আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একুশ শতক ॥ জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনা

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

॥ পর্ব : দুই ॥

সেই হাসিনা একাত্তরে বন্দিত্ব বরণ করেন বাবা ও ভাইদের রাজনীতির জন্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি দলীয় রাজনীতির কোন কিছুতে তেমনভাবে যুক্ত হননি। পঁচাত্তর পর্যন্ত বলতে গেলে রাজনীতির সঙ্গে তেমন কোন সম্পর্কও ছিল না। বাবা ক্ষমতার কেন্দ্রে বসবাস করার পরও তাঁর জীবনধারা ছিল সাধারণ আটপৌঢ়ে মধ্যবিত্ত গৃহিণীর। প্রাণে বেঁচে যান পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট দেশের বাইরে ছিলেন বলে। প্রায় ছয় বছরের বিদেশ অবস্থানকালে তাঁকে জীবনের হিসাব নতুন করে করতে হয়েছে এবং ১৯৮১ সালে তাঁকে যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় তখন জাতির জনকের এই দলটি প্রায় মৃত্যুর মুখে। পাকিস্তানের আইএসআই ও জিয়াউর রহমানের ডিজিএফআই-এর চরদের দ্বারা দলটি যখন সম্পূর্ণ বিভক্ত হওয়ার পথে তখন তিনি এর হাল ধরেন। আজকের আওয়ামী লীগ কার্যত একেবারে শূন্য থেকে শেখ হাসিনার হাতে গড়া। তিনি তাঁর বাবার আমলের চাচাদের সঙ্গে রাজনীতি করে যেভাবে তাল মিলিয়ে চলেছেন সেটি একেবারেই অনন্য। তিনি জানতেন অনেকেই তাঁকে আওয়ামী লীগের নেত্রী হিসেবে ঠিকভাবে মানতে পারতেন না। কাদের সিদ্দিকী তো সেজন্য আওয়ামী লীগ থেকে বেরই হয়ে যান। তাঁরা তাঁর বাবার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন এবং অনেক বিষয়েই তাঁরা শেখ হাসিনার চাইতে অনেক বেশি বুঝতেন বলে মনে করতেন। এঁদের কেউ কেউ পরে আওয়ামী লীগ ছেড়েও যান। কিন্তু তিনি সকলকে নিয়েই আওয়ামী লীগ গড়ে তুলেছেন। তিনি জানতেন, যে যাই বলুক আওয়ামী লীগকে তাঁর মতো করেই গড়তে হবে। দলে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে কতটা সময় লেগেছে এবং তিনি কিভাবে সেই দুরূহ কাজটি করেছেন যাঁরা ৮১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি ভেতর থেকে দেখেছেন তাঁরাই বলতে পারবেন। কোন সন্দেহ নেই যে, এই বিশাল দলটিতে লাখ লাখ মানুষের অবদান আছে। তবে শেখ হাসিনাকে বাদ দিলে পঁচাত্তরের পরের আওয়ামী লীগকে কখনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটি বড় দৃষ্টান্তের কথা এখানে উল্লেখ না করে পারা যাবে না। তিনি বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা বাকশালের বাইরে নিয়ে আসেন আওয়ামী লীগকে। কাজটি কেবল কঠিন নয়, দুঃসাহসীও ছিল। নতুন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক বাকশাল নামক সেই দলটির পতাকা বহন করেন এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূলস্রোত হিসেবে সেটিকেই আদর্শগতভাবে মনে করা স্বাভাবিক ছিল। শেখ হাসিনা অনুভব করেছেন যে, একদলীয় বাকশাল এবং বহুল আলোচিত সমাজতন্ত্র নিয়ে খুব বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া যাবে না। তখনকার বিশ^প্রেক্ষিতকে তিনি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। বিশেষ করে তখনকার প্রেক্ষিত এমন ছিল যে দেশটা প্রায় পাকিস্তান হয়ে যায়। দুনিয়াতে সমাজতন্ত্রের পতন হচ্ছে। তখন যদি তিনি বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রকে আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শ হিসেবে সবার ওপরে তুলে না ধরতেন, তবে আজকের বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মূল রাজনীতির কোন অস্তিত্ব থাকত না। আওয়ামী লীগ হয়ত বাকশাল নামে জাসদ-বাসদের মতো আরও একটি দল হয়ে থাকত। অনেকেই বলেন যে, শেখ হাসিনার উত্তরাধিকারই হচ্ছে বড় শক্তি। এটিকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটি সত্য। কিন্তু শুধুমাত্র উত্তরাধিকার যদি রাজনীতির নিয়ামক হতো তবে আরও অনেকের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনার মতো সফল হতো। শেখ হাসিনার নিজের প্রজ্ঞা না থাকলে মওলানা ভাসানীর ন্যাপ আজ যে অবস্থায় আছে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের সেই দশা হতো। কথাটি নির্মম- কিন্তু সত্য।

বাস্তবতা হলো, সুদীর্ঘ পনেরো বছরের একক রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। একুশ বছর পর দল হিসেবে আওয়ামী লীগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু তার চাইতে বড় কাজটি দিয়েই শেখ হাসিনা তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব শুরু করেন। আমি এমন একজন মেয়ের পিতা এবং এমন একজন বোনের ভাই হতে পারলে গর্ব করতাম এজন্য যে, তিনি সন্তানের- বোনের দায়িত্ব পালন করার জন্য ১৫ আগস্টে খুনীদের আইনসঙ্গত বিচার করেন। কোন অস্থিরতা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশে তিনি আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি খুনীদেরকে। এতে কেবল যে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত দায় মোচন করেছেন তাই নয়, এর ফলে দেশে আইনের শাসন সমুন্নত হয়েছে এবং সেই একটি বিচারের ধারাবাহিকতায় আজ পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিলের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। এ জন্যই বাংলাদেশের ইতিহাস শেখ হাসিনাকে ন্যায় বিচারের প্রতীক হিসেবে দেখবে। এর পাশাপাশি বেগম খালেদা জিয়া দুইবার প্রধানমন্ত্রী থাকার পরেও তার নিজের স্বামী হত্যার বিচার করতে সক্ষম না হয়ে প্রমাণ করেছেন যে, আমরা দুই রমণীকেই যে এক কাতারে দাঁড় করাই তার কোন যুক্তি নাই। আমার নিজের কাছে মনে হয় বেগম খালেদা জিয়ার দুটি বড় ব্যর্থতা তিনি কোনদিন ঢাকতে পারবেন না। এর একটি হলো, তিনি জিয়াউর রহমানের মতো একজন মানুষের স্ত্রী হিসেবে তাঁকে যারা খুন করেছে এবং যারা এই খুনের জন্য দায়ী তাদের চেহারা জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, তিনি একজন যথার্থ মা হিসেবে তাঁর দুটি সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। দেশে যদি আওয়ামী লীগের বিরোধিতাকারী শক্তি এত বিশাল না হতো তবে তিনি তাঁর দলও গড়তে পারতেন না- এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হতে পারতেন না। তিনি হলেন সময়ের দাবিতে তৈরি হওয়া রাজনীতিক। সময়ের চাহিদা না থাকলে তিনি রাজনীতি থেকেও বিদায় হয়ে যাবেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের দুটি সময়কালে বাংলাদেশের পরিবর্তন এবং শেখ হাসিনার এগারো বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কালের পরিবর্তনের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরলেই বোঝা যাবে তাদের দু’জনের মাঝে কি বিশাল ফারাক রয়েছে। এই দু’জন কেবল আলাদা মানবসত্তা নন, দুটি আলাদা ব্যক্তিত্ব।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সময়কালে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্ব সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি বাংলাদেশের জন্য আনে সেটি হচ্ছে, তখন তিনি একটি আধুনিক বাংলাদেশের রূপরেখা এই জাতিকে উপহার প্রদান করেন। যিনি অর্থনীতিবিদ নন, কিন্তু তিনি বাংলাদেশের উপযোগী গতিশীল অর্থনীতির ছকে দেশটাকে প্রতিস্থাপন করেন। আওয়ামী লীগের সমাজতান্ত্রিক ঘরানার অর্থনীতিকে একুশ শতকের উপযোগী করার কঠিন কাজটি তিনি তার শাসনকালের পাঁচ বছরে সম্পন্ন করেন। যিনি নিজে বিজ্ঞানী নন, কিন্তু তিনি দেশটাকে বিজ্ঞানমনস্ক করেন। শিক্ষার প্রসার, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন থেকে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সকল পর্যায়ে তিনি নতুন শতাব্দীর ভাবনাকে যুক্ত করেন। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে ঋণী এজন্য যে তিনি কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করেন। তিনি একই সঙ্গে মোবাইলের মনোপলি ভাঙ্গেন এবং অনলাইন ইন্টারনেটের প্রসার ঘটান। সেই সময়ে যদি এমন কিছু সিদ্ধান্ত না নেয়া হতো তবে আজকের বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি নামক কোন কিছু আমরা খুঁজে পেতাম না।

ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা: অনেকেই বলেন, ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং দিন বদলের ইশতেহার ঘোষণা করে দেশটিকে সত্যি সত্যি ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করিয়েছেন। আসলে ১৯৯৬ সালেই তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখেন। বেগম খালেদা জিয়ার সরকার সেই সিঁড়িটিকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেন এবং দেশটিকে আবার সেই পাকিস্তানী ধর্মান্ধতার মাঝে ঠেলে দেন। শেখ হাসিনা ৯৬-২০০১ সময়কালে দেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে যেসব ইতিবাচক কাজ করেন তার সবই খালেদা জিয়া বন্ধ করে দেন। ৯২ সালে সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত না হওয়া এবং ২০০৩ সালের জেনেভো কনভেনশনের পরবর্তী কোন কার্যক্রম গ্রহণ না করার ফলে আমরা ডিজিটাল বিশ্ব থেকে ছিটকে পড়ি। শেখ হাসিনা সেই জঙ্গীবাদকে কেবল রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করেননি, তিনি এর অর্থনৈতিক কর্মসূচী ঘোষণা করেন। তার মুখে ১২ ডিসেম্বর ২০০৮ যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখন পুরো জাতি একটি নতুন স্বপ্ন দেখে। বিশেষ করে যে নতুন প্রজন্ম একটি উন্নত জীবনের আকাক্সক্ষা নিয়ে স্বপ্ন দেখছে, যে জাতি বিশে^র অন্য সকল দেশের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায় সেই জাতি নিজেকে শক্তিমান ভাবতে থাকে। কেউ কেউ একে একটি আকস্মিক ঘটনা বলে মনে করেন। কিন্তু যদি তারা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের সময়কালে শেখ হাসিনা দেশটির ডিজিটাল রূপান্তরে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তার খবর নেন তবে তাঁরা এটি বুঝতে সক্ষম হবেন যে, এটি কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল না। হতে পারে যে, আমি তাঁর মুখে ডিজিটাল বাংলাদেশ শব্দটি তুলে দিয়েছি। কিন্তু তিনি নিজে যদি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়টি না ভাবতেন তবে তাঁর মুখে কেন, কোথাও এই শব্দ ঠাঁই পেত না। শেখ হাসিনাকে বলার আগেই আমি তো ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. জাফর ইকবাল, এইচ-এন করিমসহ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেছি। কিন্তু তাঁরা তা গ্রহণ করেননি। আমার সৌভাগ্য যে, সেই সময়ে নির্বাচনী ইশতেহারটি প্রস্তুত করার জন্য সমন্বয় করার কাজটি করছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নূহ উল আলম লেনিন। তিনি প-িতদের মতো ডিজিটাল বাংলাদেশ সেøাগানটিকে উড়িয়ে দেননি। ফলে সেটি নির্বাচনী ইশতেহারে ঠাঁই পায়।

বিষয়টি যে আমাদের পরিকল্পনার কতো গভীরে স্থাপিত তার প্রতিফলন আমরা এর সংজ্ঞায় দেখতে পারব। আমার নিজের মতে ডিজিটাল বাংলাদেশ হচ্ছে, সেই সুখী, সমৃদ্ধ, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ যা সকল প্রকারের বৈষম্যহীন, প্রকৃতপক্ষেই সম্পূর্ণভাবে জনগণের রাষ্ট্র এবং যার মুখ্য চালিকা শক্তি হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। এটি বাঙালীর উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা। এটি বাংলাদেশের সকল মানুষের ন্যূনতম মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর প্রকৃষ্ট পন্থা। এটি একাত্তরের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপকল্প। এটি বাংলাদেশের জন্য স্বল্পোন্নত বা দরিদ্র দেশ থেকে সমৃদ্ধ ও ধনী দেশে রূপান্তরের জন্য মাথাপিছু আয় বা জাতীয় আয় বাড়ানোর অঙ্গীকার। এটি বাংলাদেশে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সোপান। কার্যত এটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একুশ শতকের সোনার বাংলা। এই ঘোষণার ফলে শেখ হাসিনা কেবল যে দেশটির অগ্রগতিকে তাঁর জন্মের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তা-ই নয়, বরং দেশটির স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সঙ্গেও সম্পৃক্ত করেছেন।

ঢাকা, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক ॥

ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com,

ওয়েবপেজ:ww w.bijoyekushe.net,ww w.bijoydigital.com

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

১৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: