কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগের সমস্যা ষড়যন্ত্রকারী ও জমিদার

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৪
  • স্বদেশ রায়

আগেও এই কলামে কয়েকবার লিখেছি, আবারও লিখছি খালেদা জিয়া বা তারেকের নেতৃত্বাধীন কোন বিএনপি আর কখনও বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে না। বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এ সত্য নিশ্চিত করে। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতার মৌরুসী পাট্টা পেয়ে গেছে। তাদের মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ কোটির বয়স ১৮ থেকে তিরিশ। এরা তরুণ। তরুণরা তুলনামূলক সৎ থাকে। যে কোন সৎ পরিবর্তনে পৃথিবীর ইতিহাসে তারাই ভূমিকা রেখেছে। এই সত্যটুকু আওয়ামী লীগের সর্বক্ষণিক উপলব্ধি করা উচিত।

বাংলাদেশের এই তরুণরা এখনও কম বেশি শেখ হাসিনার সঙ্গে। তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি চায়। শেখ হাসিনাও এই তরুণদের মানসিকতা বোঝেন। তাই তিনি সব সময় বলেন, বিশ্বাস করেন, আমরা জনগণের সেবক। আমরা শাসক নই। শেখ হাসিনার বিপরীতে এখন আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া নয়। তাই এ ক্ষেত্রে খালেদার চরিত্র কী সে বিচারে গিয়ে লাভ নেই। তবে শেখ হাসিনা বলেন বহুবচনে অর্থাৎ তাঁর দলের সকলে জনগণের সেবক। শেখ হাসিনা রক্ত করবীর রাজার মতো এখনও শতভাগ কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকা মানুষ না হলেও এ সত্য তাঁকে স্বীকার করতে হবে, বাস্তবতার কারণে তিনি এখন অনেক কিছু দেখতে পান না। আগের মতো সেই দেখার সুযোগও তাঁর নেই। তাই তিনি বহু বচনে বলেন, ‘আমরা জনগণের সেবক’। সত্য হচ্ছে, শেখ হাসিনা নিজে ছাড়া তাঁর সরকারের ও নেতাদের ভেতর হাতেগোনা দু’একজন আছেন যাঁরা জনগণের সেবক। বাদবাকি সবাই জমিদার। তাঁরা রসিয়ে রসিয়ে ক্ষমতা উপভোগ করছেন। শেখ হাসিনা তাঁদের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এনে দিয়েছেন নিজের জীবনকে বাজি রেখে অথচ তাঁর দলের ও সরকারের ওই সব দুর্নীতিবাজ, লোভী ও অযোগ্যরা মনে করছে এটা পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা। তাদের ভাবখান এমন বুড়ো জমিদার হঠাৎ করে তরুণী ভার্যা পেয়ে গেছেন সঙ্গে অযাচিত অঢেল অর্থ। তাই রসিয়ে রসিয়ে জীবনকে অশ্লীল ও অশৈল্পিকভাবে উপভোগ করছেন। শেখ হাসিনার মন্ত্রীদের ভেতর, কেন্দ্রীয় নেতাদের ভেতর ও সারা বাংলাদেশের এক শ্রেণীর নেতৃত্বের ভেতর এই অশ্লীল জমিদাররা জেঁকে বসেছে। এর মূল কারণ ভবিষ্যত বিশ্লেষণ করবে। তবে সাধারণ সাংবাদিকের দৃষ্টিতে যা পাই তা উল্লেখ করতে হলে, নেতাজী সুভাষ বোসের আত্মজীবনীর প্রায় শুরুর কয়েকটি লাইনের সারমর্ম উল্লেখ করতে হয়। নেতাজী সুভাষ বোস লিখেছিলেন, আমার জন্ম এত অর্থ-বিত্তের ওপর, আমার জীবনে অর্থ-বিত্ত নিয়ে আর কোন মোহ ছিল না। জীবনের এই প্রান্তে এসে, ক্ষুদ্র উপলব্ধি ও সীমিত পড়াশোনার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনের, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে যে বিপ্লব হলো তার ব্যর্থতার মূল কারণটি এখানেই নিহিত বলে মনে করি। ভারতবর্ষের কিছু বামপন্থী নেতা ছাড়া অধিকাংশ যাঁরা বাম আন্দোলনে গিয়েছিলেন তাঁদের ছোটবেলায় সম্বল ছিল কেবল লোটা-কম্বল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপ্লবে যারা অংশ নিয়েছিল তাদেরও বড় অংশের তাই। তাই বড় অংশই লোভের কাছে পরাজিত হয়েছে। এখানে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, অস্বাক্ষর কৃষক মুক্তিযোদ্ধা তো এ কাজ করেনি। এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আবার রবীন্দ্রনাথের কাছে যেতে হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যে নিষ্কাম কর্মের কথা বলেছেন অর্থাৎ কাজ করো কিন্তু ফলের আশা করো না তার উদাহরণ পৃথিবীতে দুটি আছে। এক অস্বাক্ষর কৃষক আর ভারতবর্ষের যৌথ পরিবারের মা। এই কৃষকেরা ও মায়েরা কাজ করে কিন্তু ফল চায় না। আমাদের কৃষক মুক্তিযোদ্ধারা এ কারণে লোভের কাছে পরাজিত হয়নি। শেখ হাসিনার চরিত্র বাঙালী যৌথ পরিবারের মায়ের চরিত্র। দেশের জন্যে, ষোলো কোটি মানুষের জন্যে তিনি নিঃস্বার্থ কাজ করে যাচ্ছেন, কোন লাভের আশা নেই তাঁর। কিন্তু পারছেন না ওই ছোটবেলায় কেবল লোটা কম্বল যাদের সম্বল ছিল তাদের কারণে। সারা বাংলাদেশে এই লোটা কম্বল শ্রেণী এখন জমিদার হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা যদি এদের নেতৃত্ব থেকে না সরান এবং এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেন তাহলে ভবিষ্যত শুভ নয়। ঠিক এমনিভাবে তাঁর দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও কিন্তু এই লোটা কম্বল শ্রেণী আছে, আছে সরকারেও, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভূমিকম্পের আশঙ্কা থেকেই যায়। শেখ হাসিনার সরকারের যে মন্ত্রী ক্ষমতায় যাওয়ার আগে ২০০ টাকার হোটেলে থাকতেন তিনি এখন তাঁর এলাকার সরকারী প্লটের বড় অংশ ভাগ করে দেন আত্মীয়স্বজনের মাঝে। এর কারণ খুঁজতে সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক ফার্গুসনের বই পড়ার দরকার নেই। কারণ একটাই ‘লোটা-কম্বল’, আর কিছু নয়।

শেখ হাসিনা তরুণ নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন যাঁরা বাংলাদেশের মানের সম্পন্ন ঘর থেকে এসেছেন, যাঁদের পিতৃ পরিচয় ছিল তাঁরা নিজেদের গড়ে তুলছেন। কিন্তু ওই লোটা কম্বল শ্রেণী থেকে যারা এসেছে তারা শুধু নেতৃত্বকে ব্যবহার করে অশ্লীল সম্পদ গড়েনি, তারা আজ সৈয়দ আশরাফের মতো নেতারও বিরোধিতা করে। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে ব্যক্তিগত কোন ঘনিষ্ঠতা নেই। ১/১১-এর পরে দুই দিন কি তিন দিন কথা হয়েছে। তাও বসে নয়, দাঁড়িয়ে। আমাদের এক শ্রেণীর সাংবাদিক ও আওয়ামী লীগের এক শ্রেণীর নেতার মুখে তাঁর বহু বদনাম শুনি। তবে সাংবাদিক হিসেবে কিছু খোঁজ খবর নেয়ার যোগ্যতা হয়ত আছে। তারানকোর সঙ্গে মিটিংয়ের সময়ে ডিপ্লোম্যাটিক সোর্স থেকে ওই বৈঠকের শুধু নয়, আগে পিছেরও অনেক খবর পেতাম। সব যে প্রকাশ করা যায় তা নয়। প্রকাশ করলে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে ক্ষণিকের জন্যে জাহির করা যায়। তবে, সাংবাদিকের নৈতিকতা সম্পর্কে নাহোক অন্তত বিশ পঁচিশটা বই যে পড়িনি তা তো নয়। পাশাপাশি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ আর রবীন্দ্রনাথের সহজপাঠ দিয়ে বাল্যশিক্ষা নিয়েছি। তাই অন্তত কিছুটা হলেও বুঝি সাংবাদিকের তথ্য প্রকাশ করা যেমন দায়িত্ব তেমনি কতটুকু প্রকাশ করতে হবে, কতটুকু করতে হবে না এই নীতিজ্ঞান থাকা আরও বড় দায়িত্ব। এছাড়া সৈয়দ আশরাফের ভাষণের দু’চারটে লাইন মাঝে মাঝে পাই। তিনি পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি হলেও তিনি বক্তব্য রাখলেও কেন আমাদের সাংবাদিকরা অন্য নেতাদের বক্তব্য বড় করে দেন তাও বুঝি না তা নয়। তবে সে সত্য আর নাই বা বললাম। তবে সৈয়দ আশরাফ সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হলো, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের এই দুর্ভিক্ষের দিনে ভাত না হোক এই ফ্যানটুকুই যথেষ্ট।

এই সৈয়দ আশরাফকে নিয়ে এখন ষড়যন্ত্র চলছে। বিএনপি করছে না। আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সৈয়দ আশরাফ নাকি অতি কথনের একজন। কারণ নিশা দেশাইকে তিনি দুই আনার মন্ত্রী বলেছেন এতে নাকি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে। যে পত্রিকার সম্পাদকের এতটুকু শালীনতা জ্ঞান নেই যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা ও শেখ হাসিনার মতো একজন সম্মানীয় ব্যক্তিকে নিয়ে লিখতে গেলে অন্তত এটুকু শালীনতা রাখতে হয় যে, মিথ্যা বলেছেন এর পরিবর্তে লেখা উচিত ‘তিনি সত্য বলেননি’ কিন্তু তা না লিখে তিনি লিখেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা মিথ্যে বলেছেন’। ওই পত্রিকা লিড নিউজ করল যে, সৈয়দ আশরাফের এই বক্তব্যে আমেরিকা-বাংলাদেশ সম্পর্ক সমস্যায় পড়বে। শুধু তাই নয়, কয়েকটি পত্রিকায় আমাদের দেশের তথাকথিত কয়েকজন এক্সপার্ট তাদের বিজ্ঞ অপিনিয়নও দিলেন। এই সব এক্সপার্টের কতটুকু পার্টস আছে তা নিয়ে আমার মতো লেখকের লেখার ক্ষমতা নেই। সৈয়দ মুজতবা আলী, পরশুরাম বা শিবরাম চক্রবর্তী যদি এদের নিয়ে লিখতেন তাহলে পাঠক একটি চমৎকার রসাত্মক লেখা পেতেন। তবে এই সব পার্টস ছাড়া এক্সপার্ট ও সম্পাদকদের বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক জ্ঞান দেখে রবীন্দ্রনাথের লাইন ধার নিয়ে বলতে হয়, এ দীনতা ক্ষমা করো।

তবে একদিকে যখন শেখ হাসিনার জমিদারের সংখ্যা বাড়ছে, তাঁর দলের অধিকাংশই বুঝতে অক্ষম শেখ হাসিনা জীবনবাজি রেখে দলকে দ্বিতীয়বারের জন্যে ক্ষমতায় এনেছেন। তারা এটুকুও বুঝতে পারছে না শেখ হাসিনা জীবনবাজি রেখে দলকে ক্ষমতায় না আনলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে বাড়ি বাড়ি ঢুকে হত্যা করা হতো। এই সব কোন বাস্তবতাকে উপলব্ধি না করে খুবই হীনস্বার্থে তাদের অনেকে নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যেমন একটি উদাহরণ, কোন রাজনৈতিক দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বোর্ড সব থেকে বিশ্বস্ত নেতাদের দিয়ে গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ডও তার বাইরে নয়। তাই ওই বোর্ডে শেখ হাসিনা কী বলেছেন সেটা কেন বাইরে আসবে? অথচ পার্লামেন্টারি পার্টির সভা থেকে বের হয়েই এক নেতা বিশেষ এক সাংবাদিকের দ্বারা একটি বিশেষ নিউজ লেখান যে, শেখ হাসিনা পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় এইচ টি ইমামের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং ওই একই ভাষায় লেখা নিউজটি কয়েকটি পত্রিকায় ছাপা হয়। একটি ইংরেজী পত্রিকায়ও একই কথাগুলো শুধু ভিন্ন ভাষায় ছাপা হয়।

সাংবাদিক আবেদ খান বেশ মুনশিয়ানার সঙ্গে তাঁর লেখায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের ওই সব নেতার কাজ ও খালেদার সঙ্গে সরকারী কর্মকর্তাদের মিটিং একই সূত্রে গাথা। এর সঙ্গে দ্বিমত হওয়ার কারো কোন কারণ নেই। তবে এর সঙ্গে এটুকু যোগ করতে হয়, পার্লামেন্টারি পার্টির যে নেতা এই ষড়যন্ত্র করেন তাকে কি আর পার্লামেন্টারি পার্টিতে রাখা উচিত। তাকে চিহ্নিত করা কি শেখ হাসিনার পক্ষে কঠিন কাজ হবে? বঙ্গবন্ধু ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে রেখে শুধু নিজে মূল্য দেননি, জাতি আজও মূল্য দিচ্ছে। শেখ হাসিনা ছাড়া এই মুহূর্তে বাঙালীর কোন বাতিঘর নেই। তাই জাতির ও দেশের স্বার্থে এ সব ষড়যন্ত্রকারীর বিরুদ্ধে শেখ হাসিনাকে কঠোর হতে হবে। এখানেও তাঁকে রবীন্দ্রনাথে বিশ্বাস করতে হবে, তাঁকে পালন করতে হবে- ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তোমার আদেশে। দেশ ও জাতির স্বার্থে শেখ হাসিনাকে এ দুর্বলতা কাটিয়ে নিষ্ঠুর হতেই হবে এক্ষেত্রে। অন্যদিকে শেরে বাংলা ভূস্বামী জমিদারী প্রথা বাতিল করেছিলেন, শেখ হাসিনাকে অবশ্যই নির্মূল করতে হবে দেশব্যাপী তাঁর দলে যে রাজনৈতিক জমিদার গড়ে উঠেছে তাদেরকে। এরাই শেখ হাসিনার সকল পরিশ্রম, সকল অর্জন সাধারণ মানুষের কাছে ঢেকে দিচ্ছে।

swadeshroy@gmail.com

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৪

১১/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: