কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অনিশ্চিত গন্তব্যে আফগানিস্তান

প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৪
অনিশ্চিত গন্তব্যে আফগানিস্তান

পশ্চিমা শক্তিগুলো আফগানিস্তান থেকে সরে গেছে। সেই সঙ্গে সরে গেছে বেশিরভাগ বিদেশী লোকজন। এদের সিংহভাগই সাহায্যকর্মী। সাহায্য বাজেট সঙ্কোচন ও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতাই এর কারণ। যারা এখনও রয়ে গেছে, তারা প্রধানত সুরক্ষিত জায়গায় থাকছে, যেগুলো সাধারণ আফগানদের দৃষ্টিসীমার বাইরে। বছরখানেক আগেও যেসব রেস্তোরাঁ, বার ও অতিথিশালা জমজমাট ছিল, সেগুলো এখন ব্যবসার অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষভাবে এ অবস্থা হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় তালেবান আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৮ জন বিদেশী নিহত হওয়ার পর থেকে। বিদেশীরা চলে যাওয়ায় হাজার হাজার পাচক, ড্রাইভার ও দোভাষী চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে।

এক বছর আগে আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার। এখন তা মাত্র ১২ হাজারে দাঁড়িয়েছে। সাহায্য উদ্যোগ কমে আসার এটাই মূল কারণ। আর এই সাহায্য উদ্যোগ হ্রাস পাওয়ায় সব খাতের কাজকর্মে স্থবিরতা নেমে আসে। ২০০১ সালে মার্কিন হামলার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল জোরেশোরে । কিছু কিছু সামাজিক সূচকের যথেষ্ট উন্নতিও হয়েছিল। যেমন, নারী শিক্ষার হার তালেবানদের সময়ে ছিল ৩ শতাংশ। এখন তা ৩৩ শতাংশ। কিন্তু দারিদ্র্যের হার এক দশক ধরে ৩৬ শতাংশে আটকে আছে। কোথাও কোথাও বেড়েছে।

সহিংসতায় জর্জরিত আফগানিস্তান এশিয়ার দরিদ্রতম দেশ এবং বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ দেশগুলোর একটি। পাশ্চাত্যে দেশগুলো নিজেরাই আজ অর্থনৈতিক সঙ্কটগ্রস্ত হওয়ায়, আফগানিস্তানের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এমন একটি দেশকে মোটামুটিভাবে সুন্দর একটি দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে আফগানদের কয়েক দশক সময় লাগবে। তবে দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ঠিকমতো মোকাবেলা করতে না পারলে, এতদিনের সব অর্জন ব্যর্থ হয়ে তো যাবেই, এমনকি দেশটার অন্ধকার অতীতে ফিরে যাওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রধান দু’পক্ষ পশতু ও তাজিকদের মধ্যে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব প্রশ্নে সমঝোতা হয়েছে। দু’পক্ষই মিলিতভাবে রাজি হয়েছে সরকার গঠন করতে । সেই হিসেবে পশতু নেতা আশরাফ গনি হয়েছেন প্রেসিডেন্ট এবং তাজিক নেতা আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এই সমঝোতা কতদিন টেকে, সেটাও প্রশ্ন। আগামী বছর হবে পার্লামেন্ট নির্বাচন। তারপরই সমঝোতার প্রকৃত রূপটি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। অথচ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দেশটার অনেক কিছু, বিশেষ করে এর অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভরশীল। বলাবাহুল্য, দেশটার অর্থনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ও গু-ামির সংক্রমণ ঘটেছে। মাদক ব্যবসা মোট জিডিপির ১৫ শতাংশ। শক্তিশালী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ না থাকলে, এমন অর্থনীতি সামাল দেয়া কঠিন।

তালেবান শাসনোত্তর প্রথম দশকে অর্থনীতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৯ শতাংশ। সরকারের আয় ২০০২ সালে জিডিপির ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১১ সালে সাড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদ্রোহী তৎপরতায় অর্থনীতির প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। এ বছর প্রবৃদ্ধির হার দেড় শতাংশে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাতে করে বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৫০ কোটি ডলার। এই ঘাটতি পূরণের জন্য দাতাদের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে হবে। আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল। ২০১৩ সালের জুনে ন্যাটো বাহিনীকে ফ্রন্টলাইন থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার পর থেকে ন্যাটোর গড়ে দেয়া সাড়ে তিন লাখ সদস্যের আফগান বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে বটে, তবে তালেবানদের মোকাবেলায় তারা মোটেও যথেষ্ট নয়।

গত দুই বছরে তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধে এই বাহিনীর ৯ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। অর্থাৎ, ১৩ বছরে ন্যাটো বাহিনীর যত সৈন্য নিহত হয়েছে, তার প্রায় তিনগুণ। প্রত্যন্ত এলাকাগুলো তালেবানরা নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের শক্তি ক্রমশ বাড়ছে এবং অচিরেই নতুন নতুন এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে। প্রেসিডেন্ট গনি যদিও আলোচনার মাধ্যমে তালেবানদের সঙ্গে একটা শান্তি সমঝোতা আশা করেন, তথাপি আফগান সরকারের অস্তিত্বের প্রতি তালেবানরা একটা হুমকি হিসেবেই থেকে যাবে। অন্যদিকে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তালেবানদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। কারণ, যে বাহিনীর নেতৃত্বের সদর দফতর পাকিস্তানে, সে বাহিনীকে পরাভূত করার উপায় নেই। সুতরাং তালেবান হামলা, বেআইনি মাদক ব্যবসা, ও বিভিন্ন দুর্বৃত্তচক্রের কর্মকা- আফগান সরকারকে ক্রমশ অচল করেই তুলবে।

সূত্র : দি ইকনোমিস্ট

প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৪

১০/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: