মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মুক্তিযুদ্ধে নারী

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪
  • সাবিনা ইয়াসমিন

মুক্তিযোদ্ধার কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে অস্ত্র হাতে এক বীরপুরুষের অবয়ব ভেসে ওঠে। কিন্তু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শুধু পুরুষরা নয়, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে নারীও। তবু মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের কথা এলে নির্যাতিত আর ধর্ষিত হওয়ার কথাই বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্রে ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার কথা উল্লেখ রয়েছে। বীরাঙ্গনা বা ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা এতবেশি বলা হয়েছে যে তার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে নারীর অস্ত্র হাতে বীরত্বের কথা, সাহসিকতার কথা। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের ইতিহাস সমানভাবে বীরত্বের ও গৌরবের। অথচ সেই গৌরবের ইতিহাসের অনেকটাই রয়ে গেছে অনালোচিত ও অজানা।

তারামন বিবি, সিতারা বেগম কাঁকন বিবির মতো গুটিকয়েক নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথাই কেবল জানি। ইতিহাস আর স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছে অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধা।

বীরযোদ্ধা করুন। যুদ্ধ শুরু হলে স্বামী শহীদুল যুদ্ধে যোগদান করেন। কিন্তু রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে শহীদ হয় শহীদুল। স্বামীর মৃত্যুর একমাস পর তিন বছরের মেয়েকে মায়ের জিম্মায় রেখে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। বরিশালের মুলাদী থানার কুতুব বাহিনীর অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন করুনা। এই বাহিনীর ৫০ জন নারীযোদ্ধার কমান্ডার হন তিনি। অসীম সাহসিকতা আর বীরত্বের সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের দায়িত্ব পালন করেন করুনা ও তাঁর নারী মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী। এক অপারেশনে পাক বাহিনীরত এলোপাতাড়ি গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। আর তাতে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে হয় করুনাকে।

মনোয়ারা বেগম শত্রু ও শত্রু শিবিরের গোপন খবর পৌঁছে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। পাক বাহিনীর গতিবিধির খবর জানতে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন কিশোরগঞ্জ সদর। নিকলী ও বাজিতপুরের আশপাশের এলাকায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ কাজ করে গেছেন মনোয়ারা। এ ছাড়াও তিনি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সংগ্রহ ও রান্না করা, যুদ্ধাহতদের সেবাশুশ্রƒষাসহ সবই করেছেন।

সিরাজগঞ্জের মনিকা সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন একাধিকবার। রাজাকার ও পাক বাহিনীর আসা যাওয়ার খবরসহ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আদান-প্রদান করতেন। বন্দুক চালাতে না জানলেও অস্ত্রহাতে ক্যাম্প পাহারা দিয়েছেন। সম্মুখযুদ্ধে সহযোদ্ধাদের গুলি-বোমা বহন করেছেন।

’৭১ এ ফাতেমার বয়স ছিল ১৩ বছর। মাথার চুল ছোট থাকায় তাকে ছেলেই মনে হতো। মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের এই কিশোরী জীবনবাজি রেখে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। কাদেরিয়া বাহিনীর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা, অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাহারা দেয়া, খবর আনা নেয়াসহ অস্ত্র সরবরাহ করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা কাঞ্চনমালার বাড়ি লৌহজং থানার কমলা ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম ডহরিতে। যুদ্ধের দু’বছর আগে বিয়ে হয় তার। ’৭১-এ পাকবাহিনীর ধরপাকড়ে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয় কাঞ্চনমালা। ক্যাম্প থেকে একদিন পালাতে গিয়ে পুনরায় পাকি সেনার হাতে ধরা পড়ে। নির্মম পাশবিক অত্যাচারে জ্ঞান হারালে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে মৃত ভেবে নদীর ধারে ফেলে যায়। এক মুক্তিযোদ্ধার সহায়তায় সে যাত্রায় বেঁচে যায় কাঞ্চনমালা।

ভারতের তুরা ক্যাম্প হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। টাঙ্গাইল ও ঘাটাইলে কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সাহসিকতা আর বীরত্বের পরিচয় দেন তিনি।

দেশ স্বাধীন হবার মাত্র কয়েকদিন আগে পাক বাহিনী আর তাদের দেশীয় দোসরদের নির্মমতার শিকার হন সাংবাদিক সেলিনা পারভীন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে ১৩ ডিসেম্বর তাঁর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় মিলিটারি জিপ। ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় তাঁর মৃতদেহ। সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের মতো পাক বাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকার আলবদরের রোষানলে পড়েন কবি মেহেরুন নিসা। রাজাকার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন তিনি।

সাধারণ মানুষ জানে না মুক্তিযুদ্ধে নারীর কতবড় ভূমিকা ছিল। জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে নারীও অংশ নিয়েছিল। সাহসিকতা আর বীরত্বের পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি অনেক নারী যোদ্ধার কপালে। ইতিহাসের পাতায়ও ঠাঁই হয়নি করুনা, মনিকা, ফাতেমা আর কাঞ্চনমালার মতো আরও অনেক নাম না জানা নারী মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে তাঁরা হয়ে আছেন অদৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধে পুরুষরা করেছেন দু’রকম যুদ্ধ। দেশরক্ষা আর জীবন রক্ষার যুদ্ধ। আর নারী তখন করেছেন তিনটি যুদ্ধ। দেশরক্ষা, জীবন রক্ষার পাশাপাশি তাদের ছিল সম্ভ্রম রক্ষার আরেক যুদ্ধ। অথচ মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের ইতিহাস কেবল পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের।

স্বাধীনতা লাভের পরও নারী মুক্তিযোদ্ধা আর বীরাঙ্গনাদের করতে হয়েছে বেঁচে থাকার অন্যরকম আরেক লড়াই। নারী যোদ্ধাদের অনেকেই স্বীকৃতি পাননি, পাননি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা। রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতায় বীরেরা যুদ্ধে জয়ী হলেও জীবনযুদ্ধে হয়েছেন পরাজিত। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়ার কথা বললেও এখনও তা কাগজ কলমেই রয়ে গেছে।

বাঙালী বীর নারীরা চরম অবহেলা আর উদাসীনতার আড়ালে পড়েও তাদের কর্তব্য পালন করে গেছেন নীরবে, নিভৃতে। ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতেও তারা ছিলেন সোচ্চার। সিতারা বেগম ও কাঁকন বিবিদের পর সে পথ দেখিয়েছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, কবি সুফিয়া কামাল। তাদের পথে আজ হাঁটছে এ প্রজন্মের নারীরা, মায়েরা, মেয়েরা। যুগে যুগে দেশ ও জাতি গঠনে নারীর অবদান স্বীকৃতি না পেলেও নারীর কৃতিত্ব তাতে মলিন হবে না এতটুকুও। কেননা নারীই জননী, আর জননী মানেই তো জন্মভূমি।

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

১৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: