মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সবুজে থাকা সবুজে বাঁচা

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪
  • তৌফিক অপু

‘কোন্ বনেতে কটার বাসায় বাড়ছে ছোট ছানা,

ডাহুক কোথায় ডিম পাড়ে তার নখের আগায় জানা।

সবার সেরা আমের আঁটির গড়তে জানে বাঁশী,

উঁচু ডালের পাকা কুলটি পাড়তে পাড়ে হাসি।

বাঁশের পাতায় নথ গড়ায়ে গাবের গাঁথি হার,

অনেক কালই জয় করেছে শিশু মনটি তার।’

পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের বিখ্যাত কাব্যগ্রস্থ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ এর এই চরণগুলোর মতোই ছায়া সনিবিড় শান্ত এক প্রকৃতির অপর নামই ছিল বাংলাদেশ। প্রকৃতির অপর লীলাই ছিল শৈশবের খেলার সাথী, গাঁয়ের কোল ঘেঁষে স্নিগ্ধ টলটলে পানির নদী বয়ে যাওয়া এখন আর চোখে পড়ে না। আমের আঁটির বাঁশি। বাঁশের পাতার নথ কিংবা গাবের গাঁথির মালা অতীত হয়েছে অনেক আগেই। এখনকার গ্রামের শিশুর শৈশবেও প্রকৃতি বুঝি নিত্যসঙ্গী হতে পারছে না। জনসংখ্যার আধিক্যতা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং বাসস্থান নির্বাচনে নির্বুদ্ধিতার পরিচয়ই বুঝি এর মূল কারণ।

বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের যে দুর্বার অন্দোলন চলছে আমাদের দেশও তার বাইরে নয়। বরং আমাদের দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয় অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এ বিষয়ে বিশ্বের মানুষ যতটা সচেতন আমরা ঠিক তার উল্টো। অন্যান্য দেশের মানুষের চিন্তায় যেখানে ঘুম হারাম হবার উপক্রম সেখানে আমরা নিধিরাম সরদার হয়ে বসে আছি এবং আরও বেশি করে প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট করে চলছি। একবারও ভাবছি না নিজেরাই যে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছি।

কবির সেই কবিতার কথাতেই যদি ফিরে যাই, সেখানে সোজন তার ছোট বেলার খেলার সাথী দুলীকে সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতির কোলে ছুটে বেড়াত, এ গাছ থেকে ও গাছে চড়তো সে সব বর্ণনা বোধ হয় এখনকার কবিদের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। কবিতার রসবোধের একটি জায়গা আজ নিজেরাই সঙ্কুচিত করে ফেলেছি। কারণ কবি জসীম উদ্দীনের রেখে যাওয়া সেই প্রকৃতি যে এখন অর নেই। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে কতশত গাছ।

পরিবেশ সংরক্ষণ, বৈশ্বিক উষ্ণতা, ওজনস্তর সংরক্ষণ, কার্বন নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি নেতিবাচকতা থেকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গাছ। যে কোন দেশের সার্বিক পরিবেশ সুরক্ষার জন্য অন্তত ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমান বনভূমির পরিমাণ মাত্র ৬-৭ শতাংশ। যা সত্যিকার অর্থেই আশঙ্কাজনক। প্রয়োজনে, অপ্রযোজনে কিংবা স্বার্থের টানে নির্বিচারে গাছ কেটে নিজেদের বিপদ যেন নিজেরাই ঢেকে এনেছি। অথচ বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ আমাদের নেই এতে।

সত্যিই সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ! দিনে দিনে আরও বেশি করে ধ্বংসের ষোলকলা চালিয়ে যাচ্ছি। পরিসংখ্যান মতে আমাদের মাথাপিছু বনভূমির পরিমাণ ০.০২২ হেক্টর। যা আজ থেকে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে ছিল ০.০৩৫ ভাগ। ফারেস্টি মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ১৯৮১-৯০ সাল পর্যন্ত মোট বনভূমি ধ্বংসের হার ৩.৩ শতাংশ। যা বর্তমানে আরও বেশি। সে হারে আমরা গাছ কেটে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনছি তাতে গড়ে মাথাপিছু বনভূমি শূন্যের কোটায় আসতে খুব বেশিদিন সময় লাগবে না।

দিন যতই এগোচ্ছে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। বেড়েছে শিক্ষার হার। কিন্তু এই পুঁথিগত বিদ্যা যেন কাজে আসছে না। কারণ আমরা স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারিনি। পারিনি উন্নত মন মানসিকতার পরিচায়ক হতে, এছাড়াও অশিক্ষিতের হার আশঙ্কাজনক হারে রয়েই গেছে। মূলত অশিক্ষা, অজ্ঞতা জনসংখ্যার আধিক্যতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নই বনভূমি ধ্বংসের অন্যতম কারণ। এছাড়া রয়েছে ভূমিদস্যুদের আগ্রাসন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমনÑ ঘূর্ণিঝড়, বন্যা-জলোচ্ছ্বাস তো রয়েছেই। আমাদের দেশের বনভূমিগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ বনভূমি হচ্ছে সুন্দর বন, শুধু আমাদের দেশেই নয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হচ্ছে সুন্দরবন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কাঠ পাচারকারীদের কারণে সৌন্দর্য হারাচ্ছে সুন্দর বন। এছাড়া বন দখল করে চলছে শুঁটকির কারবার এবং লোকসংখ্যার চাপে বনভূমি কেটে তৈরি হচ্ছে কৃষিজমি। যেহেতু ম্যানগ্রোভ ফারেস্ট প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়ে থাকে তাই এতে বাধা পড়লে বনভূমি দারুণভাবে প্রতিহত হয়।

বাংলাদেশের বনভূমির আরও বড় একটি অংশ হচ্ছে পাহাড়ী বনভূমি, দেশের মোট কাঠের চাহিদার ৪০ শতাংশ আসে এসব পাহাড়ী বনভূমি থেকে। কিন্তু অপরিকল্পিত জুমচাষ পাহাড়ী বনভূমিকে দারুণভাবে বিনষ্ট করে। এতে করে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে পাহাড়ী বনভূমি। এছাড়া পাহাড়ে এক প্রকার ভূমিদস্যুদের নজর পড়ায় তারা পাহাড়ী বনভূমি ধ্বংসে মত্ত হয়ে উঠেছে। গাছ পাচারকারীরা সরকারী নীতিমালার তোয়াক্কা না করে অসাধু বনকর্মীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নির্বিচারে উজার করছে বনের গাছ। যার ফলে প্রকৃতি তার সৌন্দর্য এবং ভারসাম্য দুটোই হারাচ্ছে। আবার দেশের অন্যদিকে মধুপুরের গড় এবং শালবন নগরায়নের ফলে ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। শালগাছের পরিমাণ আগের থেকে এখন অনেক কম। দখল, চোরাচালান, অবৈধ পাচার, কারখানা স্থাপনসহ নানা কারণে ধ্বংসের মুখে শালবন। দিনে দিনে সঙ্কুচিত এ বনভূমির সঙ্গে হারিয়ে প্রাকৃতিক অন্যান্য অমূল্য সম্পদ যেমন বন্যপ্রাণী, পাখি কিংবা কীটপতঙ্গ, এরাও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় দারুণভাবে কাজ করত। আজ নিজেরাই নিজেদের হাতে সবকিছু ধ্বংস করে নিঃস্ব হওয়ার পথে। এখনও সময় আছে এর থেকে পরিত্রাণের।

পাহাড়ের আর্তনাদ

প্রতিবছরই চাপা আর্তনাদের শব্দ আমাদের শুনতে। যা আমরা শুনতে আগ্রহী নই। তারপরেও চোখের সামনে প্রতিবছরই এ আর্তনাদের দৃশ্য দেখতে হয়। পাহার ধস আমাদের কাছে চেনা শব্দ এবং চেনা দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। তাকিয়ে দেখা ছাড়া যেন কিছুই করার নেই। অথচ এই নির্মম কর্মকা-ের জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। বেপরোয়াভাবে পাহাড় কেটে রাখার দরুণ এই পাহাড় ধস। নিজেরা একটু ভাবি কেন করছি এ ধরনের ঘৃণ্য কাজ? শুধুই কি নিছক কিছু স্বার্থের লোভে?

বেরিয়ে আসা উচিত এ ধরনের অপরাধ থেকে। রক্ষা করা উচিত প্রকৃতিকে। তা-না হলে নিজেদের ফাঁদে নিজেদেরই মরতে হবে।

মরা নদীতে বান

যেন তেনভাবে বালু উত্তোলন করে নদীকেও মেরে ফেলেছি আমরা। নদী দখল উৎসবে মেতে ঢাকার আশ পাশের নদীগুলো বিলীন করে ফেলেছি। যে কারণে যখন তখন বন্যার হানা দেয়া আমাদের তাকিয়ে দেখতে হয়। এ ব্যাপারে জোড়ালো আওয়াজ তুলতে হবে।

বনভূমি রক্ষায় যত আয়োজন

বাংলাদেশের পরিবেশ অনেকাংশে গাছের ওপর নির্ভরশীল। এখানে গাছ কাটা বা পাচার করা অবশ্যই রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ বলে বিবেচনা করা উচিত। দেশে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ অভিযান চলে এবং বৃক্ষমেলা হয়। এতে গাছের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়। মানুষ গাছ কেনে এবং লাগানোর উদ্যোগ নেয়। সরকারীভাবেও গাছ লাগিয়ে, বন সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয় যা প্রশংসনীয়। যদিও যে হারে বন ধ্বংস হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ করা কঠিন। সেজন্য বৃক্ষরোপণ খুব বেশি জরুরী। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করে তোলা উচিত বৃক্ষরোপণের ব্যাপারে। পাচারকারীদের হাত থেকে বন রক্ষা এবং চুরি যাতে না হয় সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করা বিশেষভাবে জুরুরী। উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীর প্রতি আমাদের জোর দেয়া উচিত। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের নিজেদের আরও সচেতন হয়ে বৃক্ষরোপণ এবং এর লালনের ব্যাপারে বিশেষভাবে যতœবান হতে হবে, তা না হলে সরকারের হাজার চেষ্টা ব্যর্থতে পরিণত হবে। নিজেদের প্রয়োজনেই নিজেদের সচেতনতা তৈরি জরুরী।

নগরীতে বনায়ন

বর্তমানে আমাদের ঢাকা শহরের যে অবস্থা তাতে করে চাইলেই আমরা জায়গা ফাঁকা করে গাছ লাগাতে পারব না। গায়ে গা লাগিয়ে একের পর এক দালান যেন আকাশটাই ঢেকে দিচ্ছে। নিজেদের হাঁটা চলার রাস্তাটুকু আমরা রাখছি না। সেখানে গাছের জন্য জায়গা করে দেয়া যেন অনেকটাই অসম্ভব। তবে মন্দের ভালোর মধ্যে যে ব্যাপারটি লক্ষণীয় সেটা হচ্ছে এখন প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদেই ছোট বড় নার্সারি গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ নিজেদের পছন্দের গাছ দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে পুরোটা ছাদ। অনেকে আবার বড় বড় ফলের গাছও ছাদে ঠাঁই করে নিয়েছেন। মজার বিষয় ছাদে ধান চাষ পর্যন্ত হয়েছে। যা সবুজের প্রতি ভালবাসার প্রতিচ্ছবি। দেরিতে হলেও যখন আমাদের উপলব্ধি হয়েছে তখন গাছ লাগানোর জায়গা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এখন বাধ্য হয়েই ছাদে বনায়ন করতে হচ্ছে। এটাও একটা ইতিবাচক দিক। কেউ ফলের গাছ কেউ বা ঔষধি গাছ ছাদে লালন করছেন। আর ফুলের গাছ তো বলাই বাহুল্য। সেটা ছাদ ছাড়াও ঘরের বেলকনিতেও শোভা পায়। বিভিন্ন কর্পোরেট অফিস তাদের রুমগুলো বর্তমানে গাছ দিয়ে ডেকোরেশন করে থাকে। যে কারনে চাহিদা বেড়েছে ইন হাউস প্ল্যান্টের। ভুল যা হওয়ার হয়ে গেছে কিন্তু আগামীতে কোন ভুল হতে দেয়া যাবে না। সবুজ বিনষ্টে কোন আপোষ চলা উচিত নয়। আগামীর প্রজন্মের জন্য সুন্দর বাসস্থান রেখে যেতে হবে। যতটুকু সবুজ এখন আমাদের রয়েছে তা না কমিয়ে বরং বাড়নো উচিত। সরকারী নজরদারি আরও বেশি জোরদার করা উচিত। নগরির প্রতিটি ছাদ যদি সবুজে ভরে যায় তাহলে উপর থেকে দেখতে মনে হবে ঘন সবুজ বন। আমাদের ঢাকা এভাবেই যেন সবুজে ভরে ওঠে।

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

১৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: