রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সবুজ রমনা

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ইশতার রাহা

রাজধানী ঢাকায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বিস্তৃত সবুজ মাঠ ও বনভূমির বেষ্টনী। কোলাহল-যান্ত্রিকতার ভিড়ে কংক্রিটের এ শহরে মিলিয়ে যাচ্ছে পাখির কলরব ও সবুজের সৌরভ। বটের ছায়ায় নদীর কুলে রাখালের প্রকৃতি অবলোকনের স্মৃতি এখন কেবল উপন্যাসের পাতায়। বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়াবহ। মিল-কারখানার বর্জ্যে ভরা নদী এখন দূষণের মাত্রা ছাড়িয়ে বিপর্যয়ের পথে। পাশাপাশি চলছে ভূমিদস্যুদের নদী দখল ও অপরিকল্পিত ড্রেজিং। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার কারণে যেখানে সেখানে জনবসতির ফলে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। আবর্জনার স্তূপে ভরা নালা ও নর্দমা এমন শহরে সবুজের যতটুকু ছটা তার সবটায় কেবল রমনা। পার্ক কিংবা উদ্যান যে নামেই ডাকা হোক, রমনা ঢাকার অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ার কারণে রমনার গুরুত্ব ও আকর্ষণও কম নয়। প্রতিবছর রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমেই শুরু হয় নববর্ষের সূচনা। এছাড়া রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা ও নিদর্শন দ্বারা পরিবেষ্টিত রমনা উদ্যান। ফলে এ এলাকার নিরাপত্তা বিষয়টিতে বিবেচ্য। সম্ভবত এ কারণে রমনা থানা সত্ত্বেও শাহবাগ থানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রমনা পার্ক ঢাকার অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি বিনোদন কেন্দ্র। প্রতিদিন অসংখ্য নাগরিক এ পার্ক প্রভাতে এবং সন্ধ্যায় হাঁটতে এবং শরীরচর্চা করতে আসেন। রমনা উদ্যানে একটি লেক এবং অসংখ্য গাছ রয়েছে। নানা প্রজাতির গাছপালা এ এলাকার নান্দনিক শোভা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যস্ত শহরে নগরবাসীকে একখ- প্রকৃতির পরশ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

ধুসর শহরে সবুজ উদ্যানের কারণে রাজধানীতে আসা যে কোন আগন্তুকের কাছে রমনা উদ্যান এক বিস্ময়। কারণ শহরজুড়ে সবুজের এমন নিপুণ হাতছানি খুঁজে পাওয়া যায়।

তাই রমনার স্মৃতি কখনও ভুলবার নয়। ঢাকা নিবাসী নাগরিকদের স্মৃতিতে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে পার্কটি। পৌঢ় কিংবা যুবা সব বয়সীদের কাছেই মোহময়ী এক স্থান রমনা। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় এ স্থানে ছুটে আসার ব্যাকুলতা তাই সকলের। সকাল-সন্ধ্যা সর্বক্ষণ সব বয়সী নাগরিকের পদচারণায় মুখরিত রমনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিন্টো রোডের কারণে অভিজাত শ্রেণীর উপস্থিতিটাও লক্ষ্য করার মতো। সকাল-সন্ধ্যা এ সব এলিটদের উপস্থিতির কারণে রমনা পার্কের মিন্টো রোড গেটে ফলমূলের পসরা সাজিয়ে ভিড় করে থাকে অসংখ্য ফেরিওয়ালা। অভিজাত গ্রাহকদের লক্ষ্য রেখেই এমন আয়োজন। রমনা উদ্যান বরাবরই এলিটদের প্রাণকেন্দ্র। মুঘল আমল থেকেই এ ধারাবাহিকতা। কোম্পানি ব্রিটিশ কিংবা পাক শাসনেও এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি। ফলে সরকারী পর্যায়ে এ উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিপাটি করে রাখার বিষয়টি বেশ গুরুত্বসহকারে প্রচেষ্টা করা হয়।

রমনার বর্তমান সীমানা যাই হোক না কেন, মুঘল আমল থেকেই একটি বিশেষ এলাকা হিসেবে রমনা সকলের কাছে বিবেচ্য।

রমনার গোড়পত্তন ও নামকরণ সবটায় মুঘলদের। ১৬১০ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ঢাকা ছিল সুবেদার ইসলাম খাঁর শাসনাধীন। ‘রমনা’ ফার্সি শব্দ, যার অর্থ সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর; ইংরেজীতে যা লন।

রমনার সীমানায় ওই সময় দুটো আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে- চিশতিয়া ও সুজাতপুর। এ নামেও রমনা এলাকাকে ডাকা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে নামগুলো হারিয়ে গেলেও টিকে যায় রমনার নাম। সুবেদার মুহাম্মদ আজমের শাসনামলেও রমনা এলাকায় বেশ কিছু স্থাপনার গোড়াপত্তন ঘটে। পুরনো হাইকোর্ট ভবন থেকে বর্তমান সড়ক ভবন পর্যন্ত মুঘলরা অসাধারণ এক বাগান তৈরি করে। যার নামকরণ করা হয় বাগ-ই-বাদশাহী। এ নামেও রমনাকে ডাকা হতো। কিংবা শতকের গোড়ার দিকেও এ এলাকায় বিশাল এক ফটক দেখা যেত। যা বাদশাহী বাগানের ফটক নামে ঢাকাবাসীর কাছে পরিচিত ছিল। যা হোক, মুঘলদের রাজধানী স্থানান্তর রমনাকে বিরান অঞ্চলে পরিণত করে। বাদশাহী বাগান পরিণত হয় ভূতের জঙ্গলে। অযতেœ ও অবহেলায় জঙ্গলাকীর্ণ রমনা কোম্পানি আমলে পুরান ঢাকার স্বাস্থ্যনাশের কারণও হয়েছিল। ব্রিটিশ নথিতে এ তথ্য পাওয়া যায়।

মুঘল আমলে গড়ে ওঠা দুই অভিজাত এলাকাও (সুজাতপুর ও চিশতিয়া) পরিণত হয় তখন কবরস্থানে।

রমনা পুনরুদ্ধারে প্রথম এগিয়ে আসেন তৎকালীন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস। পরিবেশবাদী চার্লস ডস সর্বশক্তি নিয়ে নেমে পড়েন ঢাকা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজে। বাসযোগ্য ভূমিতে পরিণত করতে তিনি ঢাকার বন্দী কয়েদিদের এ কাজে নিয়োগ দেন। ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করার এমন প্রয়াসের জন্য তাঁর নাম হয়ে যায় ‘একসেনট্রিক সিভিলিয়ান’। তিন মাস ধরে জঙ্গল সাফ করার পর ডস রমনা পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেন। ১৮২৫ সালে ডসের এ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কারণেই বায়ু চলাচলের পথ পরিষ্কার হয়। চার্লস ডস পরিচ্ছন্ন ডিম্বাকৃতি অংশটি কাঠের রেলিং দ্বারা পরিবেশন করে তৈরি করেন রেসকোর্স।

ডস এ এলাকায় প্রচুর দুষ্প্রাপ্য গাছ লাগিয়েছিলেন। ধারণা করা হয় নেপাল হতে এ সব গাছ আনা হয়। ডস রমনা এলাকাটিতে অভিজাত নেটিভ ও ইংরেজদের একটি বিনোদন কেন্দ্র পরিণত করার চেষ্টা করেন। প্রবেশ মুখে স্তম্ভ এবং একটি টিলাও তৈরি করেন। এ অঞ্চলকে তখন রমনা গ্রীন নামে ডাকা হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ডস ঢাকা ত্যাগের পরই রমনা পুনরায় বিরানভূমিতে পরিণত হয়। ১৯৫৯ সালে রেসকোর্স ও রমনা প্লেন দুই অংশে ভাগ করা হয় রমনা উদ্যান। এবং রমনা পরিণত হয় আবারও বিরান ভূমিতে। ১৮৫৯ সালের নথিতেও রমনা ছিল এক বিরান ভূমি। পরবর্তীতে ঢাকার নবাব বা পুনরায় রমনার আশপাশে নানা স্থাপনা তৈরির মাধ্যমে অভিজাত এলাকা হিসেবে রমনাকে প্রস্তুত করেন।

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

১৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: