মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সবুজ আন্দোলন

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪
  • কামরুল হাসান

সভ্যতার পদযাত্রায় মানব ইতিহাসে নব নব ধারণা ও তত্ত্বের উদ্ভব হয়। পারিপার্শ্বিক অবস্থা এসব নব ধারণা ও তত্ত্ব উদ্ভাবের মূল কারণ। আদিম সমাজ কিংবা মধ্য যুগে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি কখনও উচ্চারিত হয়নি কিংবা এ নিয়ে সচেতনতার প্রয়োজনও দেখা দেয়নি। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর নগরায়ন এবং কলকারখানা স্থাপনের ফলে আবাদ ভূমি ও বায়ুদূষণের বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হলে পশ্চিমা বিশ্বে পরিবেশবাদ বা পরিবেশ আন্দোলনের ধারণার জন্ম হয়। যদিও সেই সময় এ ধরনের আন্দোলনকে রোমান্টিক মুভমেন্ট হিসেবেও কটাক্ষ করা হতো। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতার বিষয়ে তখন ছিল ধারণারও অতীত। পরিবেশ সংরক্ষণ কিংবা ভারসাম্যের মতো শব্দ তখনও যুক্ত হয়নি মানব অভিধানে। ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওর্থ সর্বপ্রথম এ ধারণার জন্ম দেন। তাঁর লেখা একটি কবিতার পঙ্ক্তি হয়ে ওঠে এ আন্দোলনের মূল উপজীব্য। শিল্প বিপ্লবের পর কলকারখানার লাগামহীন বায়ু নির্গমনের ফলেই মূলত এ আন্দোলনের সূত্রপাত। মিলকারখানায় কয়লার ব্যবহার শিল্পাঞ্চলে বায়ুদূষণের মাত্রা মারাত্মক বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাড়তে থাকে শহরের ময়লা-আবর্জনা স্তূপ।

বায়ুদূষণ ও আবর্জনার স্তূপ শহুরে মধ্যবিত্তের মাঝে নতুন উদ্বেগ তৈরি করে। মধ্যবিত্ত সমাজ আরও বেশি সচেতন হয় পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভারসাম্যের বিষয়ে। তাদের দাবি আগামী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার দায়িত্ব সকলের। সম্ভবত এ আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতেই গ্রেট ব্রিটেন সর্বপ্রথম পরিবেশ আইন প্রবর্তন করে। ১৮৬৩ সালে বায়ুদূষণের মাত্রা কমানোর লক্ষ্যেও আলকালি এ্যাক্ট (অষশধষর অপঃং) পাস করা হয়। তবে বন সংরক্ষণ নীতির সূত্রপাত হয় ব্রিটিশ ভারতে। বন কিংবা অরণ্য সংরক্ষণ করার লক্ষ্যেই ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট। স্যার জেমস র‌্যানাল্ড মার্টিন ভারতের বন সংরক্ষণ আন্দোলনের প্রবক্তা। ব্রিটিশ এ ভদ্রলোক ইংরেজ শাসনামলে ভারতের নাগরিকদের অরণ্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে বনায়ন ধ্বংসের যে প্রতিযোগিতা সেই সম্পর্কে সচেতন করেন ভারতের নাগরিকদের। স্যার জেমস মার্টিন প্রথম এ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। বনায়ন ধ্বংসের কারণেই খরা-বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি। পরিবেশ সম্পর্কে স্যার মার্টিনের ব্যাখ্যা এবং জোর লবিংয়ের ফলে জন্মলাভ করে বিশ্বের প্রথম বন বিভাগ (ঋড়ৎবংঃ উবঢ়ধৎঃসবহঃ)। ভারতের বন সংরক্ষণে বন বিভাগ এবং স্যার জেমস মার্টিনের ভূমিকা অতুলনীয়। ব্রিটিশ ভারতের গবর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি ১৮৫৫ সালে এ সম্পর্কীয় এক আইন পাস করেন এবং পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে এ আইন বিস্তৃত এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে।

বন বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পশ্চিমা বিশ্বে ধীরে ধীরে বন্যপ্রাণী শিকার ও হত্যা বন্ধে সচেতন হয় নাগরিক সমাজ। ইউরোপের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এ সচেতনতা বাড়তে থাকে। সরকারীভাবে পাস হয় বন সংরক্ষণ আইন এবং বন সংরক্ষণ নীতি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ আন্দোলনে গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতার বিষয়টি তখনও এতটা গুরুত্বসহকারে দেখা হতো না। ১৯৭০ সালে বিশ্বে প্রথম আর্থ ডে (ঊধৎঃয ফধু) উদযাপন করা হয়। গ্রীন পিস মতো সংগঠনের জন্মের মধ্য দিয়ে রাজনীতিক ও সামাজিক আন্দোলনে পরিবেশের বিষয়টি যুক্ত হয়। ১৯৮০ সালে আর্থ ফার্স্ট (ঊধৎঃয ঋরৎংঃ) সংগঠন দাবি করে মানব বিকাশের মতো বিশ্বের নানা প্রজাতির জীবজন্তুর বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ যে কোন একটি প্রাণীর বিলুপ্তির মধ্যে পরিবেশ ভারসাম্যের যথেষ্ট ঝুঁকি বিদ্যমান। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘ প্রথম মানব পরিবেশের বিষয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে এবং দেশে দেশে এ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশের ভারসাম্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্রমাগত বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে হিমবাহের বরফ গলার বিষয়টি পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ তৈরি করে। দাবি ওঠে পশ্চিমা বিশ্বেরÑ কার্বন নিঃসরণ কমানোর কারণ উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের কারণে নিম্নাঞ্চল অদূর ভবিষ্যতে তলিয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন এ নিয়ে আইনী বাধ্যবাধকতা ব্যাপারটি সামনে নিয়ে আসে। সম্প্রতি পেরুর রাজধানী লিমায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন। এমন এক সময়ে এ সম্মেলনের আয়োজন বৈশ্বিক উষ্ণতা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মহাসাগর ও ভূমিতে গড় তাপমাত্রা গত ১৩৪ বছরের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এ বছরে একাধিক বৈশ্বিক আয়োজনে বেশ কিছু আশা সঞ্চারী উদ্যোগ নেয়া হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের আহ্বানে ১০ লাখের বেশি মানুষের সমাবেশের আয়োজন করা হয়। আগামী বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এ সম্পর্কীয় একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে। প্যারিস চুক্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইনী বাধ্যবাধকতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। বিশ্বের ৪০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ দুই রাষ্ট্র চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সম্মত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে গ্রীন ফান্ডের ব্যবস্থা করা হয়। স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্যই এই ফান্ড। তবে লিমা সম্মেলনে গরিব রাষ্ট্রগুলো ধনী রাষ্ট্র থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি তোলেন। যদিও এ ইস্যুটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি লিমা সম্মেলনে। পেরুর এই সম্মেলন জলবায়ু আন্দোলনের জন্য এক মাইলফলক হতে পারে যদি সব রাষ্ট্র প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য চুক্তির ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে।

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

১২/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: