কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের শাস্তি ইতিহাসের দায়

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪
  • সরদার সিরাজুল ইসলাম

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন। উদ্দেশ্য ছিল যে বাঙালীরা কখনও স্বাধীন ছিল না সে বাঙালীদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দেয়া। দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানের শোষণ, শাসন থেকে মুক্ত করা। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, এলডিএফ বিরোধিতা করলেও কেবল জামায়াত দলগতভাবে পাক সহযোগী সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। প্রথমে রাজাকার পরে আলবদর ডেজিগনেশন নিয়ে সশস্ত্র হয়। বেতন ছিল। গেজেটে তাদের নাম আসে। বাংলাদেশে পাকবাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল তার সিংহভাগ ছিল এদের কারণে। পাকবাহিনী পথ-ঘাট চিনত না, তাই দেশীয় দোসর, রাজাকার ও আলবদররা মুক্তিকামী জনগণ ও মুক্তিসেনা তাদের ভাষায় ‘জয় বাংলা ও মুজিবের বাচ্চাদের বা কাফের’দের মেরে বেহেস্ত যাওয়ার জন্য গাজী বা শহীদ হওয়ার উৎফুল্ল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল।

ইতিহাস সচেতন সবাই জানেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে দুই মাস একটু লম্ফ দিয়েছে। কিন্তু ডিসেম্বর এলে তারা অন্তিমশয্যাগ্রহণ করে। পাকিস্তান ৩ ডিসেম্বর ভারত আক্রমণ করলে ভারত এই অঞ্চলে পাল্টা আক্রমণ চালায় পাকবাহিনীর ওপর। এতে তারা কাবু হয়ে পড়ে কয়েক ঘণ্টায়। ওরা তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-গণচীনের সহযোগিতায় যুদ্ধবিরতি এমনকি পাক কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিয়ে আলোচনায় বসার চেষ্টা করে। কিন্তু মার্কিন সপ্তম নৌবহরের তামাশা এবং চীনের চতুরতা অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারত বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীর সুদৃঢ় নজিরবিহীন ডিপলোম্যাসি পাকদের আত্মসমর্পণ ব্যতীত কিছুই ছিল না। ডিসেম্বরের ৩ তারিখে ভুটান, ৬ তারিখে ভারতের স্বীকৃতি পর ক্যান্টনমেন্ট বাদে ১০ তারিখের মধ্যে প্রায় সব পাকবাহিনী ঢাকার দিকে পালিয়ে এসেছে। ১০ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা ছিল বলতে গেলে অবরুদ্ধ। পাকি এবং শীর্ষ দালালরা প্রাণভয়ে আতঙ্কিত। ১০ ডিসেম্বর মিত্র ভারতীয় বাহিনীর হেলিকপ্টারে রায়পুরায় অবতরণ। ১১ তারিখে মিত্রবাহিনীর ৭শ’ ছত্রিসেনা মধুপুর এলাকায় এবং ভারতীয় ৫টি ব্যাটেলিয়ন এবং জেনারেল নাগরা বাহিনীর টাঙ্গাইলে অবস্থানের পরে পাকিদের পালাবার কোন পথ ছিল না। ১৩ ডিসেম্বর পাকবাহিনী গবর্নর হাউসে বোমাবর্ষণ করলে ভয়ে আতঙ্কিত গবর্নর ডাক্তার মালেক তাঁর মন্ত্রিসভাসহ পদত্যাগ করে শেরাটন হোটেলে আশ্রয় নেয়। পাকি জেনারেল নিয়াজীও প্রাণ বাঁচাবার জন্য ব্যাকুল। আর ইয়াহিয়া মদের বোতল নিয়ে মত্ত হয়ে হাজার মাইল দূরে পশ্চিম পাকিস্তান রক্ষার জন্য (পূর্ব পাকিস্তান নয়) প্রলাপ বকছিলেন।

বাঙালীর বিজয়ে নিশ্চিত হয়ে পাকদোসর জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ তখন আলবদর (এখন শিবির) বাহিনী চালিয়েছিল এক জঘন্য নরহত্যা এই ঢাকায়। জামায়াত একটি তালিকা বানিয়েছিল সমাজের বুদ্ধিজীবী হত্যার। ঢাকায় তখন কারফিউ। ১৩ ডিসেম্বর ওদের ছিল ইপিআরটিসির কাদা মাখানো একটি মাইক্রোবাস। নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে স্বজনদের সামনেই ‘আমাদের সঙ্গে একটু যেতে হবে স্যার’ বলে সেই যে নিয়ে গেল প্রথমে মোহাম্মদপুরে আলবদর হেড কোয়ার্টারে। সেখান থেকে গভীর রাতে (১৪ ডিসেম্বর) রায়েরবাজার ‘বধ্যভূমি’ এলাকায় হত্যা করার পরে মরদেহ শনাক্ত হয় ১৬ ডিসেম্বর। এসব বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ হলেনÑ অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জেল হায়দার চৌধুরী, ডাঃ আলীম চৌধুরী, ডাঃ ফজলে রাব্বী, ডাঃ মোহাম্মদ মুর্তজা, ড. আবুল খায়ের, সাংবাদিক ও লেখক শহীদউল্লাহ কায়সার, সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, অধ্যাপক মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান প্রমুখ।

ডাঃ আলীম চৌধুরীকে (চক্ষু চিকিৎসক) ধরিয়ে দেয়ায় প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছিলেন প্রতিবেশী প্রয়াত মাওলানা মান্নান (এরশাদের মন্ত্রী ও ইনকিলাবের মালিক)। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই ১৯৭২ সালের দালাল আইনে রাজাকার-আলবদরসহ পাকবাহিনীর সহযোগীদের বন্দী করা হয়। সাপ্তাহিক অর্থনীতি ১৮ ডিসেম্বর ’৮৮ সংখ্যায় প্রকাশÑ ১৯৭৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ওই আইনের অধীনে ৩৭ হাজার ৪৭১ জনকে বন্দী করা হয়েছিল এবং একই সময় পর্যন্ত বিচার হয়েছিল ২ হাজার ৮৪৮ জনের যার মধ্যে দ-প্রাপ্ত হয় ৭৫২ জন। অনেকের ফাঁসির হুকুমও হয়েছিল। সাধারণ ক্ষমায় (সাধারণ ক্ষমায় যা খুন, ধর্ষণ, লুটেরার জন্য ছিল না) মুক্তিলাভ করেছিল ৩৬৪০০ দালাল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১-১২-৭৩ তারিখে এ তথ্য প্রকাশ করেন (ফ্যাক্টস এ্যান্ড ডকুমেন্ট-বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- পৃষ্ঠা-৫০)।

১৯৭৩ সালের বিচারের উল্লেখযোগ্য কিছু তথ্য নিম্নে উল্লেখ করা হলোÑ

(সাপ্তাহিক বিচিত্রা-২৮ ডিসেম্বর ১৯৭৩) ৬-১-৭৩ বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলার আসামি খলিলের যাবজ্জীবন কারাদ-। ২৯-৬-৭৩ তারিখে সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন মামলা-রাজাকার খলিলের যাবজ্জীবন কারাদ-। ৩১-৮-৭৩ কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার মুন্নার মৃত্যুদ-। ৩০-৬-৭৩ তাং মুনীর চৌধুরী অপহরণ মামলায় দু’জনের যাবজ্জীবন কারাদ-।

দালাল আইনে বিচারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়ে যারা খালাস পেয়েছে তাদের কিছু তথ্য রয়েছে মওদুদ আহমদের ‘বাংলাদেশ শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’ গ্রন্থের ইংরেজী ভার্সন পৃষ্ঠা ৪৮-৫০। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মশিউর রহমান যাদু মিয়া (আগস্ট ’৭৩), এ টি মৃধা (মে ’৭৩), জবেদ আলী, মোহাম্মদ হোসেন, লুৎফুল মৃধা, আবদুর রহমান বকুল (আগস্ট ’৭৩), একেএম নাজমুল হুদা, হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ নুরুদ্দিন (আগস্ট ’৭৩) প্রমুখ।

পাকবাহিনীর ৯৩ হাজার সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিল। এরা ২ বছর আটক থাকার পরে যুদ্ধবন্দী বিনিময় চুক্তির অধীনে পাকিস্তানে ফেরত যেতে সক্ষম হয়। এছাড়া ছিল অবাঙালী নাগরিক যারা পাকিস্তানে যেতে চায়। তাদের সদস্য এখনও আছে। বঙ্গবন্ধু সরকার এদের মধ্যে থেকে ১৯৫ জনকে তদন্ত শেষে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে শনাক্ত করেন, ১৭-৪-৭৩ তারিখে দিল্লীতে ঢাকা-দিল্লী যৌথ ঘোষণায় এদের বিচার হবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৭ এপ্রিল দিল্লী ঢাকায় এসে বিবৃতি প্রদান করেন। কিন্তু এই ইশতেহার প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভয়েস অব আমেরিকা পাকিস্তানের এক উচ্চপদস্থ সহকারী কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রচার করেÑ ‘বাংলাদেশ যদি যুদ্ধবন্দীদের ক্রিমিনাল অফেন্সের জন্য বিচার করে তবে পাকিস্তানে সমসংখ্যক উর্ধতন বাঙালী সামরিক-অসামরিক কর্মকর্তার বিচার করবে’ অথচ তারা কেউ যুদ্ধাপরাধী নয়। কেবল তারা বাংলাদেশে ফেরত আসতে চেয়েছে এই অপরাধে তাদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে প্রতিশোধমূলক বিচারের পাঁয়তারা করেছিল ভুট্টো। উল্লেখ্য, সঠিক তথ্য না থাকলেও পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালী কর্মচারীর সংখ্যা ছিল সামরিক বাহিনীতে ২৬ হাজার এবং বেসামরিকে ১৫ হাজার। ভুট্টোর এ ধরনের হুমকির ফলে পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালীদের কথা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হয়নি। (বিচিত্রা ২৭/৪/৭৩)।

একাত্তরের গণহত্যা-বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনক্সা জামায়াতের। বঙ্গবন্ধু সরকার এদের যথোপযুক্ত বিচারের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন এবং গোলাম আযমকে এ দেশে নাগরিক বাতিলসহ অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন। জিয়াউর রহমান কলাবরেটর আইন ১৯৭২ বাতিল ঘোষণা করেন ৩১-১২-৭৫ এবং খুনী-দালালরা ছাড়া পায়। এক খুনী চৌধুরী মইনুদ্দিন এখন লন্ডনে বিরাট ধনসম্পদের মালিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। মীর কাসেম আলী দেশে শীর্ষ ধনী। সালাউদ্দিন কাদেরও কম যায় না। (এ দু’জনও বিচারের কাঠগড়ায়)।

বিভিন্ন সময়ে বিএনপি নেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। একাত্তরের খুনীদের বাঁচানোর জন্য হরতাল দিয়েছেন, অবরোধের কর্মসূচী পালন করেছেন। একাত্তরে পাকিরা কারফিউ দিয়েছিল নিজেদের রক্ষার জন্য। ম্যাডামের হরতাল-অবরোধ একাত্তরে বিজয়ী বাঙালীর বিরুদ্ধে। তিনি আজ (১৪ ডিসেম্বর) যাবেন শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ রায়ের বাজারে (শুনতে পাবেন কি শহীদের অভিশাপ)। আর কতদিন যাবেন, সেটাই দেখার বিষয়। আগামীতে সুযোগ পেলেই জামায়াতীরা স্মৃতিসৌধ নিশ্চিহ্ন করবে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে প্রায় বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তীতে জিয়া-এরশাদ-খালেদা এসব ’৭১-এর খুনীকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, মর্যাদা, রাজনীতি করার সবকিছুই অধিকার দিয়েছেন। খালেদা জিয়া আলবদর প্রধান নিজামী ও মুজাহিদীকে মন্ত্রী বানিয়ে জাতীয় পতাকা এবং বাঙালীকে অপমান করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে ’৭১-এর ঘাতকদের বিচারের যে অঙ্গীকার করেছেন তা একে একে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গোলাম আযমের চূড়ান্ত শাস্তি ৯০ বছরের কারাদ- যা শেষ হওয়ার আগেই তিনি মারা গেছেন। ফাঁসি আদেশ কার্যকর হয়েছে কাদের মোল্লার। নিজামী-মুজাহিদী এদেরও মৃত্যুদ-াদেশ হয়েছে। কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- আদেশ আপীল বিভাগ বহাল রেখেছেন। যে কোন দিন কার্যকর হতে পারে। এমনিভাবে জামায়াত-শিবির-মুসলিম লীগের পাকদোসর, খুনী, লুটেরা কেউই রক্ষা পাবে না। বিএনপি এবং তাদের সমমনারা এদের রক্ষা করতে পারবে না। ১৪ ডিসেম্বর এমনকি সারাবছরই এদের জাতি ঘৃণা করবে এবং চিরকাল শ্রদ্ধা জানাবে বীর শহীদদের। আমরা মনে করি বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের শাস্তি এখন ইতিহাসের দায়। এজন্য জনগণকে শেখ হাসিনার পেছনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪

১৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: