মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ডুবন্ত ট্যাঙ্কার উদ্ধার,দেখা মিলছে না কুমির ডলফিনের

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪
ডুবন্ত ট্যাঙ্কার উদ্ধার,দেখা মিলছে না কুমির ডলফিনের
  • সুন্দরবনে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বাবুল সরদার, বাগেরহাট ॥ বৃহস্পতিবার দুপুরে শ্যালা নদীর মৃগমারীতে মূল নদী থেকে ৬ কিমি দূরে ডুবন্ত তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘এমভি ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ উদ্ধার করা হয়েছে। সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ অফিস সংলগ্ন জয়মনিঘোল এলাকায় এটিকে টেনে আনা হয়েছে। দুপুরে উদ্ধারকারী জাহাজ জোবায়দা-৩, জোবায়দা-৪, জ্বলন্ত ও ডিবি রাইজিং-৩ ডুবন্ত ট্যাঙ্কারটি উদ্ধার করে। সুন্দরবনে ডলফিন নিয়ে কাজ করা একটি চীনা প্রতিনিধি দল ও নৌবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করে। তবে ট্যাঙ্কারটির ৩টি চেম্বারের তেল সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। অপর দুটি চেম্বারেরও পানি ঢুকেছে।

বন মন্ত্রণালয়েরর পৃথক তদন্ত কমিটি

সুন্দরবনে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নূরুল কবিরকে প্রধান এবং সৈয়দ মেহেদী হাসানকে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্যের পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির অপর সদস্যরা হলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের দিলীপ কুমার দত্ত, পরিবেশ বিভাগের ড. সুলতান আহম্মেদ, ড. মোঃ রেজাউল হক, খুলনা সুন্দরবন বিভাগের সিএফ কার্ত্তিক চন্দ্র সরকার, পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের পরিচালক(বিপুন) মীর রেজা আলী এবং বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি।

জরুরী সমন্বয় সভা ॥ বৃহস্পতিবার দুপুরে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরী সভা হয়। খুলনার বিভাগীয় কমিশনার আব্দুস সামাদের সভাপতিত্বে জরুরী সমন্বয় সভায় নৌবাহিনী, সুন্দরবন বিভাগ, বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড, পদ্মা অয়েল কোম্পানি, জেলা প্রশাসন, বন্দরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

তেল ক্রয়ে মাইকিং ॥ বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সুন্দরবনের নদনদীতে ভেসে যাওয়া তেল উদ্ধারের জন্য বন সংলগ্ন এলাকাবাসীকে আহ্বান জানানো হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে তেল সংগ্রহের কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক শুকুর আলী। তিনি বলেন, জনগণের কাছ থেকে পদ্মা অয়েল কোম্পানি ৩০ টাকা দরে প্রতিলিটার ওই তেল কিনবে। মংলার জয়মনিঘোল এলাকায় পদ্মা অয়েল কোম্পানি দুটি তেল ক্রয় কেন্দ্র খুলেছে।

ছাড়পত্রের অপেক্ষায় কান্ডারি ॥ বৃস্পতিবার বিকেলে শ্যালা নদীতে ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কারের পাশে এসে নোঙ্গর করেছে জাহাজ কা-ারি-১০। তবে সুন্দরবনে ভাসমান তেলের ওপরে যে কেমিক্যাল পাউডার ব্যবহার করলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা সে বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র চাওয়া হয়েছে। ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত কা-ারি-১০ কাজে অংশ নেবে না বলে জানান জেলা প্রশাসক।

শ্যালা নদীতে নৌচলাচল বন্ধ ॥ তিনি আরও জানান, এ দুর্ঘটনার পর পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ওই রুটে সবধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ডুবে যাওয়া তেলবাহী ট্যাঙ্কার ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ উদ্ধারসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকার খুবই আন্তরিক। ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কার থেকে নির্গত তেল যাতে আরও বেশি ছড়িয়ে পড়তে না পারে তার জন্য সবধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

৩ দিনেও দেখা মেলেনি কুমির ও ডলফিনের ॥ এদিকে ৩ দিনের জোয়ার-ভাটায় পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের বন অভ্যন্তরসহ ১০০ কিমি অধিক এলাকার নদনদী নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তেলের কালো আস্তরণ। ছড়িয়ে পড়া তেল তুলে নেয়ার কোন ব্যবস্থা না থাকায় ম্যানগ্রোভ এ বনের গাছের শ্বাসমূল ঢেকে যাচ্ছে। এত সুন্দরবনের শুধু বনজ সম্পদই নয়, ছড়িয়ে পড়া তেলের কারণে শ্যালা নদীর অভয় আশ্রমে বিলুপ্ত প্রায় ইরাবতী ডলফিনসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন, কুমিরসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। ৩ দিনেও দেখা মেলেনি কুমির ও ডলফিনের। জানিয়েছেন জেলে ও বন সংলগ্ন এলাকার মানুষ। তবে ৭২ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি ডুবে যাওয়া অয়েল ট্যাঙ্কারের নিখোঁজ মাষ্টার মোকলেসুর রহমানের (৫০) লাশ।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আমির হোসাইন চৌধুরী জানান, জাহাজ কা-ারি-১০ থেকে সুন্দরবনে ভাসমান তেলের ওপরে একধরনের পাউডার ছিটিয়ে তেল নষ্ট করার যেকথা ছিল তা বাতিল করা হয়েছে। ওই পাউডার ছিটালে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ কারণে তা বাতিল করা হয়।

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীর মৃগমারী এলাকায় মঙ্গলবার ভোরে এমভি টোটাল ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় তলা ফেটে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৮ লিটার ফার্নেস তেল নিয়ে ডুবে যায় ট্যাঙ্কার এমভি ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন।

পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ ॥ সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ট্যাঙ্কার ডুবে নদনদী ফার্নেস অয়েলে সয়লাব হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তেল-গ্যাস-বিদ্যুত-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বন সংলগ্ন শরণখোলা সুন্দরবন রক্ষা পরিষদ। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গভীরভাবে লক্ষ্য করেছে যে, ওই তেল সুন্দরবনের নদনদী ও খালসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রমশ বিস্তৃতি ঘটছে। তাতে গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও মাছসহ জলজ প্রাণীর মারাত্মকভাবে ক্ষতিসাধিত হবে, যা পূরণ হওয়ার নয়। ফলে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে পড়েছে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ ও ছড়িয়ে পড়া তেল দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।

রাসায়নিক ছিটানো বাতিল ॥ ট্যাঙ্কার ডুবে সুন্দরবনের নদী খালে ছড়িয়ে পড়া তেলের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ১০ হাজার লিটার রাসায়নিক নিয়ে কা-ারি-১০ নামে একটি জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। ওই রাসায়নিক ভাসমান তেলের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে তেল নিষ্ক্রিয় করা হবে। কিন্তু পরে জীববৈচিত্র্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় কর্মসূচী বাতিল করা হয়।

সুন্দরবনের নদী-খালে ভাসছে তেল ॥ সকালের গাঢ় ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে ছুটে চলা সুন্দরবনের দিকে। সাড়ে নয়টার দিকে সুন্দরবনের শ্যালা নদীর চ্যানেলে ট্রলারে প্রবেশ করতেই সেখানের পানিতে ঘন কালো ফার্নেস তেলের সারি সারি ঢেউ চোখে পড়ে। এখান থেকেই দেখা যায় সুন্দরবনের নদনদীর পানিতে মিশে ভাসতে থাকা জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর তেল। গত দু‘দিনে নিমজ্জিত ট্যাঙ্কার থেকে তেল বের হয়ে সুন্দরবনের প্রায় বিশ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে জোয়ার-ভাটার টানে। পানির তোড়ে তেল সুন্দরবনের প্রধান স্তর ম্যানগ্রোভ স্তরেও পৌঁছে গেছে। নদীর তীরের ঘাস, লতাগুল্ম আর গাছগাছালিতেও কালো কালো হয়ে তেলের আস্তরণ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। জোয়ারের পানিতে যতদূর পর্যন্ত উঁচুতে পানি উঠেছে ততদূর পর্যন্ত তেলের কালো আস্তরণ পড়েছে গাছগাছালিতে। যতই এগিয়ে যাওয়া যায় ততই পানিতে গাঢ় ঘন তেলের আস্তরণের ব্যাপকতা বাড়তে থাকে। প্রায় আধা ঘণ্টা এভাবে নদী পাড়ি দেয়ার পর দেখা মিলল অর্ধডুবন্ত তেলবাহী ট্যাঙ্কার। ডুবন্ত ট্যাঙ্কারের সঙ্গে আরও দুটি জাহাজ দড়ি দিয়ে বেঁধে ট্যাঙ্কারটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন কোম্পানির নিয়োজিত লোকজন। তবে তা প্রাথমিক কাজ বলে জানান উদ্ধার কাজে নিয়োজিতরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্যালা নদীর শাখা খাল জয়মনি, মৃগমারী, মোরগমারী, বাদামতলা, খড়মা, উলুবুনিয়া, বটতলা, তেঁতুলবুনিয়া, ভাইজোড়া, হেতালমারী ও জিন্নাতের খালে জ্বালানি তেল ভাসছে। স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, অভয়াশ্রম শ্যালা নদীর জয়মনি এলাকায় একটু পর পর ডলফিন লাফিয়ে উঠত। তবে তেল ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আর কোন ডলফিন উঠতে দেখা যায়নি।

সেখানে কথা হয় ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কারের সুপারভাইজার মোঃ ওলিউল্লাহ আর সুকানী মোঃ এবাদতের সাথে। তারা জানান, গত মঙ্গলবার ভোরে জয়মনি এলাকা থেকে তারা তেলবাহী ট্যাঙ্কার ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন নিয়ে সুন্দরবনের শ্যালা নদীর মৃগমারী এলাকায় পৌঁছলে ঘন কুয়াশার কারণে সেটিকে নোঙ্গর করে কুয়াশার সংকেত জ্বালানো হয়। কিন্তু ভোর সাড়ে চারটার দিকে অপর একটি কার্গো এমভি. টোটাল দ্রুত বেগে আসতে দেখে নাবিকরা সংকেত দিয়ে চিৎকার করতে থাকে। সেগুলোকে আমলে না নিয়ে এমভি. টোটাল জাহাজটি তাদের ট্যাঙ্কারে সরাসরি ধাক্কা দেয়। এতে ট্যাঙ্কারটির তলা ফেটে পানিতে ডুবে যায়। এ সময় ট্যাঙ্কারে থাকা সাতজন নাবিকের মধ্যে ৬জন উদ্ধার হলেও মাস্টার মোকলেসুর রহমান নিখোঁজ হন। গত দুদিনেও তাঁর কোন সন্ধান মেলেনি। স্থানীয় ডুবুরি, কোস্টগার্ড ও বনবিভাগের কয়েকটি টিম নিখোঁজ মাস্টারের সন্ধান করছে। তারা জানান, এই সময়ে তেলের ট্যাঙ্কার ফেটে পানিতে তেল নির্গত শুরু হয়। দুই দিনে ট্যাঙ্কারে থাকা তিন লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার তেল পানিতেই মিশে গেছে। বুধবার সকালে তাদের কোম্পানির পক্ষ থেকে আরও দুটি জাহাজ এনে ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কারটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি উদ্ধারে দুই দিন লাগতে পারে বলে তারা জানায়। তবে বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে এসে বিআইডব্লিউটিএর

খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক আশরাফ হোসেন জানান, ডুবন্ত ট্যাঙ্কারটি উদ্ধারে বরিশাল থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক ও নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ বুধবার রাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে উদ্ধার কাজ শুরু হতে পারে। তারা দ্রুততার সঙ্গে জাহাজটি উদ্ধারে চেষ্টা করছেন বলে জানান।

এ তেলবাহী ট্যাঙ্কারডুবির ঘটনার পর সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও আমীর হোসাইন চৌধুরী ও খুলনার বন সংরক্ষক কার্ত্তিক চন্দ্র সরকারসহ বনবিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনাস্থলে কথা হয় খুলনা বন সংরক্ষকের সঙ্গে। তিনি জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বনবিভাগের পক্ষ থেকে সকল বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে। ঘটনাস্থলটি বিরল প্রজাতির ইরাবতি ডলফিনসহ ৬ প্রজাতির ডলফিনের অভয়াশ্রম এলাকা। ইতোমধ্যেই ট্যাঙ্কার থেকে তেল নির্গত হয়ে সুন্দরবনের শ্যালা নদীসহ আশপাশের নদ-নদীর প্রায় ২০কিলোমিটার এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে। জোয়ার-ভাটায় নতুন নতুন এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়ছে। এই ক্ষতিকর তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণেন ডলফিন, জলজপ্রাণীসহ মৎস্যভা-ারের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্ক দেখা দিয়েছে। এছাড়া সার্বিক জীববৈচিত্র্যও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি দ্রুত ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কারটি উদ্ধার ও তেল অপসারণের চেষ্টার কথা জানান। তবে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, যেভাবে তেল নদ-নদীর পানিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে এর ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।

মন্ত্রীর অসন্তোষ, ইউনেস্কোর উদ্বেগ ॥ গত ১৫ দিনের ব্যবধানে মংলা বন্দরের অদূরে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অভ্যন্তরে শ্যালা নদীতে দুটি নৌযানডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বার বার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও নৌ-মন্ত্রণালয়ের খামখেয়ালিপনার কারণে সুন্দরবনের অভ্যন্তর থেকে ২০১১ সালের মে মাস থেকে পণ্যবাহী ভারি জাহাজ চলাচল শুরু করে। এ ঘটনায় বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ইউনেস্কো প্রকাশ করেছে উদ্বেগ। বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আব্দুস সামাদের সভাপতিত্বে মংলা বন্দরের মিলনায়তনে এক জরুরী সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সভায় নৌবাহিনী, সুন্দরবন বিভাগ, বিএডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড, পদ্মা অয়েল কোম্পানি, জেলা প্রশাসন, বন্দরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মুঃ শুকুর আলী জানান, সাড়ে তিন লক্ষাধিক লিটার জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ উদ্ধার করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ভোরে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জে শ্যালা নদীতে একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ডুবে গেছে সাড়ে তিন লক্ষাধিক লিটার জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’। গত ২৪ নবেম্বর ভোরে একই নদীতে নিমজ্জিত হয় পর্যটক বহনের কাজে ভাড়ায় চালিত যাত্রীবাহী নৌযান এমভি শাহীদূত। দুটি নৌযানই তলা ফেটে নিমজ্জিত হয়। এদিকে, কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র (অনাপত্তির সনদ) ছাড়া প্রায় তিন বছর যাবত মংলায় জাহাজ আসা-যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সমুদ্রবন্দর। এছাড়া এমভি শাহীদূত নদী থেকে উত্তোলনের আগেই আরও একটি তেলবাহী জাহাজডুবি এবং ট্যাঙ্কার ফেটে তেল ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন।

১৫ দিনে দুটি নৌযানডুবি ॥ গত ২৪ নবেম্বর সোমবার ভোরে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের হরিণটানা এলাকায় তলা ফেটে নিমজ্জিত হয় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি শাহীদূত। তবে যাত্রীবাহী হলেও সুন্দরবনের পর্যটক পরিবহন কাজে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছিল। দুর্ঘটনার সময় লঞ্চে কোন পর্যটক না থাকায় এবং মাস্টার ও ড্রাইভারসহ অন্য কর্মচারীরা সাঁতরে তীরে ওঠায় কেউ হতাহত কিংবা নিখেঁজ হননি। পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আমীর হোসেন চৌধুরী জানান, জনৈক আতিয়ার রহমান বাবুল সুন্দরবনে পর্যটন ব্যবসা করার জন্য ঢাকা থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চটি ভাড়া করে আনেন।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, লঞ্চটি পিরোজপুরের ভা-ারিয়া থেকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে খুলনায় যাচ্ছিল। ২৪ নবেম্বর ভোরে ঘন কুয়াশার মধ্যে লঞ্চটি শ্যালা নদীর একটি ডুবোচরে আটকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে এর ডেকের তলা ছিদ্র হয়ে যায়। এক পর্যায়ে ভেতরে পানি ঢুকে কাত হয়ে ডুবে যায় লঞ্চটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বার্ষিক ফিটনেস পরীক্ষার সময় লঞ্চটির কয়েকটি ত্রুটি শনাক্ত হয়েছিল। তবে সেগুলো সংশোধন না করেই টোকেনের মাধ্যমে সাময়িক চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। যে কারণে ২০ বছরের পুরনো নৌযানটির তলদেশের ইস্পাতের পুরুত্ব ক্ষয়ে পাতলা ও দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এবং ডুবোচরে সামান্য আঘাতেই তলদেশ ছিদ্র হয়ে লঞ্চটি ডুবে যায়।

সুন্দরবনের অভ্যন্তরে শ্যালা নদীতে দু’টি নৌযানডুবির পর ওই পথ দিয়ে নৌযান চলাচল করতে পারছে না। বিকল্প হিসেবে বনের আরও ভেতর দিয়ে চলাচল করছে বিভিন্ন ধরনের নৌযান। এসব নৌযান থেকে নির্গত বর্জ্য (অপরিশোধিত জ্বালানি) নদীর পানিকে দূষিত করায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া সর্বশেষ মঙ্গলবার সাড়ে তিন লক্ষাধিক জ্বালানি তেল বোঝাই ট্যাঙ্কার ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে ট্যাঙ্কারের তেল নদীতে মিশে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকার পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। এতে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।

ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস ও পুনর্বাসনে সহায়তার আগ্রহ ॥ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে ফার্নেস অয়েল বোঝাই ট্যাঙ্কারটি ডুবে নদ-নদীর পানি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে সকল প্রকার বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ঐতিহ্যের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস এবং পুনর্বাসন লক্ষ্যে সরকারী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের নিয়ে সরকারকে সহায়তা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংস্থাটির পক্ষ থেকে পাঠানো এক ইমেইল বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৯ ডিসেম্বরে দুর্ঘটনাকবলিত একটি জাহাজ থেকে সুন্দরবনের ভেতরে তেল নিঃসরণের সাম্প্রতিক ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে ইউএনডিপি (জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী) বাংলাদেশও উদ্বিগ্ন। তেল নিঃসরণের এলাকাটি চাঁদপাই অভয়ারণ্য সংলগ্ন, যা বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত সর্ববৃহৎ সংরক্ষিত জলাভূমি এবং গাঙ্গেয় ও ইরাবতী নামক দুটি বিপদাপন্ন ডলফিন প্রজাতির বিচরণ ক্ষেত্র।

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

১২/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: