কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ক্যাটস আই

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪
  • সৈয়দ মনোয়ার আলী

খুলনা জজকোর্ট প্রাঙ্গণের কালের সাক্ষী প্রাচীন বটগাছটা কেটে পাকিস্তান ইসলামী জমহুরিয়াতের সেপাইরা জায়গাটার মুসলমানি দেয়ার কাজ সম্পন্ন করল।

কোর্টে এখন লোকসমাগম কম। কিন্তু শনিবার দুপুরে যারা অফিস ছেড়েছিল তারা বিশাল বটগাছটাকে আগের মতোই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো দেখে গিয়েছিল। তারা আজ অফিসে ঢোকার মুখে হতবাক হয়ে ক্ষণিক থমকে দাঁড়াল এবং সম্বিত ফেরামাত্র দ্রুত অবনত মস্তকে কোর্ট বিল্ডিংয়ের ভারি দেয়ালের আড়ালে অদৃশ্য হলো। তারা হঠাৎ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। গেটের মুখে মাথার ওপর চিরচেনা সবুজ ছাউনিটা নেই, সেখানে চৈত্রের খরখরে নীল আকাশ বেখাপ্পাভাবে দৃশ্যমান। বিশাল গাছটা অবিশ্বাস্যভাবে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে আছে। তবে তাদের ভয়ের বড় উৎস ছিল তিনজন সেপাই। কোর্টের সামনে সংকীর্ণ পথের ওপর বেয়নেট লাগানো চাইনিজ রাইফেল হাতে ক্রুদ্ধ উদ্ধত চেহারায় তারা শ্রমিকদের গাছকাটার কাজ তদারক করছিল। কোর্টের সামনেই আর্মি ক্যাম্প। গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় সবাই জেনে গেছে যে, এদের মতিগতির কোন ঠিক নেই, কখন কি ধরনের আচরণ করবে তারও কোন গ্যারান্টি নেই।

শরাফত আলীও এদের আচরণ সম্পর্কে এতটাই অনিশ্চিত ছিলেন যে, তার সফেদ লেবাস, শ্মশ্রুমণ্ডিত সম্ভ্রান্ত চেহারা এবং রাজনৈতিক দর্শন সবই সময়ের অনুকূল থাকা সত্ত্বেও রিকশাটা গেটের কাছে থামতেই তিনিও থমকে গিয়েছিলেন। তিনি শুনেছেন এখানে ওখানে আরও অনেক বট অশ্বত্থ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। স্বচক্ষে এই প্রথম দেখলেন। কানাঘুষায় শুনেছেন পৌত্তলিকতার প্রতীক বিবেচনায় গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। পাকিস্তান ইসলামী জমহুরিয়াতে পৌত্তলিকতার অবশেষ নাকি রাখা হবে না। শরাফত আলী জানেন না এমন অদ্ভুত ব্যবস্থাপত্র এদেরকে দিয়েছে! তিনি নিজের রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে বেশ সচেতন, কিন্তু সবাই জানে তার মধ্যে গোঁড়ামির লেশমাত্র নেই। তার বোধে আসে না গাছ কিভাবে পৌত্তলিকতার প্রতীক হয়! গ্রামের দিকে অবশ্য কোন কোন বট অশ্বত্থের গোড়ায় হিন্দু মেয়েরা সিঁদুর দিয়ে মাঙ্গলিক চিহ্ন আঁকে, মানতের ঘট কলা আলোচাল রেখে যায়। কিন্তু তাতে বট অশ্বথের কি দায়! এই গাছটার বেলায় তো আবার সে ধরনের বাহানাও নেই। তবু পৌত্তলিকতার দায় মাথায় নিয়ে প্রাচীন বটগাছটা এখন খণ্ড খণ্ড হয়ে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে আছে। একদল শ্রমিক ঘর্মাক্ত শরীরে পথের উপর থেকে ভারি গুঁড়িগুলো সরানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করছে। তাদের চোখেমুখে রাত জাগার ক্লান্তি। বিশ্রাম নেই, দু’দণ্ড বসে বিশ্রাম নেবে তেমন সাহসও বোধহয় কারও নেই। শরাফাত আলী এক সময় স্পার্টাকাস ছবিটা দেখেছিলেন। তার কাছে গাছকাটা শ্রমিকদের চেহারাগুলো অবিকল রোমের পাথরভাঙ্গা দাসদের মতো মনে হয়! তিনি ভেবে পান না এ কিসের আলামত!

তিনি দ্রুত পালানোর তাগিদ অনুভব করেন। তাঁর অবস্থা হয় ময়াল সাপের চোখে চোখ পড়া সম্মোহিত বানরশাবকের মতো, পালাতে পারেন না। ষষ্ঠইন্দ্রিয় তাকে সতর্ক করে আর্মিদের চোখেপড়ার পর সরে যাওয়ার চেষ্টা করা বিপদের কারণ হতে পারে। এমন নয় যে তাঁর কোর্টে আসা অত্যাবশ্যক ছিল। কোর্টের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক চাকরি মামলা বা আইন পেশা সংক্রান্ত কিছু নয়। তিনি একজন পামিস্ট, হাত দেখেন। হাতের রেখা গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ইত্যাদি বিচার বিশ্লেষণ করে মক্কেলের ভূত ভবিষ্যত বলে দেন, মামলা মকদ্দমার তদবির পরামর্শ দেন। কোর্ট এলাকায় এটা বেশ ভাল পেশা।

জ্যোতিষি হিসেবে শরাফত আলীর পসার নেহাত মন্দ নয়। তথাপি এই মুহূর্তে নিজেরই ভাগ্য নিয়ে তার উদ্বেগ কাটছে না। এতদিন তিনি বটের ছায়ায় চৌকি পেতে বসেছেন। এখন বটগাছটা নেই। চৌকিটা তোলা আছে হোসেনের চা দোকানের চারপাশ খোলা ছাউনিতে। সম্ভবত কাঠুরেরাই তুলে রেখেছে। হোসেন ফেরেনি। ইচ্ছা করলে তিনি সেখানে বসতে পারেন। কিন্তু আজ তার বসার ইচ্ছা নেই। রিকশাওয়ালাকে সামান্য এগিয়ে উকিল বারের গেটে দাঁড়াতে বলে তিনি স্খলিত পায়ে কোর্টের দিকে পা বাড়ান। তার উদ্দেশ্য ভেতরের প্যাসেজ দিয়ে পেছনে বারের গেটে যেয়ে রিকশায় উঠবেন। এতে সেপাইদের নজর এড়িয়ে অনায়াসেই চলে যাওয়া যাবে।

তবে এ সময় অভাবিত কিছু ঘটনার দ্বারা তার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়। বাধ্যতামূলক না হলেও তখন বাঙালীরা সেপাইদের গাড়ি, শান্তিকমিটির সদস্য ও বিহারিদের দেখামাত্র সালাম জানাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে এই রেওয়াজ অলক্ষে আপনা থেকেই চালু হয়। দস্তুরমাফিক শরাফত আলীও বিগলিতভাবে সেপাইদের সালাম দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই অভাবিত ঘটনাটি ঘটে। একজন সেপাই সম্ভবত তার খানদানি সুরত, সফেদ শ্মশ্রু“ও লেবাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উল্টে তাকেই সালাম দিয়ে বসে। এটা ছিল বলার মতো ঘটনা। এর প্রতিক্রিয়া শরাফত আলীর জন্য খুবই ইতিবাচক হয়। তার বিমর্ষ ভাব সহসা তিরোহিত হয় এবং ইসলামী জমহুরিয়তের সেপাইদের উপর প্রায় ভেঙ্গেপড়া বিশ্বাসটা আবার জোরালো হয়ে ফিরে আসে। ফলে চমৎকার মুড এবং আস্থার সঙ্গে তিনি কোর্টের বারান্দায় পা রাখেন।

কয়েকজন আরদালি তখন ব্যস্তত্রস্তভাবে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে সবাইকে যার যার জায়গায় বসে কাজে মনোনিবেশ করার অনুরোধ জানাচ্ছিল। জজ সাহেবের হুকুম। যে কোন সময় অফিসে আর্মি ভিজিট হতে পারে। তিনিও স্টলে যেয়ে বসার অনুরোধ পেলেন। তাঁকে বলা হলো, আর্মিরা শুধু কোর্ট কাছারি নয়, গোটা এলাকায় স্বাভাবিক অবস্থা দেখতে চায়।

শরাফত আলী পলানোর চিন্তা বাদ দিলেন এবং রিকশা থেকে তাঁর ব্যাগ নামিয়ে দ্রুত হাতে হোসেনের টি-স্টলের ছাউনিতে চৌকি সাজাতে বসলেন। টি-স্টলটা ছিল কোর্ট রোড থেকে জজকোর্টে ঢোকার ঠিক কর্নারে। চৌকির ওপর জাজিমটা বিছাতে যেয়ে তিনি সন্তোষ বোধ করেন। খানদানি জাজিমটা ক্যাপ্টেনের কাছে তাঁর মর্যাদা অনেকখানি বাড়িয়ে দিতে পারে! তিনি জাজিমের পাড়টা সামনের দিকে বেশ খানিকটা ঝুলিয়ে দিলেন যাতে ইংরাজীতে ‘শোলাপুর’ লেখাটা সহজেই চোখে পড়ে। জাজিমের ওপর কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো দুর্বোধ্য রেখা ও সংখ্যা সম্বলিত পাঞ্জার ছবি দুটো সামনের দিকে মুখ করে বসিয়ে দিলেন। পাশে হস্তরেখাবিষয়ক পুরনো গোটা তিনেক বই। ইংরাজীতে লেখা বইটা তিনি সযতেœ ওপরে রাখলেন। তার সামনে হাতল লাগানো প্রায় ঝাপসা একটা ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস। দু’পাশে পুরনো টিনের কৌটায় রং বেরঙের ছোটবড় বেশকিছু পাথর এবং তামা-রুপার আংটি। চৌকির পাশে ছোট টুলে মক্কেলের বসার জায়গা। গোটা সাজসজ্জায় তিনি তাঁর সফল পেশাদারি পরিচয় এবং অভিজ্ঞতা যতেœর সঙ্গে তুলে ধরলেন। তিনি শুনেছেন অধিকাংশ আর্মি অফিসার হাতের রেখায় বিশ্বাস করে। হিটলার স্টালিনও নাকি করতেন। ক্যাপ্টেনও করতে পারে, বিচিত্র কি।

কোর্ট প্রাঙ্গণে এখন এমনিতেই লোকজন কম। উকিল মোক্তাররা অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা কোর্টে আসেন না। মক্কেলরাও বেশিরভাগ দূরদূরান্তের লোক। অনেকেই দেশ ছেড়েছেন। যারা আছেন যাতায়াতের সমস্যা, পথে-ঘাটে জীবনের ঝুঁকি এবং পরিস্থিতির কারণে মামলা লড়ার উৎসাহ হারিয়েছেন। তাঁরাও আসেন না। তাই বলে কোর্ট যে জনশূন্য হয়ে পড়েছে তা নয়। শহর ও আশপাশের ছাপোষা উকিল, মোক্তার, মোহরাররা ঠিকই অফিসে হাজিরা দেন। মক্কেলের ভিড়ও আছে যথেষ্ট। সেখানে নতুন মুখের সংখ্যা ঢের বেশি। এদের এখন পোয়াবারো, নানা ধান্ধায় নিয়মিত কোর্টে হাজিরা দেয় তারা। দুঃসময়টা কারও কারও কাছে আশীর্বাদের মতো। তারপর আছে সরকারী কর্মচারীরা। রেডিওর জরুরী এলার্ম শুনে তারাই সর্বাগ্রে কাজে যোগ দিয়েছে, নইলে চাকরি হারানোর ভয়। এরা ছাপোষা মানুষ, মাস গেলে মাইনে না পেলে তাদের সংসার চলে না। গরজ বড় বালাই। এভাবে একজন দুজন করে দিনে দিনে লোক বেড়েছে। মুদিখানা হোটেল রেস্তোরাঁ খুলেছে। ধন্বন্তরি ওষুধ, শক্তিবর্ধক শেকড়বাকড়, চশমা, বুক বাইন্ডার, দাঁতের মাজন, পানবিড়ির দোকানদাররাও এসেছে একে একে। পেটের দায় আছে সবারই। সমাগমটাও তাই নেহাত কম নয়।

বেলা এগারোটার দিকে আর্মির প্রতীক্ষিত গাড়ি দুটো আসে প্রায় ঝড়ের বেগে। রাস্তা থেকে জজকোর্টের দিকে টার্ন নিতে গতি সামান্য শ্লথ হয়। কভার্ডভ্যানের পেছনে বসা খাকি ধড়াচূড়া পরা আর্মিদের থমথমে কঠিন মুখগুলো একপলক দেখার সুযোগ পান শরাফত আলী। কেন জানি তার উৎসাহ অনেকখানি মিইয়ে যায়। কেউই তারা আসন ছেড়ে ওঠেন না, নিশ্চল পাথরের মতো যার যার জাগায় বসে থাকেন। এমনকি যেসব মক্কেল ধুরন্ধর সাক্ষী-মোহরারদের চাপে চা নাস্তা খেতে হোটেলে ঢুকেছিল, খাওয়া শেষে চায়ের কাপ হাতে তারাও চুপচাপ বসে থাকে। বাইরে বেরিয়ে কে খামোখা বিপজ্জক আগন্তুকদের সামনে পড়তে! এর মধ্যে একজন ক্যামেরাম্যান ঝটপট তাদের ছবি তুলতে থাকে। শরাফত আলী বিস্মিত হন। তার বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই গাড়ি দুটো যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই হুসকরে বেরিয়ে যায়। তিনি চেন লাগানো পকেট ঘড়িটা বের করে সময় দেখেন, ঠিক ত্রিশ মিনিট ওরা এখানে ছিল।

মোড় ঘোরার মুখে জিপের আরোহীকে এবার পরিষ্কার দেখতে পান শরাফত আলী, স্বগোতোক্তি করেন, এই তাহলে ক্যাপ্টেন! যেমন শুনেছেন লোকটাকে তার তেমন রুক্ষ বা হিংস্র মনে হয় না। ফর্সা একহারা চেহারা। হতে পারে যুবক অথবা চল্লিশোর্ধ, চেহারায় বয়সের ছাপ নেই। অথচ নৃশংস বলে বাজে দুর্নাম কুড়িয়েছে লোকটা। প্রমাণেরও অভাব নেই। হেলিপোর্ট থেকে হতভাগ্য মানুষের হৃদয়চেরা আর্তনাদ প্রায়ই শুনতে হয় তাদের, দেখতে না চাইলেও এমন সব দৃশ্য চোখে পড়ে যা শুধু ভেতরে রক্তক্ষরণই ঘটায়। শরাফত আলী দ্রুত চোখ নামিয়ে নেন। মোড় ঘোরার মুখে ক্যাপ্টেন তার দিকে ঠাঁয় তাকিয়ে আছে। সহসা সে দৃষ্টির তল খুঁজে পান না তিনি।

খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে এক সময় পথের ওপাশে কেরামতের হোটেলে ঢুকে পড়েন শরাফত আলী। ভাল চা পাওয়া যায় এখানে। ভিড়ও লেগে থাকে। আজ অবশ্য আর্মি ভিজিটের প্রতিক্রিয়ায় লোকজন নেই বললেই চলে। মালিক নিজেই দু’কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এলো, ধপ করে সামনের চেয়ারে বসে পড়ে গম্ভীর হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, ক্যাপ্টেন কি বলে গেল শুনেছেন শরাফত ভাই!

শরাফত আলী এখনও কিছু শোনেননি। তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কেরামতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

কেরামত মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল, আমাদের মেছিয়ার গেছিল অফিসে বড়বাবুর চা নাস্তা নিয়ে, ক্যাপ্টেনের বক্তৃতা শুনে এসেছে। লোকটার চেহারা ভাল হলে হবে কি, আস্ত হারামজাদা একটা! চোখের চাউনি নাকি সাপের মতো। প্রথমেই জজ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছে হিন্দু মালাউন আর আওয়ামী লীগের কেউ জয়েন করেছে কিনা। জজ সাহেব স্রেফ না বলে দিয়েছেন। ক্যাপ্টেন বলেছে, বহুত আচ্ছা! উনলোগ সব গাদ্দার হ্যায়, বাগি আদমি। পাক মুলুকমে উন্লোগকো জায়গা নেহি হোগা, নোক্রিভি নেহি। এয়ছা কোই আনেছে জরুরী ক্যাম্পে খবর ভেজ্না, ইয়ে আপকা ফরজ্ কাম হ্যায়। যাওয়ার আগে হারামজাদাটা লোকজনকে উসকেও দিয়ে গেছেÑযো কুরসি খালি হোগা উস্মে তোমহারা বেকার ভাই-ব্রাদারকো বয়ঠা দো, এপয়েন্টমেন্ট মিল যায়েগা। দেখবেন শরাফত ভাই, এরপর নিজের লোককে চাকরি দেয়ার জন্য একজন আর একজনের পেছনে কিভাবে লেগে গেছে!

শরাফত আলী গুম হয়ে গেলেন। তিনি জানেন কয়েকজন হিন্দু ইতোমধ্যে কাজে যোগ দিয়েছে, আজও অফিসে এসেছে তারা। তাছাড়া এমন কে আছে যে গত নির্বাচনে এবং অসহযোগ আন্দোলনে আওয়ামী লীগ বা জয়বাংলা করেনি! তার ভয় হয় এরা এখন টিকবে কিভাবে?

তার আশঙ্কা অচিরেই সত্য হয়ে সামনে এসে দঁড়ায়Ñ সে ননী। ননী বিশ্বাস মুন্সেফ কোর্টের পিওন, মাঝ বয়সী। একবার এক আত্মীয়কে নিয়ে এসেছিল হাত দেখাতে। তার দেয়া পাথর নিয়ে লোকটা নাকি বেশ উপকার পেয়েছে। সেই থেকে শরাফত আলীর উপর ননীর অগাধ বিশ্বাস। আর্মি ক্রাকডাউনের পর হিন্দুদের মধ্যে ননীই প্রথম কাজে যোগ দিয়েছিল। পরে একে একে আরও কয়েকজন এসেছে। ননী যেদিন আসে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল, উদ্বিগ্নও হয়েছিল। কিন্তু বাধা দেয়নি কেউ। মুন্সেফ সাহেবকে সে বলেছিলÑ কি করব হুজুর, মেয়েটা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাড়িতে এসে উঠেছে, জামাইটার আজঅবধি খবর নেই। কাজ না করলে এতগুলো মুখের ভাত যোগাব কিভাবে। ননী থেকে গেছে, সে এখন নুরুমিয়া।

ননী এবার এল নিজের হাত দেখাতে। তার সঙ্গে আরও দুজন আছে। তারা আসলে এসেছে সান্ত¡না পেতে, হয়ত বা বিদায় নিতে। বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে বলল, এখন আমাদের কি হবে দাদা! আর তো থাকতে সাহস পাচ্ছি না। দু’পা এগুলেই আর্মি ক্যাম্প, কে কখন কি খবর দিয়ে বসে কে জানে! কিন্তু বলতে পারেন কোথায় যাব এখন, এতগুলো বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কোথায় যেয়ে দাঁড়াব? আপনি তো অনেকের ভূত-ভবিষ্যত বলে দেন, দেখুন না আমাদের হাতটা একটু গুনে!

শরাফত আলী ননীর বাড়ানো হাতটা দুহাতের মধ্যে টেনে নিয়ে এতদিনে তাকে নিতান্ত সত্য কথাটাই বললেনÑ নারে ভাই, ওসব বলার ক্ষমতা আমার কোথায়! কেউ ও ক্ষমতা রাখে কিনা তাও জানি না। তোমাকে ওভাবে কিছুই বলতে পারব না। তবে এখন তো দেখি, অনেকেই নানা পথ ধরে ভারতে চলে যাচ্ছে। দুর্দিন কাটার অপেক্ষায় প্রাণটুকু অন্তত বাঁচিয়ে রাখ।

ওরা চলে গেল। শরাফত আলী হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠলেন। তার এতদিনের বিশ্বাসে বড় ধরনের চির ধরেছে। পাশাপাশি এ সময় এমন একটা ঘটনা ঘটল যা তাকে প্রচণ্ড উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপ করল। তিনি বুঝলেন তিনি একটা বড় ভুল করে বসেছেন। তার আসলে সে সময় চলে যাওয়াই ভাল ছিল। এখন কিভাবে ভুলের মাসুল গুনতে হয় কে জানে! ক্যাপ্টেন তাকে আর্মি ক্যাম্পে জরুরী তলব পাঠিয়েছেন। সেই দুঃসময়ে একজন বাঙালীর জন্য এ ধরনের তলব আজরাইলের তলব বলেই ধরে নেয়া হত, তার ফিরে আসা ছিল অনিশ্চিত। তাকে ডাকতে এসেছিল ক্যাম্পের এক বিহারি পুলিশ। এরা ছিল বিষফোঁড়ার মতো। নিরুপায়ভাবে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ভাইয়া, আপকো কুছ মালুম হ্যায় ক্যাপ্টেন সাহাব কিউ বোলায়া? ম্যায় তো কুছ কসুর নেহি কিয়া।

সে জবাব দেয়ার প্রয়োজন মনে করে না। শরাফাত আলী অনুনয় বিনয় করেনÑ ভাইয়া, ম্যায়ভি আপকা মাফিক মোহাজের হু, ম্যায় বারাসাত কি রাহেনেওয়ালা থা। বাতাইয়ে না, ক্যাপ্টেন সাব মুঝে কিউ বোলায়া?

পুলিশটা খিচিয়ে ওঠেÑ কিউ তং করতা! মুঝে কেয়া মালুম কিউ বোলায়া, আপ জলদি চলিয়ে।

এই আকস্মিক ঘটনায় হোটেল মালিকও ঘাবড়ে গিয়েছিল, তবুও সান্ত¡নার ছলে বলল, আল্লার নাম নিয়ে যান শরাফত ভাই, দেখবেন কিছুই হবে না, আপনি তো কোন অন্যায় করেননি। ক্যাপ্টেন সাহেব হয়ত হাত দেখাবেন, আপনাকে দেখে তার বিশ্বাস জন্মেছে। যাওয়ার আগে পুলিশটাকে আড়াল করে সে আবার ফিসফিস করে বলল, তবে হাতে যাই দেখেন শরাফত ভাই, খবরদার খারাপ কিছু বলতে যাবেন না যেন।

শরাফত আলী নিশ্চিত নন তার স্নায়ুবিক চাপ কতখানি। আগে এসব দেখার কোন প্রয়োজন হয়নি। তবে এই মুহূর্তে অনেক চেষ্টাকরেও তিনি আয়তল কুরছিটা ঠিকমতো মনে করতে পারলেন না। যা মনে পড়ল তা একাত্তরের দিনগুলোতে নিরন্তর আল্লাহর দরবারে পেশ করা অসহায় বাঙালীর করুণ আর্তিÑ‘লাইলাহা ইল্লা আন্তা সোবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জলেমিন’। বিড়বিড় করে তাই পড়তে পড়তে ম্যাগনিফাইং গ্লাস ও পামিস্ট্রির ওপর কিরোর ইংরেজী বইটা হাতে নিয়ে পুলিশের পিছু পিছু তিনি হেলিপোর্টের আর্মি অফিসে উপস্থিত হলেন।

ক্যাপ্টেন ভেতরের রুমে চেয়ারে অলসভাবে বসে টেবিলের ওপর গোলাকার একটা পেপারওয়েট বনবন করে ঘোরাচ্ছিলেন। শরাফত আলীকে দেখে বললেন, আইয়ে পামিস্ট সাব, বয়ঠিয়ে, ম্যায় তো আপকা এনতেজার মে হু। কেয়া পিয়েগা চায়ে না কফি?

আপকা বহুত মেহেরবানি স্যার, শরাফত আলী বিগলিতভাবে বললেন, ম্যায় তো থোড়া পহেলে চা পিলিয়া স্যার।

তো কিয়া! দো কাপ চা বহুত জেয়াদা তো নেহি হোগা। তিনি চায়ের ফরমাশ দিয়ে বললেন, ওয়েল মিস্টার পামিস্ট, আব সাচ্ বাতাইয়েÑ কেয়া আপ পামিস্ট হ্যায়; বুজরুক হ্যায় তো নেহি!

শরাফত আলী বিনয়ের সঙ্গে বললেন, জি নেহি স্যার। তব আপ মালিক হ্যায়, আপকো ইয়ে বাতানা ফরজ্ হ্যায় কি ম্যায় নে সির্ফ্ আন্দাজ কর সাকতা হু, অ্যাকচুয়ালি কেয়া হোগা আউর নেহি হোগা উও তো স্যার খুদ আলিমুল গায়েব আল্লাহ কি এখতিয়ার হ্যায়।

ঠিক হ্যায়! ঠিক হ্যায়! তো দেখো মেরা হাতÑআল্লা মিয়ানে কেয়া লিখ্যা হ্যায়। ক্যাপ্টেন তার শক্তসমর্থ হাতের পাঞ্জা শরাফত আলীর চোখের সামনে মেলে ধরেন।

বিনয়ের সঙ্গে ক্যাপ্টেনের বাড়ানো হাত ধরে কয়েক সেকেন্ড পাঞ্জার এপিঠ ওপিঠ পরখ করলেন শরাফত আলী। তারপর প্রায় ঝাপসা ম্যাগ্নিফাইং গ্লাসটা হাতের তালুর ওপর ঝুলিয়ে রেখে ধীরে ধীরে তার ভূত-ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করে গেলেন। কখনো মাথা দুলিয়ে কখনো ভ্রƒকুঞ্চিত করে ক্যাপ্টেন কথাগুলো শুনে গেল। শরাফত আলী বললেন, একঠো অ্যাগট স্টোন লিজিয়ে স্যারÑ আকিক, হামারা নবী করিমকো বহুত পছন্দ থা। আর একঠো ক্যাটস্ আই, আপকা লিয়ে আচ্ছা হোগা। মেরে পাস জেনুইন স্টোন হ্যায় স্যার।

ক্যাপ্টেন ভ্রƒকুঞ্চিত করে জিজ্ঞাসা করলেন, ক্যাটস্ আই কিউ?

ইয়ে পাত্থরকা মরতবা বহুত জেয়াদা হ্যায়। স্যার, ইট মে হেল্প টু কিপ ইউ সেফ ফ্রম দি অডস্। কওম আউর ইসলামকি খাতেরমে আপলোগকো কেতনা রিস্ক লেনা পড়তা হ্যায়, ইয়ে আপকা লিয়ে বহুত হেল্পফুল হোগা। কিম্মত ভি জেয়াদা নেহি।

ক্যাপ্টেন খরখরে চোখে কয়েক সেকেন্ড শরাফাত আলীর দিকে তাকিয়ে থেকে ঝট্কা মেরে হাতটা টেনে নেন, বলেন, তো এহি বাত মিস্টার পামিস্ট! ঠিক হ্যায় তোম ফিকর মৎ করো, হাম জরুর ক্যাটস আই ঢুন্ড লুঙ্গা, আসলি ক্যাটস আই। পাশের রুমে আর একজন দীর্ঘদেহী অফিসার এতক্ষণ কাগজপত্রে চোখ বুলা”িচ্ছলেন। ঝটকরে উঠে এসে বললেনÑ আরে ইয়ার তুম হাত দেখাতা হো, হাউ ফানিয়ু হ্যাভ বিলিফ ইন অল দিজ বোগাস!

কিউ নেহি! আরে দেখতা নেহি ইয়ে পামিস্ট সাহিব কেতনা বুজুর্গ আদমি হ্যায়। তুম ভি হাত দেখালো। হরবখত তোমকো ভি অপারেশনমে ইধার-উধার যানা পড়তা হ্যায়, রিস্ক কভার করনে কি লিয়ে কোই স্টোন কি জরুরত হ্যায় কি নেহি দেখলো ইয়ার। স্টোন ভি ইনকা পাস মিলেগা, আউর কিম্মত ভি জেয়াদা নেহি! কেয়া সাম্ঝা!

আচ্ছা! তো দেখিয়ে মেরা হাত। অফিসারটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাত বাড়িয়ে ধরেন।

শরাফত আলী অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার হাতের তালুর উপর আতস কাঁচটা মেলে ধরে কিচুক্ষণ চুপচাপ হাতের রেখা নিরীক্ষণ করে বলেন, স্যার আপকা হাত বড়ি আচ্ছি হাত হ্যায়, ইওর হেল্থ আউর লাইফ লাইন ভি আচ্ছা হ্যায়। আপকা কোই স্টোনকা জরুরত নেহি। তব আচ্ছা হোগা, আগার আপ একÑ

কথা কেড়ে নিয়ে অফিসারটি বলল, বাস্! সামাঝ্ গিয়াÑ ক্যাটসআই! তো শুনিয়ে পামিস্ট সাব, লাইফলেস্ ঠাণ্ডি পাত্থর মেরা বিলকুল পসন্দ নেহি। মেরা পছন্দ সির্ফ্ হট ফ্লেশ! ক্যাটস আই, ব্লু অর ব্লাক আইড্ ব্লন্ডেÑ যো মিল যায়ে, মুঝে কোই ফারাক পড়তা নেহি! সে অশ্লীলভাবে ঠা ঠা করে হেসে ওঠে।

শরাফত আলী গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তাদের আচরণের অর্থ এবং এই মুহূর্তে নিজের ললাটের লেখা অনুধাবন করতে চেষ্টা করেন। বলা বাহুল্য ব্যর্থ হন। তার মনে হয় এরা তাকে নিয়ে ইন্দুর-বিড়াল খেলছে। শেষ কিভাবে হবে তিনি ভেবে পান না, ভয়ে শিটিয়ে থাকেন। তবে যতটা আশঙ্কা করেছিলেন তার ভাগ্য ততটা খারাপ হয় না, কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেন তাকে ছাড়পত্র দেনÑ ওয়েল, আভি তোম যা সাকতে হো।

তিনি ত্রস্তহাতে বই ও ম্যাগ্নিফাইং গ্লাসটা তুলে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং প্রায় কুর্নিশ করার ভঙ্গিতে নত হয়ে সালাম জানিয়ে স্খলিত পায়ে রওয়ানা দেন। দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই আবার তার ডাক পড়েÑ মিস্টার পামিস্ট, ইওর ফিস! কিয়া ভুল গিয়া?

শরাফত আলী দেখেন ক্যাপ্টেন তার দিকে দুটো পাঁচ টাকার নোট বাড়িয়ে ধরে আছে। ঘামে ভেজা চেহারায় স্থুল লালসা, রসিকতা করে বলেনÑ ডোন্ট ওরি মিস্টার পামিস্ট, ম্যায় জলদি জলদি আসলি ‘ক্যাটস্ আই’ ঢুন্ড লুঙ্গা, কোই না কোই জরুর মিল জায়েগাÑইয়াং এ্যান্ড বিউটিফুল, ইওর কান্ট্রি হ্যাজ প্লেন্টি অব ইট! তারা দুজন অশ্লীলভাবে ঠা ঠা করে হেসে ওঠে। তিনি কাঁপতে থাকেন। ডুবন্ত মানুষের মত কুটোগাছ ধরে হলেও তিনি বাঁচতে চান। যন্ত্রচালিতের মতো হাত বাড়িয়ে ক্যাপ্টেনের হাত থেকে জলন্ত অঙ্গার দুটো তুলে নিয়ে আর একদফা সালাম দেন তিনি। তার কান ভো ভো করতে থাকে। শয়তান হাসছে, হেসেই যাচ্ছে!

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

১২/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: