কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভর্তি ও ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪
  • সরকারী ও বেসরকারী স্কুলে নীতিমালা লঙ্ঘন

বিভাষ বাড়ৈ ॥ সরকারী ও বেসরকারী স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হতেই নীতিমালা লঙ্ঘন করে ইচ্ছেমতো অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফর্ম পূরণের ক্ষেত্রেও উঠেছে একই অভিযোগ। নীতিমালা লঙ্ঘন করে এসএসসির ফর্ম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ঘটনায় ইতোমধ্যে ২৫ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। রাজধানীর বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে শিশুদের ভর্তিতে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ঘটনায় অভিভাবকদের মাঝে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। ১০ হাজার টাকার বেশি নেয়া যাবে না; শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমন হুঁশিয়ারি দিলেও বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলে প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ভর্তিতে আদায় করা হচ্ছে ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা। সন্তানের শ্রেণী পরিবর্তনেই অভিভাবকদের গুনতে হচ্ছে ১৮ হাজার ৩০০ টাকা। ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

জানা গেছে, এবার রাজধানীর ৩২ সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো ভর্তির আবেদন ফর্ম বিতরণ ও জমাদান কার্যক্রম চলে অনলাইনে। গত ২ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে কার্যক্রম চলে শুক্রবার রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক ) মোঃ মোস্তফা কামাল জনকণ্ঠকে জনিয়েছেন, অভিভাবকদের এবার আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ফর্ম সংগ্রহ করার বিড়ম্বনা ছিল না। প্রথম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য অনলাইনে এবার আবেদনপত্র জমা পড়েছে ৭২ হাজার। দু’একদিনের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছ থেকে শ্রেণীভিত্তিক আসন সংখ্যা জানা হবে বলে জানান উপ-পরিচালক। কেবল অনলাইনেই (িি.িফংযব.মংধ.বফঁ.নফ) আবেদন করতে হয়েছে প্রার্থীদের। বিদ্যালয়ে কোন ভর্তি ফর্ম পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিবেচিত হলে এবার এসএমএসের মাধ্যমেই তা জানিয়ে দেয়া হবে। প্রথম শ্রেণীতে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। লটারির ফল ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই জানা যাবে। তবে অন্যান্য শ্রেণীতে অনলাইনে আবেদনের পর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে শিক্ষার্থীদের। প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য লটারি হবে ২৭ ডিসেম্বর। প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া যাবে এমন বিদ্যালয় আছে ১৪টি। তবে দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষা নেয়া হবে। ৩২টি বিদ্যালয়কে তিনটি গুচ্ছ করে যথাক্রমে ১৭, ১৮ ও ২০ ডিসেম্বর এসব পরীক্ষা নেয়া হবে। নবম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে। কোন শিক্ষার্থী একই গুচ্ছভুক্ত কেবল একটি বিদ্যালয়ে আবেদন করতে পারবে। কেউ ইচ্ছা করলে তিনটি গুচ্ছের তিনটি বিদ্যালয়েও আবেদন করতে পারবে। সরকারী স্কুলের ভর্তি প্রক্রিয়া ভালভাবে আগালেও ইতোমধ্যেই কিছু বেসরকারী স্কুলের বিরুদ্ধে নীতিমালা লঙ্ঘন করে ইচ্ছেমতো অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন অভিভাবকরা। প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিলে অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়। কিছুটা আগে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়া বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ঘটনায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মাঝে। এখন পর্যন্ত এখানে প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিশু শ্রেণী হওয়ায় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ঘটনা সরাসরি শিক্ষার্থীর তুলনায় অভিভাবককেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভর্তি নীতিমালায় সুনির্দিষ্ট খাতওয়ারি তথ্য দিয়ে বলেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ২০০, সম্পূর্ণ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ১৫০ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা ব্যতীত দেশের সকল প্রতিষ্ঠানে ভর্তির আবেদন ফর্মের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ টাকা গ্রহণ করা যাবে। সেশন চার্জসহ ভর্তি ফী সর্বসাকুল্যে মফস্বল এলাকায় ৫০০ টাকা, পৌর (উপজেলা) এলাকায় এক হাজার টাকা, পৌর (জেলা সদর) এলাকায় দুই হাজার টাকা গ্রহণ করা যাবে। ঢাকা ব্যতীত অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় তিন হাজার টাকার বেশি হবে না। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় অবস্থিত এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকার অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা যাবে না। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় অবস্থিত আংশিক এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং এমপিওবহির্ভূত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য শিক্ষার্থীর ভর্তির সময় মাসিক বেতন, সেশনচার্জ ও উন্নয়ন ফীসহ বাংলা মাধ্যমে আট হাজার টাকা এবং ইংরেজী ভার্সনে ১০ হাজার টাকার বেশি গ্রহণ করা যাবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জারি করা নীতিমালা অমান্য করলে অভিযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুসারে এমপিও, স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতি বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেখা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা মানছে না বিয়াম স্কুল কর্তৃপক্ষ।

প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা গেল, অভিভাবকরা বাইরে জড়ো হয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তারা কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে বলছিলেন, এরা ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করছেন অথচ কিছু বলাও যাবে না। মোস্তাক আহমদ নামে এক অভিভাবক বলছিলেন, আমার এক সন্তান এখানে পড়ালেখা করছে। আরেক সন্তান চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু এরা নোটিস দিয়েছে, যারা এখানে পড়ালেখা করছে তাদের নতুন শ্রেণীতে যেতে ১৮ হাজার ৩০০ টাকা লাগবে। চতুর্থ শ্রেণীতে নতুন ভর্তিতে লাগবে ২০ হাজার ৮০০ টাকা। অভিভাবকরা বলেন, ‘আমরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছি। কিন্তু তারা কোন কথা শুনতেই চান না। তারা বলেন, যা করেছে ঠিকই করেছে। এটাই দিতে হবে। অন্যথায় ভর্তি হওয়া যাবে না। ঘটনা সম্বর্কে অধ্যক্ষে শাহানা হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বলেন, অভিভাবকরা যা বলছেন তা ঠিক নয়। তবে অফিসে আমি কথা বলেও অভিভাবকদের কথার সত্যতা পেয়েছি মন্তব্য করলে অধ্যক্ষ বলেন, আসলে এর মধ্যে তিন মাসের বেতন আছে। এটা অনেক অভিভাবক বোঝেন না। বেতন ছাড়াও টাকা বেশি নেয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে অনেক ব্যয় আছে। শিক্ষার্থীদের টাকা দিয়েই প্রতিষ্ঠান চলে। সরকারের কোন অর্থ আমরা নেই না। তাই টাকা একটু বেশি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে অধ্যক্ষ ফাউন্ডেশনের পরিচালকের (শিক্ষা) সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরিচালক আফজাল হোসেন এ বিষয়ে বলছিলেন, বিয়াম সরকারীও না এমপিও ও না। এখানে শিক্ষার্থীদের টাকা দিয়েই চলতে হয়। ভাল শিক্ষক আছে এখানে। ভাল শিক্ষক হলে তাদের বেতনও একটু বেশি দিতে হয়। তা না হলে তারা আসবে না। ভাল শিক্ষক না হলে ভাল শিক্ষাও পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানে এত টাকা নিয়ে প্রাইভেট স্কুল তো লাখ লাখ টাকা আদায় করলেও কিছু বলার থাকবে না। বিষয়টি তোলা হলে তিনি বলেন, আমাদের টাকা নেয়া যৌক্তিক। তার পরও যদি মন্ত্রণালয় জবাব চায় আমরা আমাদের জবাব অবশ্যই দেব। অভিযোগ উঠেছে শান্তিনগরের কিডস টিউটোরিলাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও। এখানে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির সময়ই নেয়া হচ্ছে ২৬ হাজার টাকা। অভিভাবকরা একই অভিযোগ এনেছেন, একটা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তিতেই এভাবে টাকা নিতে পারলে অন্যর তো এই সুযোগ গ্রহণ করবেই। মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি দেখা উচিত।

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফর্ম পূরণের ক্ষেত্রেও রীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর দনিয়া কলেজ শিক্ষা বোর্ডের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এইচএসসি পরীক্ষার ফর্মপূরণ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্ধারিত ফী’র তুলনায় শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কয়েকগুণ বেশি টাকা আদায় করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বোর্ডের নির্ধারিত ফী অনুযায়ী বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১৭৭০ টাকা ও মানবিক/ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১৫৭০ টাকা প্রদান করবেন। কিন্তু দনিয়া কলেজে নিয়মিত শিক্ষার্থীর ৭ হাজার ৭৫ টাকা ও অনিয়মিত শিক্ষার্থীর জন্য ৭ হাজার ১৭৫ টাকা প্রদানের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে এসএসসির ফর্ম পূরণে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত ফী এখনও ফেরত না দেয়ায় ২৫ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে কারণ দর্শাও নোটিস দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড। কেন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে না সে বিষয়ে আগামী ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে জবাব দিতে বলা হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. শ্রীকান্ত কুমার চন্দ বলেছেন, এইচএসসির ফর্ম পূরণে যাতে কেউ বেশি টাকা নিতে না পারে সেজন্য আগেই আমরা সতর্ক করেছি। এসএসসির বিষয়টিতে ২৫ প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। দেখি, তারা কি জবাব দেয়। এরপর অবশ্যই বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

১৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: