আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রাজশাহীর তাজা মাছ মিলছে ঢাকায়, স্বাদেও অুঁট

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪
রাজশাহীর তাজা মাছ মিলছে ঢাকায়, স্বাদেও অুঁট
  • চাষে ব্যাপক সাফল্য

মামুন-অর-রশিদ ॥ ‘মাছে ভাতে বাঙালী’। কালের পরিক্রমায় মাছের চাষ অনেকাংশে বাড়লেও বাড়েনি মাছের আকার। তবে পাল্টেছে সেই ধারণা। এখন পুকুরেই চাষ হচ্ছে ৮ থেকে ১০ কেজি ওজনের দেশী রুই, কাতল, মৃগেল প্রভৃতি মাছ। স্বাদ অটুট রেখে জীবন্ত অবস্থায় এসব বড় আকারের মাছ এখন যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আকারে বড় হওয়ায় এ মাছের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে এর উৎপাদনও।

রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা গ্রামে মাছ চাষীরা বেছে নিয়েছেন এ পন্থা। পুকুরের মিঠা পানিতে এ মাছ চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখেছেন অনেকে। মাত্র ২০ হাজার টাকার পুঁজি কাজে লাগিয়ে অনেকে এখন হয়েছেন কোটিপতি। ‘কার্প ফ্যাটেনিং’ পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ করা হচ্ছে এ মাছের। এতে পুকুরের মাছ এক বছরের মাথায় বড় করা হয় ৬ থেকে ৭ কেজি। ১৫ থেকে ১৬ মাসের মধ্যে তা হয় ৮ থেকে ১০ কেজি। এতে চাষীরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। অল্প সময়ের মধ্যে এ পদ্ধতি রাজশাহীর মাছ চাষীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করতে গিয়ে দেশের বেশিরভাগ জায়গা থেকে বড় আকারের মাছের উৎপাদন হারিয়ে গেছে বললেই চলে। চাষীরা সাধারণত এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত বড় করেই মাছ বাজারে ছেড়ে দেয়। বছরে দুই থেকে তিনবার উৎপাদনে যাওয়ার জন্য চাষীরা এ কাজ করে থাকে। উৎপাদন না থাকার কারণে বাজারে বড় মাছের চাহিদা এখন আকাশচুম্বি। সেই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার পারিলা এলাকার চাষীরা ‘কার্প ফ্যাটেনিং’ পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদন শুরু করে।

বর্তমানে ওই পদ্ধতিতে মাছের উৎপাদন করে মাত্র এক বছরের মধ্যে একটি মাছ ৬ থেকে ৭ কেজি পর্যন্ত বড় করছে পারিলা অঞ্চলের মাছ চাষীরা।

পারিলা এলাকায় ‘কার্প ফ্যাটেনিং’ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা কয়েক চাষী জানান, বাজারে ছোট ও মাঝারি ধরনের মাছের আমদানি অনেক। সে কারণে মাছ চাষীরা অনেক সময় দাম পায় না। তবে বড় মাছের চাহিদার তুলনায় আমদানি থাকে অনেক কম। বাজারে বড় মাছ আসলে ক্রেতারা চড়া দাম দিয়ে কিনতে চায়। বড় মাছের এ চাহিদা থেকেই তারা ‘কার্প ফ্যাটেনিং’ পদ্ধতিতে মাছের চাষ শুরু করে। এতে তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি মূল্যে বাজারে মাছ বিক্রি করতে পারছেন।

এ পদ্ধতিতে পুকুরে বছর শেষে প্রতি বিঘায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ কেজি মাছের উৎপাদন পাওয়া যায়। বড় মাছ হওয়ার কারণে এসব মাছ প্রতি কেজি ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। এতে বিঘা প্রতি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকার পর্যন্ত মাছ বিক্রি করা সম্ভব।

মাছ চাষীরা জানান, মাছ উৎপাদন করে প্রতি বিঘা থেকে বছরে এক লাখ ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ ৮০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করা যেত। তবে ‘কার্প ফ্যাটেনিং’ পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদন করে এক দুই থেকে তিন গুণ বেশি মাছের চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।

বড় মাছ উৎপাদনের জন্য দুইটি বড় সমস্যার কথা উল্লেখ করেন মাছ চাষীরা। এদের একটি হলো মাছ তরতাজা অবস্থায় বাজারজাতকরণ ও অপরটি মাছের ভাল মানের খাবার। দুই সমস্যার একটি (বাজারজাতকরণ) চাষীরা নিজেদের পদ্ধতিতে সমাধান করে ফেলেছেন। চাষীদের নিজস্ব পদ্ধতিতে চাষীরা পুকুর থেকে মাছ তুলে শুধু তরতাজা নয় একবারে জীবন্ত মাছই পৌঁছে দিচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অনেক বাজারে।

এ পদ্ধতিতে চাষীরা ট্রাকে মোটা পলিথিন বিছিয়ে দেয়। এরপর সেখানে পানি দেয়া হয়। ওই পানিতে পুকুর থেকে মাছ তুলে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর ট্রাকে করে মাছ নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন জায়গায়। ট্রাকের পানিতে আঘাত করে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে একজন শ্রমিক থাকে। প্রতি ট্রাকে এ পদ্ধতিতে ১৪ থেকে ১৫ মণ মাছ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। বর্তমানে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার মাছের বাজারে যে বড় জীবন্ত মাছ পাওয়া যায় তার বেশিরভাগটাই রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা এলাকার। প্রতিদিনই এখান থেকে মাছের ট্রাক ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় যায়। এখন ঢাকা নিউমার্কেটে এ ধরনের বড় মাছ ‘পারিলার মাছ’ বলেই পরিচিতি লাভ করেছে।

তবে মাছ নিয়ে যাওয়ার পথে নানানভাবে মাছ চাষীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। চাষীদের কয়েকজন জানান, রাজশাহী থেকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার সময় পথে পথে পুলিশী চাঁদাবাজি অন্যতম। এ চাঁদাবাজির কারণে চাষীদের ঢাকা মাছ নিয়ে যেতে অতিরিক্ত ৬ থকে ৮ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।

কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতি ॥ এ পদ্ধতিতে পুকুরে মাছ পাতলা করে চাষ করা হয়। সাধারণ পদ্ধতিতে বেশি মাছ পুকুরে ছেড়ে সামান্য বড় হতেই বাজারজাত করা হয়। কিন্তু ‘কার্প ফ্যাটেনিং’ পদ্ধতিতে মাছ পুকুরে পাতলা করে চাষ করা হয়। এ পদ্ধতিতে প্রতি বিঘায় ১৫০ থেকে ২০০টি রুই, সিলভার কার্প ও কাতলা ৫০টি করে, মিরর কার্প ২৫ থেকে ৩০টি, মৃগেল ১৫০টি ও গ্রাস কার্প ৫টি করে চাষ করা হয়। পুকুরে সাধারণত যে পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হয় তাতে প্রতি বিঘায় এ সংখ্যার তুলনায় ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি মাছ চাষ করা হয়।

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪

১৩/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: