুলিঙ্গ’ নির্মিত হয়। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ফটকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ছাত্রের নামের তালিকার ফলকস্তম্ভ।

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

১৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: