মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ঈশ্বরদীর বিবিসি বাজার এখন সরগরম

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪
  • কাশেম মোল্লার কথা কেউ মনে রাখেনি

তৌহিদ আক্তার পান্না, ঈশ্বরদী থেকে ॥ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ঈশ্বরদীর পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর বাজারে কাশেম মোল্লার চায়ের দোকান ছিল। কাশেম মোল্লা চায়ের দোকানদার হলেও স্বাধীনতার চেতনায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে যে না পারার বেদনাকে বুকে ধারণ করে তিনি একটি রেডিও কিনে দিন রাত দোকানে চালু রাখতেন। এ কারণে রেডিও শোনার জন্য এলাকার মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা সব সময়ই তার দোকানে ভিড় করতেন খবর শোনার জন্য। বিশেষ করে বিবিসি খবর শোনানো এবং শোনার জন্য ভিড় করা হতো। মুক্তিযুদ্ধকালীনই এ বাজারের নাম পরিবর্তন হয়ে বিবিসি বাজার বলে পরিচিতি লাভ করে।

জানা যায়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ক্যাম্প বসিয়েছে ঈশ্বরদীর পাকশী পেপার মিল ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায়। পেপার মিল থেকে দক্ষিণ দিকে সামান্য পথ হাঁটলেই বিবিসি বাজার। ওই এলাকার বাসিন্দা কাশেম মোল্লা। অভাবের কারণে সপ্তম শ্রেণীর বেশি পড়তে পারেননি। ফলে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে প্রথমে পাকশী রেলবাজারে দেন একটি মুদি দোকান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে পাকিস্তানী আর্মি বাজার পুড়িয়ে দিলে তিনি চলে যান নিজ গ্রাম রূপপুর বাজারে। নিজের হাতে সেখানে লাগান একটি কড়ই গাছ। গাছের পাশেই দেন ছোট্ট চায়ের দোকান। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই যখন উৎবেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দেশের খবর জানতে পারছে না কেউ।

মুক্তিযোদ্ধারা অধির আগ্রহে চেয়ে থাকত কখন কি নির্দেশনা প্রদান করা হয়Ñ আর সেই খবর তারা কিভাবে পেতে পারে সেজন্য। রেডিও পাকিস্তানেও ছিল না সঠিক কোন খবর। সঠিক খবর শোনা যেত শুধু বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, কলকাতা বেতার আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে।

বর্তমানে ৮৫ বছর বয়সে নুইয়ে পড়েছেন সেই মুক্তিকামী কাশেম মোল্লা। হানাদার বাহিনীর পিস্তলের বাটের আঘাতে জখম হওয়া পা নিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা কাশেম মোল্লা জনকণ্ঠকে জানান, স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের ইচ্ছেই থ্রি ব্যান্ডের একটি রেডিও কেনা হয়েছিল। যে সময় পাঁচ গ্রামে খুঁজেও একটি রেডিও পাওয়া যেত না। আর সেই সময় থ্রি ব্যান্ড রেডিওর মালিক হওয়া ছিল রীতিমত গর্বের ব্যাপার। চায়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় জমানোর জন্যেই দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে রেডিওটি দোকানে নিয়ে যেতাম। দেশে যুদ্ধ লাগার পর দেশের সামগ্রিক অবস্থান নিয়ে বিবিসি বাংলায় খবর প্রচারিত হতো। মুক্তিযোদ্ধারা খবরা-খবর শোনার জন্য তার চায়ের দোকানে অবস্থান নিত। ধীরে ধীরে সকলের মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের খবর শুনে দেশাত্মবোধে জাগ্রত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কাশেম মোলা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর শোনাতেন। রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও কলকাতা বেতারের খবর শোনার জন্য আশপাশের মানুষ দু’বেলা নিয়মিত ভিড় জমাতো তাঁর চায়ের দোকানে। চা খেতে আসা নানান লোকজনের নানা তথ্য থাকত কাশেম মোল্লার কাছে। গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশীয় দোসর, রাজাকার ও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সম্বন্ধে তথ্য দিতেন। এ কারণে ক্রমেই ভিড় বাড়তে থাকল তার দোকানে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গড়ে উঠল সম্পর্ক। অনেক সময় খবর পরিবেশন হয়ে যাওয়ার পর, যোদ্ধারা রণাঙ্গন থেকে ফিরে এলে তিনি সেই তথ্যগুলো শুনে হুবহু মুক্তিযোদ্ধাদের শোনাতেন।

হঠাৎ একদিন দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন আগে রাজাকারদের খবরের ভিত্তিতে পাকিস্তানী সেনারা হানা দেয় কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে। কাশেম মোলার ভাষায়, ‘পাকিস্তানী সেনারা আমারে হুংকার দিয়া অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়া বলে, তোম এধার আও, তোমহারা দোকানমে রেডিও বাজতা হায়, শালে, তুমকো খতম কারদে গা, তুম রেডিও নিকালো।’ সেনাদের কথায় আমার তো জানে পানি ছিল না। ভেবেছিলাম, ‘মাইরে ফেলবে। আমি কলেম ও চিজ হামারা নেহি হে, আদমি লোক খবর লেকে আতা হে, শুনলোকে লেকে চলে যাতা হে।’

কাশেমের কথায় সেনা সদস্যরা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হাতের রোলার আর পিস্তলের বাট দিয়ে আমার পায়ে আঘাত করে। সেই থেকে আজও পর্যন্ত আমার সেই পা অকেজো হয়ে রয়েছে।

কাশেম মোল্লা আরও বলেন, সন্ধ্যে হলেই রূপপুর গ্রামে হাঁকডাক শুরু হতো। গ্রামের লোকেরা একে অন্যেকে বলত, চল ‘বিবিসি শুনতে যাই’। এভাবে আমার চায়ের দোকানে বিবিসির খবর শোনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আরও কয়েকশ দোকান, বিস্তার লাভ করতে থাকে পরিধি। যা পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘বিবিসি’র খবর শোনার বাজার’ এবং শেষে ‘বিবিসি বাজার’ নামকরণ হয়। কিছু উৎসাহী লোক পরবর্তীতে লন্ডনে চিঠি লিখে বিবিসি কর্তৃপক্ষকে ঈশ্বরদীর রূপপুরে বিবিসি বাজার নামকরণের কাহিনী জানায়। এরপর বিবিসি কর্তৃপক্ষ ১৯৯২ সালে বিবিসির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাদের একটি টিম বাংলাদেশে এসে কাশেম মোল্লাার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি শ্রোতাদের সঙ্গে আলাপ করা। তারা পরিদর্শন করেন বিবিসি বাজারটিও। এসেছিলেন বিবিসির ইস্টার্ন সার্ভিস সেকশন প্রধান ভ্যারি ল্যাংরিজ, বাংলা বিভাগের তৎকালীন উপপ্রধান সিরাজুর রহমান, ভাষ্যকার দীপঙ্কর ঘোষ এবং বিবিসির সাবেক বাংলাদেশ সংবাদ দাতা আতাউস সামাদ।

কাশেম মোল্লার চিকিৎসা ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন সিরাজুর রহমান। তিনি লন্ডন থেকে কাশেম মোল্লার উদ্দেশে বেশ ক’টি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো বেশ কয়েক হাতে পড়লেও কাশেম মোল্লার কাছে পৌঁছায়নি। এখন কাশেম মোল্লা বয়সের ভারে আর কোন কাজ করতে পারেন না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগুলো মনে করেন আর আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হলেও খবর কেউ রাখে না। নিজ হাতে লাগানো কড়ই গাছ মোটাতাজা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মাথা উঁচু করে আজও দাঁড়িয়েছে আছে কড়ই গাছটি। কিন্তু কাশেম মোল্লার অবদান কি ভুলে যাওয়া উচিত হবে?

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪

১৩/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: