কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : সাম্প্রতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

ইতিহাস পরিক্রমায় এ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ ঘটনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধ শুধু স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ নয়, মানব মুক্তির যুদ্ধ। বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ জয়ই প্রমাণ করেছে এদেশের মানুষ দেশপ্রেমিক। দেশের জন্য জীবন দিতে এদেশের মানুষেরা কোন কার্পণ্যে করে নি। দেশমাতৃকার সম্মান রক্ষায় হানাদারের মেশিনগানের সামনে বুক চেতিয়ে দিতে একটুও বুক কাপেনি তাদের। অসম সাহস আর বীরত্বের মধ্যে দিয়ে পাক হানাদারের বর্বোরোচিত হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল এ দেশের মানুষেরা। অর্জিত হয় মহান বিজয়। তবে এর জন্য আতœত্যাগ করতে হয়েছিল ত্রিশ লাখ শহীদকে। এই আতœত্যাগ আর সেই সঙ্গে প্রতিবেশি দেশ ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সহায়তা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পথে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ভারতের সঙ্গে সেই বন্ধুত্ব আজও অক্ষুন্ন রয়েছে। র্দীঘবন্ধুত্ব আর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যর সূত্র ধরে ২০১১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ভারত-বাংলাদেশের সর্ম্পক বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেই আলোচনা অনুষ্ঠানের ভিত্তিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর নাসরিন রচনা করেন ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সাম্প্রতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে’ বইট্।ি

সেই আলোচনা সভায় বরেণ্য শিক্ষাবিদ,গবেষক, রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব,কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের আলোচনার মধ্যে দিয়েই এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের নানা জানা-অজানা কাহিনী উঠে আসে। সেইসবের ভিত্তিতেই রচিত হয়েছে এই বইটি। বইটি পাঁচটি পর্বে বিন্যস্ত। সূচনা পর্বের পর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ সংক্রান্ত চারটি প্রবন্ধমালা আছে। প্রথম প্রবন্ধটি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ষোড়শী মোহন দাঁ’র। এই প্রবন্ধে সাতচল্লিশের দেশবিভাগ কিভাবে সাংস্কৃতিক জীবনধারায় প্রভাব ফেলেছিল তা তুলে ধরেন। এছাড়া তিনি উদ্ধাস্তু সমস্যা আর নারীর যন্ত্রণার যে চিত্র এপার-ওপার সাহিত্যিকদের কলমে ওঠে এসেছে তাও উপস্থাপন করেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ:পূর্বসূত্র প্রবন্ধে ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ গড়ার প্রচেষ্টা, দেশবিভাগের মধ্যে দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সূচনা যে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করছে তা তুলে ধরেছেন। মেসবাহ কামাল তাঁর প্রবন্ধে দেশবিভাগের আগ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপটের অবতারণা করার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি জাতিসত্তার বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন। কথা সাহিত্যিক দেবেষ রায় তাঁর ‘শিকড় শিকড়েই থাকে’প্রবন্ধে এদেশের ইতিহাস,ঐতিহ্য,সংস্কৃতির সঙ্গে যে তাঁর গভীর হৃদতার সর্ম্পক তা তুলে ধরেন। মিজারুল কায়েস তাঁর ‘গল্পের নাম ১৬ ডিসেম্বর’ প্রবন্ধে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হত্যা,সেক্টর কমান্ডারদের হত্যা আর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিদের ক্ষমতার মসনদে অসীন হওয়ার ট্রাজেডিকে উপস্থাপন করেন।

বইটির দ্বিতীয় পর্বটি সাজানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণের ভিত্তিতে। প্রখ্যাত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ‘আমার একাত্তর’ প্রবন্ধে যুদ্ধকালীন শরণার্থী শিবিরের বিভিন্ন অমানববিক দিকগুলোর কথা যেমন তুলে এনেছেন তেমনি আজকের বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের কথাও তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে ব্যক্তিক ও দলীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্য বারংবার কিভাবে সংবিধানের কাটাছেড়ার মধ্যে দিয়ে সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে তার সরুপও তুলে ধরেছেন। ‘স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু ’ প্রবন্ধে ইকবাল বাহার চৌধুরী তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেছেন। হারুন-অর-রশিদ বীরপ্রতীকের ‘মুক্তিযুদ্ধের সাতকাহন’, কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীরপ্রতীকের ‘গণযোদ্ধার জনযুদ্ধ’ এবং ‘আমাদের বীরশ্রেষ্ঠগণ’, কামরুল আহসান খানের ‘স্মৃতি একাত্তর’, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের ‘বেতিয়ারা যুদ্ধ ও বিশেষ গেরিলা বাহিনী’ প্রবন্ধগুলোতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের যেনকেইডেরা করেছেন তন্মোধ্যে দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেহারা ফুটে ওঠে।

বইটির তৃতীয় পর্বের প্রবন্ধগুলো সাজানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ এবং ভারত-বাংলাদেশ সর্ম্পকের থিমের ভিত্তিতে। ষোড়শী মোহন দাঁ’র ‘বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের পটভূমি ও বাংলা সাহিত্যে’, সুদেষ্ণা চক্রবর্তীর ‘পশ্চিমবঙ্গেও সাহিত্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ,সুধীর রায়ের ‘মানুষ মানুষের জন্য’, মুনতাসীর মামুনের ‘ইতিহাসের বাঁধন,সর্ম্পকের টানাপোড়েন’,হারুন-অর-রশিদের ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সমকালীন প্রসঙ্গ’ এবং শাহরিয়ার কবিরের ‘বৈরিতা নয় সম্প্রীতি’ প্রবন্ধগুলোতে মুক্তযুদ্ধকালীন ভারত-বাংলাদেশের সর্ম্পকের ধরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং সেই ঐতিহাসিক সর্ম্পক বর্তমানের সর্ম্পকে কিভাবে প্রভাবিত করছে তা তাঁরা দেখিয়েছেন। চর্তুথ পর্বের প্রবন্ধমালা সাম্প্রদায়িতা থিমের ওপর রচিত। মুনতাসীর মামুন তাঁর ‘সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে’ প্রবন্ধে এদেশে কিভাবে সাম্প্রদায়িকতা ডালপালা মেলেছে এবং কিভাবে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রাম চলছে তা তুলে ধরেছেন। সৈয়দ হাসান ইমাম তাঁর ‘ অসাম্প্রদায়িকতার সংগ্রাম’ প্রবন্ধে দেশভাগের জন্য যে মুসলমানদের দায়ী করা হয়,তা যে অযৌক্তিক সে বিষয়টিকে তুলে ধরেন। পঞ্চম পর্বে আছে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক বিষয়ের ওপর মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ। পাঁচ পর্বের এই বইটিতে শুধু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস,মুক্তিযুদ্ধে বন্ধু ভারতের অবদানকেই তুলে আনা হয়নি, সাতচল্লিশের দেশবিভাগের যন্ত্রণা,স্বাধীনতার অপূর্ণ স্বপ্ন আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইকেও তুলে আনা হয়েছে। এই বইটিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক অজানা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। উন্মোচন করা হয়েছে আমাদের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের সরুপ। মহান মুক্তিযুদ্ধ আর আজকের বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই বইটি অনন্য।

আরিফুর সবুজ

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

১২/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: