আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিপর্যস্ত সুন্দরবন

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৪

মঙ্গলবার ভোরে পূর্ব সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে একটি জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যাওয়া জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল নদীর পানিতে মিশে যাওয়ার কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। ইতোমধ্যে সরকার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা কিভাবে রোধ করা যায় তার সুপারিশ দেবে আগামী ১৫ কর্মদিবসের ভেতরে। পানিতে মিশে যাওয়া তেলের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে তথা সুন্দরবন বাঁচাতে হলে এ মুহূর্তে জরুরীভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। সময়ক্ষেপণের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। প্রতি ঘণ্টাই মূল্যবান।

তেল ছড়িয়ে পড়া এলাকাটি সরকার ঘোষিত ডলফিনের অভয়ারণ্য। আট প্রজাতির ডলফিনের এই বিচরণ ক্ষেত্রটি জাতিসংঘ ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। আর সুন্দরবন হলো ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী এলাকাটি নৌযান চলাচলের জন্য নিষিদ্ধ। অথচ ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে নৌপরিবহন অধিদফতর বনের ভেতর দিয়ে বিকল্প এ নৌপথ চালু করে। ফলে সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয় কতিপয় আইন ও নিয়ম। এগুলো হলো বন আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জাতিসংঘের কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি (সিবিডি) এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিশনের নিয়ম। চলতি বছরেরই মে দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে নৌপথটি বন্ধের নির্দেশ দেন। নির্দেশটি মানলে আজ এত বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হতো না।

সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর পানিতে জ্বালানি তেলের উপস্থিতি জলজপ্রাণী, সুন্দরী গাছ এবং পশু-পাখির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সুন্দরবনের মতো শ্বাসমূলীয় বনের বৃক্ষরাজির শ্বাস গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় শ্বাসমূলের মাধ্যমে। তাই জোয়ারের সময় বনের মাটির ওপর ছড়িয়ে পড়া তেলের আস্তরণের কারণে গাছের শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হবে। এর ফলে গাছের জীবন মারাত্মকভাবে বিপন্ন হবে। বন অসুস্থ হলে বন্যেরা কীভাবে সুস্থ থাকবে?

অন্যদিকে তেলের উপস্থিতি নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস করবে। ফলে মাছসহ জলজপ্রাণী অক্সিজেন সঙ্কটে ভুগে মরণাপন্ন হতে পারে। সব মিলিয়ে সুন্দরবন ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য আজ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। এই অপূরণীয় ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হতো যদি জাহাজডুবির পরপরই জাহাজটি উদ্ধার এবং ছড়িয়ে পড়া তেল নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো। এখনও সে সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারী দফতরসমূহের কাছে পানিতে ভাসমান তেল অপসারণ বা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকার কথা। যদি তাতে ঘাটতিও থেকে থাকে সেক্ষেত্রে নৌবাহিনীর সহযোগিতা গ্রহণ করা যেতে পারে। এই বিপর্যয়ের মুখে বিপদ থেকে উদ্ধারই বড় কথা। প্রয়োজনে বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণও যুক্তিযুক্ত হবে বলে আমরা মনে করি।

শেষ পর্যন্ত নদীতে ছড়িয়ে পড়া জ্বালানি তেল অপসারণ বা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণের সূচনা হয়েছে। তেলের দূষণ নিয়ন্ত্রক রাসায়নিক দ্রব্য (অয়েল ডিসপারসেন্ট) নিয়ে জাহাজ ‘কা-ারি-১০’ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দুর্ঘটনাস্থলে রওনা দিয়েছে। ডুবে যাওয়া জাহাজটি উদ্ধারেও দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ আগেই পাঠানো হয়েছে। এখন দরকার সার্বিক তদারকি। সেই সঙ্গে তিন বছর আগে চালু হওয়া এই বিকল্প নৌপথটি বন্ধ এবং ভরাট হয়ে যাওয়া পূর্ববর্তী নৌপথটি চালুর ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী।

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৪

১১/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: