মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৪
চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ
  • স্বাধীনতার চার দশকে সেলুলয়েডের ফিতায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্র। সেগুলোর কোনটি মহাকালের বিচারে উত্তীর্ণ হয়ে নাম লিখিয়েছে ক্লাসিকের খাতায়। আবার নির্মাণশৈলী এবং গল্পের গাঁথুনির দুর্বলতায় অনেক চলচ্চিত্র মানুষ আর মনে রাখেনি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বিপুলসংখ্যক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। অনেক যুদ্ধ ফেরত মুক্তিযোদ্ধা বিবেকের তাড়নায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকায় সেভাবে আর মুক্তিযুদ্ধ

স্বাধীনতার চার দশকে সেলুলয়েডের ফিতায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্র। সেগুলোর কোনটি মহাকালের বিচারে উত্তীর্ণ হয়ে নাম লিখিয়েছে ক্লাসিকের খাতায়। আবার নির্মাণশৈলী এবং গল্পের গাঁথুনির দুর্বলতায় অনেক চলচ্চিত্র মানুষ আর মনে রাখেনি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বিপুলসংখ্যক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। অনেক যুদ্ধ ফেরত মুক্তিযোদ্ধা বিবেকের তাড়নায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকায় সেভাবে আর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণকে উৎসাহিত করা হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নিয়ে লিখেছেন ইমরান হোসেন

আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসামান্য আত্মত্যাগ আর পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে বীরত্বগাথাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে বেশকিছু ভাল মানের চলচ্চিত্র। এসব সিনেমায় পাক হানাদার বাহিনীর বাংলার সাধারণ মানুষের ওপর নৃশংস অত্যাচার উঠে এসেছে সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষের প্রতিবাদী হয়ে ওঠার গল্পও উঠে এসেছে সেলুলয়েডের ফিতায়। এসব সিনেমার মধ্যে রয়েছে চাষী নজরুল ইসলামের ‘্ওরা এগারো জন’ , সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’, চাষী নজরুলের ‘সংগ্রাম’ , হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমনি’, ‘শ্যামলছায়া’ তৌকির আহমেদের ‘জয়যাত্রা’, এবং জাহিদুর রহিম অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’, মোরশেদুল ইসলামের ‘ আমার বন্ধু রাশেদ’ নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর ‘গেরিলা’, ‘একাত্তরের যীশু’ তারেক মাসুদের মাটির ময়না’ মনসুর আলীর ‘সংগ্রাম’সহ আরও বেশকিছু ভাল মানের চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই নির্মিত হয়েছিল চরচ্চিত্র ‘রক্তাক্ত বাংলা’, ‘বাঘা বাঙ্গালী’, ‘আলোর মিছিল’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘আগামী’, ‘নদীর নাম মধুমতি’, ‘মেঘের অনেক রং’সহ আরও কিছু চলচ্চিত্র।

গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত হয়েছে বেশকিছু নান্দনিক তথ্যচিত্র। এসব তথ্যচিত্র নির্মাণের সূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালে নয় মাসের যুদ্ধকালীন সময়েই। জহির রায়হান, তারেক মাসুদ আর আলমগীর কবিরের মতো চলচ্চিত্রকাররা ক্যামেরা হাতে তথ্যচিত্র নির্মাণ করে লড়াই করেছেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। জহির রায়হান একাত্তরের পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’। তারেক মাসুদের তথ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ আর ‘মুক্তির কথা’য় ১৯৭১ সালের পাক বাহিনীর অন্যায় যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট এক কোটি শরণার্থীর অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র তুলে আনা হয়েছে। পৃথিবীর মানুষের কাছে তিনি তুলে ধরেছেন যে, বাংলাদেশের মানুষের ওপর একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

তবে একথাও সত্যি যে, গত চার দশকে যে পরিমাণে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হবার কথা ছিল ঠিক সে পরিমাণে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র আমরা পাইনি। বিগত সামরিক শাসন আমলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের যে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, সেটি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মোটামুটি দুঃসাধ্য। স্বাধীনতার চার দশক পরে এসে ১৯৭১ সালের আবহ তৈরি করতে হলে পরিচালককে সেট, কস্টিউম, এবং লোকেশনের ক্ষেত্রে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এসব কারণেও আমাদের চলচ্চিত্রে সেভাবে মুক্তিযুদ্ধ উঠে আসেনি। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বেশকিছু চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধ সাইড স্টোরি হিসেবে উঠে এসেছে। তবে সেসব সিনেমায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উঠে আসেনি প্রকৃত অর্থে। কিছুকাল আগে বলিউডে ‘গু-ে’ নামক একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। যেখানে চলচ্চিত্রের শুরুতেই ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে ভারত বনাম পাকিস্তানের যুদ্ধ বলা হয়। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের সূচনা ঘটে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রমোদীদের মধ্যে। পরে গু-ের প্রযোজনা সংস্থা তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ায় বিষয়টির সেখানেই ইতি ঘটে। কয়েক মাস আগে ভারতে মুক্তি পায় মৃত্যুঞ্জয় দেবরত পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘যুদ্ধশিশু’। একাত্তরের বীরঙ্গনাদের বর্ণনাতীত কষ্ট নিয়ে নির্মিত হয় চলচ্চিত্রটি। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চলচ্চিত্রটির মুক্তি দেয়া হয়। এই চলচ্চিত্রে রাইমা সেন অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নেন।

বর্তমান সময়ে সরকার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণকে উৎসাহিত করতে সরকারী অনুদানের ব্যবস্থা করেছে। তবে এই অনুদানের অর্থ একটি আন্তর্জাতিক মানের যুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে অসংখ্য নান্দনিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সেসব চলচ্চিত্র ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবীতে। মানুষ জানতে পেরেছে যুদ্ধের প্রকৃত ভয়াবহতা। আমরা আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঠিক সেইভাবে উপস্থাপন করতে পারিনি। স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে আমরা যদি সোচ্চার হতে পারতাম, তবে সারা পৃথিবী আরও বেশি জানতে সক্ষম হতো যে, ১৯৭১ সালে নয় মাসে কি ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞই চালানো হয়েছে নিরীহ বাঙালীর ওপরে! তবে আশার কথা, বর্তমান সময়ে প্রতিবছর একাধিক করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে ছোট ছোট আখ্যান বা টুকরো গল্পকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে মানুষের মুখে মুখে এখনও ফেরে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বীরত্বগাথা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ব্যাপকতা ফুটিয়ে তোলা বেশ কঠিন। এক্ষেত্রে ছোট গল্পকে বেছে নেয়াই শ্রেয়। সামনের দিনগুলোতে তরুণ চলচ্চিত্রকাররা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরও বেশি পরিমাণে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রতী হবেন, এমনটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৪

১১/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: