মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

গার্মেন্টে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় সম্ভব

প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৪
  • এ্যাপারেল সামিট শেষে লক্ষ্য অর্জনের ৬ বাধা শনাক্ত

রহিম শেখ ॥ ২০২১ সালের মধ্যে পোশাক শিল্পে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এ খাতের উদ্যোক্তা সংগঠন বিজিএমইএ। গত এক দশকে পোশাক শিল্পের আধুনিকায়নের ফলে কিছু সমস্যা দূর হলেও এ লক্ষ অর্জনে এখনও প্রধান ৬টি বাঁধা রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হ্রাস, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সার্বিকভাবে পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এ্যাপারেল সামিটে অংশ নিতে বাংলাদেশে আসা বিদেশী উদ্যোক্তা, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বিশেষ্টজনরা এসব কথা বলেছেন। তাঁরা জোর দিয়েছেন দক্ষ শ্রমিক তৈরি, গার্মেন্টসে সংস্কার ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ওপর। তবে সার্বিকভাবে অবকাঠামো উন্নয়নে আগামী এক দশকে সাত হাজার ৪০০ কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে হবে বাংলাদেশকে। সেমিনারে অংশ নিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তারা বলেছেন, বিদেশী ক্রেতাদের কাছে চাই পোশাকের ন্যায্যমূল্য এবং সরকারের কাছে চাই প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা।

সোমবার শেষ হওয়া এ্যাপারেল সামিট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি আতিকুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকা- ও রানা প্লাজা ধসের প্রভাবে গত বছর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা অতিক্রম করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও ওই সময় শিল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর পরও ১ বছরে ১১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে পোশাক শিল্পের। অনুকূল পরিবেশ পেলে বাংলাদেশী পোশাক রফতানিতে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি অর্জনের রেকর্ড রয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশী ক্রেতাদের আস্থা ফেরাতে এ্যাপারেল সামিটের আয়োজন করা হয়। তিনি বলেন, তিন দিনের সেমিনারের ৯টি সেশনে অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হ্রাস, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সার্বিকভাবে পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সামিটে অংশ নেয়া বিদেশী অতিথিরাও স্বীকার করেছেন এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব হলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় সম্ভব বলে আতিকুল ইসলাম জানান। তিনি আরও বলেন, তিন দিনের সেমিনারে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্তভাবে কীভাবে গার্মেন্টস সেক্টরকে এগিয়ে নেয়া যাবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। সামিটে আসা বিদেশী ক্রেতাদের ১১টি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে গার্মেন্টসগুলোয় সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

জানা গেছে, বিগত কয়েক বছরে দেশের পোশাক কারখানায় ঘটে যায় রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারান কয়েক হাজার নিরীহ শ্রমিক। এতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বিদেশী ক্রেতারা। যার ফলে হুমকির মুখে পড়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প। এই সঙ্কট কাটাতে বিদেশীদের কাছে দেশীয় গার্মেন্টস মালিকদের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরতে সচেষ্ট হয় পোশাক মালিক ও রফতানিকারকরা। যার অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয় ঢাকা এ্যাপারেল সামিট ২০১৪। তিন দিনব্যাপী এ্যাপারেল সামিট শেষ হয়েছে সোমবার। অনুষ্ঠিত হয়েছে ৯টি বিশেষ সেমিনার। সামিটে অংশগ্রহণ করেছে ৭৬টি দেশী-বিদেশী কোম্পানি। সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। সেমিনারের বিষয়গুলো ছিল ‘বাংলাদেশ আরএমজি ২০২১-রিচিং ফিফটি বিলিয়ন অন ফিফটিয়েথ এ্যানিভার্সারি অব বাংলাদেশ’ ‘এ কোলাবরেটিভ এ্যান্ড কো-অর্ডিনেটেড এ্যাপ্রোচ’, ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার দ্য রোড টু চিটাগং এ্যান্ড বিয়ন্ড’ ও ‘এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি এ মাস্ট।’ সোমবার এক সেমিনারে উত্তরা আমেরিকায় বাংলাদেশের পোশাকের ক্রেতাদের জোট এ্যালায়েন্সের বোর্ড সদস্য ও বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বলেন, ভারত ও চীনের মতো বাংলাদেশকে তৈরি হতে হবে। অবকাঠামোর উন্নয়ন দ্রুতগতিতে করতে হবে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা যাতে ব্যবসা করে মুনাফা করতে পারেন, সে বিষয়ে আশ্বস্ত করতে হবে। এ্যালায়েন্স প্রধান এলেন টশার বলেন, তাজরীন ও রানা প্লাজায় বিপর্যয়ে ব্র্যান্ড হিসেবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গার্মেন্টসের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে বর্তমানে কাজ চলছে। এতে সরকারকে আরো উদ্যোগী হতে হবে। বাংলাদেশে এ্যালায়েন্সের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে কারখানার মানোন্নয়নে এ্যালায়েন্স ৫ কোটি ডলার ব্যয় করবে। ওই সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, আগামী তিন বছরে দেশের সব পোশাক কারখানা অগ্নি, স্থাপত্য কাঠামো ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় কমপ্লায়েন্ট হবে। এজন্য সরকার নিরাপত্তা সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক সুবিধাসহ বিভিন্ন নীতিসহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তাজরীন, রানা প্লাজার ঘটনা আমাদের জন্য ‘ওয়েক আপ কল’ ছিল।

তিন দিনের এ্যাপারেল সামিটের অধিকাংশ সেশনে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারের বিষয়টিও উঠে আসে। রবিবার বিকেলে এক সেমিনারে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ব্যাংকের উচ্চ সুদ হার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের সুদ হার সবচেয়ে বেশি। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এরই মধ্যে ৫০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আরও ৫০০ বন্ধের পথে। এ খাতের আরও প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় সম্ভব হবে না। সোমবার সন্ধ্যায় তৃতীয় অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ছিল পরিবেশ। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর আতিউর রহমান প্রধান অতিথি ছিলেন। তিনি ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারের বিষয়ে কথা বলেন। ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য থাকার পরও সুদের হার কেন কমছে না এমন প্রশ্নের জবাবে আতিউর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার জোর করে কমাতে চায় না। জোর করা হলে সাময়িকভাবে সুদের হার কমবে, দীর্ঘ মেয়াদে তা টেকসই হবে না। বরং মূল্যস্ফীতি কমলে সুদের হার স্বাভাবিকভাবে কমে আসবে।

সেমিনারে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ‘দায়িত্বশীল নিরবচ্ছিন্ন পণ্য সরবরাহে অধিকতর সাহায্যকারী কী হতে পারে’ এমন প্রশ্ন সম্পর্কিত তাৎক্ষণিক ভোটাভুটিতেও ন্যায্যমূল্য পরিশোধের বিষয়টি অধিক ভোটে এগিয়ে থাকে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জানান, বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলো সস্তায় পণ্য বিক্রি করতে চায়। বাংলাদেশ তাদের সাহায্য করে। কারণ বাংলাদেশ কম মজুরিতে তাদের পণ্য তৈরি করে। গত ১০ বছরে বিভিন্ন পণ্যে দাম বাড়লেও ক্রেতারা তাদের পণ্যের দাম বাড়ায়নি। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে পোশাক কারখানাগুলোর কাজের পরিবেশ উন্নত করার জন্য এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্স কাজ করে যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করলেও তারা কারখানাগুলোকে সার্টিফিকেট ইস্যু করে না। সার্টিফিকেট দিলে বিদেশী ক্রেতারা ওই কারখানার প্রতি আগ্রহ দেখাতে পারে।

তিনদিনের এ্যাপারেল সামিটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। সোমবার দুপুরে মেলায় অংশগ্রহণকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য চাপ দেয় বিদেশী ক্রেতাদের সংগঠন এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্স। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করা হবে না বলেও চাপ দেয়া হয়েছে। এ কারণে দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা জোরদার করতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এবারের সামিটে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রাংশের স্টল বা প্যাভিলিয়ন বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের ডেপুটি ডিরেক্টর মামুন মাহমুদ জানান, দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ দেয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা নিরাপদ পরিবেশের মধ্যে একটি। এই মেলার মাধ্যমে গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। এর পাশে দেখা বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির প্যাভিলিয়নে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ডিসপ্লে চোখে পড়ার মতো। ডিসপ্লেতে ছোট পণ্যের মধ্যে আছে ফায়ার হাইড্রেন্ট ও স্পিংকলার সিস্টেম, ফায়ার রেটেড ডোর, অটোমেটিক ফায়ার ডিটেকশন, ফায়ার হাউস রিল ইউনিট, ফায়ার বেল। বড় যন্ত্রাংশের মধ্যে আছে ফায়ার পাম্প, গ্যাস সাপোজিশন, ফায়ার হাউস পাইপ ইউনিট। কোম্পানির বিল্ডিং সলিউশন ইউনিট এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর এস এম শাহজাহান সাজু। অলিম্পিয়া ফায়ার প্রটেকশন কোম্পানিও অগ্নিপ্রতিরোধক যন্ত্রপাতি নিয়ে স্টল দিয়েছে। এ কোম্পানি মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, চীন থেকে অগ্নিপ্রতিরোধ যন্ত্রাংশ আমদানি করে থাকে। দেশের চাহিদার কথা বিবেচনা করেই তারা বিভিন্ন দেশের পণ্য বাজারে আনছে বলে জানান কোম্পানির ব্যবস্থাপক মিরান হোসেন। তিনি বলেন, ইউকে থেকে আমরাই দেশে প্রথম অগ্নিনির্বাপক পণ্য এনেছি। গ্রাহকরা আমাদের পণ্যের গুণগত মান ভাল বলেই আস্থা রাখছে। এ আস্থার কারণে আমাদের সাপ্লাই ভাল হয়েছে।

প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৪

১০/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: